লোকসভা নির্বাচন-২০১৯

শক্তিশালী নেতৃত্বকেই বেছে নিলেন ভারতীয়রা

  এম হুমায়ুন কবির ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দৃষ্টিপাত

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের যে প্রবণতা তাতে মনে হচ্ছে বিজেপি গতবারের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে কিছু বিষয় রয়েছে যেমন- ভারতীয় ভোটাররা মনে করেন মোদি সরকার অনুমোদনযোগ্য। এছাড়া ভারতের জনগণ মনে হয় দৃঢ় নেতৃত্বে আস্থা রাখতেই পছন্দ করছেন।

সেক্ষেত্রে মোদির নেতৃত্ব, তিনি যেভাবে গত পাঁচ বছর সরকার পরিচালনা করেছেন সেটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান, বিশেষত জঙ্গি হামলার জবাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলার বিষয়গুলোকে ভারতের এগিয়ে যাওয়া হিসেবে মনে করছেন দেশটির ভোটাররা।

ভারতের বড় শক্তি ছিল বৈচিত্র্য। তারা একে এতদিন গুরুত্ব দিত। ধর্মীয়, জাতিগত ও ভাষা-সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে ভারতে যে কাঠামো দাঁড়িয়েছিল, সেটার প্রতি ভারতের বেশির ভাগ মানুষের আর আস্থা নেই বলে নির্বাচনের ফলাফলের প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে। বিপরীতে একটি ধর্ম-সংস্কৃতি, শক্তিশালী নেতৃত্ব ও এক ধরনের অর্থনৈতিক ধাঁচের প্রতি ভারতের বেশির ভাগ মানুষের সমর্থন দেখা যাচ্ছে।

কারণ বিগত বছরগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা হিন্দুদের ভালনারেবল হিসেবে তুলে ধরার যে ন্যারেটিভ বিজেপি নিয়েছে, সেটা কাজে দিয়েছে। মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে। ভারতের জনগণের এ ইচ্ছাকে আমাদের সম্মান জানাতে হবে। তবে ভবিষ্যতে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটা দেখার বিষয়।

আমার ব্যক্তিগত মত হল, মোদি সরকার গঠন করলে ভারতের বিভিন্ন বৈচিত্র্য, ধর্ম-বর্ণ-সংস্কৃতি ইত্যাদিকে কীভাবে একসঙ্গে দাঁড় করানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। না হলে উন্নয়নের সুষম বণ্টন হবে না, সুফল কমে যাবে। বিভাজন থেকে বের হয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। দেশের অভ্যন্তরের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এগোতে হবে।

কারণ ভারত এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় দেশ। ২০১৪ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিবেশীদের নিয়ে চলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন মোদি; কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ভারতের যে আকাক্সক্ষা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে, সেদিকে এগিয়ে যেতে হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়টা যদি দেখি, বিগত ১০ বছরে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। প্রথমে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোটের পাঁচ বছর, তারপর বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের পাঁচ বছরে সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। বিজেপি দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করলেও সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। আমাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়গুলো ঠিক থাকবে। আমাদের যে প্রত্যাশা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পণ্য রফতানি, বিনিয়োগ ইত্যাদি আরও কার্যকর হবে এবং প্রসার ঘটবে বলে আমরা আগাম আশাবাদ ব্যক্ত করি।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের আশা রয়েছে। এবার রাজ্য সরকারে মমতার তৃণমূলই ক্ষমতায় থাকছে, অন্যদিকে কেন্দ্রে আরও শক্তিশালী হয়ে আসছে মোদি সরকার। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে মমতার আপত্তি ছিল এবং আছে। আমি মনে করি, কেন্দ্রে শক্তিশালী সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব সাহসী ভূমিকা নিতে পারে এক্ষেত্রে। সেটি হলে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের বিস্তৃতি ও গভীরতা আরও বাড়বে।

এবার ভারতের অভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গ। কংগ্রেস দেশটির স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দেয়া এবং স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা দল হলেও ২০১৪ ও এবারের নির্বাচনে দেখা গেছে ভারতের নতুন প্রজন্ম দলটিতে আর আস্থা রাখছে না। দুই বার বিষয়টির প্রমাণ তারা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে আমার মনে হয়, কোনো ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য সবসময় একটি দল বা গ্রুপের প্রতি সমান সমর্থন থাকবে, তেমনটি নয়। এছাড়া বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে ভালো নেতৃত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। মোদির উত্থান, সাবলীল ও পরিবর্তনমুখী নেতৃত্ব তারা নিয়ে আসতে পেরেছে, যাতে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে কংগ্রেস পারিবারিক কাঠামোয় আটকে আছে। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রের নেতৃত্ব মানুষকে আর আকৃষ্ট করতে পারছে না। এছাড়া মোদির নেতৃত্বে এনডিএ জোটের বিপরীতে কংগ্রেস ভালো ঐক্য গড়ে তুলতে পারেনি এবং ঐক্য প্রয়াসে মনোযোগীও হতে পারেনি। রাহুল তেমন কিছু দেখাতে পারেননি। মানুষ ধরে নিয়েছে যে, কংগ্রেসের শক্তিশালী কোনো নেতা নেই। কংগ্রেস জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবে- নির্বাচনী প্রচারণায় এমন প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন এবং কংগ্রেস থেকে স্পষ্ট কোনো জবাব দেয়া হয়নি। এসব কারণে দলটি ভালো করতে পারেনি। যদিও ফলাফলের প্রবণতা বলছে, ২০১৪ সাল থেকে এবার কিছুটা ভালো করবে রাহুলের কংগ্রেস।

মোদি সরকার আবারও শক্তিশালীভাবে ফিরে আসতে যাচ্ছে- এতে সংখ্যালঘুদের জন্য স্বস্তির কোনো বার্তা নেই। তবে আমি মনে করি, প্রথমবারের চেয়ে এবার তারা ভিন্ন অবস্থান নেবে। ধর্মীয়, জাতিগত ও জাতপ্রথাগত সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করতে হবে। কারণ একশ্রেণীর ও একমুখী ভারত সম্ভব নয়। উন্নত হতে হলে সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। সংখ্যালঘুদের আশ্বস্ত করতে হবে। অন্যথায় বিভাজন বাড়বে এবং সামাজিক অস্থিরতা আরও বেশি হারে তৈরি হবে।

হিন্দুত্ববাদের উত্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে কেবল হিন্দুত্ববাদ কেন, ভারতে যে কোনো ধরনের চরমপন্থার উত্থানই আমাদের জন্য উদ্বেগের। এতে সবার নিরাপদ থাকার বিষয়টি ঠিক থাকে না। আমরা চাই না ভারতের যে কোনো ঘটনাবলি আমাদের এখানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলুক। সবশেষে, মমতা ও মায়াবতীসহ অনেক আঞ্চলিক দল সরকার গঠনের নিয়ামক হতে চাইলেও ফলাফলের প্রবণতা বলছে তেমনটি হচ্ছে না। কারণ এটি জাতীয় নির্বাচন আর এতে জাতীয় নিরাপত্তা ও শক্তিশালী নেতৃত্বকেই ভারতীয় ভোটাররা বিবেচনায় নিয়েছেন, আঞ্চলিক ইস্যুগুলোকে নয়। কিছুদিন আগেও কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে হারার পর লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিজেপির জয়জয়কার তো সে কথাই বলছে।

এম হুমায়ুন কবির : সাবেক কূটনীতিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×