ভারতের নির্বাচনের ফল ঘোষণা, অতঃপর

  পবিত্র সরকার ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের জাতীয় নির্বাচন

আমি যে সবজান্তা নই এবং ভারতীয় ভোটারদের মন বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি, একথা নিষ্ঠুরভাবে প্রমাণিত হওয়ার কি কোনো আনন্দ আছে? কিংবা নিজের পছন্দসই যোগ্য প্রার্থীদের বিপুল পরাজয় দেখার আনন্দ? নিজের মতাদর্শের বিলয়ের সমূহ সম্ভাবনা দেখার আনন্দ?

যুগান্তরের পাঠকরা দেখতেই পাচ্ছেন, নির্বাচনের আগে ধৈর্যচ্যুতি ঘটানো দীর্ঘ লেখায় আমি যে হিসাব এবং যে আশা করেছিলাম, ভারতে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ ঝড় তাকে আপাদমস্তক পর্যুদস্ত করে দিয়েছে। ভারতে বিজেপি একাই ৩০৪টি সিট জিতে এ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, তার শরিকরাও পেয়েছে ৪৪টি সিট। মোট ৫৪২টি সংসদ আসনে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে?

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু আর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে টেক্কা দিয়েছেন মোদি। বিজেপি শিবিরে এখন আবিরখেলা এবং লাড্ডু-ভক্ষণের উৎসব হলে তাকে আমাদের সম্ভ্রমের চোখেই দেখতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদি হতে চলেছেন ভারতের বিপুল ক্ষমতাধর এক শাসক। এ তাকে আত্মবিশ্বাস তো দেবেই, ঔদ্ধত্য দিলেও দিতে পারে। জনগণ তাকে সেই অধিকার দিয়েছে।

আমার তুচ্ছ সান্ত্বনা এই যে, একা আমি মূর্খ প্রমাণিত হইনি, আরও অনেক মহা-মহাব্যক্তি, রথী-মহারথী, রাজনীতি ও মিডিয়ার দেবদেবীদের সঙ্গে আমার পোড়াকপাল আমি ভাগ করে নিয়েছি। নির্বাচনের আগে তারাও এরকম কিছু আশা করেননি।

সত্যি বলতে কী, নির্বাচনের আগেকার হিসাব, আর নির্বাচনের ঠিক পরবর্তী এগ্জিট বা নির্গমন পোলের মধ্যে এমন বিপুল পার্থক্য আগে কখনও দেখা যায়নি। সেই কারণেই নির্গমন ভোটে যখন শ্রী মোদি ও বিজেপির ঢালাও জয় নির্দেশ করা হল, তখনও আমাদের কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। এখন গণনা শেষ, বাস্তবটি আমাদের সামনে দন্ত-বিকশিত অবস্থায় খাড়া, আমরা তাকে নিয়ে কী করব তাই ভেবে হাবুডুবু খাচ্ছি।

অথচ লক্ষণগুলো কিন্তু ভুল ছিল না। মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে বিধানসভা নির্বাচন, অন্যান্য কয়েকটি উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয় হয়েছিল, পশ্চিম ভারতে কৃষকের অসন্তোষ প্রকাশ্য পথে নেমে ক্ষোভ দেখিয়েছে, চাষীদের আত্মহত্যা থামেনি, রান্নার গ্যাস, গাড়ির পেট্রোল-ডিজেলের দাম বেড়েছে, ফলে গরিবের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়েছে।

রাফালের দুর্নীতি নিয়ে মোদিজি নিজে অস্বস্তিতে পড়েছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, লাখ লাখ কোটি টাকা ব্যাংকের ঋণ নিয়ে তার বন্ধুস্থানীয়রা কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তার নোট বাতিলে আর সাধারণ বিক্রয় কর (জিএসটি) বসানোর সিদ্ধান্তে ছোট ব্যবসায়ীরা প্রচুর মার খেয়েছেন, নোট বদলানোর লাইনে দাঁড়িয়ে একশ’র বেশি মানুষ মারা পড়েছেন।

তার প্রতিশ্রুতি মতো কোনো ফলই ভারতবাসী পায়নি; কালো টাকা উদ্ধার করে প্রত্যেক ভারতীয়ের অ্যাকাউন্টে পনেরো লাখ টাকা জমা হয়নি, ‘অচ্ছে দিন’ আসেনি, ‘স্বচ্ছ ভারত’ মানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভারতও মুখ দেখায়নি; এ দেশের বস্তি, রাস্তাঘাটের আবর্জনা যেমন ছিল তেমনই আছে।

আর আমাদের মতো তথাকথিত ‘বুদ্ধিজীবী’দের কাছে যেটা সবচেয়ে ধিক্কারজনক ছিল সেটা হল বিজেপি, আরএসএস, সংঘ পরিবার ইত্যাদির মতাদর্শগত অবস্থান। দেশকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়ে তারা ভোট চেয়েছে।

গো-মাতাকে রক্ষা করার নাম করে তারা মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে, নাথুরাম গডসকে মহান শহীদ বানিয়েছে, এ আমলে একাধিক যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবীর (দাভোলকর, পানসারে, গৌরী লঙ্কেশ) হত্যা ঘটেছে, বিজ্ঞান কংগ্রেসে আজগুবি পৌরাণিক গল্পকে বিজ্ঞানের মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে (যেমন গণেশের কাঁধে হাতির মাথা বসানো হয়েছিল প্লাস্টিক সার্জারি করে কিংবা রাবণের লঙ্কার বিমানবন্দরে ২৪ রকমের বিমান ছিল) এবং এমনও বলা হয়েছে, হিন্দুরা কখনও সন্ত্রাসবাদী হতে পারে না।

যদিও রাজস্থানে মালদহের শ্রমিককে যারা পোড়ালো বা ‘গো-মাংস’ রাখার দায়ে যাদের হত্যা করা হল তাদের ধর্ম কারও অজানা নয়। তার ওপর পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের জিগির এবং যুদ্ধের সাফল্য সম্বন্ধে সন্দেহজনক নানা দাবি। দেখা গেল, সেসব প্রচারে এবং নেতাদের অতিনাটকীয় ধরন-ধারণ ও বক্তৃতায় ভারতের মানুষ মুগ্ধ হয়েছেন এবং বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন।

আমাদের আশা-প্রত্যাশা-মতামতকে জনগণ ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন। অমর্ত্য সেন বিদেশে বসে বলেছেন, ভারতের মানুষ অশিক্ষিত আর মূর্খের মতো ভোট দিয়েছে। কিন্তু তা বললে তো কোনো সমাধান হয় না। এজন্যই তো জনগণকে রাষ্ট্র সাক্ষর বা ‘শিক্ষিত’ (দুয়ের মধ্যে যথেষ্ট তফাৎ আছে) করার জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেয় না, ভাবে এরা যতদিন কম কম বুঝবে, ততদিনই আমাদের লাভ।

পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির বিপুল উত্থান ঘটেছে। কোনো কোনো পক্ষ থেকে এখানকার মুখ্যমন্ত্রীকে ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রক্ষেপ করা হচ্ছিল, আপাতত সে চেষ্টা আশা করি স্থগিত থাকবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এমন ধূমকেতু-প্রতিম উত্থানের কারণ কী?

পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা পত্রিকা, যারা তৃণমূলকে কিছুটা সমর্থন করতে শুরু করেছিল, তাদের আজকের দ্বিতীয় সম্পাদকীয় থেকে একটু উদ্ধৃত করি : ‘‘অপশাসনের পিছনে রহিয়াছে গভীরতর ব্যাধি। শাসক দলেই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি এবং ঔদ্ধত্য ও তজ্জনিত গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। দুর্ভাগ্যের কথা, গত আট বছরে দলের আগাছা সাফাইয়ের কাজ কোনো গুরুত্ব পায় নাই। সিন্ডিকেট হইতে গরু পাচার, অবৈধ বালির ব্যবসা হইতে মাটির চোরাকারবার, বিবিধ অনাচারের সহিত তৃণমূল কংগ্রেসের নাম জড়াইয়া আছে। মানুষ দেখিয়া আসিতেছে। দেখিতেছে, প্রশাসন কীভাবে দলের নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছে, পুলিশের নিরপেক্ষতা ভাসিয়া গিয়াছে খালবিলে। তাহার সহিত যুক্ত হইয়াছে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’-এর দায়।’’

পত্রিকাটি ইমাম ভাতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছে (শ্মশানে পুরোহিতদের ভাতার কথা করেনি) এবং একথাও বলেছে যে, সাধারণভাবে সংখ্যালঘু সমাজের তাতে উপকার হয়েছে কিনা সন্দেহ। যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের একটা বড় সংখ্যার ভোটার যে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভোট লুটের অপমান আর গ্লানির বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী একটা দলের আশ্রয় চেয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তাদের মধ্যে বামপন্থী ভোটার নেই এমন দাবি বামপন্থীরা করবেন না মনে হয়। আমাদের কাছে সংকটটা হল রাষ্ট্রযন্ত্রের সাম্প্রদায়িকীকরণ, যা সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের লক্ষণ, গণতন্ত্রের নয়।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কী সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ বয়ে আনছে তা ভাবা কঠিন। হয়তো মোদিজি এবং তার সরকার আগের মতোই সুসম্পর্ক রক্ষা করবেন। আগের আমলে বাংলাদেশ সম্বন্ধে বেশকিছু বন্ধুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকা দরকার। আর তিস্তার জলবণ্টন চুক্তির জন্য মমতার প্রতিরোধকে আরেকটু দুর্বল করা যাবে।

কিন্তু একটা রাষ্ট্র, উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ আর শক্তিশালী রাষ্ট্র, ধর্মের নিশান নিয়ে খাড়া হলে অন্য রাষ্ট্রের উপরেও, বিশেষত বাংলাদেশের উপরেও যে নেতিবাচক চাপ পড়বে সে তো কারও অজানা নয়। বিশেষত, এনআরসি বা নাগরিকত্বের পরিচয় নিয়ে নানা রাজ্যে ঝামেলা তৈরি হলে তার চাপও বাংলাদেশের উপর পড়বে এবং বাংলাদেশে প্রতিকূল জনমত তৈরি হবে।

আর বামপন্থীদের এ দুর্দিনে তাদের আত্মানুসন্ধানও অপরিহার্য। ‘শিকল ছাড়া আর কিছু হারাবার নেই’ কথাটায় ভুল নেই; কিন্তু সুখ-দুঃখে মানুষের কাছাকাছি থেকে, তাদের সমাজ, ইতিহাস আর মতাদর্শের শিক্ষা দিয়ে, আবার সংসদীয় ক্ষমতায় ফেরা কত কঠিন, তা নিশ্চয়ই তারা উপলব্ধি করছেন। বিশ্বায়িত এ ‘পয়সার সাধনা’মগ্ন পৃথিবীতে সে চেষ্টা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×