শতফুল ফুটতে দাও

নজরুল-সুকান্ত ও কৃষকের ঈদ

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ২৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদ

কবি সুকান্ত মুখোপাধ্যায় ক্ষুধাজর্জর এই পৃথিবী থেকে কবিতাকে ছুটি দিতে চেয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন-

‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’

কবি যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা হল ক্ষুধাপীড়িত এই পৃথিবীতে কাব্যচর্চা হয় না। কাব্যচর্চার জন্য চাই শোক-দুঃখ ও জরামুক্ত এক পৃথিবী। আমরা জানি, যুগে যুগে কবিরা শুধু আনন্দের গান গাননি, তারা গেয়েছেন মানুষের হৃদয়ের অন্তর্নিহিত বেদনা, ক্ষোভ ও বঞ্চনা নিয়ে। সুতরাং আনন্দের অনুভূতি যেমন মহৎ কাব্যের জন্ম দিতে পারে, তেমনি দুঃখ-বঞ্চনাও জন্ম দিতে পারে মহৎ কাব্যের। তবে পৃথিবীর অনেক শ্রেষ্ঠ কাব্যের জন্ম হয়েছে গভীর বেদনাবোধ থেকে। সুখের মিলনের অনুভূতি হয় ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দুঃখ হৃদয়ে যে দাগ কাটে তা সহজে মুছে যায় না।

পূর্ণিমার চাঁদ ও পূর্ণিমার রাতের দৃশ্য নিয়ে অনেক কবি চমৎকার সব কবিতা রচনা করেছেন। কিন্তু ক্ষুধাক্লিষ্ট মানুষের কাছে পূর্ণিমার চাঁদ তার অপরূপ রূপে ধরা দেয় না। তার কাছে মনে হয় ওই চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি। জঠরে যখন ক্ষুধা তখন মহৎ কোনো ভাবনা হৃদয়ে কোনো ঠাঁই পেতে পারে না। ওই সময় ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য এক টুকরো ঝলসানো রুটি হয় পরম আকাঙ্ক্ষার বস্তু।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার, উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি শিশু-পাঁজরের হাড়?’ কবি নজরুল এং কবি সুকান্ত যেন একই ভাবনার ধারায় মিশে গেছেন। সুকান্তের চোখে পূর্ণিমার চাঁদ ধরা দিয়েছিল ক্ষুধাক্লিষ্ট গরিবের জন্য ঝলসানো রুটি হয়ে। অন্যদিকে কবি নজরুল ঈদের চাঁদকে দেখেছেন কৃষকের মৃত শিশুর পাঁজরের হাড়ের মতো। পাঁজরের হাড় যেমনি বাঁকা, রমজানের শেষে যে ঈদের চাঁদ ওঠে, সেটিও পাঁজরের হাড়ের মতোই বাঁকা। কৃষকের এই সন্তান অকালমৃত্যুর কাছে হার মেনেছে। জীবদ্দশায় তার বাবা-মা তাকে এক বিন্দু দুধ দিতে পারেনি। অপুষ্টিতে অনাহারে শিশুটির মৃত্যু ঘটেছে। কবি আরও লিখেছেন,

‘আসমান-জোড়া কাল কাফনের আবরণ যেন টুটে এক ফালি চাঁদ ফুটে আছে, মৃত শিশু অধর পুটে। কৃষকের ঈদ! ঈদগাহে চলে জানাজা পড়িতে তার, যত তকবির শোনে বুকে তার ততো উঠে হাহাকার! মরিয়াছে খোকা, কন্যা মরিছে, মৃত্যু-বন্যা আসে।

এজিদের সেনা ঘুরিছে মক্কা-মসজিদে আশপাশে।’

একদিকে ঈদের চাঁদ যেন মৃত খোকার পাঁজরের হাড়ের মতো, অন্যদিকে মৃত শিশুটির ঠোঁট দুটি যেন এক ফালি চাঁদের মতোই ফুটে আছে। প্রকৃতির বিরল সুন্দর ছবিগুলো কীভাবে অভাব-অনটন-দুঃখ-দারিদ্র্যের সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠতে পারে সেই দৃশ্য তুলে ধরার ক্ষমতা সুকান্ত বা নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। কারণ তাদের জীবনের অভিজ্ঞতায় ছিল অভাব-অনটনের কশাঘাত আর ক্ষুধার কষ্ট। এমন ভাবনা অন্য কোনো কবির পক্ষে ভাবা সম্ভব নয়। সারা জীবনে শুধু অবিমিশ্র সুখ ও আনন্দের অনুভূতিতে কাল কাটিয়েছে, নজরুলের ভাবনা বড়ই মর্মস্পর্শী। একই কবিতায় তিনি আরও লিখেছেন,

‘বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিম আসমানে, লুকাইয়া আছো লজ্জায় কোন মরুর গরস্তানে। হের ঈদগাহে চলিছে কৃষক যেন প্রেত কংকাল, কসাইখানায় যাইতে দেখেছো শীর্ণ গরুর পাল? রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু সলিলে হয়, বেলাল! তোমার কণ্ঠে বুঝির আজান থামিয়া যায়! থালা, ঘটি, বাটি বাধা দিয়ে হের চলিয়াছে ঈদগাহে, তীর-খাওয়া বুক, ঋণে বাধা শির লুটাতে খোদার রাহে।’ ইচ্ছা হয় ভাঙা ভাঙা উদ্ধৃতির পরিবর্তে কাজী নজরুল ইসলামের ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতাটি পুরোটাই তুলে ধরি।

পাঠক যদি পুরো কবিতাটি পড়ে দেখতে চান তাহলে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত এবং আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘নজরুল রচনাবলী’ তৃতীয় খণ্ড খুঁজে দেখতে পারেন।

আজ যখন (১৬ রমজান ১৪৪০) যুগান্তরের জন্য নির্দিষ্ট কলাম লিখছি, তার দু-সপ্তাহের মধ্যে এবারের ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। সেই ঈদুল ফিতর কি কাজী নজরুল ইসলাম অংকিত ঈদের ছবি থেকে ভিন্ন ধরনের কিছু হবে? একথা অনস্বীকার্য যে, কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশশাসিত এবং জমিদারপীড়িত বঙ্গদেশে বসে যা লিখেছিলেন তা হয়তো পুরোপুরি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। এই বাংলাদেশে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ১৯৭২ সালে এদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৭২ ডলার। সেই সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী। হতদরিদ্রের সংখ্যাও ছিল ৪০ শতাংশেরও বেশি। সময়ের বিবর্তনে দরিদ্রের হার কমেছে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এখনও ৪-৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম দুই দশকে কৃষিই ছিল অর্থনীতির প্রধান খাত। এরপর কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৮-১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে অর্থনীতির প্রধান খাত হল সেবা খাত। এ খাত থেকে জিডিপিতে অবদান ৫২ শতাংশের মতো। বাকিটা আসে শিল্পখাত থেকে। সেবা খাতের অন্যতম দুর্বলতা হল এর সিংহভাগই অনানুষ্ঠানিক। তবে এখনও কৃষি খাত বিপুল মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। কৃষি খাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মৌসুমজুড়ে কাজের চাহিদা এক রকম থাকে না। রোয়া রোপণ ও ধান কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হয়। ফলে এরকম সময়ে কৃষি মজুরের মজুরিও বৃদ্ধি পায়। গত কয়েক বছর ধরে কৃষিতে যন্ত্রায়ন শুরু হয়েছে। এখন দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে হার্ভেস্টার দিয়ে ধান কাটা হয় এবং মাড়ানোও হয়। মৌসুমভেদে কৃষি মজুরের মজুরি বৃদ্ধি পেলেও তারা যে খুব ভালো আছে, তা কিন্তু নয়। মৌসুমের যে দিনগুলোতে কৃষি মজুরের চাহিদা কমে যায়, সে দিনগুলোতে কৃষি মজুররা খুব কষ্টে থাকে। তাদের অনেকে শহরে চলে আসে এবং রিকশা চালানো থেকে শুরু করে নানা ধরনের সেবাখাত কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় দুটি প্রধান খাত হল পোশাক নির্মাণ এবং বিদেশে কর্মসংস্থান। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমজীবী মানুষদের বড় একটি অংশ বেকার হয়ে যাবে এবং তার ফলে দেশে বেকারত্ব অনেক গুণ বেড়ে যাবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও টান ধরবে।

কিছুদিন হল বোরো ধান উঠছে। এবার বোরো ধানের উৎপাদন অতীতের তুলনায় কয়েক লাখ টন বেশি। মাঠ পর্যায়ে ধানের দাম পড়ে গেছে। প্রতি মণ ধান এখন ৫-৬শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ প্রতি মণ ধানের উৎপাদন ব্যয় ৮শ’ টাকারও বেশি। কৃষক দারুণ ক্ষতির সম্মুখীন। তারা বলছে এক বিঘা জমির ধান কাটতে মজুরি দিতে হয় ৯শ’ টাকা। কৃষকের এই দুর্ভোগের সময় সংহতি জানিয়েছে সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। তারা বিনা পয়সায় কৃষকদের ধান কেটে দিয়েছে। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও জাতীয় সংকট নিরসনে এটা কোনো কূলকিনারা করতে পারে না। সংবাদে জানা গেছে, একটি জেলায় ডিসি সাহেবও ধান কাটায় অংশ নিয়েছেন। এসব করে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

অর্থনীতিশাস্ত্রে কব-ওয়েভ থিয়োরেম নামে একটি তত্ত্ব আছে। এই তত্ত্ব বিশেষ করে কৃষির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দেখা যায় কোনো বছর ফসল বেশি উৎপাদন হলে এর দাম পড়ে যায়। ফলে পরের বছর কৃষক আর অতিরিক্ত উৎপাদন করতে চায় না। ফলে শস্যের দাম বৃদ্ধি পায়। বাজারের ওপর কোনোরকম হস্তক্ষেপ না করা হলে এ ধরনের পরিস্থিতি বারবার সৃষ্টি হতে থাকে। পাশ্চাত্যের বড় জোতের কৃষির ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব যতটা প্রযোজ্য, বাংলাদেশের মতো আত্মপোষণশীল কৃষির ক্ষেত্রে ততটা প্রযোজ্য নয়। আত্মপোষণশীল ব্যবস্থায় যত কষ্টই হোক না কেন, কৃষক চেষ্টা করে তার ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় ফসল উৎপাদন করতে। বাংলাদেশের কৃষির এই চেহারাতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন কৃষকরা বাজারের সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে। ফলে উদ্বৃত্ত উৎপাদন হলে ফসলের দাম পড়ে যায়। এর পাশাপাশি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চলছে বিদেশ থেকে চাল আমদানি। ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কেন ভালো ফসল হওয়া সত্ত্বেও বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হচ্ছে- ব্যাপারটি রহস্যাবৃত! দেশ থেকে অর্থ পাচারের জন্য এই কৌশল ব্যবহৃত হতে পারে।

সরকারের মূল্য সমর্থননীতি কৃষকের কোনো কাজে আসছে না। কারণ সরকার কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি শস্য সংগ্রহ করে না। সরকার শস্য ক্রয় করে চাতাল ও মিল মালিকদের কাছ থেকে। গুদামে পর্যাপ্ত স্থান নেই বলে এই প্রক্রিয়ার পক্ষে কথা বলা হচ্ছে। মন্ত্রীরাও নানা রকম কথা বলছেন, যা কৃষকের সঙ্গে পরিহাসের সমতুল্য। দেশে যদি মেগা প্রজেক্টের জন্য অর্থায়ন সম্ভব হয়, তাহলে খাদ্য গুদাম নির্মাণের জন্য অর্থায়ন কেন সম্ভব হচ্ছে না? আসল কথা হল, বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকির পাশাপাশি মূল্য সমর্থননীতিকেও কার্যকর রূপ দিতে হবে। এর অর্থ হল কৃষকের কাছ থেকেই সরাসরি ধান ক্রয় করা। যে কৃষকরা তুলনামূলকভাবে গরিব এবং চাষের জন্য ঋণ বা দাদন নিয়েছে, তারা বাধ্য হয় ফসল মাঠে থাকতেই অথবা বাড়ির দরজায় আনার পরপরই তা বিক্রি করে দিতে। একে বলা হয় বাধ্যতামূলক বাণিজ্যায়ন বা Forced Commercialization. এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন কৃষকদের দ্বারা ঊর্ধ্বমুখী সমবায় সংস্থা গড়ে তোলা, যার ফলে কৃষক গুদামজাতকরণ থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সর্বস্তরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। তবে এই ধরনের সংস্থা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ। তাই সরকার সাময়িকভাবে খুবই সহজশর্তে কৃষকদের ঋণ দিতে পারে। এই ঋণের সমর্থন লাভের মধ্য দিয়ে কৃষক কিছুটা শক্তি পাবে। অন্যথায় কৃষকের জন্য এবারের ঈদ কবি নজরুলের কৃষকের ঈদের তুলনায় গুণগতভাবে ভিন্ন কিছু হবে না। যে যাই বলুক না, ক্ষুব্ধ কৃষক হয়তো ফসলের মাঠে আরও আগুন জ্বালাবে। এমন কাজ কোনো নাগরিকেরই কাম্য নয়।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×