শতফুল ফুটতে দাও

কংগ্রেসেই নিহিত ছিল বিজেপির বীজ

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ০২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিজেপি

ভারতের সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির মাটি কাঁপানো বিজয় অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের নামাবলি পরা কংগ্রেস হয়ে পড়েছে খুবই কোণঠাসা।

এক সময় মনে করা হতো, কংগ্রেস আমাদের উপমহাদেশে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ঝাণ্ডা বাহক। প্রকৃত অর্থে কংগ্রেস কতটুকু ধর্মনিরপেক্ষ ছিল তার হিসাব কষতে গেলে আমাদের কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা সময় থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতা এবং তৎপরবর্তীকালে স্বাধীন রাষ্ট্র ভারতের ক্ষমতায় আসার পর কংগ্রেস কী ভূমিকা পালন করেছে, তা একটু যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে।

আজ বিজেপি নামে যে দলের ঈর্ষণীয় উত্থান ঘটেছে সেই দলের অনেক প্রবীণ নেতাই কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কাজেই বিজেপির বীজ কংগ্রেসের মধ্যেই লুপ্ত ছিল। ভারতের অনেক মুসলিম নেতা কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের সঙ্গে থাকতে পারেননি। মওলানা মোহাম্মদ আলীও কংগ্রেসের নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু তাকেও কংগ্রেস ছাড়তে হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দীর্ঘ দিন কংগ্রেসের সঙ্গে ছিলেন।

একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগে যুগপৎ নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাম্প্রতিককালে ইতিহাসবিদরা গবেষণা করে জিন্নাহর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী চিন্তাভাবনা যে তার হৃদয়ের অনেকটুকু জুড়ে ছিল তার প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। কংগ্রেস নেত্রী সরোজিনি নাইডু জিন্নাহকে ‘হিন্দু-মুসলিম মিলনের দূত’ আখ্যায়িত করেছিলেন। জিন্নাহর মৃত্যুর পর যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি শোকবাণী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে সরোজিনি নাইডুর শোকবাণীটি সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী। তিনি বলেছিলেন, I could not speak these days অর্থাৎ জিন্নাহর মৃত্যুতে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

জাতি হিসেবে বাঙালি আজ এক নেই। বাঙালিদের মধ্যে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক, অন্যদিকে রয়েছে যারা স্বাধীন ভারতের নাগরিক। জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভ ভাই প্যাটেলের অনড় মনোভাবের জন্যই ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যায় তখন বাংলাও বিভক্ত হয়ে যায়।

এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। যারা জয়া চ্যাটার্জির ‘Bengal Divided’ গ্রন্থটি পাঠ করেছেন তারা বাংলা ভাগের জন্য হিন্দু ভদ্রলোকদের কারসাজি ও কুমন্ত্রণা সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পেরেছেন। জয়া চ্যাটার্জির গ্রন্থটি মূলত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য লেখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। একইভাবে যারা বিমলানন্দ শাসনামলের ‘বাংলা কেন ভাগ হল’ বইটি পড়েছেন তারা জানেন সর্বনাশের মূলে ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উদ্যোগে গৃহীত ‘Bengal Pact’ ছিন্নভিন্ন করে দেয়া।

এর জন্যও দায়ী মূলত কংগ্রেস নেতারা। সর্বোপরি যে ওয়াভেল প্লান হতে পারত উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত্তি বিনাশকারী, সেই ওয়াভেল প্লানও কংগ্রেস ভণ্ডুল করে দিয়েছিল। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, As you sow, So you reap. কংগ্রেস সময়ের বিভিন্ন স্তরে যেসব বিষাক্ত বীজ রোপণ করেছিল, তা আজ বিষবৃক্ষ হয়ে বিজেপি নামক বিষাক্ত ফলেরই ফলন ঘটাচ্ছে।

কর সেবকরা যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করছিল, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নরসিমা রাও। তিনিও ছিলেন একজন কংগ্রেস নেতা। বাবরি মসজিদের ধ্বংস প্রতিরোধ করার জন্য তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। রাজীব গান্ধী তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন অযোধ্যা থেকে। এই অযোধ্যাতেই ছিল বাবরি মসজিদ। তিনি ‘রাম রাজ্য’ প্রতিষ্ঠা করবেন বলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। খুব নির্দোষ অর্থে ‘রাম রাজ্যকে’ বিবেচনা করে যদি ভাবা হয় ‘ন্যায়ের রাজ্য’, তাহলেও এই স্লোগানটির মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদকে সুরসুরি দেয়ার প্রবণতা খুঁজে পাওয়া যায়। যে জওহরলাল নেহেরুকে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পথপ্রদর্শক রূপে ভাবা হয়, তিনিও এক সময় হিন্দুত্বের মধ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। এসব দেখে শুনে মনে হয় রাজনীতিতে আছে শুধু ভণিতা, আদর্শ বলতে কিছু নেই। উচিত কথা বলতে হলে বলতে হয়, বিজেপি অন্তত ভণিতা করেনি। তারা যা ভাবে, তারই বহির্প্রকাশ ঘটায়। এদের আর যাই বলা হোক দোদিল বান্দা বলা যাবে না। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বা ইহজাগতিকতাবাদের ইতিহাস খুঁজতে গেলে মধ্যযুগে ফিরে যেতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষকরণ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় খ্রিস্টীয় চার্চের নিকট থেকে ভূ-সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে অর্পণ হিসেবে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে চার্চের ইহজাগতিক ক্ষমতাও অস্বীকৃত হয়। ক্রমান্বয়ে এই প্রক্রিয়ায় ধর্মযাজকরা পরিণত হয় সাধারণ মানুষে। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে ধর্মনিরপেক্ষকরণের ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে ধর্মীয়তা থেকে অধর্মীয়তা তথা ইহজাগতিকতায় নিবিষ্ট মানবজাতি প্রবেশ করেছে।

এরকম একটি ক্রান্তিকালের জন্য প্রয়োজন ছিল দুটি জগতের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা। এর একদিকে রয়েছে সাধারণ মানুষ ও নাগরিকরা এবং অন্যদিকে রয়েছে ধর্ম ও পবিত্রতার সন্ধানীরা। বুঝতে কষ্ট হয় না, ধর্মনিরপেক্ষকরণ ইহজাগতিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এর ভিত্তিতে যা কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তা ইহজাগতিক মঙ্গলের কথা ভেবেই করা হয়। এর মধ্যে ধর্মানুসারী বা ধর্ম কর্তৃক অনুপ্রাণিত মতবাদের কোনো স্থান নেই। এটাকেই যৌক্তিকতাবাদ বা যৌক্তিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়। লক্ষ্য অর্জন এবং তা অর্জনের উপায় হিসেবে ওয়েভারের বাধ্যবাধকতা ছাড়া অন্যকিছুর স্থান নেই। এই মতবাদ অনুসারে শাসকরা কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী কাজ করবেন না। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন ইহজাগতিক পন্থা অবলম্বন করে। এর ফলে সাধারণ জনগোষ্ঠী চার্চের শিক্ষা অনুযায়ী আচরণ করতে অথবা তার প্রতিনিধিদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য থাকবে না। চূড়ান্তভাবে এর অর্থ দাঁড়ায় সব আদর্শ শুধু ধর্মীয় মতবাদ বা বিশ্বাস নয়, পরিত্যক্ত হবে এবং তার জায়গায় স্থান পাবে ইহজাগতিক এবং যৌক্তিক আচরণ। কিছু কিছু রাজনৈতিক আদর্শ রয়েছে যার মধ্যে নিহিত আছে আংশিক ধর্মীয়তা। এরকম ক্ষেত্রে আদর্শমুক্ত অবস্থানের অর্থ হল ধর্মনিরপেক্ষকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা।

অনেকেই ভেবেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষকরণের প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং এটি হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য ও অপরিবর্তনীয়। বাস্তবে তা কিন্তু হয়নি। এই প্রক্রিয়াও অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে। ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতা অনেক ব্যক্তির জীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এবং এসব ব্যক্তিও সমাজ ও রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে। রাজনৈতিক মতাদর্শগুলো ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, যৌক্তিক পন্থা ও প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ তার পরিবর্তে স্থান করে নেবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, অনেক শাসকই শক্তিশালী ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা প্রণোদিত হন। তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন ঘটান।

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতে হিন্দুত্ববাদের যে অভ্যুত্থান ঘটেছে, তা যদি ভারতের মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য পীড়াদায়ক না হয় এবং বাংলাদেশে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের ঠেলে দেয়া না হয়, তাহলে ভারতে হিন্দুত্ববাদের এই অভ্যুত্থানকে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার রূপে আমরা মেনে নেব। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে তাই করতে হয়। কিন্তু কথা হল গণতন্ত্রের মর্মবস্তু কী? সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কী? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেভাবে কাজ করে তার পক্ষে উগ্রধর্মীয় মতাদর্শের উত্থান আদৌ রোধ করা সম্ভব কিনা, তাও ভেবে দেখতে হবে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তকদের।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×