জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক কেন

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এম এ খালেক

ফাইল ছবি

চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত শতাংশ হতে পারে, তা নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বলেছে, কোনো দুর্বিপাক না ঘটলে বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। একই সময়ে আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতও ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ হবে অন্যতম শক্তিশালী একটি দেশ। এমনকি ভারতের মতো একটি স্থিতিশীল অর্থনীতিও প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে বাংলাদেশকে অতিক্রম করে যেতে পারবে না।

আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ভারতকেও ছাড়িয়ে যাবে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি সংবাদ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সামাজিক সূচকের অনেকগুলোতেই ভারত এবং পাকিস্তানকে টপকে গেছে। বাংলাদেশ গত প্রায় ১১ বছর ধরে গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশ বা তারও বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে।

বিশ্বের খুব কম দেশের পক্ষেই ধারাবাহিকভাবে এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের অন্যতম এবং গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হল জিডিপি প্রবৃদ্ধি। কাক্সিক্ষত মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারলে বোঝা যায়, দেশটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করছে। যদিও জিডিপি প্রবৃদ্ধিই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সমতাভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার শর্ত নয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও একটি দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেশের নাগরিকদের জন্য কতটা সুখ নিশ্চিত করতে পারে, সেটাও বিবেচ্য। অর্থনৈতিক উন্নয়ন জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারছে কিনা, সেটা বিবেচনা করা হচ্ছে।

স্মর্তব্য, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে তথ্য পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়; তার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীরা দ্বিমত প্রকাশ করে থাকে। উন্নয়ন সহযোগীরা মনে করছেন, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে গড়ে ৭ শতাংশের উপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। একটি সংস্থা বলছে, এই প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো দাবি করছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৮ শতাংশের বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে।

বিশ্বব্যাংক এবং সরকারের দেয়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে মোটামুটি এক শতাংশের মতো ব্যবধান থাকে। সরকারের যে পরিসংখ্যান, উন্নয়ন সহযোগীরা তার চেয়ে অন্তত এক শতাংশ কম প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করে। বছর শেষে দাতা সংস্থাগুলো এবং সরকার তাদের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সরে আসে না। এর অর্থ হচ্ছে, সরকার যে পরিসংখ্যান প্রদান করে থাকে, তার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীরা একমত প্রকাশ করে না। পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতার জন্য এই অমিল বা পার্থক্য মোচনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার বলে অনেকে মনে করেন। কারণ, কোনো বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান দিয়ে কখনই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থনীতি বিষয়ক পরিসংখ্যান; তা যত তিক্তই হোক না কেন, বাস্তবতাকেই গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কারণ, কোনো বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যানের ভিত্তি করে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়; তা কখনই সঠিক ফল দিতে পারে না। সত্য যত তিক্তই হোক; আমাদের তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। প্রতিবছরই উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের দেয়া পরিসংখ্যানের ভিন্নতা সৃষ্টি হচ্ছে কেন- তার কারণ খুঁজে বের করা দরকার। প্রয়োজনে এ নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা করা যেতে পারে। একই বছরের পরিসংখ্যান নিশ্চয়ই দু’রকম হতে পারে না। উন্নয়ন সহযোগীরা পরিসংখ্যান প্রণয়নকালে কোনো ভুল করলে তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের সেই ভুল শোধরাতে পারে। সরকারও তাদের পরিসংখ্যানে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করে নিতে পারে। প্রতিবছর পরিসংখ্যানগত এই ভিন্নতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকারিভাবে প্রতিবছর যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়, তার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীরা যেমন দ্বিমত প্রকাশ করে; তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের অনেকেই সরকারের দেয়া তথ্যকে গ্রহণযোগ্য বলে মানতে নারাজ। তারা মনে করছেন, প্রবৃদ্ধির হারকে নানাভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে উন্নয়ন সহযোগীদের তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করা দরকার। প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে, কাদের দেয়া তথ্য সঠিক? হতে পারে উন্নয়ন সহযোগীদের দেয়া তথ্য সঠিক নয়। তাহলে সেটা তাদের সঙ্গে বসে নির্ধারণ করে নিলেই তো সমস্যা মিটে যায়। দুর্বল ভিত্তির উপর স্থাপিত কোনো ভবন যেমন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; তেমনি বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর করে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে, তা কাক্সিক্ষত মাত্রায় ফল দিতে পারে না। তাই পরিসংখ্যান তা যতই অনাকাক্সিক্ষত হোক না কেন; সঠিকভাবে তুলে ধরাটাই যৌক্তিক।

একটি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নানাভাবে হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে কাক্সিক্ষত হচ্ছে রিয়েল সেক্টর থেকে অর্জিত প্রবৃদ্ধি। রিয়েল সেক্টরের মাধ্যমে অর্জিত প্রবৃদ্ধি দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি কখনই কাম্য হতে পারে না। কারণ, কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি দেশে আয় বৈষম্য সৃষ্টি করে; বেকারত্ব বৃদ্ধি করে। বিশ্বে এমন অনেক দেশের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যারা কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে তাদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করলেও শেষ পর্যন্ত সেই প্রবৃদ্ধি তাদের জন্য বিপদের কারণ হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধি কখনই টেকসই হতে পারে না। টেকসই এবং কর্মসংস্থানমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রথমেই যে বিষয়টি জরুরি, তা হল বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এই বিনিয়োগ আবার আসতে হবে ব্যক্তি খাত থেকে। কারণ, সরকারি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়, তা সাধারণত ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে না। সরকারি উদ্যোগে যেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়, সেখানে দুর্নীতির মাত্রা থাকে বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিনিয়োগ কার্যক্রমে এক ধরনের ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি অনেকটা একই স্থানে স্থির হয়ে আছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপি’র ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হয়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এসে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ। অবশ্য এই সময়ে সরকারি খাতের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু সরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎপাদন বৃদ্ধিতে তেমন একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে না; যতটা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ঘটে। এছাড়া ব্যক্তি খাতে যে বিনিয়োগ প্রদর্শন করা হচ্ছে; তার কতটা সত্যিকারার্থে বিনিয়োগ হচ্ছে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই বিনিয়োগের নামে বিভিন্ন সূত্র থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে; যেহেতু দেশে বিনিয়োগের মতো উপযুক্ত পরিবেশ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তেমন কোনো অস্থিরতা নেই। কিন্তু এক ধরনের অনিশ্চয়তা তো রয়েই গেছে। যারা বিনিয়োগকারী, তারা নতুন করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসাহ বোধ করছেন না। ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কমে গেছে। ব্যাংকগুলো বিনিয়োগকারীদের তেমন একটা সাপোর্ট দিতে পারছে না। দেশের ভোগ ব্যয় বেড়েছে। সরকারি এবং ব্যক্তি খাতে ভোগ ব্যয় বেড়েছে। ভোগ ব্যয় বাড়লে মানুষে ক্রয় করার ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু মানুষের প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা কি সেভাবে বেড়েছে? প্রাপ্ত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দেশের মানুষের ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত আয় সেভাবে বাড়েনি; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের সাধারণ মানুষের আয় এবং ব্যয় করার ক্ষমতা উভয়ই হ্রাস পেয়েছে। আমরা যে হিসাব পাই, তা গড় হিসাব। এই গড় হিসাব দিয়ে কখনই সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষমতা এবং অবস্থা পরিমাপ করা যায় না। গত বছর দুই আগে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার খবরে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। আগে যেখানে ১২ শতাংশ ছিল মধ্যবিত্ত, এখন তা বেড়ে হয়েছে ২০ শতাংশ। এটি অবশ্যই একটি ভালো সংবাদ। কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের হার বৃদ্ধির অর্থই হচ্ছে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সরকার সমর্থক একজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপ হয়েছিল। তিনি বললেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা বাড়ছে- এটা অবশ্যই একটি ভালো সংবাদ; কিন্তু দেখতে হবে, এই বৃদ্ধিটা কিভাবে হল? এটা কি বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে হয়েছে, নাকি আর্থিক দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে হয়েছে? তার এই বক্তব্যে যথেষ্ট যুক্তি আছে। কারণ, আমরা কেউই চাইব না অবৈধ উপায়ে কেউ রাতারাতি বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলুক।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মানুষ রাজনৈতিক এবং অন্যান্য ক্ষমতা ব্যবহার করে রাতারাতি বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছে। সাধারণভাবে যারা সততার সঙ্গে জীবনযাপন করতে চান; তারা খুবই অসহায় অবস্থার মধ্যে আছেন। একজন যদি ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি টাকার মালিক হন, তাহলে সেটা কোনোভাবেই আমাদের কারও কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশ উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে এটা ঠিক; কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কিভাবে অর্জিত হচ্ছে, সেটাও দেখার বিষয় বটে। একজন ছিনতাইকারী যে অর্থ আয় করে, তা কালো টাকা হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু সেই কালো টাকা যদি নানাভাবে রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতে চলে আসে; তাহলে তাকে আর কালো টাকা বলা যাবে না। এভাবে কালো টাকাও দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। কিন্তু আমরা কি সেটা চাই? আমাদের দেখতে হবে, প্রবৃদ্ধি কিভাবে অর্জিত হল এবং তা দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে কতটা অবদান রাখতে পারছে।

এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক