ঈদ আনন্দে সম্প্রীতির সোপান

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রীতি

বছর ঘুরে ঈদ কড়া নাড়ছে দরজায়। যার যার সামর্থ্য নিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ঈদ প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে। যুগ যুগ ধরেই এদেশে ঈদুল ফিতর উদযাপন বিশেষ মাত্রা পায়। মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব হলেও অমুসলিম প্রতিবেশী বন্ধুও এ আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। এদেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘকালীন অসাম্প্রদায়িক চেতনা আবার নতুন করে ঝালিয়ে দেয় ঈদ।

গত বছর দু’জন হিন্দু বন্ধু পূজার সময় এসএমএস করে আমাকে ‘শুভ বিজয়া’ জানিয়েছিলেন। ঈদের দিন আমি আমার অনেক হিন্দু ও বৌদ্ধ বন্ধুকেও ‘ঈদ মুবারক’ জানিয়েছি। ওরাও ‘ঈদ মুবারক’ জানিয়ে এসএমএস করেছে। এ ঘটনা খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু আমার কাছে একটু অন্যরকম লেগেছিল; যখন আমার এক মুসলমান ছাত্রী পূজার সময় এসএমএস করে আমাকে ‘শুভ বিজয়া’ জানায়। এর মধ্য দিয়ে একটি শুভ ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। ঈদ, পূজা, খ্রিস্টানদের বড়দিন বা বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা- যে কোনো পার্বণ উপলক্ষে আমরা যদি ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে পরস্পরের জন্য শুভ কামনা করতে পারি, তবে তো জয় হবে মানবতারই।

সব সম্প্রদায়ের আনন্দ যার যার সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা থেকেই হয়ে থাকে। দুর্গা পূজায় হিন্দুরা যূথবদ্ধভাবে আনন্দ করে, মণ্ডপে মণ্ডপে দল বেঁধে সবাই যায়, একসঙ্গে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়। মুসলমানদের ঈদ-আনন্দের ধরনটা আলাদা। মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে কোনো প্রতীকী স্থাপনা নেই। ফলে পার্থিব ও অপার্থিব আনন্দ ফল্গুধারার মতো ছড়িয়ে থাকে। তবুও অধুনা ঈদ আনন্দে অনেক রূপান্তর ঘটেছে; বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। উনিশ শতকের ঢাকার ঈদ উৎসব এখনও টিকে থাকলে পূজা উৎসবের পাশাপাশি তুলনামূলক বিচার করা যেত। সে যুগে অনেক আনন্দঘন ঈদ উৎসব পালন করত ঢাকাবাসী। ঈদের দিন জমকালো আনন্দ মিছিল বের হতো। অবশ্য কয়েক বছর ধরে ঢাকায় ঈদ আনন্দ মিছিল হচ্ছে। উনিশ শতকে আর্মানিটোলা, ধূপখোলা বা রমনার মাঠে ঈদ উৎসবের অংশ হিসেবে কত্থক নাচের আয়োজন হতো। কোথাও হতো হিজড়া নাচ।

অনেক মহল্লার কমিটি আগে থেকে হিজড়াদের বায়না করত। ঘুড়ি ওড়ানো আর নৌকাবাইচের আয়োজন হতো। আর এসব অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও আনন্দ ভাগ করে নিত। আমাদের ছেলেবেলার কথা স্মরণে আনতে পারি; নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অনেক হিন্দু পরিবারের বাস ছিল। এদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভারত চলে গেছেন। এসব বাড়িতে আমার বোনদের বান্ধবী অনেক দিদি ছিলেন।

আদর-স্নেহ পেয়ে তাদের দূরসম্পর্কের মনে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হল, আমরা ছোটরা যেমন করগুনে ঈদের অপেক্ষা করতাম; একইভাবে দুর্গা পূজা, লক্ষ্মী পূজা আর সরস্বতী পূজার জন্যও দিন গুনতাম। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখা, ঢাকির জাদুকরী হাতে মনমাতানো ঢাকের বাদ্যে মাতোয়ারা হওয়া আর প্রসাদ খাওয়ার লোভ তো ছিলই।

শুধু ঈদ নয়, মহররমের মিছিলেও ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ ছিল। ইরাক-ইরানসহ অনেক আরব দেশে শিয়া-সুন্নির মধ্যকার দ্বন্দ্ব হানাহানির পর্যায়ে চলে যায়। এদিক থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আঠারো শতক থেকে ঢাকায় মহররম পালিত হচ্ছে। শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে সুন্নি মুসলমানের অংশগ্রহণ এদেশে স্বাভাবিকই ছিল।

আঠারো-উনিশ শতকের নথিতে দেখা যায়, একটি সাংস্কৃতিক প্রণোদনা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে শরিক হতো মহররমের মিছিলে। বিশ্বাস ছিল, কারবালার স্মৃতিতে দুলদুলের প্রতীক ঘোড়ার পায়ে দুধ ঢেলে মনোবাঞ্ছা করলে তা পূরণ হয়। অনেক হিন্দুও ইচ্ছা পূরণের আশায় দুলদুলের পায়ে দুধ ঢালত।

মুসলমান পীরের সমাধিতে হিন্দুর যাওয়া, প্রার্থনা করা এদেশে একটি সাধারণ চিত্র। গ্রাম-গঞ্জের নানা জায়গায় এখনও ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার নদীতে কলার ভেলায় রঙিন কাগজের ঘর বানিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসানো হয়। এ ‘ভেলা ভাসানো’ উৎসবে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে। সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে আছে এমন মুসলমান বাওয়ালি, কাঠুরে বা জেলেরা বনের রক্ষাকর্ত্রী কল্পনায় বনবিবি আর ব্যাঘ্র-পীর গাজীর নাম জপ করে। অন্যদিকে হিন্দু বাওয়ালি, কাঠুরে ও জেলে একই অধিকর্ত্রী দেবী হিসেবে বনদুর্গা আর ব্যাঘ্র দেবতা হিসেবে নাম জপ করে দক্ষিণ রায়ের।

এসব বাস্তবতা এদেশের দীর্ঘকাল ধরে লালিত সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাই প্রকাশ করছে। সমাজ ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমি আমার লেখায় বহুবার বলার চেষ্টা করেছি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে এদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অপচ্ছায়া খুব স্বাচ্ছন্দ্যে ডানা মেলতে পারবে না। এদেশের সাধারণ মানুষের মানসিক গড়ন সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধিকে সমর্থন করে না। তারপরও এ সত্য মানতে হবে যে, অন্ধকারের জীব; যারা ধর্মকে আধ্যাত্মিকতার গাম্ভীর্য আর সৌন্দর্যে না দেখে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারা কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করে। অন্য দল অতটা বুঝে নয়; বরং সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ও কূপমণ্ডুকতার কারণে ধার্মিক না হয়ে এক ধরনের ধর্মান্ধ হয়ে যায়।

ধর্মচর্চার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন না করে অনালোকিত এবং সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ধর্মনেতার বয়ান শুনে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়। প্রথম শ্রেণীর ধর্ম-বণিকদের চেনা যায়, ফলে এদের প্রতিহত করাও সম্ভব। কিন্তু অতি ধীরে হলেও দ্বিতীয় শ্রেণীর সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষের পক্ষে সমাজ কলুষিত করার ক্ষমতা বেশি বলে আমি মনে করি। প্রথমে তারা নিজ পরিবারকে প্রভাবিত করে, পরে প্রতিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

আগে গ্রামগঞ্জে ঈদ উপলক্ষে মেলার আয়োজন হতো। এ ঈদ মেলায় ধর্মনির্বিশেষে সবারই অংশগ্রহণ স্বাভাবিক ছিল। একইভাবে পূজা উপলক্ষেও মেলা বসে। এসব মেলায় কোনো ধর্মের মানুষই সাম্প্রদায়িকতার বাছবিচার করে না। এ সবই আবহমান বাংলার সাধারণ ছবি। ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবে আমরা যদি বাঙালির ঐতিহ্যগত অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রজ্বলিত রাখার সচেতন প্রয়াস অব্যাহত রাখতে পারি, তবে সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার ছড়ানো অপশক্তি অবদমিত হবে। প্রতিবেশী অমুসলিম সম্প্রদায়ের বন্ধুদের ঈদের আনন্দের ভাগ দিতে পারি অনায়াসেই।

পারস্পরিক সংস্পর্শের শক্তিতে সাম্প্রদায়িক নৈকট্য অনেক বৃদ্ধি পায়। ঈদ সেই সুযোগ করে দিতে পারে অনায়াসেই। ছোটবেলায় দেখেছি, বাড়িতে ঈদের বিশেষ রান্নার পরও আলাদা করে মুরগি রান্না হতো। এগুলো হিন্দু সম্প্রদায়ের বন্ধুদের জন্য। কারণ ওদের জন্য এ আয়োজন করা হতো গরুর মাংসের বিপরীতে। ঈদ এলে এ ঐতিহ্যিক প্রণোদনা এখনও আমাদের মধ্যে কাজ করে।

আমার এক বিত্তশালী বন্ধু বেশ কয়েক লাখ টাকার জাকাত দেন প্রতিবছর। তিনি তার গ্রামের বাড়ির দরিদ্রদের তালিকা করে নীরবে দানসামগ্রী পৌঁছে দেন তাদের হাতে। এতে ধর্ম সম্প্রদায়ের বাছ-বিচার করেন না। অনেক হিন্দু পরিবারও তার জাকাতের ভাগ পান। একবার তার সম্পর্কের এক মাদ্রাসা শিক্ষক চাচা বললেন, জাকাতের এ টাকা দরিদ্র মুসলমানেরই পাওয়া উচিত। আমার বন্ধুর উত্তরটি ভালো লেগেছিল।

তিনি বললেন, দেখুন চাচা, আমি বিবেক দিয়ে চলতে পছন্দ করি; ধর্ম পরিচয়ে নয়- আমি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে থাকি। ছোটবেলায় বইতে পড়া সেই গল্পটি এখনও মনে গেঁথে আছে। সেই যে বুড়ি মহানবীর পথে কাঁটা ছড়িয়ে কষ্ট দিত; অথচ তার অসুখে ছুটে গিয়েছিলেন নবী। অসুস্থ অমুসলিম বুড়িকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। আমি এভাবেই ইসলামের মাহাত্ম্যকে দেখতে চাই। ধর্মীয় সংকীর্ণতা নয়, ইসলাম মানবতার জয়গানই করেছে; সুতরাং আপনারা যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন। আমি ধর্মের নামে মানবতাকে আলাদা করব না। মানুষ হিসেবেই দেখতে চাইব সবাইকে।

ঈদ আসন্ন। আমি মনে করি, ঈদ শুধু মুসলমানের ধর্মীয় উৎসবই নয়; ঈদ-আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের শক্তি। একে ধারণ করে ঈদ উৎসবকে অর্থবহ করে তুলতে পারলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তার আপন সৌন্দর্যকে সমুন্নত রাখতে পারবে। ঈদ কিন্তু বড় অর্থে মানবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। ইসলামে দেবতা-বিগ্রহের মতো প্রতীকী কোনো রূপ নেই। বিপরীতে ঈদের আনন্দ ফলগুধারার মতো উৎসারিত হয়। এই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র; অনেকটা স্রোতঃস্বিনী নদীর মতো। বেগবান বহতা নদী কোনো বাছ-বিচার করে না। নিজ বুকে নর্দমান পানি, না স্বচ্ছ পানি মিশ্রিত হচ্ছে; তা নিয়ে ভাবে না। সব জলরাশিকেই গ্রহণ করে আরও স্ফীত হয়। প্রবাহিত হয় আরও তীব্র বেগে। এমন মানবিকতার উদার পরিবেশ ঈদ উৎসবকেও উজ্জীবিত করতে পারে।

আমার বরাবরই মনে হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে এদেশের ধর্ম-বণিক রাজনীতিকদের অপতৎপরতা আর জঙ্গিবাদ কখনও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে না। এ জন্য অনালোকিত জনগোষ্ঠীকে আলোয় আনতে হবে আবহমান বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে। বিজ্ঞানমনস্কভাবে ধর্মচর্চা এবং বাঙালির হাজার বছরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পাঠক্রমে যুক্ত করতে হবে। আর এ ঐতিহ্যের সৌন্দর্য সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে মিডিয়াকে। আলোর প্রক্ষেপণ ছাড়া কি অন্ধকার দূর হয়? এ কারণেই ঈদ উৎসবকে একটি শক্তিশালী আলোকবর্তিকা হিসেবে সামনে রাখা যেতে পারে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×