শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন শিক্ষিত নাগরিক

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ইমন চৌধুরী

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন শিক্ষিত নাগরিক। ছবি: সংগৃহীত

একটি দেশ বা জাতি কতটা এগিয়েছে সেটা বুঝতে হলে সুনির্দিষ্ট কিছু খাত বা বিষয়ের ওপর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা খাত এর অন্যতম। একটি দেশের শিক্ষার হার যত বেশি, সেদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তত বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। আধুনিক বা উন্নত বিশ্বের অংশ হতে গেলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কতটা এগিয়েছে এ প্রশ্ন যে কেউ তুলতেই পারেন। কিন্তু সুদুত্তর মিলবে কি? বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় আমরা কতটা পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি এশিয়ার দেশগুলোর শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকাতেও আমরা এখন আর নেই! অথচ একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড! সেই সুদিন যেন ফুরিয়ে গেছে। আমরা পিছিয়ে পড়ছি ক্রমশ।

পাসের হার আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেই আমরা শিক্ষিত জাতি হয়ে উঠব এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। কিভাবে চলছে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো? কেউ কি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি সবদিকে সমানভাবে নজর রাখতে পারে? নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা কি সবাই যোগ্য? সবাই কি নিয়মিত ক্লাস নেন? আরেকটি বড় প্রশ্ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডিতে কারা থাকেন? তাদের যোগ্যতা কী? তাদের অনেকেই হয়তো যোগ্য; কিন্তু সবাই কি সমান যোগ্য? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে থাকার মতো যোগ্যতা কি তাদের সবার আছে? প্রশ্নগুলো যত দ্রুত উঠবে ততই মঙ্গল।

রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা নজরদারির মধ্যে থাকলেও গ্রাম বা মফস্বল শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সঠিক নজরদারি নেই বললেই চলে। আর এ সুযোগে এলাকার মাতবর শ্রেণীর অনেক লোকও গভর্নিং বডিতে ঢুকে পড়েন। এদের অনেকেরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে থাকার মতো যোগ্যতা নেই। অদক্ষ ও অযোগ্য এই সদস্যরা কি যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন? সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন সেটি হল, গভর্নিং বডিতে যারা থাকেন তাদের সবার শিক্ষাগত যোগ্যতা কী?

অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি যেমন গভর্নিং বডিতে থাকেন, তেমনি অনেক অশিক্ষিত ব্যক্তিকেও এসব পদে দেখা যায় প্রায়ই। গ্রাম বা মফস্বল শহরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষিত ব্যক্তির পাশাপাশি অনেক অশিক্ষিত লোকজনকেও গভর্নিং বডিতে থাকতে দেখা যায়। প্রশ্নটা হচ্ছে, যাদের নিজেদেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তারা কিভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাবেন? অনেক সময় অশিক্ষিত এ সদস্যরা শিক্ষকদের জন্যও বিব্রতকর হয়ে ওঠেন। একটি প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক একদিন আফসোস করেই এক আলোচনায় বললেন, ‘গভর্নিং বডিতে মাঝে মাঝে এমন সদস্যও দেখা যায় যাদের সঙ্গে কথা বলারই রুচি হয় না।’

এ বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনার সময় এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করা। যে প্রতিষ্ঠান শিক্ষার আলো ছড়াবে সে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে কোনো অশিক্ষিত ব্যক্তি জড়িত থাকাটা সমীচীন বলে মনে করি না। এসব ক্ষেত্রে সবার জন্য ন্যূনতম শিক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। অর্থাৎ অভিভাবক প্রতিনিধি থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে যারাই থাকবেন, তাদের সবারই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে।

মফস্বল শহর এবং গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে অনেক সময় ভীষণ হতাশ হতে হয়। দেখা যায় স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, অনেক সময় সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে অনেক অযোগ্য লোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে ঢুকে পড়েন। তাদের না থাকে শিক্ষাগত যোগ্যতা, না থাকে অভিজ্ঞতা, না থাকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ন্যূনতম দক্ষতা। শুধু অর্থ কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে নিজেদের জায়গা করে নেন। তারা মনে করেন এতে তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়বে।

কিন্তু তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো উপকার যে হয় না তা বলাই বাহুল্য। তাদের কেউ কেউ শিক্ষা সংক্রান্ত অনেক বিষয় সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না। আর এদের দৌরাত্ম্যে অনেক সময় সমাজের শিক্ষিত ও প্রকৃত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরাও গভর্নিং বডিতে থাকার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। তাই প্রতিষ্ঠান ধরে ধরে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে অযোগ্য ও অশিক্ষিত ব্যক্তিদের গভর্নিং বডির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া উচিত।

আর এক্ষেত্রে সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যে নিয়ম বা আইন আছে তার যথোপযুক্ত প্রয়োগ করতে হবে। যদি নিয়ম বা আইনে কোনো রকম ফাঁক-ফোকর থাকে তাও চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধন করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সদস্য হতে না পারেন।

আধুনিক বা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি দেশের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে দেশটির শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। শিক্ষার হার যত বাড়বে দেশ তত এগিয়ে যাবে। কিন্তু অযোগ্য-অশিক্ষিত ব্যক্তি বা নাগরিক দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো উন্নয়ন হতে পারে না। যারা এসব দায়িত্বে থাকবেন তাদের সবারই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব। এই উপলব্ধি থেকেই অনুমান করা যায় শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষিত ও প্রকৃত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি রাষ্ট্রের জন্য কতটা প্রয়োজন। একটি দেশ বা জাতিকে এগিয়ে নিতে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষিত নাগরিকের বিকল্প নেই।

ইমন চৌধুরী : লেখক ও সাংবাদিক