মোদির মন্ত্রিসভার ব্যবচ্ছেদ

  শশি শেখর ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নরেন্দ্র মোদি
নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি

নরেন্দ্র মোদি তার মন্ত্রিসভা ঘোষণা করার পর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অংশীজন পর্যন্ত নানাভাবে আশ্চর্যান্বিত ও শিহরিত হন। কিছু মানুষ দেখেন তাদের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে ফলে গেছে।

মোদির প্রথম মন্ত্রিসভা ও দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় জ্যেষ্ঠ দু’জন ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি। বছরের পর বছর নয়াদিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির নানা বিষয়ের মধ্যস্থতাকারী অরুণ জেটলি নিজের স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রিসভায় থাকতে অপারগতা জানিয়ে এরই মধ্যে মোদিকে চিঠি দিয়েছেন।

অসুস্থতার কারণে সুষমা স্বরাজও ভিদিশা থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে বিরত থাকেন। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব (ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্করের উপস্থিতি থেকে বোঝা গেছে তার (সুষমার) মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি। পররাষ্ট্রনীতিতে জয়শঙ্করের অভিজ্ঞতা থাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদের জন্য তিনি উপযুক্ত।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নামের অনুপস্থিতি প্রায় সবাইকে বিস্মিত করেছে। জেপি নাড্ডা, সুরেশ প্রভু, রাধা মোহন সিং, রাজ্যবর্ধন রাথোর, জয়ন্ত সিনহা, মহেশ শর্মা এবং অনুপ্রিয়া প্যাটেল ছিলেন বিস্মিতভাবে বাদ পড়াদের তালিকায়। নতুন মন্ত্রিসভায় অমিত শাহ’র অন্তর্ভুক্তির পর এটা এখন পরিষ্কার যে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একজন নতুন রাষ্ট্রপতি খুঁজবে। এখন পর্যন্ত দলটি এক ব্যক্তি, এক পদ নীতি অনুসরণ করছে। চারটি রাজ্যে আগামী কয়েক মাসে রাজ্যসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমন একটি পরিস্থিতিতে দলটি কি অমিত শাহকে দুটি দায়িত্বে নিয়োজিত রাখবে বা শিগগিরই নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করবে?

রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে এগিয়ে আছেন হিমাচলের জেপি নাড্ডা; কিন্তু তিনি পড়াশোনা করেছেন বিহারে। বিহার হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজ্য এবং লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বিজেপি ও জনতা দল ইউনাইটেডের জোট বিস্ময়কর ভালো ফল অর্জন করেছে। এটিকে প্রাসঙ্গিক হিসেবে নিলে নাড্ডার প্রার্থিতা ঠিক মনে হয়; কিন্তু ভুপেন্দর যাদবের মতো দলটির অনেক ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বিভিন্ন ফ্রন্টে নিজেদের মূল্যায়নের যথার্থতা প্রমাণ করেছেন।

শেষ মুহূর্তে নিতীশ কুমার যে তার দল জনতা দল ইউনাইটেডের মন্ত্রিসভায় যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বাস্তবভিত্তিক বলে প্রমাণিত হচ্ছে। তিনি অনুভব করেছেন, তার দলের আরও বেশি আসন দাবি করার অধিকার রয়েছে এবং মন্ত্রিসভায় একটি আসন যথেষ্ট নয়। বিজেপির সঙ্গে নিতীশ কুমারের সম্পর্ক সবসময়ই অগভীর ছিল এবং নির্বাচনের ফল ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে মনে হচ্ছে কোনো ধরনের গোলযোগ দেখা দিয়েছে।

রাম ভিলাস পসওয়ানও শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শপথ নেয়াদের মধ্যে ছিলেন। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি; কিন্তু নিজের ছেলে চিরাগ পসওয়ানের জন্য চেয়েছিলেন। চিরাগেরও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তেমনটি ঘটেনি।

আপনা দলের অনুপ্রিয়া প্যাটেলকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যদি আপনি জনতা দল ইউনাইটেড, লোক জনশক্তি পার্টি ও আপনা দলকে একসঙ্গে এক ক্যাটাগরিতে দেখেন, তাহলে আপনার মনে হবে যদিও মোদি প্রত্যেককে সঙ্গে নিতে চান; কিন্তু তিনি চাপে পড়ে কোনোকিছু দিতে অনিচ্ছুক। যদি শিবসেনা একটিমাত্র পদ পায় তবে কেন জনতা দল ইউনাইটেডকে বেশি দিতে হবে? একইভাবে নির্বাচনপূর্ব চুক্তিতে লোক জনশক্তি পার্টিকে (এলজেপি) মন্ত্রিসভায় একটি পদ এবং রাজ্যসভায় রাম ভিলাস পসওয়ানের জন্য সদস্যপদের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। অনুপ্রিয়া প্যাটেল অসন্তুষ্ট ছিলেন, এমনকি নির্বাচনের আগেও। তাদের সবাই এখন স্পষ্ট একটি বার্তা পেয়েছেন।

এবার আমরা মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আসছি এবং সেটি হল অমিত শাহ’র অন্তর্ভুক্তি। সর্বশেষ কয়েক মাসে রাজনৈতিক সার্কেলে এমন খবর ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, অমিত শাহ মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। কেউ কেউ তো এমন দাবিও করেছেন, ২০২৪ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হবেন। অমিত শাহ মোদির গুজরাট মন্ত্রিসভায় দীর্ঘসময় মন্ত্রী ছিলেন এবং অনেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন; তার সামনে কাশ্মীর পরিস্থিতি, রামমন্দির ইস্যু, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও ৩৫-এ সহ অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

কর্নাটকের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সদানন্দ গৌডাকেও মন্ত্রিসভায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি শপথ নিয়েছেন নিতীন গড়করির পরে ও নির্মলা সীতারমনের আগে। এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, বিজেপি কর্নাটকে অনেক ভালো করেছে এবং ২৫টি আসন বাগিয়ে নিয়েছে। গৌডার মধ্য দিয়ে মোদি কর্নাটকবাসীকে এ বার্তা দিতে চান যে, তিনি তাদের সঙ্গে আছেন। দ্বিতীয়ত, এর মধ্য দিয়ে তিনি বর্তমানে দক্ষিণে জয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। এ কারণে নির্মলা সীতারমনকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। রাজনাথকে দেয়া হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ দফতর।

তিনটি নাম এখানে উল্লেখ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি স্মৃতি ইরানি। রাহুল গান্ধীকে আমেথিতে হারানো সহজ ছিল না। আর এটি নিশ্চিত ছিল যে, এ কারণে স্মৃতি ইরানিকে পুরস্কৃত করা হবে। একইভাবে রমেশ পোখরিয়াল নিশাঙ্ক এবং অর্জুন মুন্ডাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভালো একটি কাজ করেছেন। এ দু’জন কেবল নিজেদের রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীই ছিলেন না, তাদের তৃণমূল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

এটি স্পষ্ট, মন্ত্রিসভার মাধ্যমে মোদি তার দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন। মন্ত্রিসভা দেখে মনে হচ্ছে, তার উত্তরাধিকারের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। অমিত শাহ ও সীতারমনকে নতুন দায়িত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তিনি জানেন, দ্বিতীয় ইনিংস অনেক বেশি কঠিন প্রথমটি থেকে। আর এটি ভালোভাবে সম্পন্ন করার জন্য অনেক বেশি দক্ষ সহকর্মী দরকার।

হিন্দুস্তান টাইমস থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

শশি শেখর : হিন্দুস্তান পত্রিকার এডিটর ইন চিফ

ঘটনাপ্রবাহ : ভারতের জাতীয় নির্বাচন-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×