বোর্ডের উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরিবর্তন সময়ের দাবি

  মাছুম বিল্লাহ ০৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এবার এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার পর সারা দেশে ৩ লাখ ৬৯ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জমা পড়েছে। শুধু ঢাকা বোর্ডেই ১ লাখ ৪০ হাজার ৯২৩টি খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন পড়েছে। আর আবেদনকারীর সংখ্যা ৫৮ হাজার ৭০ জন। ২০১৮ সালেও ১ লাখ ৩৮ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন পড়েছিল। সেখান থেকে ১ হাজার ৯৯০ জনের ফলও পরিবর্তন করা হয়।
ফাইল ছবি

এবার এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করার পর সারা দেশে ৩ লাখ ৬৯ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জমা পড়েছে। শুধু ঢাকা বোর্ডেই ১ লাখ ৪০ হাজার ৯২৩টি খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন পড়েছে। আর আবেদনকারীর সংখ্যা ৫৮ হাজার ৭০ জন। ২০১৮ সালেও ১ লাখ ৩৮ হাজার খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন পড়েছিল। সেখান থেকে ১ হাজার ৯৯০ জনের ফলও পরিবর্তন করা হয়।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ অনেকেই মনে করেন যে, খাতা পুনর্মূল্যায়ন মানে পুনরায় খাতা দেখা। মূলত হওয়াও উচিত তাই। কিন্তু হচ্ছে এর পুরো উল্টোটা। ফল নিরীক্ষণে মাত্র চারটি বিষয় দেখা হয়।

এক, সব প্রশ্নের উত্তরে নম্বর সঠিকভাবে বসানো হয়েছে কিনা, দুই, প্রাপ্ত নম্বর গণনা ঠিকভাবে করা হয়েছে কিনা, তিন, প্রাপ্ত নম্বর ও এম আর (অপটিক্যাল মার্ক রিডার) শিটে তোলা হয়েছে কিনা এবং নম্বর অনুযায়ী ও এম আর শিটের বৃত্ত ভরাট ঠিক আছে কিনা। আসল বিষয়টি অর্থাৎ উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়ন করা হয় না।

একজন পরীক্ষক খাতা দেখার পর তার নম্বর প্রদান করা ঠিক আছে কিনা তা দেখা হয় না। আশ্চর্যান্বিত হওয়ার বিষয়! বোর্ড ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন যে, শুধু নম্বর যোগ-বিয়োগের ভুলেই একেকটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়ে থাকে। এই যখন অবস্থা তখন, পুনরায় খাতা দেখলে আবেদনকারীদের বেশির ভাগেরই ফল পরিবর্তন হবে এবং পরীক্ষকদেরও আরও কয়েকগুণ ভুল ধরা পড়বে- এটি সহজেই অনুমান করা যায়।

জানা যায় রাজধানীর মতিঝিল মডেল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের ইংরেজি ভার্সনের একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি প্রথমপত্রে ৬০ পেয়েছে বাকি বিষয়গুলোতে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রেও সে পেয়েছে ৯২। ওই বিদ্যালয়ের ইংরেজি ভার্সনের ১৬ জন শিক্ষার্থীই ইংরেজি প্রথমপত্রে কম নম্বর পেয়েছে অথচ অন্য ওই সব বিষয়ে তারা এ প্লাস পেয়েছে। ইংরেজি প্রথমপত্রে তারা ৫৫ থেকে ৬৪-এর মধ্যে নম্বর পেয়েছে। একই ঘটনা বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে। খাতা মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছে ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থীরা।

এর কারণ হচ্ছে ইংরেজি ভার্সনে যারা পড়াচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই ইংরেজি ভার্সনে পড়ানোর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সরাসরি শিক্ষকতায় থাকাকালীন প্রতি বছর যখন বোর্ডে খাতা নিতে যেতাম তখন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের কাছে শুনতাম এবং অনেক প্রমাণ তারা আমাদের দেখাতেন যে কত অভাবনীয় এবং কত রকমের ভুল পরীক্ষকরা করে থাকেন।

পরীক্ষার খাতা নিয়ে অথবা ফেলে দিয়ে কোনো কোনো পরীক্ষক বিদেশে চলে গেছেন, কাজের মেয়ের দ্বারা ওএমআর শিট পূরণ করানো হয়েছে, ৮২-এর স্থলে নম্বর ২৮ দিয়ে ওএমআর শিট পূরণ করে চূড়ান্ত ফল তৈরি করা হয়েছে ইত্যাদি বহু রকমের ঘটনা ঘটে বোর্ডের খাতায়। আমি নিজেও অনেক সহকর্মীর খাতা দেখার ইতিহাস দেখেছি।

কর্তৃপক্ষের কিছু পদক্ষেপ এ বিষয়গুলোতে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। বিষয়গুলো নিয়ে বহু বছর যাবৎ বহুবার লেখালেখি করেছি কিন্তু পরিবর্তন এখনও খুব একটা দেখতে পাচ্ছি না একমাত্র বেডু (বাংলাদেশ এক্সামিনেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিট) প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া। তবুও সেটি প্রশংসনীয়। উত্তরপত্র মূল্যায়নে বেডুর উদ্যোগেই এখন পরীক্ষকদের মডেল উত্তরপত্র দেয়া হয়। পরীক্ষকদের ছয় দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ৬০ হাজার পরীক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই বেডু নাকি অনলাইনেও এই প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। খাতা মূল্যায়নে আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে তবে সিনসিয়ারলি যারা খাতা দেখেন না তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া আর মডেল উত্তরপত্র প্রদান করেই কতটা কী করা যাবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পরীক্ষার খাতা যেভাবে মূল্যায়ন করা হয় সেটি কোনোভাবেই সঠিক মূল্যায়ন নয়। অনভিজ্ঞ ও নতুন একজন পরীক্ষক তো জানেনই না কিভাবে একটি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হয়। অথচ একমাত্র তার মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করছে একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবনের ফল, ইতিহাস, একাডেমিক অর্জন, জীবনের ভবিষ্যৎ মোড়। কী করে এটি হতে পারে? আমি কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে কর্মরত থাকাকালীন একবার তুখোড় একব্যাচ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কেউই ইংরেজিতে ‘লেটার মার্কস’ পায়নি। অথচ কলেজের ইন্টারনাল পরীক্ষায় সবাই লেটার মার্কস পেয়েছিল কারণ অবজেকটিভ অংশে সবাই পূর্ণ ৫০ নম্বরই পেয়েছিল আর লিখিত ৫০-এর মধ্যে কেউই ৩০ এর নিচে পায়নি।

উল্লেখ্য, ক্যাডেট কলেজের ইন্টারনাল পরীক্ষার খাতা বেশ কঠিন করে দেখা হয়। বোর্ড পরীক্ষায় একটি ক্যাডেটও লেটার মার্কস পায়নি। পরে জানা গেল বোর্ড পরীক্ষার খাতা গ্রামের কোনো এক শিক্ষকের কাছে পড়েছিল। তিনি কী করেছেন কেন করেছেন জানার কোনো সাধ্য ছিল না, শুধু দেখা গেল ইংরেজিতে কেউই লেটার মার্কস পায়নি। ওই সময়ে একটু ভালো শিক্ষার্থীরা অবজেকটিভ থাকার কারণে প্রায় সবাই লেটার মার্কস পেত।

নীতিমালা অনুযায়ী প্রধান পরীক্ষক হওয়ার জন্য দশ বছরের এবং পরীক্ষক হওয়ার জন্য পাঁচ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এসব নিয়ম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হয় না। প্রতিষ্ঠান প্রধান সম্মতি দিলেই পরীক্ষক হয়ে যাচ্ছেন সব ধরনের শিক্ষক। জুনিয়র সেকশনের শিক্ষক পরীক্ষক হচ্ছেন সিনিয়র সেকশনের, কলেজের শিক্ষকও স্কুলের খাতা দেখছেন। কোনো একজন শিক্ষক যদি স্বল্প সময়ের জন্য হলেও একটি বিষয় পড়ান, তিনি ওই বিষয়ের পরীক্ষক হয়ে যান। এভাবে এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ের পরীক্ষক হচ্ছেন। আর মাধ্যমিক পর্যায়ে তো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকই নেই, এ সুযোগটি আরও কাজে লাগানো হচ্ছে।

খাতা পরীক্ষণে আর একটি সমস্যা হয় অনেক ভালো প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে শহরের ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক পরীক্ষক হওয়ার মতো কষ্ট করতে চান না। কারণ অর্থই তাদের কাছে বড় কথা। তারা বোর্ডের খাতা দেখে সময় নষ্ট করার চেয়ে দু’ব্যাচ শিক্ষার্থী পড়িয়ে অনেক বেশি উপার্জন করতে পারেন। তাই বছর দু’য়েক আগে বোর্ড নিয়ম করেছিলে যে, নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বোর্ডের খাতা অবশ্যই দেখতে হবে। জানি না কতটা কার্যকর হয়েছে। আর বোর্ড কর্র্তৃপক্ষ তো যত তাড়াতারি ফল ঘোষণা করতে পারে ততই যেন তারা মঙ্গল মনে করেন এবং কৃতিত্ব মনে করেন। স্বল্প সময়ে প্রকৃত মূল্যায়ন কি হচ্ছে?

বোর্ডের খাতা পরীক্ষণে কিছু পরিবর্তন আনতেই হবে। প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়নকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়ার চাপও কমে যাবে, শিক্ষার্থীরা বিষয়ের গভীরে যেতে পারবে এবং এই ধারাবাহিকের ফল বোর্ডেও প্রেরণ করতে হবে যাতে একজন শিক্ষার্থীর হঠাৎ কোনো পরিবর্তন বা বিপর্যয় সহজেই ধরা পড়ে। এটি করা হলে শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো ক্লাসও করবে এবং এই মূল্যায়নটি গুরুত্ব পাবে। দ্বিতীয় আর একটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। সেটি হচ্ছে বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ কোনোভাবেই একজন শিক্ষকের দ্বারা করানো যাবে না। তিনজন হলে ভালো হয়, সম্ভব না হলে অন্তত দু’জন পরীক্ষক একটি উত্তরপত্র পৃথকভাবে মূল্যায়ন করবেন। কারও নম্বর কেউ জানবেন না। দু’জন বা তিনজনের নম্বর গড় করে ফল তৈরি করতে হবে। এটি করা হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর খাতা পুনর্মূল্যয়নের দরখাস্ত জমা পড়ে অথচ তাদের খাতাও পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না সেই অনৈতিক দিকটি এড়ানো যাবে এবং লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে এভাবে আর ঠকতে হবে না। বোর্ড পরীক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে, আস্থা বেড়ে যাবে। পরীক্ষার ফল নিয়ে আর খুব একটা প্রশ্ন থাকবে না, যেটি এখন আছে।

মাছুম বিল্লাহ : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×