নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি: বাজেটে কিছু অবশ্য করণীয়

  ড. আর এম দেবনাথ ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি: বাজেটে কিছু অবশ্য করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

কয়েক দিন পরই ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ হবে। পরবর্তী বাজেট, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ সম্ভবত শেষ। কৃষককুল এবার বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য পায়নি। পবিত্র ঈদ তারা কষ্টের মধ্যে করেছেন। এ প্রেক্ষাপটেই রচিত হচ্ছে, চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ চলছে নতুন বাজেটের ওপর। অনুমান করি, নতুন অর্থমন্ত্রীর এখন ঘুম নেই। তিনি ‘অর্থকষ্টে’ পড়েছেন।

এত বড় খরচের বাজেট, টাকা আসবে কোত্থেকে? আবার সংগৃহীত টাকা কোথায় খরচ করা হবে? এত দাবিদার- সবাই সরকারের আনুকূল্য চায়। কেউ কর দিতে চায় না। একসময় এর সমাধান ছিল। আমাদের অর্থমন্ত্রীরা কর্মচারীদের নিয়ে, কাগজপত্র নিয়ে দারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে যেতেন প্যারিসে- ফ্রান্সের রাজধানীতে। সেখানে বসত দাতা, সাহায্যদাতা, ঋণদাতাদের বৈঠক। উপস্থিত থাকত খবরদারি করার আন্তর্জাতিক সংস্থা- আইএমএফ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান।

সওয়াল-জওয়াব করতে হতো; যা মিলত তা দিয়েই হতো বাজেট। সেই অবস্থা এখন আর নেই। আমরা এখন নিু-মধ্য আয়ের দেশ। আমদানি, রফতানি, রেমিটেন্স, কৃষি উৎপাদন ইত্যাদির নিরিখে সবল দেশ। কিন্তু সবল দেশ হলে কী হবে, রাজস্বের অভাব। কেউ কর দিতে চায় না। সবাই চায় মওকুফ। এ অবস্থায় সরকার দিনের পর দিন সাধারণ মানুষকেই বেছে নিয়েছে ভার বহনকারী হিসেবে। আশার কথা- অর্থমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এবার নতুনভাবে কারও ওপর কর চাপাবেন না। কারও কাছ থেকে তিনি জোর করে কর নেবেন না।

অর্থনীতি বড় হয়েছে। তা আকারে-প্রকারে স্ফীত হয়েছে। নতুন নতুন খাত অর্থনীতিতে যোগ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী সেসব ক্ষেত্র খুঁজে বের করবেন। তাদের কাছ থেকে তিনি কর আদায় করবেন। তিনি এ-ও মনে করেন, দেশে ৪ কোটি লোক আছে যারা কর দিতে পারেন, অথচ দেন না। ধীরে ধীরে তাদের করের আওতায় আনবেন। সেই উদ্দেশ্যে উপজেলায়-উপজেলায় ‘রাজস্ব অফিস’ খুলবেন। অফিসাররা ট্যাক্স সংগ্রহ করবেন।

বলাই বাহুল্য, এসব পদক্ষেপ সম্পর্কে আলোচনা করার কিছু নেই, বিতর্ক করারও কিছু নেই। তিনি কর্পোরেট ট্যাক্স কমাবেন, ব্যক্তিগত আয়করের হার হ্রাস করবেন। তিনি শেয়ারবাজারের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেবেন। ভর্তুকির ব্যবস্থা করবেন। ব্যাংকের জন্য পুঁজি সরবরাহ করবেন। এসবের ওপরেও কোনো কথা চলে না। আমি বলি কী, অর্থমন্ত্রীকে আমি টাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। এক-দুই পয়সা নয়, ভালো পরিমাণ টাকা। প্রায় ১২-১৩ হাজার কোটি টাকা। কীভাবে? এর উত্তরে একটি দৈনিকের সাহায্য নিতে পারি।

২৯ মের খবর- ‘সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দের ২০ শতাংশ অপচয়’। এতে অপচয়ের পরিমাণ কত হয়? ৬৪ হাজার কোটি টাকা মোট বরাদ্দ। তাহলে ২০ শতাংশে বা এক-পঞ্চমাংশে কত দাঁড়ায়? ১২-১৩ হাজার কোটি টাকা হয়। দেখা যাচ্ছে, ২০-২১টি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান মোট ৯৯টি কর্মসূচি চালায় সারা দেশে। গরিব, দুস্থ, বেওয়া-বিধবা, অসচ্ছল, পশ্চাদপদ, প্রতিবন্ধী ও শিশু শ্রেণীর লোকেরা সরকার থেকে ‘সামাজিক সুরক্ষা’ হিসেবে মাসিক কিছু ভাতা পান। খরচের ২০ শতাংশই অপচয়। এ অপচয়ের টাকার ভাগ পায় গ্রামীণ টাউট-বাটপাড়রা; যারা ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করে। দেখা যাচ্ছে, এ অপচয় চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এর কোনো প্রতিকার নেই। এ অপচয় একটি ক্ষেত্রে নয়, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। তা রাজস্ব বাজেটের বেলায় সত্য, উন্নয়ন বাজেটের বেলায়ও সত্য।

সাবেক অর্থমন্ত্রী স্কুলগুলোকে ‘এমপিও’ভুক্তিকরণ প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, স্কুল নেই, ছাত্র নেই, শিক্ষক নেই- অথচ এমপিওভুক্ত করে সরকার থেকে টাকা দিতে হবে। এর জন্য প্রচণ্ড চাপ। হাসপাতালের ওষুধ বাজারে বিক্রি হয়, রোগীরা ওষুধ পান না। তাদের ওষুধ কিনতে হয় বাজার থেকে। এক্স-রের ফিল্ম বাজারে বিক্রি হয়। হাসপাতালে রোগীর খাবার নেই। তা-ও বাজারে বিক্রি হয়। অথচ এসব খাতে শত শত কোটি টাকা প্রতিবছর খরচ হয়।

জেলখানার কয়েদিদের খাবার কিনে খেতে হয় বলে বহুবার খবরের কাগজে খবর ছাপা হয়েছে। কত টাকার বাল্ব কত টাকায় কেনা হয়, তা-ও আমরা জানি। কয়েকদিন আগেই আনবিক শক্তি কেন্দ্রের ক্রয়ের ওপরে একটা খবর ছাপা হয়েছে, যা অনিয়মে ভর্তি। একই অবস্থা উন্নয়নের বাজেটেও। বলা হয়ে থাকে, সেখানে এক টাকার কাজ দু’টাকায় করা হয়। কাজের মান নিু। কাজের আগেই টাকা তুলে নেয়া হয়। কাজ না করে টাকা তোলা হয়। বছরের ৯-১০ মাসে ২০ শতাংশ টাকা খরচ হয় না। অথচ পরবর্তী দুই মাসে খরচ হয়ে যায় বাকি ৮০ শতাংশ টাকা। এ ঘটনা সর্বজনবিদিত।

কিন্তু কেউ এ ‘মধুচাকে’ আঘাত করতে চান না। এভাবে দেখলে বোঝা যায়, সরকারের খরচেই গণ্ডগোল। এখানে অদক্ষতা, চুরি, অপচয় সহ্যসীমার বাইরে চলে গেছে। অথচ এ বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। প্রতিবছর খরচের বোঝা বাড়ানো হচ্ছে। আর বাড়ছে ট্যাক্স। তৈরি হচ্ছে ইতিহাসের নজিরবিহীন বাজেট। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, খরচের ক্ষেত্রে গুণগত মান রক্ষা করা গেলে কম পরিমাণের বাজেট দিয়েও বেশি কাজ করা যায়। অপচয় বন্ধ করে নতুন কর আদায়ের ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়া যায়। গড়ে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের ২০ শতাংশ অপচয় ধরে নিলে কত টাকা হয় ভাবা যায়?

আসা যাক কর ফাঁকির প্রশ্নে। একটি দৈনিক ২৬ মে একটি খবর দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘উইথ হোল্ডিং ট্যাক্স’ খাতে ১৩৫০ কোটি টাকার একটি বড় ফাঁকি ধরেছে রাজস্ব বোর্ড। এটি একটি খবর। প্রায় প্রতিদিন ট্যাক্স ফাঁকির, ভ্যাট ফাঁকির খবর বিভিন্ন কাগজে নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। এসব একসঙ্গে যোগ করলে হাজার হাজার কোটি টাকা হবে। এ ফাঁকি রোধ করলে বাজেটের টাকার কোনো অভাব হয় না। মানুষকে করের বোঝায় কষ্ট দিতে হয় না।

অথচ দেখা যাচ্ছে, সরকার ফাঁকি রোধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কর ধার্যের পথে যাচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বছর দুই-তিনেক আগে রাজস্ব বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘বন্ডেড ওয়ারহাউস’-এর মাল বাইরে বিক্রি করার ফলে রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ-কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। বিদেশ থেকে তেল আমদানি হয়। সেই তেল ট্যাঙ্কারে তোলার সময় বাতাসে উড়ে যায়। গ্যাসের বিল, বিদ্যুতের বিলের টাকা মেরে দেয়া হয়। বিল কম করা হয়। বিল করা হয় না।

শত শত দোকান, হাজার হাজার দোকান দেশে। এরা ভ্যাটের জন্য নথিভুক্ত নয়। নথিভুক্ত করতে গেলেই আন্দোলন। আবার যারা নথিভুক্ত তারা ভ্যাটের টাকা সরকারকে জমা দেয় না। ভ্যাট তো ব্যবসায়ীদের নয়। তারা ভ্যাট সংগ্রহ করে সাধারণ ক্রেতার কাছ থেকে। সেই টাকা সরকারকে না দিয়ে তারা মেরে দেয়। শুল্ক বিভাগের ফাঁকির অঙ্ক তো পর্বতময় ফাঁকি। মালের ভুল বর্ণনা পরিচয় দিয়ে, আমদানিকৃত পণ্যের ক্যাটাগরি পরিবর্তন করে, পণ্যের ধরনের পরিবর্তন করে প্রতিমাসে হাজার হাজার কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। এর কোনো প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর আছে কররেয়াত। এর পরিমাণ ইদানীংকালে মাত্রার বাইরে চলে গেছে। বিগত ৪ বছরে প্রায় সোয়া লক্ষ কোটি টাকার কররেয়াত দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ীদের। ফলে ভুগছে রাজস্ব বোর্ড। তারা সরকারের বকুনি খাচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না, এটি বরাবরের অভিযোগ। হাজার হাজার কোটি টাকার কররেয়াত দিলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিশ্চয়তা দেখা দেবে- এটাই স্বাভাবিক।

এতসব কথা বলার উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে বলা যে, বাজেটের গুণগত মান বৃদ্ধি করে অর্থাৎ অপচয়, চুরি বন্ধ করে কয়েক বছর কর না বাড়িয়েও সরকার সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে পারে। এমনকি সরকার মধ্যবিত্তকে ব্যক্তিগত আয়কর থেকেও মুক্তি দিতে পারে। কীভাবে? রাজস্ব বোর্ড প্রায় ৬০-৭০টি উৎসে অগ্রিম আয়কর কেটে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও এ হার ১০-১৫ শতাংশ। উৎসে এ অগ্রিম আয়কর কাটার পর সরকারের আর পাওনা থাকে না। এ অবস্থায় রিটার্নের মাধ্যমে হিসাব নেয়ার ব্যবস্থার উপযোগিতা কী, যেখানে হাজার হাজার করদাতাকে উল্টো করের টাকা ফেরত দিতে হয়।

এদিকে সরকার দেখা যাচ্ছে, ভ্যাটের দিকেই নজর বেশি দিচ্ছে। এটি সুবিধাজনক, যদিও তা পরোক্ষ কর- সবাইকে একই হারে কর দিতে হয়। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার আর থাকে না। তবু দেখা যাচ্ছে, সরকার এ ভ্যাটের ওপরই বেশি নির্ভরশীল হচ্ছে। অথচ ‘ভ্যাট’ একটা ‘এক্সপেন্ডিচার ট্যাক্স’। এখানে সমস্যা একটা, ‘ইনকাম ট্যাক্স’ ইনকামের ওপর ট্যাক্স। তা দেয়া হলে ‘এক্সপেন্ডিচার ট্যাক্স’ চালু থাকবে কেন? এ বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।

এবার ২০১৯-২০ সালের বাজেটে কিছু অবশ্য করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করতেই চাই। আমার মতে, বাজেটের অর্থ সংগ্রহ এবং রাজস্ব ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টির উপকরণ রয়েছে। সরকার দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব বেশি আদায় করছে গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে। আবার উল্টোদিকে খরচের ক্ষেত্রে তা পাচ্ছে সুবিধাভোগী শ্রেণী। অধিকন্তু খরচের অগ্রাধিকারও ঠিক নেই। রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ধনীদের একাংশ কোনো ট্যাক্স দেয় না, ব্যবসায়ীদের একাংশ কর ফাঁকি দেয়।

আবার ভ্যাট দেয় সবাই একই হারে। এর অর্থ সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত বাজেটের টাকা জোগায়। বিপরীতে সরকার যে খরচ করে তার অপচয়ের দিক বাদ দিলেও অগ্রাধিকারের খাত নির্দিষ্ট নেই। কয়েক বছর ধরে শতাংশ হিসাবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ হ্রাস পাচ্ছে। এমনিতে দৃশ্যত টাকার অঙ্কে তা বাড়ছে।

অবকাঠামো, বড় বড় অবকাঠামো আগে না শিক্ষা ও স্বাস্থ্য আগে- এবিষয়ক অগ্রাধিকার সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। ‘জিপিএ-৫’প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ১০ শতাংশও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারে না। এতে শিক্ষার মানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার, না কি বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেয়া দরকার- এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। রাজস্ব সংগ্রহ ও রাজস্ব ব্যয় উভয় ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। এক্ষেত্রে গরিব ও মধ্যবিত্তের কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় আনা দরকার। কারণ বাজার সৃষ্টিতে তাদেরও রয়েছে বড় ভূমিকা- যা ছাড়া বাজার অর্থনীতি অচল।

ড. আরএম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×