বাজেট হোক ভারসাম্যপূর্ণ ও গণমানুষের

  মনজু আরা বেগম ১০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট হোক ভারসাম্যপূর্ণ ও গণমানুষের
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সরকারের এ মেয়াদে প্রথম বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে। বাজেট পেশের জন্য সরকারের সব রকম প্রস্তুতি চলছে। জনা যায়, এবারের বাজেটের আকার ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছি। আমাদের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে মাথাপিছু আয়। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশের ওপরে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃষি ক্ষেত্রে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার এ দেশে আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যায়। খাদ্যের অভাবে মারা যাওয়ার ঘটনা এখন আর আমাদের দেশে ঘটছে না।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রচুর পরিমাণে রেমিটেন্স প্রেরণ করছেন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত মাসের প্রথম ১০ দিনেই রেমিটেন্স এসেছে ৬১ কোটি ২১ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ২০২ কোটি টাকা। এভাবে আসতে থাকলে মাস শেষে এর পরিমাণ ১৫০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর কথা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার। এবার তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫ লাখ কোটি টাকার ওপরে। সে সময় জনসংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে সাত কোটি। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ কোটিতে। আসন্ন বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ ধরা হচ্ছে বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০১৬ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিগত ছয় বছরে মাথাপিছু মাসিক আয় বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় আয় ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। ২০১০ সালে প্রতিমাসে এ আয় ছিল ২ হাজার ৫৫৩ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে বার্ষিক গড় আয় বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে এ আয় কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের একক আয় নয়। পরিবারের আয় ও মোট জনসংখ্যাকে পরিবারপ্রতি ভাগ করে দেয়া হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব এসেছে। তবে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত পরিমাণে বাড়েনি। বিনিয়োগ না বাড়ার ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়নি। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতিতে একসময় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

জনসংখ্যা, সম্পদ এবং শিক্ষাকে ঘিরে আবর্তিত হয় দেশের অর্থনীতি। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন গুণগত-মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার। সম্পদের অসম বণ্টন দূর হবে না যথাযথ শিক্ষার আলো ছাড়া। বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার কথা যতই বলা হোক না কেন, সমাজ থেকে বৈষম্য দূরীভূত তো হবেই না বরং আরও বাড়বে। শিক্ষার সবস্তরে সমান প্রবেশাধিকারের সুযোগ সৃষ্টি, গ্রাম ও শহরের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য দূরীকরণ এবং এর গুণগতমান উন্নয়নের বিষয়টির ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যতই হচ্ছে, বৈষম্য ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, অতি দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হচ্ছে।

আমাদের উন্নয়নটা অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে না। বাংলাদেশে যে আটটি জেলা সবচেয়ে দরিদ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, তার ৫টিই রংপুর বিভাগে। আমাদের স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যই ছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি না। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হবে। সেজন্য রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আগামী বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ থাকতে হবে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কর রেয়াতের সুবিধা দিতে হবে। এ ছাড়াও মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে অনেক পিছিয়ে দিতে পারে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য উন্নত এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। বৈষম্যমূলক শিক্ষার অবসান এবং মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

সাধারণ শিক্ষার ওপর জোর না দিয়ে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। সেজন্য বাজেটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বরাদ্দ রাখতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর না দিলে আমরা একসময় মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত হব। মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে, যা একটি জাতির কাম্য হতে পারে না।

প্রতিবছর বিশাল আকারের বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, বাজেটের লক্ষ্য ও বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে যথাযথ খাতে এবং যথাসময়ে ব্যয় ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়, সেদিকে প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। আসন্ন বাজেটে উৎপাদনমুখী নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।

শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গত বাজেটের আগেও লিখেছিলাম শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতে। কারণ স্বল্প পুঁজিতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এ খাতেই সম্ভব। রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ওপর সর্বাধিক গুরুত্বরোপ করতে হবে, কারণ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে এনবিআর-এর হিসাব মতে, বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা মাত্র ৪০ লাখ। এক কোটিও না। এর মধ্যে আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা মাত্র ১৮ লাখ।

এনবিআর’র লোকবল, লজিসস্টিক সাপোর্টসহ আনুষঙ্গিক সুবিধাদি এত বিশাল জনসংখ্যার রাজস্ব সংগ্রহের জন্য যথেষ্ট বা পর্যাপ্ত নয়। এজন্য আয়কর সংগ্রহের জন্য বিদেশের অনুরূপ বেসরকারি উদ্যোগকে স্বাগত বা আহ্বান জানাতে হবে। এজন্য এ খাতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়নে বৈষম্য কমাতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যাবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চিহ্নিত পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে প্রয়োজন অনুপাতে আঞ্চলিক ভিত্তিতে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। বাজেটে শুধু বরাদ্দ রাখলেই চলবে না। বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে সময়মতো ছাড় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এর কার্যক্রম সম্পন্ন হয় সেজন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করে সুষ্ঠু তদারকির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

শুধু তা-ই নয়, এসব পিছিয়ে পড়া অবহেলিত অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামো খাত, বিশেষ করে রেল খাতের দ্রুত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সরকারি এ খাতটি অত্যন্ত অবহেলিত।

সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও বয়স্ক-প্রবীণ ব্যক্তিরা রেলপথে ভ্রমণ করতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন; কিন্তু রেলের অব্যবস্থাপনার কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের রেলপথে ভ্রমণ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজেটে এ দিকটিতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। আসন্ন বাজেটে উল্লেখকৃত সুপারিশগুলো আমলে নিয়ে একটি সুষম, গণমানুষের বাজেট উপস্থাপনের জন্য সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।

মনজু আরা বেগম : সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×