প্রস্তাবিত বাজেট তরুণ প্রজন্মবান্ধব কি?

  মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান ১৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট

১৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

তার বাজেট বক্তৃতায় স্পষ্ট করে তিনি বলেছেন, ‘তারুণ্যের শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’ স্লোগানের অধীনে দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবসমাজকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও উৎপাদনমুখী শক্তিতে রূপান্তরের জন্য সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় তরুণদের মধ্যে সব ধরনের ব্যবসায় উদ্যোগ (স্টার্টআপ) সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তাছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি শুভ সংবাদ। তবে সব তরুণ যে উদ্যোক্তা নন- সেটি বিবেচনায় নিয়ে তারুণ্যবান্ধব ব্যবস্থা সৃষ্টির অবারিত সুযোগ রেখে প্রস্তাবিত বাজেট সংসদে পাস করা উচিত হবে বলে আমরা মনে করি।

এছাড়াও তিনি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১৮ বছরের কম বয়সী নাগরিকদের নিবন্ধন ও তাদের পরিচয়পত্র সরবরাহের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। নিশ্চয়ই সরকার তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে সুদূরপ্রসারী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা ভাবছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই।

তবে তরুণ প্রজন্ম নির্ভরশীল অবস্থা থেকে কিভাবে স্বনির্ভর হতে পারে এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগসংবলিত বিষয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত, এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে তা হবে সরকার ও জনগণ উভয়ের জন্য কল্যাণকর।

৪০তম বিসিএসে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ প্রার্থী আবেদন করেছিলেন, যাদের সবাই কিন্তু উদ্যোক্তা ছিলেন না। এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ আর যাই থাক, বেকারত্ব যে অন্যতম কারণ; সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদন (২৩ জানুয়ারি, ২০১৮) অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেকারত্বের হার ভারতে অপরিবর্তিত, ভুটান ও শ্রীলংকায় কমলেও আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, নেপাল এবং পাকিস্তানে বেশি।

আইএলও একই প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থানের হার কম। কিন্তু কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় অধিকাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, যা দারিদ্র্য দূরীকরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাজেটে জীবন ও জীবিকামুখী প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয় অন্তর্ভুক্তিতে সরকারকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে প্রকাশ- দেশে প্রকৃত কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার।

১৬ নভেম্বর ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘আঞ্চলিক কর্মসংস্থান’ নিয়ে আইএলও ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলছে, দেশের নিষ্ক্রিয় ২৭.৪ শতাংশ তরুণ এবং ৪৫ শতাংশ তরুণী কোনো ধরনের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নন, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন না এবং কর্মসংস্থানের উপায়ও খুঁজে বের করতে পারছেন না। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ১২.৮ শতাংশ বেকার, যাদের মধ্যে ১০.৭ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত (২০১৭ সাল) এবং যাদের অধিকাংশই নিষ্ক্রিয়।

গৃহীত উচ্চশিক্ষা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিশ্চয়তা দিতে না পারায় বেকারত্বের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধারে-কাছেও নেই আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী উচ্চশিক্ষার সংস্পর্শে আনা দরকার।

পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা নির্ভর বাজেট পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি প্রশংসার যোগ্য, যা বাস্তবায়ন করতে হবে; তবে তা যেন গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সমতাভিত্তিক হয়।

বাংলাদেশে বিসিএসসহ বেশ তাৎপর্যসংখ্যক সরকারি চাকরিতে আবেদন থেকে শুরু করে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন ইত্যাদি আনুষ্ঠানিকতা প্রায় ২-৩ বছর ধরে চলমান থাকে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যে কোনো চাকরিতে তারুণ্যের মেধাকে কাজে লাগানো গেলে উভয়পক্ষের জন্যই তাতে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি।

মেধাবী তরুণ প্রজন্মের বিমুখতা একটি দক্ষ এবং উন্নত প্রশাসনের জন্য প্রত্যাশিত নয়। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদনের ফি বাতিলসহ অন্যান্য সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে মেধাবীরা যাতে অধিক হারে এগিয়ে আসতে পারে, তার পথও রাষ্ট্রকে সুগম করা দরকার; যার একটি সঠিক দিকনির্দেশনা এবারের বাজেট পাস করার আগে অন্তর্ভুক্ত করলে মঙ্গলজনক হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী তারুণ্যের চাওয়া-পাওয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যতের জন্য উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচনী ইশতেহার, চলমান মেগা প্রকল্প ও সম্প্রতি অনুমোদিত (৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮) শত বছরের ব-দ্বীপ পরিকল্পনার (ডেল্টা প্লান) বাস্তবায়ন; ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন; প্রধান প্রধান রেল সড়কগুলো দুই লাইনে উন্নীতকরণ এবং দূরযাত্রার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন (নন-স্টপ) দ্রুত ও আরামদায়ক ভ্রমণের ব্যবস্থা; বাংলাদেশ রেল ও বিমানকে লাভজনক খাতে রূপান্তর; ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি; উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠন; প্রচলিত ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির অবসান; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ; অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের বিকাশ; সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ও পরিমিত ব্যবহার এবং সম্পত্তি দখলমুক্তকরণ; ঋণখেলাপি, শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্রকারী, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি দেশ, যেখানে জনসাধারণ নিশ্চিত নিরাপত্তা অনুভব করবে।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান : পিএইচডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×