ভারতে চিকিৎসক ধর্মঘটের নেপথ্যে

  কৌশিক দত্ত ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসক

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী নিজের ভারতজোড়া খ্যাতি আরও খানিকটা বাড়িয়ে নিলেন। লোকসভা নির্বাচনের আগে আঞ্চলিক দলগুলোকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।

দুর্ভাগ্যক্রমে তার সেই প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। তিনি সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। সারা ভারতের চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজটি সফলভাবে তিনিই করলেন। পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসকদের ওপর লাগাতার অকথ্য শারীরিক নির্যাতন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের নিন্দনীয় ভূমিকার পরিণতিতে ভারতজুড়ে পালিত হল প্রতিবাদ দিবস।

সারা ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে, এমনকি দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে পালিত হল প্রতিবাদী ধর্মঘট। কলকাতার রাস্তায় বেরোল মহামিছিল। চিকিৎসকদের পাশে পাশে মিছিলে হাঁটলেন, ন্যায়ের শাসন দাবি করলেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ অচিকিৎসক মানুষ।

যে সমস্যা এক ঘণ্টায় মেটানো যেত, তাকে সরকারি উদ্যোগে জটিল করে তুলে রোগীদেরও ঠেলে দেয়া হল চরম দুর্ভোগের মধ্যে। আগেও বারবার চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনাগুলোকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এবং হাসপাতালের উন্নয়নসংক্রান্ত চিকিৎসকদের দাবি-দাওয়াকে হিমঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে পত্রপাঠ। তারই পরিণতিতে নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজের ভয়াবহ হিংস্রতা এবং চিকিৎসককে হত্যার চেষ্টা ঘটে যাওয়ার পরও সরকারের তরফে কোনো অনুশোচনা চোখে পড়ল না। তার বদলে চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে চিকিৎসকদের বাধ্য করা হল আন্দোলনের পথে যেতে।

১০ জুন ২০১৯ পঁচাশি বছরের বৃদ্ধের মৃত্যুর পর দুই ট্রাক বোঝাই সশস্ত্র দুষ্কৃতি এসে একটি সরকারি হাসপাতালকে আক্রমণ করে। সেখানে কর্তব্যরত সরকারি কর্মচারীদের বেধড়ক মরধর এবং দুজন চিকিৎসককে খুন করার চেষ্টা করে। ভারি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে এক তরুণ চিকিৎসকের মাথার খুলি ভেঙে হাড়ে গর্ত করে মস্তিষ্কে রক্তপাত ঘটানো হয়। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন এবং অসীম জীবনীশক্তির জোরে একটু একটু করে সেরে উঠছেন। যে কোনো আত্মসম্মান জ্ঞানসম্পন্ন মুখ্যমন্ত্রী এ আক্রমণকে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে দেখবেন এবং কঠোর হাতে তার মোকাবেলা করবেন, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সেই পথে হাঁটলেন না। তার পুলিশ (পুলিশমন্ত্রী/স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বয়ং তিনি) বিনা বাধায় দুশ’ গুণ্ডাকে ঢুকতে দিল এবং চিকিৎসকদের বাঁচাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিল না আধা মিনিট দূরে এন্টালি থানা থাকা সত্ত্বেও। তিনি নিজে অদ্ভুত কিছু বক্তব্য পেশ করলেন পরবর্তী কয়েকদিন ধরে, রাজ্যের প্রধান হয়েও আন্দোলনসহ গোটা বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রং দেয়ার চেষ্টা করলেন এবং রাজ্যে ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকা বিজেপি সেই অবিমৃশ্যকারিতা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটল।

মুখ্যমন্ত্রী যদি পরদিন অফিস যাওয়ার পথে একবার আইসিইউতে ভর্তি তরুণ চিকিৎসক পরিবহকে দেখতে যেতেন, তার মাথায় হাত রাখতেন মায়ের মতো আর নীলরতন হাসপাতালের আতঙ্কিত জুনিয়র চিকিৎসকদের সামনে গিয়ে বলতেন, ‘ভয় পেও না, কাজ করো, আমি তো আছি, আমি সুরক্ষা দেব’- তাহলে আন্দোলন এগোতোই না এতদূর। সদ্য পাস করা তরুণ ছেলেমেয়েরা সরল মনে তাকে বিশ্বাস করত; কারণ ওইটুকু স্নেহের কথা, ভরসার কথাই তারা শুনতে চেয়েছিল। তারপর মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী না হয় তার আগেকার সব প্রতিশ্রুতির মতো এবারের প্রতিশ্রুতিও বেমালুম ভুলেই যেতেন; কিন্তু এটুকু নমনীয়তা দেখালে এত বড় সমস্যা তিনি সাময়িকভাবে এড়াতে পারতেন। তা হল না। তার ভূমিকা এ সহজ পথটি রোধ করে দাঁড়াল। তিনি যে রাজ্যবাসীর অভিভাবক নন, প্রভু চিকিৎসকসহ সব সরকারি কর্মচারীকে যে তিনি ভৃত্যমাত্র মনে করেন, তা তিনি আবার বুঝিয়ে দিলেন স্বকীয় অমিত ভাষণে। ছাত্র ও চিকিৎসকদের নিজের কলেজে বহিরাগত বলে দাগিয়ে দিয়ে এবং হুমকি দিয়ে তিনি বৈরিতাকে চরম সীমায় নিয়ে গেলেন। ইংরেজিতে এ কর্মকাণ্ডকে বলে 'burning the bridges'. আন্দোলন হুহু করে ছড়িয়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গের সব হাসপাতালে।

পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠল ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার বাহিনী। হকিস্টিক হাতে হাসপাতাল আক্রমণ, পাথর ছুড়ে একের পর এক জুনিয়র চিকিৎসকের মাথা ফাটানো, এসিডের বোতল হাতে ভয় দেখানো, মেয়েদের হোস্টেলের সামনে প্যান্ট খুলে ধর্ষণের হুমকি, ব্যাংকে টাকা তুলতে যাওয়া ডেন্টাল ছাত্রের চোখ নষ্ট করে দেয়া, রাতের অন্ধকারে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে আগুন লাগিয়ে ছাত্রদের পুড়িয়ে মারার চেষ্টা ইত্যাদি অভাবনীয় নৃশংস পদ্ধতি অবলম্বন করে আন্দোলনটিকে ভাঙার চেষ্টা চলতে লাগল। এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হল যে, আন্দোলনরত চিকিৎসকদের পক্ষে নমনীয় হয়ে কিছু পরিষেবা দিতে শুরু করা হয়ে উঠল অসম্ভব। মাঝখান থেকে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন সিনিয়র চিকিৎসক ও অধ্যাপকরাও। স্নেহভাজন ছাত্রদের ওপর এমন নির্যাতন তাদের পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠল। তারা দলে দলে পদত্যাগ করতে শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক সরকারি চিকিৎসক ও অধ্যাপক পদত্যাগ করেছেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে। নিরো বাঁশি বাজাচ্ছেন।

ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষও। এখানে সরকারের অঙ্কে ভুল হয়ে গিয়েছিল। তারা মানুষকে মূর্খ ভেবেছিলেন। মনে করেছিলেন পেটোয়া কিছু লোকের সাহায্যে অপপ্রচার চালিয়ে চিকিৎসকদের আবার ভিলেন সাজানো যাবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিয়ে ভেঙে যাওয়া ভোট ব্যাংকটিকে আবার জোড়া লাগানো যাবে। সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লেন এবং ক্ষেপলেন; কিন্তু শত মিথ্যা প্রচার সত্ত্বেও গরিষ্ঠসংখ্যক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ রুষ্ট হলেন সরকারের প্রতি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল, যা স্পষ্ট হল মহামিছিলে।

পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসক সংগঠনগুলোর ডাকে ১৪ জুন বিকালে মিছিল হল নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত। যেহেতু এ আন্দোলন ধসেপড়া সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে, চিকিৎসকদের সুরক্ষার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবিতেও, তাই মিছিলে যোগ দেয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি ছিল উদার আহ্বান। তারা এলেন। কেউ অফিস ফেরত, কেউ স্কুল ছুটি নিয়ে ছুটে এলেন। হাজার হাজার মানুষ রোগী ও চিকিৎসক পাশাপাশি পথ হাঁটলেন গ্রীষ্মের বিকালে। স্লোগান উঠল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। রোগীরা চিৎকার করে বললেন, ‘সেভ দ্য সেভিয়রস’, ‘ডাক্তারের রক্ত হবে নাকো ব্যর্থ’। স্লোগান উঠল, ‘স্বাস্থ্যের দাবিতে, শান্তির দাবিতে আমাদের সংগ্রাম চলছে চলবে’। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠি হাতে পুলিশ কনস্টেবলও স্মিত হাসিতে জানিয়ে দিলেন, সরকারের আজ্ঞা মানতে বাধ্য হলেও তার অন্তর রয়েছে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়ানো, বাড়ির বারান্দায় জড়ো হওয়া অগণিত মানুষ অবাক হয়ে দেখছিলেন, যেন ভরা বর্ষার ব্রহ্মপুত্র সগর্জনে ছুটে চলেছে সাগরের দিকে। মোটরসাইকেল থামিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেড় মাইল লম্বা মিছিলের ভিডিও তুলছিলেন নব্য যুবকরা। এ ছবি তারা রাখবেন নিজেদের সঞ্চয়ে। এ ছবি তাদের জোগাবে অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস।

পরিচিত নাট্যকর্মীকে মিছিলে দেখে ধন্যবাদ জানাতে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘সে কী? এ মিছিল তো আমাদেরও। ধন্যবাদ নয়, এসো পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাই।’ তার কথা শুনে চোখে জল এল, বুকে বল এল। এত মিথ্যা রটনার পরও মানুষের সঙ্গে চিকিৎসকদের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারেনি তাহলে ক্ষমতাবানরা! আমরা সবাই মিলে তাহলে আবার বাঁচিয়ে তুলতে পারব অর্ধমৃত স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে! পরিকল্পনা ও পরিকাঠামোর অভাবে বারান্দায় পড়ে কাতরাতে হবে না ডেঙ্গু রোগীদের, অকালে মরে যেতে হবে না দুধের শিশুদের! সেই সুদিন আমরা আনতে পারব! পারব। নিশ্চয়ই পারব।

মিছিলের কলেবর দেখে, আওয়াজ শুনে সরকারের ওপর মহল ভয় পেয়েছেন। টের পেয়েছেন সিংহাসনের নিচের ভূমিকম্প। তাদের সুর বদলাতে আরম্ভ করেছে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ‘আলোচনা’ শব্দটি উচ্চারণ করতে শুরু করেছেন তারা। সম্ভবত একটু দেরি হয়ে গেছে।

মুখ্যমন্ত্রী যদি একবার হুঙ্কার দিতেন, ‘আমার হাসপাতালে গুণ্ডামি বরদাশত করব না, আমার ডাক্তারের গায়ে হাত দিলে সবাইকে দেখে নেব’- তাহলে আজকের মিছিল হতোই না। চিকিৎসক নেতারা দু’দিনের চেষ্টায় এত মানুষকে একত্র করতে পারতেন কিনা সন্দেহ। টিভিতে যারা মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ শুনেছেন, তাদের অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে ছুটে এসেছেন মিছিলে।

এখনও হয়তো সব শেষ হয়নি। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী যদি চান, এখনও এক ঘণ্টায় সমস্যা মিটতে পারে। যে কোনো মুহূর্তে কাজে যোগ দেয়ার জন্য চিকিৎসকরা তৈরি, শুধু যদি মুখ্যমন্ত্রী চান। তিনি রাজ্যের পরিচালক। তাকে আমরা সম্মান করি আজও। এখনও তিনি সহমর্মিতা আর সদিচ্ছা দেখালে চিকিৎসককুল যথাসাধ্য তার সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। আর কোনো রোগীকে আউটডোরের বাইরে থেকে ফিরে যেতে হবে না। আবার ভোর হবে যদি তিনি চান। তিনি কি চাইবেন?

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে

কৌশিক দত্ত : কলকাতার আমরি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×