অল্প তেলে মচমচে ভাজা যায়?
jugantor
অল্প তেলে মচমচে ভাজা যায়?

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার মান্নোয়নের সংকট নিয়ে আমাদের সমাজে একটি হতাশা রয়েছে। নিুমাধ্যমিক পর্যায় থেকে নানা নিরীক্ষার কথা আমরা প্রায়ই শুনি। মাঝে মাঝেই সাড়ম্বরে কারিকুলাম-সিলেবাসের পরিবর্তন হয়।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পরিচালনায় নতুন করে বই লেখা ও প্রকাশ করা হয়। সেগুলোর মধ্যে নানা ভুল-অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়। তা নিয়ে শোরগোল উঠে। আবার সংস্কারে নামে শিক্ষা বোর্ড। এভাবে নিরীক্ষার অক্টোপাসে পালাবদল অব্যাহতভাবে ঘটতে থাকে। আমরা জিপিয়ে ৫-এর প্রতিযোগিতা দেখতে থাকি। তথাকথিত ভালো ফলাফলের ঘূর্ণিতে আটকে পড়ে শিক্ষার্থী।

পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানা পরীক্ষা দিতে দিতে আমাদের কোমলমতি শিশুরা শিক্ষার্থী না হয়ে পরীক্ষার্থীই থেকে যায়। ক্লাস আর কোচিং করতে করতে ওদের অবকাশ বলে কিছু থাকে না। ফলে জানার জগৎ তৈরি করার কোনো জায়গা তাদের কাছে অচেনা হয়ে যায়। বুকের মধ্যে বড় হওয়ার স্বপ্ন তৈরি করার মতো মেধার শিক্ষক ক্রমাগত খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার মানোন্নয়ন হওয়ার অবকাশ কতটুকু?

বিশেষ কোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা নয়- সার্বিক বিচারে দেশের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনো ও শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বস্তি পাওয়া যাবে না। অনুসন্ধান করলে এর অনেক কারণ হয়তো চিহ্নিত করা যাবে। তবে আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা ও সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতায় বলব শিক্ষকের মান উন্নত করতে না পারলে আর কোনো প্রক্রিয়াতেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।

আপনি একটি স্কুলের চমৎকার অবকাঠামো তৈরি করলেন, নানা আধুনিক শিক্ষা উপকরণে সাজালেন; কিন্তু দুর্বল কম মেধাবী, শিক্ষকতায় মানসিকভাবে অনাগ্রহী নিরেট চাকরিপ্রার্থীকে শিক্ষক বানালেন, তাহলে শিক্ষার মানোন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা পূরণের তেমন কোনো সুযোগ থাকবে না।

আবার মেধাবী শিক্ষকও পেশা জীবনের হতাশা নিয়ে কাক্সিক্ষত শিক্ষা দিতে পারবেন না। শিক্ষক যখন দেখেন একই সমাজে বাস করা তার পরিচিত বন্ধু একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সরকারি আমলা হয়ে নানা প্রণোদনায় সুখ ভোগ করছেন আর তাকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ম্রিয়মাণ হয়ে চলতে হচ্ছে, তাহলে কেমন করে তারা ক্লাসরুমে স্বতঃস্ফূর্ত হবেন? শুধু শিক্ষকের আদর্শ ধারণ করে ছেঁড়া চটি আর পুরনো পাঞ্জাবি পরা শিক্ষক এ যুগে আশা করা বাতুলতা মাত্র।

আমি আজকের লেখায় একজন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের যাপিত জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই, তাহলে শিক্ষককুলের বাস্তব অবস্থাটা অনুধাবন করা যাবে।

যদি কেউ বলেন এ আর নতুন কী! সবাই জানেন। আমি বলব, না, অনেকেই পুরোটা জানেন না। আর অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় নীতিনির্ধারকরা জানেন না অনেকটাই। দুটো সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার এক পরিচিত তরুণ দ্বিতীয় গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। পদসংক্রান্ত নানা জটিলতায় মামলা হওয়ায় কয়েক বছর ঝুলে ছিল ওরা। অতঃপর নিষ্পত্তি হয়।

সরকার যথা জায়গায় পদায়ন করতে না পারায় এদের অনেককেই সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বানিয়ে দিয়েছে। তাতে এ নতুন শিক্ষকদের অনেকের মধ্যে স্বস্তি নেই। অনেকেই মানসিকভাবে শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। শিক্ষকতা পেশা আর দশটা চাকরির মতো নয়। শিক্ষকতার প্রতি আন্তরিক, আগ্রহী না হলে ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। এ ধারার তরুণ-তরুণীদের অনেককে অনেকটা হাত-পা বেঁধে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে স্কুলে।

তারপরও সমাজের মানুষ- পরিচিতজনরা আশ্ব^স্ত করেছে, বলেছে এটিই ভালো হয়েছে। সরকার এখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আকর্ষণীয় বেতন দিয়েছে। এখানেই বরঞ্চ ভালো থাকবে।

শিক্ষকতায় মানসিকভাবে অপ্রস্তুত আমার পরিচিত তরুণটি আনন্দ-নিরানন্দের মধ্য দিয়ে এক গ্রামের স্কুলে যোগ দিয়েছে। বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের ভার ওর ওপর। শহরতলির স্কুলে লেখাপড়া করে ছোট দুই ভাইবোন। ভাড়া বাসায় ভাইবোনকে নিয়ে থাকে এ অবিবাহিত তরুণটি। ফলে পরিবার নিয়ে এখানেই থাকতে হচ্ছে।

ছেলেটি প্রতিদিন ভোরে রওনা হয় কর্মক্ষেত্রে। যাওয়া-আসায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় হয়। যত সুযোগ-সুবিধা লোক মুখে শুনেছে, বাস্তবতা দেখে হতাশ হতে হয়েছে ওকে। ১১ হাজার ৩০০ টাকা মূল বেতনে অন্যান্য ভাতাসহ সাকুল্যে যখন সাড়ে ষোল হাজার টাকা বেতন পায় তখন সংসারের হিসাব মেলাতে পারে না।

আরও কশাঘাত পরে যখন সত্যটি জেনে বাড়িওলা চাচা আঁতকে উঠে বলেন, আমার গাড়ির ড্রাইভারকেই তো আমি সতের হাজার টাকা বেতন দেই! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এ তরুণটির কি দৈবাৎ মনে হতে পারে এর চেয়ে ড্রাইভার হওয়া ভালো ছিল? তাহলে গাড়ি ভাড়াও লাগত না।

তরুণটি হিসাব দিল স্কুলে যাওয়া-আসার গাড়িভাড়া ও দুপুরে স্কুলে কোনোরকম খাওয়ায় পাঁচ হাজার টাকা চলে যায় ওর। বাবার পেনশনের টাকায় বাড়িভাড়া মেটানো হয়। হাতে থাকা প্রায় বার হাজার টাকায় ভাইবোনের লেখাপড়া আর চিকিৎসা ও খাওয়া-পড়া চালাতে হয়। পাঠক হিসাব মেলাতে পারবেন কিনা জানি না। আমি রণে ভঙ্গ দিয়েছি। সমস্যা আরও আছে। প্রায় দেড়শ’ ছাত্রছাত্রীর স্কুলে ওরা চারজন শিক্ষক।

এর মধ্যে নানা সংকট- মিটিং ইত্যাদি নিয়ে প্রধান শিক্ষক মহোদয়কে উপজেলার শিক্ষা অফিসে ছুটতে হয়। সেখানে অনেক সময় নানা মানসিক পীড়নে বিধ্বস্ত হতে হয়। ও জানালো এই বিরুদ্ধ অবস্থায় সময় ও পরিবেশের কারণে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের এই হেডমাস্টার সাহেবের আরেকটি হতাশা আছে। যারা ভিন্ন স্বপ্ন থেকে হঠাৎ করে শিক্ষক হয়েছেন তারা এসে দেখলেন এই চেয়ারটিই তার শেষ ঠিকানা। বছরে বছরে সামান্য ইনক্রিমেন্টের টাকা যোগ হওয়া ছাড়া আজীবন একই চেয়ারেই থাকতে হবে।

এই যদি হয় বাস্তব চিত্র, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন মেধাবী তরুণ কেন প্রাইমারি স্কুল এবং উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখবে? আমরা তো সবাই বলি প্রাথমিক স্তরে ভিত তৈরি না হলে মেধাবী প্রজন্ম পাওয়া যাবে না। তাহলে আমরা শক্ত ভিত তৈরির মেধাবী কারিগর আকৃষ্ট না করে মানোন্নয়ন আশা করছি কেমন করে?

সরকারের পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সব সরকারি চাকরিজীবীর মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও সংসার চালানোতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে মানতেই হবে। কিন্তু একটি বড় সংখ্যক শিক্ষকের যেখানে মাসকাবারি বেতনই ভরসা, তার যাপিত জীবন কেমন? সাধারণ মানুষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রীর মধ্যেও কিছুটা ধোঁয়াশা আমি দেখতে পাই। তাই প্রকৃত বাস্তবতার উদাহরণটা এখানে উপস্থাপন প্রাসঙ্গিক হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র অধ্যাপক। ৫-৬ বছর পর অবসরে যাবেন। শিক্ষাজীবনের ঝকঝকে সার্টিফিকেট আছে তার। অসম্ভব দায়িত্বশীল শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। একজন বিদগ্ধ গবেষক। দেশ-বিদেশের জার্নালে তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। তার লেখা অনেক একাডেমিক বই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্সে আছে। তিনি জাতীয় বেতন স্কেলের ১ নম্বর গ্রেডে (সিলেকশন গ্রেডে) বেতন পান।

ক’দিন আগে এক সহপাঠী- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা টেলিফোনে বলছিলেন ‘তোমরা তো বেশ ভালো আছ। বেশ আরামে ক্যাম্পাসে থাকছ। বাইরে থাকলে তো অনেক টাকা ভাড়া গুনতে হতো।’ অধ্যাপক চমকে উঠলেন। বুঝলেন বন্ধুর ধারণা আমরা বিনি পয়সায় বা স্বল্প খরচে ক্যাম্পাসের বাসায় থাকি।

শুধরে দিয়ে বললেন, সরকারি নিয়মে আমার বেতনের অর্ধেক কেটে নেয়া হয়। ক্যাম্পাসের বাইরে- সাভারে এর চেয়ে ভালো বাসায় থাকলেও ২০ হাজার টাকা ভাড়া হবে না। এখানে আমাকে দিতে হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বইপত্রসহ গবেষণা সরঞ্জাম কিনতে যা খরচ হয় তার সিকি ভাগও গবেষণা ভাতা পাওয়া যায় না। শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল বন্ধুটি।

সংসারের বাইরে এই অধ্যাপকের নিজস্ব খরচ বলতে মাসে গড়ে হাজার পাঁচেক টাকার বই ও গবেষণা জার্নাল কেনা। সংসার চালানোর পর উদ্বৃত্ত থাকে না বলে প্রয়োজন থাকলেও গাড়ি কিনতে পারেননি। এখন দুর্ভাবনা অবসরের পর মাথা গুঁজবেন কোথায়! একটি ঠাঁই তৈরি করা দরকার। এমন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি করে ব্যাংক কর্পোরেট লোন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের এই শিক্ষকের দুটো বড় সংকট। অবসরের পর মাথা গোঁজার জন্য আশ্রয় তৈরি করা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি বছর বিশেক আগে এক খণ্ড জমি কিনেছিলেন। এখন ঘর বানাতে হবে। আর মেয়েটি বিশ্বব্যিালয়ের পাট চুকিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছে যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখানে পড়াতে একটি বড় খরচ আছে। তাই চোখ বন্ধ করে অধ্যাপক ৫০ লাখ টাকা লোন নিয়ে নিলেন।

পরের মাস থেকে সুদ-আসল কেটে হাতে বেতন পেতে থাকলেন ১৯ হাজার টাকার মতো। সংসার চালাতে চোখে অন্ধকার দেখলেন অধ্যাপক। পৈতৃক বাড়ি থেকে সামান্য আয় আসত। আর বছর ঘুরলে প্রকাশকদের কাছ থেক যৎসামান্য রয়্যালটির টাকা। সেই সঙ্গে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার সুযোগ পেলেন। কায়ক্লেশে চলার বন্দোবস্ত হল।

এমন একদিন তার ছাত্র সরকারের উপসচিব এলেন দেখা করতে। চকচকে নতুন গাড়ি নিয়ে। জানলেন, সহজ শর্তে সরকার ওকে গাড়ি কেনার ঋণ দিয়েছে। ড্রাইভারসহ গাড়ির ব্যয় নির্বাহের জন্য ওদের যে ভাতা দেয়া হয় তা অধ্যাপক সাহেবের বর্তমানে পাওয়া বেতনের দ্বিগুণেরও বেশি।

হয়তো অধ্যাপক সাহেব হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেছেন। স্কেল অনুযায়ী তিনি বেতন পান সিনিয়র সচিবের সমান। কিন্তু তাকে ঢাকা যেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ে। ঢাকা শহরের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবাস রিকুইজিশন দেয়ার নিয়ম নেই। তেমন প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগতভাবে রেন্ট-এ কারের দ্বারস্থ হতে হয়।

এসব গল্প শুনে আমার স্নেহভাজন এক সিনিয়র সাংবাদিক বলছিলেন, ‘অল্প তেলে মচমচে ভাজা আর কতটুকু হবে! একজন বিদগ্ধ গবেষককে নির্ভাবনায় গবেষণা ও শিক্ষকতার সুযোগ কি দিয়েছে রাষ্ট্র?’ বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাসরুম আর ল্যাবরেটরি যতই সুসজ্জিত হোক।

শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে যতই গল্প-কাহিনী ফাঁদা হোক, শিক্ষককে দুশ্চিন্তায় রেখে- যোগ্য সম্মান না দিয়ে শিক্ষার অগ্রগতি কী করে সম্ভব! বিশ্ব বিচারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং উপরে উঠবে কি শুকনো কথায়? যেসব অনুষঙ্গ এসবের পেছনে কাজ করে, এর প্রণোদনা তো সরকারকেই দিতে হয়। মানতে হবে শুধু মুখের কথায় শিক্ষার মানোন্নয়ন হয় না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

অল্প তেলে মচমচে ভাজা যায়?

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৮ জুন ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার মান্নোয়নের সংকট নিয়ে আমাদের সমাজে একটি হতাশা রয়েছে। নিুমাধ্যমিক পর্যায় থেকে নানা নিরীক্ষার কথা আমরা প্রায়ই শুনি। মাঝে মাঝেই সাড়ম্বরে কারিকুলাম-সিলেবাসের পরিবর্তন হয়।

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পরিচালনায় নতুন করে বই লেখা ও প্রকাশ করা হয়। সেগুলোর মধ্যে নানা ভুল-অসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়। তা নিয়ে শোরগোল উঠে। আবার সংস্কারে নামে শিক্ষা বোর্ড। এভাবে নিরীক্ষার অক্টোপাসে পালাবদল অব্যাহতভাবে ঘটতে থাকে। আমরা জিপিয়ে ৫-এর প্রতিযোগিতা দেখতে থাকি। তথাকথিত ভালো ফলাফলের ঘূর্ণিতে আটকে পড়ে শিক্ষার্থী।

পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানা পরীক্ষা দিতে দিতে আমাদের কোমলমতি শিশুরা শিক্ষার্থী না হয়ে পরীক্ষার্থীই থেকে যায়। ক্লাস আর কোচিং করতে করতে ওদের অবকাশ বলে কিছু থাকে না। ফলে জানার জগৎ তৈরি করার কোনো জায়গা তাদের কাছে অচেনা হয়ে যায়। বুকের মধ্যে বড় হওয়ার স্বপ্ন তৈরি করার মতো মেধার শিক্ষক ক্রমাগত খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষার মানোন্নয়ন হওয়ার অবকাশ কতটুকু?

বিশেষ কোনো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা নয়- সার্বিক বিচারে দেশের স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনো ও শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বস্তি পাওয়া যাবে না। অনুসন্ধান করলে এর অনেক কারণ হয়তো চিহ্নিত করা যাবে। তবে আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা ও সামাজিক জীবনের অভিজ্ঞতায় বলব শিক্ষকের মান উন্নত করতে না পারলে আর কোনো প্রক্রিয়াতেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।

আপনি একটি স্কুলের চমৎকার অবকাঠামো তৈরি করলেন, নানা আধুনিক শিক্ষা উপকরণে সাজালেন; কিন্তু দুর্বল কম মেধাবী, শিক্ষকতায় মানসিকভাবে অনাগ্রহী নিরেট চাকরিপ্রার্থীকে শিক্ষক বানালেন, তাহলে শিক্ষার মানোন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা পূরণের তেমন কোনো সুযোগ থাকবে না।

আবার মেধাবী শিক্ষকও পেশা জীবনের হতাশা নিয়ে কাক্সিক্ষত শিক্ষা দিতে পারবেন না। শিক্ষক যখন দেখেন একই সমাজে বাস করা তার পরিচিত বন্ধু একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সরকারি আমলা হয়ে নানা প্রণোদনায় সুখ ভোগ করছেন আর তাকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ম্রিয়মাণ হয়ে চলতে হচ্ছে, তাহলে কেমন করে তারা ক্লাসরুমে স্বতঃস্ফূর্ত হবেন? শুধু শিক্ষকের আদর্শ ধারণ করে ছেঁড়া চটি আর পুরনো পাঞ্জাবি পরা শিক্ষক এ যুগে আশা করা বাতুলতা মাত্র।

আমি আজকের লেখায় একজন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ও একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের যাপিত জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই, তাহলে শিক্ষককুলের বাস্তব অবস্থাটা অনুধাবন করা যাবে।

যদি কেউ বলেন এ আর নতুন কী! সবাই জানেন। আমি বলব, না, অনেকেই পুরোটা জানেন না। আর অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় নীতিনির্ধারকরা জানেন না অনেকটাই। দুটো সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার এক পরিচিত তরুণ দ্বিতীয় গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। পদসংক্রান্ত নানা জটিলতায় মামলা হওয়ায় কয়েক বছর ঝুলে ছিল ওরা। অতঃপর নিষ্পত্তি হয়।

সরকার যথা জায়গায় পদায়ন করতে না পারায় এদের অনেককেই সরকারি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বানিয়ে দিয়েছে। তাতে এ নতুন শিক্ষকদের অনেকের মধ্যে স্বস্তি নেই। অনেকেই মানসিকভাবে শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। শিক্ষকতা পেশা আর দশটা চাকরির মতো নয়। শিক্ষকতার প্রতি আন্তরিক, আগ্রহী না হলে ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। এ ধারার তরুণ-তরুণীদের অনেককে অনেকটা হাত-পা বেঁধে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে স্কুলে।

তারপরও সমাজের মানুষ- পরিচিতজনরা আশ্ব^স্ত করেছে, বলেছে এটিই ভালো হয়েছে। সরকার এখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আকর্ষণীয় বেতন দিয়েছে। এখানেই বরঞ্চ ভালো থাকবে।

শিক্ষকতায় মানসিকভাবে অপ্রস্তুত আমার পরিচিত তরুণটি আনন্দ-নিরানন্দের মধ্য দিয়ে এক গ্রামের স্কুলে যোগ দিয়েছে। বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের ভার ওর ওপর। শহরতলির স্কুলে লেখাপড়া করে ছোট দুই ভাইবোন। ভাড়া বাসায় ভাইবোনকে নিয়ে থাকে এ অবিবাহিত তরুণটি। ফলে পরিবার নিয়ে এখানেই থাকতে হচ্ছে।

ছেলেটি প্রতিদিন ভোরে রওনা হয় কর্মক্ষেত্রে। যাওয়া-আসায় পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় হয়। যত সুযোগ-সুবিধা লোক মুখে শুনেছে, বাস্তবতা দেখে হতাশ হতে হয়েছে ওকে। ১১ হাজার ৩০০ টাকা মূল বেতনে অন্যান্য ভাতাসহ সাকুল্যে যখন সাড়ে ষোল হাজার টাকা বেতন পায় তখন সংসারের হিসাব মেলাতে পারে না।

আরও কশাঘাত পরে যখন সত্যটি জেনে বাড়িওলা চাচা আঁতকে উঠে বলেন, আমার গাড়ির ড্রাইভারকেই তো আমি সতের হাজার টাকা বেতন দেই! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এ তরুণটির কি দৈবাৎ মনে হতে পারে এর চেয়ে ড্রাইভার হওয়া ভালো ছিল? তাহলে গাড়ি ভাড়াও লাগত না।

তরুণটি হিসাব দিল স্কুলে যাওয়া-আসার গাড়িভাড়া ও দুপুরে স্কুলে কোনোরকম খাওয়ায় পাঁচ হাজার টাকা চলে যায় ওর। বাবার পেনশনের টাকায় বাড়িভাড়া মেটানো হয়। হাতে থাকা প্রায় বার হাজার টাকায় ভাইবোনের লেখাপড়া আর চিকিৎসা ও খাওয়া-পড়া চালাতে হয়। পাঠক হিসাব মেলাতে পারবেন কিনা জানি না। আমি রণে ভঙ্গ দিয়েছি। সমস্যা আরও আছে। প্রায় দেড়শ’ ছাত্রছাত্রীর স্কুলে ওরা চারজন শিক্ষক।

এর মধ্যে নানা সংকট- মিটিং ইত্যাদি নিয়ে প্রধান শিক্ষক মহোদয়কে উপজেলার শিক্ষা অফিসে ছুটতে হয়। সেখানে অনেক সময় নানা মানসিক পীড়নে বিধ্বস্ত হতে হয়। ও জানালো এই বিরুদ্ধ অবস্থায় সময় ও পরিবেশের কারণে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের এই হেডমাস্টার সাহেবের আরেকটি হতাশা আছে। যারা ভিন্ন স্বপ্ন থেকে হঠাৎ করে শিক্ষক হয়েছেন তারা এসে দেখলেন এই চেয়ারটিই তার শেষ ঠিকানা। বছরে বছরে সামান্য ইনক্রিমেন্টের টাকা যোগ হওয়া ছাড়া আজীবন একই চেয়ারেই থাকতে হবে।

এই যদি হয় বাস্তব চিত্র, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন মেধাবী তরুণ কেন প্রাইমারি স্কুল এবং উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখবে? আমরা তো সবাই বলি প্রাথমিক স্তরে ভিত তৈরি না হলে মেধাবী প্রজন্ম পাওয়া যাবে না। তাহলে আমরা শক্ত ভিত তৈরির মেধাবী কারিগর আকৃষ্ট না করে মানোন্নয়ন আশা করছি কেমন করে?

সরকারের পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে সব সরকারি চাকরিজীবীর মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও সংসার চালানোতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে মানতেই হবে। কিন্তু একটি বড় সংখ্যক শিক্ষকের যেখানে মাসকাবারি বেতনই ভরসা, তার যাপিত জীবন কেমন? সাধারণ মানুষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রীর মধ্যেও কিছুটা ধোঁয়াশা আমি দেখতে পাই। তাই প্রকৃত বাস্তবতার উদাহরণটা এখানে উপস্থাপন প্রাসঙ্গিক হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র অধ্যাপক। ৫-৬ বছর পর অবসরে যাবেন। শিক্ষাজীবনের ঝকঝকে সার্টিফিকেট আছে তার। অসম্ভব দায়িত্বশীল শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। একজন বিদগ্ধ গবেষক। দেশ-বিদেশের জার্নালে তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। তার লেখা অনেক একাডেমিক বই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্সে আছে। তিনি জাতীয় বেতন স্কেলের ১ নম্বর গ্রেডে (সিলেকশন গ্রেডে) বেতন পান।

ক’দিন আগে এক সহপাঠী- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা টেলিফোনে বলছিলেন ‘তোমরা তো বেশ ভালো আছ। বেশ আরামে ক্যাম্পাসে থাকছ। বাইরে থাকলে তো অনেক টাকা ভাড়া গুনতে হতো।’ অধ্যাপক চমকে উঠলেন। বুঝলেন বন্ধুর ধারণা আমরা বিনি পয়সায় বা স্বল্প খরচে ক্যাম্পাসের বাসায় থাকি।

শুধরে দিয়ে বললেন, সরকারি নিয়মে আমার বেতনের অর্ধেক কেটে নেয়া হয়। ক্যাম্পাসের বাইরে- সাভারে এর চেয়ে ভালো বাসায় থাকলেও ২০ হাজার টাকা ভাড়া হবে না। এখানে আমাকে দিতে হয় প্রায় ৪০ হাজার টাকা। বইপত্রসহ গবেষণা সরঞ্জাম কিনতে যা খরচ হয় তার সিকি ভাগও গবেষণা ভাতা পাওয়া যায় না। শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল বন্ধুটি।

সংসারের বাইরে এই অধ্যাপকের নিজস্ব খরচ বলতে মাসে গড়ে হাজার পাঁচেক টাকার বই ও গবেষণা জার্নাল কেনা। সংসার চালানোর পর উদ্বৃত্ত থাকে না বলে প্রয়োজন থাকলেও গাড়ি কিনতে পারেননি। এখন দুর্ভাবনা অবসরের পর মাথা গুঁজবেন কোথায়! একটি ঠাঁই তৈরি করা দরকার। এমন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি করে ব্যাংক কর্পোরেট লোন দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের এই শিক্ষকের দুটো বড় সংকট। অবসরের পর মাথা গোঁজার জন্য আশ্রয় তৈরি করা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি বছর বিশেক আগে এক খণ্ড জমি কিনেছিলেন। এখন ঘর বানাতে হবে। আর মেয়েটি বিশ্বব্যিালয়ের পাট চুকিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়েছে যুক্তরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখানে পড়াতে একটি বড় খরচ আছে। তাই চোখ বন্ধ করে অধ্যাপক ৫০ লাখ টাকা লোন নিয়ে নিলেন।

পরের মাস থেকে সুদ-আসল কেটে হাতে বেতন পেতে থাকলেন ১৯ হাজার টাকার মতো। সংসার চালাতে চোখে অন্ধকার দেখলেন অধ্যাপক। পৈতৃক বাড়ি থেকে সামান্য আয় আসত। আর বছর ঘুরলে প্রকাশকদের কাছ থেক যৎসামান্য রয়্যালটির টাকা। সেই সঙ্গে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার সুযোগ পেলেন। কায়ক্লেশে চলার বন্দোবস্ত হল।

এমন একদিন তার ছাত্র সরকারের উপসচিব এলেন দেখা করতে। চকচকে নতুন গাড়ি নিয়ে। জানলেন, সহজ শর্তে সরকার ওকে গাড়ি কেনার ঋণ দিয়েছে। ড্রাইভারসহ গাড়ির ব্যয় নির্বাহের জন্য ওদের যে ভাতা দেয়া হয় তা অধ্যাপক সাহেবের বর্তমানে পাওয়া বেতনের দ্বিগুণেরও বেশি।

হয়তো অধ্যাপক সাহেব হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেছেন। স্কেল অনুযায়ী তিনি বেতন পান সিনিয়র সচিবের সমান। কিন্তু তাকে ঢাকা যেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ে। ঢাকা শহরের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবাস রিকুইজিশন দেয়ার নিয়ম নেই। তেমন প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগতভাবে রেন্ট-এ কারের দ্বারস্থ হতে হয়।

এসব গল্প শুনে আমার স্নেহভাজন এক সিনিয়র সাংবাদিক বলছিলেন, ‘অল্প তেলে মচমচে ভাজা আর কতটুকু হবে! একজন বিদগ্ধ গবেষককে নির্ভাবনায় গবেষণা ও শিক্ষকতার সুযোগ কি দিয়েছে রাষ্ট্র?’ বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাসরুম আর ল্যাবরেটরি যতই সুসজ্জিত হোক।

শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে যতই গল্প-কাহিনী ফাঁদা হোক, শিক্ষককে দুশ্চিন্তায় রেখে- যোগ্য সম্মান না দিয়ে শিক্ষার অগ্রগতি কী করে সম্ভব! বিশ্ব বিচারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং উপরে উঠবে কি শুকনো কথায়? যেসব অনুষঙ্গ এসবের পেছনে কাজ করে, এর প্রণোদনা তো সরকারকেই দিতে হয়। মানতে হবে শুধু মুখের কথায় শিক্ষার মানোন্নয়ন হয় না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]