ডাক্তার, রোগী, রাষ্ট্র : কে কার শত্রু?

  পবিত্র সরকার ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তার ধর্মঘট

পাঁচ-ছ’দিন ধরে পশ্চিমবাংলায় একটা অস্বাভাবিক অবস্থা চলছিল। ‘অস্বাভাবিক’ কথাটা হয়তো একটু bigmig হল, দুঃসহ বা দুর্বিষহ বললে আরও ভালো হয়। বেশকিছু সরকারি হাসপাতালে আউটডোর চিকিৎসা বন্ধ ছিল, ইনডোরেও চূড়ান্ত অবহেলা, যার ফলে রোগীর মৃত্যু ঘটেছে, প্রসূতির প্রসব ও সেই সংক্রান্ত সেবা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, আর্ত ও মুমূর্ষুর শুশ্রূষা দুর্লভ হয়ে পড়েছিল।

আমরা যেন ঘরে বসেও কান্না আর আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিলাম। এ অবস্থা যে পৃথিবীর সভ্য অংশে কোনো নাগরিক সমাজে কোনোদিন আসতে পারে, তা-ই আমাদের ভাবনার অগোচর ছিল। পশ্চিমবাংলা তা করে দেখিয়ে দিল। সরকারি একটা স্লোগান ধার করে বলি, ‘এগিয়ে বাংলা’!

ঘটনার শুরু ১০ জুন রাতে, কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে, যেখানে পঁচাশি বছরের একজন রোগীর মৃত্যুতে একদল লোক তার চিকিৎসাকারী ডাক্তারদের ওপর চড়াও হয় এবং তাদের আক্রোশ গিয়ে পড়ে সামনে থাকা জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর; কারণ সিনিয়র ডাক্তাররা প্রায়ই ঘটনাস্থলে থাকেন না, জুনিয়ররাই তাদের নির্দেশ নিয়ে ২৪ ঘণ্টা রোগীদের দেখাশোনা করে।

এই আক্রমণের ফলে পরিবহ মুখার্জি বলে একজন জুনিয়র ডাক্তারের মাথার খুলিতে ক্ষত হয় এবং দু’দিন প্রায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছায়। ডাক্তারদের এই শারীরিক নিগ্রহের প্রতিবাদে পরের দিন ১১ জুন সিনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতি পালন করেন, আর সমস্ত সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ বন্ধ থাকে।

১২ জুন তারিখে সিনিয়র ডাক্তাররাও অনেকে জুনিয়রদের সমর্থনে কর্মবিরতিতে যোগ দেন। মনে রাখতে হবে, এই দু’দিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি।

ঘটনার দিন তিনি হাসপাতাল থেকে কিছুটা দূরে বিধান সরণিতে বিদ্যাসাগর কলেজের একটি অংশে এবং হেয়ার স্কুলে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দুটি মূর্তি স্থাপন করেন। প্রথম মূর্তিটি কিছুদিন আগে, বিজেপির এক নির্বাচনী মিছিলের সূত্রে হাঙ্গামার ফলে ভাঙা পড়েছিল।

সেখান থেকে তিনি হাসপাতালটিতে একবার গেলে হয়তো সমস্যা মিটে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা শুরু হতো। সেই সুযোগ তিনি নেননি বলে অনেকের ধারণা। স্বাস্থ্য উপমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য হাসপাতালে গিয়েছিলেন, তিনি নাকি মন্ত্রীর ফোনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন, তারা তার সঙ্গে কথা বলেনি। এতে তিনি যে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তা গত ১৬ জুন এসএসকেএম হাসপাতালে তার সংবাদ সম্মেলন থেকে বোঝা যায়- ‘‘They didn't talk to me!’’

১৩ জুন নীলরতন সরকার হাসপাতালে তৃণমূল অর্থাৎ শাসক দলের কর্মী হিসেবে কথিত একদল লোক আবার জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর হামলা করে, আরও একজন জুনিয়র ডাক্তার আহত হয়, এতে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

ফলে সিনিয়র ডাক্তাররাও জুনিয়রদের পাশে দাঁড়ান এবং সিউড়ি সদর হাসপাতাল, কল্যাণী হাসপাতাল, বেলঘরিয়ার সাগর দত্ত হাসপাতাল ইত্যাদি জায়গা থেকে কর্মবিরতি আর কাজে ইস্তফার খবর আসতে থাকে।

১৪ জুন গণইস্তফার ব্যাপারটা প্রায় জলপ্রপাতের চেহারা নেয়। কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজের সিনিয়র ডাক্তাররা গণইস্তফা দেন। এর ধাক্কা সর্বভারতীয় বিস্তার নেয় এবং দিল্লির প্রধান সরকারি হাসপাতাল বা এইম্স (অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস)-এও ডাক্তাররা কর্তব্যরত ডাক্তারদের নিরাপত্তা চেয়ে এই আন্দোলন সমর্থন করেন এবং একদিনের জন্য সারা ভারতেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা বন্ধ করার ডাক দেন। বিলেতেও ব্রিটেনের মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন নাকি এ আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে।

২.

কিন্তু একটা আন্দোলন আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি পেল কিনা সেটা কোনো সান্ত্বনার বিষয় নয়, যদিও তা সেই আন্দোলনের এক ধরনের বৈধতা নির্মাণ করে। আসল কথা হল, দেশের গরিব ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর যে বৃহৎ অংশ সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল, তাদের অজস্র রোগী ও চিকিৎসাকামী মানুষ এক ভয়াবহ দুর্গতির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন, চিকিৎসা-প্রত্যাখ্যানের ফলে শিশু ও আর্তের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তা এক হিসেবে জনসাধারণ আর ডাক্তারদের পরস্পরের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেটা আদৌ কাম্য ছিল না।

আমাদের মনে হয় রাষ্ট্রের, বিশেষত মুখ্যমন্ত্রীর একপাক্ষিক জেদ ও হুমকি অবস্থাকে আরও জোরালো করে তুলেছিল। সেখানেই যদি মুখ্যমন্ত্রী থামতেন তা হলেও হতো; কিন্তু তিনি ডাক্তারদের সম্বন্ধে এমন কিছু আক্রমণাত্মক কথা বলেছেন যে, তা ডাক্তারদের রোখের উপশম ঘটানো দূরে থাক, তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তিনি বলেছেন, ডাক্তাররা রোগীর পদবি দেখে চিকিৎসা করেন (অর্থাৎ তারা সাম্প্রদায়িক বা উচ্চবর্ণের প্রতি পক্ষপাত দেখান)।

অন্যদিকে তিনিই আবার বিজেপি আর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) ওপর দোষারোপ করে বলেছেন যে, তারা রোগী মৃত্যুর বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রং মাখাচ্ছে। নীলরতনের ডাক্তাররা বলেছেন, তাদের প্রহারের পেছনে রোগীর আত্মীয়-স্বজনেরা যতটা ছিল তার চেয়ে বেশি করে ছিল ট্রাকে করে আসা প্রায় দু’শজন বহিরাগত, তাদের সন্দেহ, তারা শাসক দলেরই প্রশ্রয়ধন্য।

পরে বর্ধমান মেডিকেল কলেজে তো শাসক দলের কর্মীরাই ডাক্তারদের প্রহার করেছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বিজেপি আর সিপিআই (এম)-এর প্ররোচনায় ‘বহিরাগত’রা এসে নীল রতনে হাঙ্গামা বাধিয়েছে। ডাক্তাররা দাবি করছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী নীল রতন সরকার হাসপাতালে এসে তাদের সঙ্গে কথা বলুন।

সেই আমন্ত্রণে মুখ্যমন্ত্রীর সাড়া দেয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। এর মধ্যে নবান্নে কলকাতার কিছু প্রবীণ ডাক্তার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে গিয়ে কথা বলেছেন; কিন্তু তাতে কোনো সমাধানের সূত্র বেরোয়নি।

ফলে দু’পক্ষের এই ‘তুম্ভি মিলিটারি, হম্ভি মিলিটারি’ ধরনের অনমনীয় মনোভাব ও জেদের প্রতিযোগিতা পশ্চিমবাংলার স্বাস্থ্য-পরিষেবার ক্ষেত্রে এক সর্বনাশা অবস্থার সৃষ্টি করেছিল, এর আশু সমাধান না হলে জনস্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিপর্যয় ঘটত।

অনেকেই মনে করছে, এর ফলে বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার রমরমা ঘটবে; কিন্তু সেখানেও ডাক্তারদের প্রহৃত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, ফলে ডাক্তারদের নিরাপত্তার প্রশ্নটির মীমাংসা তাতেও হচ্ছে না।

১৬ জুন কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে মুখ্যমন্ত্রী একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তাতে ডাক্তাররা হুমকির সুরই শুনতে পেয়েছেন। তিনি আবার জুনিয়র ডাক্তারদের নেতারা তার সঙ্গে কথা বলতে না চাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বেলা দু’টার মধ্যে কাজে যোগ না দিলে তাদের ওপর জরুরি এস্মা (ESMA, Essential Service Maintenance Act) প্রয়োগ করবেন বলে ভয় দেখিয়েছেন।

বলেছেন, ডাক্তার, ফায়ার ব্রিগেড ইত্যাদি কর্মবিরতি করতে পারে না। এই আধিপত্যের সুর শুনে নীলরতনের জুনিয়র ডাক্তাররা যে খুশি হননি, তা তাদের প্রতিক্রিয়াতেই বোঝা গেছে। তারা চাইছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী একবার এসে তাদের সঙ্গে কথা বলুন, নীলরতনে।

পরে তারা নীলরতনের শর্ত থেকেও সরে এসেছেন; শুধু বলেছেন, যেখানে হোক আলোচনা হতে পারে, শুধু তাদের আলোচনা হবে ক্যামেরার সামনে, যাতে বৈদ্যুতিক মিডিয়ার দর্শকরা তা প্রত্যক্ষ করতে পারে।

৩.

অবশেষে মুখ্যমন্ত্রী সেই দাবি মেনে লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে বৈঠক করেছেন। নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী ও জুনিয়র ডাক্তারদের ঘণ্টা দেড়েকের বৈঠকে উঠে আসে সমাধান সূত্র। তবে এ ঘটনায় ১৯০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গায় প্রায় মাসখানেক নিষ্ক্রিয় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীকে (বর্তমানে তিনি উচ্চতর পদে আসীন) তখনকার প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির ‘রাজধর্ম’ পালনের উপদেশের কথা আমাদের মনে পড়ছে।

পশ্চিমবাংলায় মুখ্যমন্ত্রীর নিজের দলের ভেতরে বা বাইরে এমন কেউ নেই যে তাকে বলতে পারে, ‘মাননীয়াসু, রাজধর্ম পালন করুন, আপনার বিপন্ন রাজ্যবাসীকে পরিত্রাণ করুন। আর রাজধর্ম পালন শুধু বকুনি বা হুমকি দেয়া, কিংবা শাস্তির ভয় দেখানোতেই সীমাবদ্ধ নয়; নিজের অহংকার আর আহত ‘ইগো’কে ভুলে সাদা নিশান নিয়ে বিক্ষুব্ধদের মুখোমুখি হওয়াও রাজধর্ম।’ এসব কথা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে বলে এমন লোক বিশ্বচরাচরে আছে বলে মনে হয় না।

হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে, ফায়ার ব্রিগেডের কর্মচারী বা ডাক্তাররা ধর্মঘট করতে পারেন না। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা যখন বিঘ্নিত হয়, চিকিৎসায় বাস্তব এবং কল্পিত ত্রুটির নামে তাদের বেদম প্রহার করে প্রাণসংশয়ে পৌঁছে দেয়া হয় (২০১৮ থেকে নাকি এ ধরনের ২৬৪টি ঘটনা ঘটেছে, অপরাধীরা কেউ শাস্তি পায়নি) তখন তারাও নিরুপায় হয়ে একটা চরমপন্থা বেছে নিয়েছেন।

আমরা জানি, সব ডাক্তার সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, এই বিশ্বায়নের পৃথিবী তাদের জন্যও প্রচুর প্রলোভন তৈরি করেছে। কারও আরও অর্থলোলুপতা আর অমানবিকতার গল্প ভুক্তভোগীদের মুখে মুখে ফেরে। তবু জুনিয়র ডাক্তাররা এখনও সেই ফাঁদে পা দেননি এবং সরকারি চিকিৎসাসেবার দৈনন্দিন দিকটা এখন তাদের উপরেই প্রায় সবটা নির্ভরশীল। তাদের বা তাদের সমর্থনের জন্য ব্যাপকভাবে চিকিৎসক সমাজকে শাস্তি দিলে আমাদের সামাজিক জীবনে এক ভয়ংকর দুর্যোগ ডেকে আনা হবে।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×