নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

তবুও বাজারে কেন বাজেটের উত্তাপ?

  ড. আর এম দেবনাথ ২১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তবুও বাজারে কেন বাজেটের উত্তাপ?

মাননীয় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল যে কত অসহায় তা বাজেটোত্তর বাজার পরিস্থিতি বিচার করলেই বোঝা যায়। বাজেট ঘোষণার পরপরই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিসহ হরেকরকমের পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ বাজেট ঘোষণার আগে তিনি এক মতবিনিময় সভায় (২৫.০৫.১৯) বলেছিলেন, বাজেটের পর কোনো জিনিসের দাম বাড়বে না। তিনি কী বলেছিলেন? তার বক্তব্য ছিল : ‘আমি খুব কম কথায়, সহজভাবে একটি বাজেট দেব। সেখানে কাউকে কোনোভাবেই আর বেশি কষ্ট দিয়ে কর আদায় করব না। ... বাজেটের পর একজন এসে অভিযোগ করতে পারবেন না যে বাজেটের পর একটা জিনিসের দাম বেড়েছে। যা পেয়েছেন, তা আরও বেশি পাবেন।’ শুধু আশ্বাস দেননি, তিনি এও বলেছিলেন, দাম বৃদ্ধির কোনো ঘটনা ঘটলে তিনি তার প্রতিকার করবেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘তারপরেও যদি কেউ বিপদে পড়েন, বাজেট যদি দিয়েও দিই, তারপরও কেউ এসে অভিযোগ করলে তা পরিবর্তন করা হবে।’

বাজারে যা ঘটছে তাতে এটা জলের মতো পরিষ্কার যে, প্রায় সব জিনিসের দাম বেড়েছে, বাড়বে। আরও ঘটবে ঘটনা। সেটা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য নিয়ে। এ দুটোর দামও যে কোনো সময় বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এটা হবে জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘি ঢালার শামিল। বাজেটোত্তর বাজারে দেখা যাচ্ছে চিনি, ভোজ্যতেল অর্থাৎ সরিষা, পাম ও সয়াবিন, গুঁড়া দুধ, গুঁড়া মসলা, আইসক্রিম, তৈজসপত্র অর্থাৎ প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রী, বোতল, ফ্লাক্স, জার, প্রাকৃতিক গ্যাস, অপটিক্যাল ফাইবার, মধু, বিদেশি ভুট্টা, কাসাভার স্টার্চ (মাড়), গাড়ির টায়ার ও মোটরসাইকেলের বিদেশি টায়ার, মুঠোফোন, স্মার্টফোন আমদানি, সিম খোলার পিন, আচার, চাটনি, ব্লেড, তারকাঁটা, স্ক্রু, চশমার ফ্রেম, রিডিং গ্লাস, সান গ্লাস, লঞ্চের এসি কেবিন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের টিকিট, বিদ্যুৎ বিল, আসবাবপত্র ইত্যাদির দাম বাজারে বাড়ছে বা বাড়তির দিকে। ঢাকা শহরে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে লাগত ৫০০ টাকা। এখন লাগবে ৩০০০ টাকা। ছয়গুণ বৃদ্ধি। ই-কমার্সে বসেছে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট, যা তুলে নেয়ার জন্য এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে লিখেছেন। কুরিয়ার সার্ভিস, কোচিং, বিউটি পার্লার, ক্লাব, শপিং মল, সুপারশপ, লন্ড্রি, সিকিউরিটি সার্ভিসে নতুন করে কর বসেছে অথবা করের হার বাড়ানো হয়েছে। আরও খবর আছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ওপর অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ হারে লাগু (চালু) করা হচ্ছে। ডাল, গম, পেঁয়াজ, সার, বীজ আমদানিতেও অগ্রিম আয়কর লাগু হয়েছে। রাইড শেয়ারিংয়ে ৫-এর স্থলে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট বসছে। তালিকা আর বাড়িয়ে লাভ নেই। কারণ পণ্য ও সেবার সংখ্যা শত শত নয়, হাজার হাজার। এর প্রায় প্রতিটিতে ভ্যাট লাগু হয়েছে, ভ্যাটের হার বেড়েছে। অগ্রিম আয়কর বসানো হয়েছে। সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, স্পেসিফিক ডিউটি বসানো হয়েছে। কোথাও কোথাও সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে শুল্কমুক্তি থেকে। অর্থাৎ রাজস্ব বোর্ডের হাতে যত অস্ত্র আছে, তারা তার সবই ব্যবহার করেছে রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য। কেনই বা তারা তা করবে না? তাদের ওপর চাপ দেয়া হচ্ছে, বেশি বেশি রাজস্ব জোগাড় করে দিতে হবে। যেভাবেই হোক। এ কারণেই দেখা যাচ্ছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে ভ্যাট খাতে রাজস্ব আয় ছিল ৮১ হাজার ৮২০ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে রাজস্ব আয় করতে হবে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৭ কোটি টাকা।

আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), সম্পূরক শুল্ক, আমদানি শুল্ক, রফতানি শুল্ক, আবগারি শুল্ক ও অন্যান্য কর- এই সাত খাতে ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। আমার ধারণা এ কারণেই প্রায় সব ধরনের সেবা ও দ্রব্যে এবার ভ্যাট লাগু হয়েছে। এর ফল খুব স্বাভাবিকভাবেই মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে সব পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি। দেখা যাচ্ছে, অন্যান্যবারের মতো এবারও একশ্রেণীর ব্যবসায়ী একটা কাজ করেছেন। যেসব দ্রব্য ও সেবায় কর বসেছে বা বেড়েছে; সেসবের দাম যেমন বৃদ্ধি করেছেন, যেসবে কর বসেনি তাতেও করেছেন। আগে উৎপাদিত অথবা আমদানিকৃত পণ্য/সেবার দামও তারা বাড়িয়েছেন। অন্য ক্ষেত্রে কী হয় তা অজানা, কিন্তু বাজেটের পর মূল্যবৃদ্ধি খুব দ্রুত হয়। আরেকবার হয় পবিত্র রমজান মাসে। অন্যান্য দেশে ধর্মীয় উৎসবকালে ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষকে একটু রেয়াত দেয় বলে শুনেছি। কিন্তু আমাদের দেশের একশ্রেণীর ব্যবসায়ী কী বাজেটের সময়, কী ধর্মীয় উৎসবের সময়- কখনও তারা সাধারণ ভোক্তাকে রেহাই দেন না। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য বছরের মতো এবারও বাজেটোত্তরকালে বাজার গরম।

বাজার গরম অবস্থায় রিকশাওয়ালারাও বসে নেই। তারাও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছে। দু’দিন পর তাদের বাড়ি-ঘরের ভাড়া বাড়বে। এর ফল কী? ফল অবশ্যম্ভাবীভাবে মূল্যস্ফীতি। বহুদিন স্থিতাবস্থায় থেকে ইদানীং মূলস্ফীতি আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মে মাসে তা ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। আমি নিশ্চিত জুন মাসে তা আরও বেশি করে বাড়বে। এতে কী অসুবিধা?

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে, মূল্যস্ফীতি হলে মানুষের কোনো অসুবিধা হতো না, যদি সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সবার রোজগার-আয় বাড়ত। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবেই দেখা যাচ্ছে, তা হয় না। যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে সেভাবে রোজগার বাড়ে না। তাছাড়া রয়েছে বেকার, চাকরিচ্যুত লোকজন। রয়েছে অবসরজীবী লোকজন। তারা তো অসহায় জনগোষ্ঠী। অসহায়দের মধ্যে রয়েছে অগণিত লোক, যাদের কথা কারও মাথায় নেই। এসব মানুষ শেষ পর্যন্ত কী করে? তারা ভোগ কমায়, কষ্ট করে, খরচ কমায়। রিকশায় না উঠে পদব্রজে অফিসে যায়। দুই কেজি চিনির বদলে এক কেজি চিনি খায়। দুই বেলা মাছের বদলে এক বেলা মাছ খায়। ঢাকার মধ্যস্থলে না থেকে মিরপুরের গলিতে গিয়ে থাকে। এসব করে মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে।

কিন্তু ইদানীং সমস্যা বেড়েছে। বহু লোক চাকরিচ্যুত হচ্ছে কোনো সুবিধা প্রাপ্তি ছাড়াই। তাদের বলা হচ্ছে ‘পদত্যাগ’ করতে, যাতে মালিকদের কোনো সুবিধা না দিতে হয়। এভাবে মধ্যবয়সে স্কুল-কলেজে পড়া পুত্র-কন্যা নিয়ে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় পড়ছে। অনেক শিল্পে রোবট বসছে। মানুষের চাকরি যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে যখন মূল্যবৃদ্ধি ঘটে তখন মানুষের মাথায় বাড়ি পড়ে। মধ্যবিত্ত নিুমধ্যবিত্তের খাতায় নাম লেখায়, নিুমধ্যবিত্ত গরিবে, গরিব অতি দরিদ্রের খাতায় নাম লেখায়। এতে সমাজে থাকে ধনী-অতি ধনী এবং উল্টোদিকে শ্রমজীবী ও মজুররা। অথচ ইদানীং সবাই বলছে, মধ্যবিত্তই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাণ। যে দেশে যত বেশি মধ্যবিত্ত সে দেশের উন্নতি তত বেশি। মধ্যবিত্ত মানেই বাজার (মার্কেট)। এখন সবকিছুই বাজারের নিরিখে বিচার হয়। বাংলাদেশ হচ্ছে ‘ইমার্জিং মার্কেট’। এতে মানুষের কোনো মূল্য নেই। মানুষ হিসেবে আমরা স্বীকৃতও নই। আমরা হচ্ছি ‘বাজার’ (মার্কেট)। এ অবস্থায় এভাবে যে সহ্যসীমার বাইরে সব জিনিসের দাম বাড়ছে, তার প্রতিকার কী?

প্রতিকারের কথা বলতাম না। কারণ আমরা প্রতিকার কখনও পাইনি। এবার প্রতিকারের কথা তুলছি, কারণ মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রতিকারের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাজেট যদি দিয়েই দিই, তারপরও কেউ এসে অভিযোগ করলে তা পরিবর্তন করা হবে।’

বাজারে দেখা যাচ্ছে, পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, অভিযোগকারী প্রায় সবাই। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। বাজেটের আগে মন্ত্রী মহোদয় ভোক্তাদের সঙ্গে না হোক, অন্তত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসেছেন। এখন দেখছি তারাই প্রতিবাদে সোচ্চার। নাকি এসব মেকি প্রতিবাদ! জানি না, তবে সাধারণ মানুষের কোনো প্রতিবাদ নেই। তারা নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে, আর উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করছে বাঁচার জন্য। কে বাঁচাবে তাদের মূল্যস্ফীতির হাত থেকে? অর্থমন্ত্রী কি তার ওয়াদা মোতাবেক অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির হাত থেকে সাধারণ মানুষকে, ভোক্তাদেরকে বাঁচাবেন?

দেখা যাচ্ছে অর্থমন্ত্রী ভিন্ন পথও ধরতে পারতেন। তিনি রাজস্ব আহরণে বেপরোয়া হয়েছেন। তিনি কি জানেন না যে, রাজস্ব আহরণের অনেক পন্থা আছে। এর মধ্যে অনেক বড় পন্থা হচ্ছে ফাঁকি বন্ধ করা, চুরি বন্ধ করা, অপচয় বন্ধ করা, খরচের গুণগতমান বৃদ্ধি করা। বহুদিন ধরে লিখছি, দেশে এক টাকার কাজ দুই টাকায় করা হয়। সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে টাকা খরচের ক্ষেত্রে ‘পুকুর চুরি’ হয়। এমপিওভুক্ত স্কুল নেই, কলেজ নেই, ছাত্র নেই- তবু টাকা যায়। একথা বলেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী। সামাজিক সুরক্ষা খাতের টাকার ২৫ শতাংশই যায় অযোগ্যদের কাছে, যারা তা পাওয়ার কথা নয়। এ কথা বলেছে পরিকল্পনা কমিশনের জরিপ। ‘বন্ডেড ওয়ারহাউজের’ সুবিধা অপব্যবহৃত হয়। এর পণ্য ঢাকার ইসলামপুরে খোলা বাজারে বিক্রি হয়। সাবেক রাজস্ব বোর্ড প্রধান বলেছিলেন, এ খাতে সরকার রাজস্ব হারায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের পাওনা হাজার হাজার কোটি টাকা ‘রিটে’ আটকা আছে। একটি, দুটি ‘বেঞ্চ’ সৃষ্টি করে ওই টাকা আদায় করা যায়।

ভ্যাট কেউ দেয় না। এনবিআর বহু জরিপ করেছে। তাদের কাছে অনেক রিপোর্ট আছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, কী পণ্য আমদানি হয়, কী পণ্য রফতানি হয় তা কেউ জানে না। এতে টাকা পাচার হয়। এমন শত শত ধরনের অনিয়ম আছে, চুরি-দুর্নীতি আছে, যা বন্ধ করলে, অপচয় বন্ধ করলে নতুনভাবে রাজস্বের সন্ধান করতে হয় না। একশ্রেণীর লোককে সরকার শুধু রেয়াতই দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদের কাছ থেকে অধিকতর হারে কর আদায়ের চেষ্টা করছে- এটা তো কাম্য নয়। সরকার ইনকাম ট্যাক্সও নেবে, এক্সপেন্ডিচার ট্যাক্সও (ভ্যাট) নেবে- এটা কেমন কথা? অবশ্য এ মুহূর্তের কাজ হল অর্থমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। তিনি ওয়াদা করেছিলেন কোনো জিনিসের দাম বাড়বে না। এই ওয়াদা পূরণে তিনি কী করেন, তার অপেক্ষায় রইলাম।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×