শ্রদ্ধাঞ্জলি: নিরন্তর সংগ্রামমুখর এক নাট্যযোদ্ধার বিদায়

  মিলন কান্তি দে ২২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মমতাজউদদীন আহমদ
মমতাজউদদীন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের এক ক্ষণজন্মা নাট্যপ্রতিভা মমতাজউদদীন আহমদ। অশুভ প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কশাঘাতে জর্জরিত করেছেন। আম জনতাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছেন শিল্পের লড়াই।

তার সৃজনশীল চিন্তা-চেতনায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার সৃষ্টি সম্ভার। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, স্পষ্টবাদিতা তার অঙ্গের ভূষণ। অসত্য, অপশক্তি ও দেশদ্রোহীর বিরুদ্ধে তিনি ‘চির দুর্দম দুর্বিনীত।’ আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় ‘স্যার’ মমতাজউদদীন আহমদ পরিণত বয়সে চলে গেলেও এ বিয়োগ ব্যথা দুঃসহ, যন্ত্রণাময়। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। এ নিরন্তর নাট্যযোদ্ধাকে জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমান ও হিন্দু সমাজের পৃথক দুটি অখণ্ড স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন সংগঠিত রূপ নিচ্ছে, ১৯৩০-এর গোলটেবিল বৈঠক আর ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাবের মধ্যবর্তী সময়ে ১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মমতাজউদদীন। পরে তাদের পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট থানার বজরাটেক গ্রামে। বাবা কলিমউদ্দিন আহমদ, মা সখিনা খাতুন।

কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতার পেশাকে তিনি মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। বিগত শতাব্দীর ৬০-এর দশকে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যাপনাকালে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি আলোচিত ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। তার প্রতিভা ও মেধার উন্মেষ ঘটে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেই। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। নাট্যকার রূপে ভীষণভাবে আলোড়িত ও স্বাতন্ত্র্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন দর্শক হৃদয়ে।

মমতাজউদদীন আহমদ এ দেশ ও মাটিকে বড় ভালোবাসতেন। ঘৃণার থুৎকার দিয়েছেন স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে। যুদ্ধাপরাধীর আস্ফালন তার কাছে অসহনীয়। এ ক্রোধ ও ক্ষোভ তার নাট্য রচনার উৎস। রাজাকার-স্বৈরাচারের নিপীড়নে বিপর্যস্ত যখন বাংলাদেশ, ‘বিদ্রোহের’ নামে যখন শুরু হয় জ্বালাও-পোড়াও-ভাংচুরের মতো বর্বরোচিত অমানবিক কর্মকাণ্ড, তখনই গর্জে ওঠে মমতাজউদদীনের কণ্ঠ। তৈরি হয় নতুন প্রতিবাদী সংলাপ। জন্ম নেয় ‘বর্ণচোর’, ‘বিবাহ’, ‘হরিণ চিতা চিল’, ‘কি চাহ শঙ্খচিল’ ও ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’র মতো প্রতিরোধের নাটক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগেই ‘এবারের সংগ্রাম’ ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নামে দুটি নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাট্যধারার সূচনা করেন তিনি।

বিদ্রুপ, কটাক্ষ, স্যাটায়ার, হিউমার- এসবই হচ্ছে তার নাট্য সংলাপকে গতিময় ও নাট্যোৎকণ্ঠা সৃষ্টি করার প্রধান অবলম্বন। সংলাপের শাণিত শক্তি দিয়ে বিক্ষুব্ধ বাংলায় উড়ে বেড়ানো শকুনের বংশ ধ্বংস করতে চেয়েছেন তিনি। আবার এ বাংলার জন্য, বাংলার নির্যাতিত মানুষের জন্য তার ব্যাকুলচিত্তের বহিঃপ্রকাশও আমরা প্রত্যক্ষ করি অনেক নাটকে। তার আপাদমস্তক চরিত্রটিও যেন বিদ্রোহের প্রতীক। এ বিদ্রোহ জুলুমবাজের বিরুদ্ধে। যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে। এবারের সংগ্রাম নাটকে ‘মানুষের’ কণ্ঠে শেষ সংলাপটি হচ্ছে : ‘খুঁজে বের করব জুলুমবাজকে। আমার ছেলের রক্তের দাম আমি কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নেব।’ ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ নাটকে একটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চরিত্রের নাম নূর মোহাম্মদ। সে যখন বলে ‘প্রয়োজন হলে লক্ষ মানুষের জীবন যাবে তবু দেশ ভাগ করা চলবে না’, তখন রচয়িতা দর্শকের পক্ষ থেকে বলেন: ‘প্রেমের জ্বালা আর স্বাধীনতার আগুন কখনও নিভে যাবে না’।

মহান ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রথম নাটক ‘কবর’ রচনা করে বাংলার নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী। এ বিষয়ের ওপর দ্বিতীয় নাটক মমতাজউদদীনের ‘বিবাহ।’ গ্রামের মেয়ে সখিনার বিয়ে হবে। কনের সাজে বসে আছে। গায়ে হলুদ আর হাতে মেহেদী। চোখে স্বপ্ন কখন আসবে তার হবু বর। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শুনতে হল সেই মর্মান্তিক দুঃসংবাদ- হবু বর বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছে।

সখিনা তখন দেশপ্রেমের চেতনায় আপ্লুত হয়ে আনন্দাশ্রু চোখে বলে : ‘আমার আনন্দ-গৌরব-সুখ সংসার কাকে দেব কেমন করে দেব, ছোট মামা। হলুদ শাড়ি, আমার ওই শাড়িতে যে প্রদাহ-দাহ লেগে আছে। না-জানা ভালোবাসা ছোট মামা, আমার এক এক করে অনেক বছরের ফাল্গুন জমে আছে।’ ৮০’র দশকে থিয়েটারের (আরামবাগ) প্রযোজনায় ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সে সময়ে সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক ছিল এটি। এ নাটকটি তদানীন্তন স্বৈরাচারের শাসনামলের প্রতি একটি প্রচণ্ড চপেটাঘাত বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। নাটকের শেষের দিকে একটি প্রতীকী চরিত্র ‘মা’-এর কণ্ঠস্বর :

মা : কারা আমার ছেলেদের ধরে ধরে ফাঁসিতে ঝুলোচ্ছেরে দাসু?

দাসু : ওদের পরিচয় জানার দরকার নেই, তুমি তাদের সঙ্গে পারবে না।.....

মা : কইরে আমার ছেলেরা কইরে- বাবারা আমার- তোরা জিন্দা কি মুর্দা কোথায় তোরা, আজ আবার মা তোদের আহ্বান করতেছে। বাসু হাসু কালু নালু মানু জয়- আয়তো এবার পুনরায় একবার।

সকলে : মাগো, আমরা এসেছি।

মা : এইবার, এইবার যুদ্ধ। স্বাধীনতার যুদ্ধ।

সকলে : স্বাধীনতার যুদ্ধ।

মা : সর্বক্ষণের যুদ্ধ।

এ ‘সর্বক্ষণের যুদ্ধ’ সংলাপের তাৎপর্য হচ্ছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। মসনদে তখন স্বৈরশাসক। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গিগোষ্ঠীর দানবীয় হুংকারে মুক্তিকামী মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সংস্কৃতি কর্মীদের আন্দোলনের মুখেও ১৮৭৬ সালের অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল হচ্ছে না। মহিলা সমিতিতে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ‘বহিপীর’ এবং ঢাকা থিয়েটারের পথ নাটক ‘চর সার্কেল’ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এসব অপতৎপরতা বন্ধ করে একটি সুস্থ রাজনৈতিক-সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সাতঘাটের কানাকড়ি নাটকের ‘মা’ বলছেন, যুদ্ধ থামবে না। সর্বক্ষণের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

মমতাজউদদীন আহমদ রচিত বিভিন্ন স্বাদের গদ্য রচনা ৩২ এবং নাটকের সংখ্যা ২৭। নতুন নতুন আঙ্গিক ও বক্তব্যের অভিনবত্বে তার প্রতিটি নাটকে এসেছে বৈচিত্র্য, সংযোজিত হয়েছে জীবনঘনিষ্ঠ সংলাপ। এই শাশ্বত সংলাপ চিরকালই ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে বাংলার রঙ্গমঞ্চে।

নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদকে একদা প্রত্যক্ষ করি ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পেও। ১৯৭৫ সালের ১৩ জুলাই। চট্টগ্রাম মুসলিম ইন্সটিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় এদেশের যাত্রাশিল্পের ওপর প্রথম সেমিনার। উদ্যোক্তা অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদ চট্টগ্রাম কেন্দ্র। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ওই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করার। মমতাজউদদীন আহমদ ছিলেন প্রধান আলোচক। ৪৪ বছর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যাত্রা একটি মহান শিল্প- এটি শুধু মুখে বললে হবে না, কাজে দেখিয়ে দিতে হবে। যাত্রাকে বাঁচাতে হলে আধুনিক কোনো বিষয়ের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করা যাবে না। যাত্রা যুগ যুগ ধরে চলবে তার নিজস্ব ট্র্যাডিশনে। ৪ দশক পরও সত্য কথা বলতে হচ্ছে, যাত্রার ঐতিহ্যগত ধারা অসাধু বাণিজ্যলোভী প্রদর্শকদের হাতে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় জাতীয় যাত্রা উৎসবের স্মরণিকায় ‘যাত্রার বিবিধ অর্থে’ নিবন্ধে তিনি লিখেছেন : ‘আমরা তো দাঁড়াইয়া আছি। হারান মাস্টার হিটলার নিধনের বন্দনা ধরিলেই মিছিলের যাত্রা শুরু হইবে এবং আমরাও ঐকতানবাদনের সঙ্গে যাত্রা সূচনা করিতে পারিব।’

পরবর্তী সময়ে শিল্পকলা একাডেমির কয়েকটি যাত্রাবিষয়ক সেমিনারে তিনি মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং কখনও বা সভাপতিত্ব করেন। একাডেমি আয়োজিত দুটি জাতীয় যাত্রা উৎসবে তিনি জুরি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন।

এ বছর জানুয়ারিতে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে অগণিত ভক্ত-দর্শকের ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ খুব আগ্রহ ভরে বলেছিলেন- ‘আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি একটি লোকনাট্য নির্মাণ করব।’ হায়, শেষ ইচ্ছা তার পূরণ হল না। অতৃপ্তির বেদনা নিয়ে চলে গেলেন ওই ঊর্ধ্ব আকাশে। মহান সৃষ্টিকর্তা তার মঙ্গল করুন। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

মিলন কান্তি দে : যাত্রাব্যক্তিত্ব

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×