মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি যুদ্ধ কি আসন্ন?

  এ কে এম শামসুদ্দিন ২৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত বৃহস্পতিবার ইরান কর্তৃক মার্কিন সামরিক ড্রোন RQ-4A Global Hawk ভূপাতিত করার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সামরিক বিশেষজ্ঞরা খুব শিগগিরই কোনো সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা দেখছেন না। ড্রোন ধ্বংসের যৌক্তিকতা নিয়ে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবির মধ্যে যদিও বিস্তর ফারাক আছে, তারপরও এই দুটি রাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট এই উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন লক্ষ্য করার বিষয়। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন ও রাশিয়া ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে সতর্ক করে দিয়েছে। অপরদিকে একমাত্র যুক্তরাজ্য ছাড়া অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে শীতল মনোভাব প্রকাশ করেছে।
ছবি: সংগৃহীত

গত বৃহস্পতিবার ইরান কর্তৃক মার্কিন সামরিক ড্রোন RQ-4A Global Hawk ভূপাতিত করার পর মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সামরিক বিশেষজ্ঞরা খুব শিগগিরই কোনো সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা দেখছেন না। ড্রোন ধ্বংসের যৌক্তিকতা নিয়ে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবির মধ্যে যদিও বিস্তর ফারাক আছে, তারপরও এই দুটি রাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সৃষ্ট এই উত্তেজনা কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন লক্ষ্য করার বিষয়। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন ও রাশিয়া ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে সতর্ক করে দিয়েছে। অপরদিকে একমাত্র যুক্তরাজ্য ছাড়া অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে শীতল মনোভাব প্রকাশ করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র সৌদি আরবও যুদ্ধ এড়িয়ে চলার পন্থা অনুসরণ করবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একগুঁয়ে মনোভাবই দায়ী বলে অনেকেই মনে করেন। বিশেষ করে গত বছর ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়ার পর থেকেই সামরিক বিশেষজ্ঞরা ধারণা করে আসছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে ধীরে ধীরে যুদ্ধের পথে ঠেলে দেবে।

এজন্য যেসব পরিস্থিতি সৃষ্টি করা প্রয়োজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সব আয়োজনই করবে বলে অনুমান করা গিয়েছিল। কোনো কোনো সামরিক বিশ্লেষক ইরাকে সামরিক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি কাল্পনিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের সঙ্গে বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তুলনা দিতে শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও লিবিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পর সিরিয়াকে টার্গেট করেছিল। সিরিয়ার শাসক বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে না পারলেও দেশটিকে ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সহজেই অনুমান করা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভৌগোলিক রাজনৈতিক পরিকল্পনার পরবর্তী টার্গেট হল ইরান এবং সেই পরিকল্পনার অংশবিশেষ ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

মে মাসের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করে অতি দ্রুত পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বিমানবাহী জাহাজসহ অন্যান্য সামরিক নৌযান মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরণ করে। তাদের এ ঘোষণাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য ইরাকের রাজধানীতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বেশ কিছু কূটনৈতিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু লক্ষণীয়, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য ইরান যে হুমকি, তার সপক্ষে কোনো যৌক্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করেনি। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে বুশ প্রশাসনও একইভাবে তথাকথিত ‘Weapons of Mass Destruction’-এর যে মিথ্যা তথ্যের ধুয়া তুলেছিল, তা যুদ্ধোত্তর একাধিক তথ্যবিবরণীতে প্রমাণ মিলেছে।

এ প্রসঙ্গে আমার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। ২০১১-১২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি উচ্চতর দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে ইরান প্রসঙ্গে এক প্রাণবন্ত বিতর্কের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। সে সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বৃহত্তর দেশসমূহ বেশ সোচ্চার ছিল। ইরানের বিরুদ্ধে তখন অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করা হয়েছিল। কোর্সের এক বিশেষ প্যাকেজে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাবিষয়ক এক সেমিনারে আমি তখন অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা তাদের বক্তব্য পেশ করেছিলেন। সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইউএস মেরিন কোরের একজন কর্মকর্তা নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ‘ডাহা মিথ্যা তথ্যে’র ওপর ভর করে ইরাক আক্রমণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বর্ণনাতীত শব্দ প্রয়োগে দোষারোপ করে তার নিজ জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেন। ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে স্ত্রীর সঙ্গে তার ডিভোর্স, কন্যাসন্তানকে চিরতরে হারান এবং এমন একটি অন্যায় যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য নিজের বিবেকের কাছে দগ্ধ হওয়া ইত্যাদি বর্ণনা করে ভবিষ্যতে এমন অন্যায় যুদ্ধ যেন চাপিয়ে দেয়ার না হয়, সে কথা উল্লেখ করেন। এরপর দু’একজন বক্তার বক্তব্য শেষ হলে ইসরাইলের এক কর্মকর্তা তার বক্তব্য পেশ করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা সেমিনারের মূল বিষয়বস্তু হলেও এই কর্মকর্তাটি শুধু ইরান প্রসঙ্গ নিয়েই কথা বলেন। ইরান ইতিমধ্যেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে গিয়েছে বলে উল্লেখ করে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের নিরাপত্তা, হুমকির মুখে বলে বর্ণনা করেন তিনি। কিছুটা উত্তেজিত এবং আক্রমণাত্মক গলায় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আক্রমণের সুপারিশও করেন। ইসরাইলি কর্মকর্তাটির বক্তব্য শেষ হওয়ার পর তখন মিসরের সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য রাখার পালা।

মিসরের কর্মকর্তা তার বক্তব্যের প্রথমেই ইরান সম্পর্কে ইসরাইলি কর্মকর্তার বক্তব্যে বেশ কিছু তথ্যবিভ্রাট আছে উল্লেখ করে ইসরাইলি কর্মকর্তার উদ্দেশ্যই বলেন, ‘ইরাক ধ্বংসের পর তোমরা কি ভেবেছ, তোমাদের সরবরাহকৃত তথ্য বিশ্ববাসী এখন আর বিশ্বাস করে?’ এ কথা শোনার পর ইসরাইলের কর্মকর্তাটি পাল্টা বক্তব্য দিতে গেলে তাকে থামিয়ে দিয়ে মিসরের কর্মকর্তাটি, ইউএস মেরিন কোরের সেই কর্মকর্তার ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ইরাকের মতো আর কোনো অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে না দেয়ার অনুরোধ করেন।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৫৩ সালে ইরানের তৎকালীন সরকার উৎখাত করে শাহ্ পাহলবীকে ক্ষমতায় বসানো পর থেকে দেশ দুটির সম্পর্কের অবনতির শুরু হয়। অতঃপর শাহ্কে ক্ষমতাচ্যুত করে ইসলামী বিপ্লব ঘটিয়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনির দেশে প্রত্যাবর্তন ও ক্ষমতায় আরোহণ। এরপর ১৯৭৯-১৯৮০ সালে তেহরানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনে ৫২ জন কর্মকর্তাকে জিম্মি করা ইত্যাদি ঘটনা থেকে শুরু করে বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়াকে কেন্দ্র করে দিন দিন এই সম্পর্কের অবনতি ঘটেই চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক শক্তিধর দেশে পরিণত হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র কখনই ভালো চোখে দেখেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সব সময়ই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। এর সঙ্গে আবার ইসরাইলের স্বার্থও নিহিত আছে। পারমাণবিক ইস্যু ছাড়াও হরমুজ প্রণালীতে আধিপত্য বিরাজ করা নিয়েও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি আছে। পারস্য উপসাগরের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের জলপথে যোগাযোগের জন্য হরমুজ প্রণালি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর ৪০ শতাংশ তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে চায়। এক্ষেত্রেও তারা ইরানকে পথের কাঁটা হিসেবে মনে করে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এক্ষেত্রেও ইরানকে তারা প্রধান বাধা হিসেবে মনে করে।

এই হরমুজ প্রণালিরই খুব কাছে ফুজাইরাহ্ নামক এলাকায় গত মাসের গোড়ার দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের চারটি তেলবাহী জাহাজ আক্রমণের শিকার হয়। যুক্তরাষ্ট্র যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তারা এই আক্রমণের জন্য ইরান দায়ী বলে দাবি করে। যদিও তাদের দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করেনি। তারপরও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র অতিদ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক সমাবেশ ঘটায়। এরপর ১৩ জুন বৃহস্পতিবার ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে কয়েক মাইল দূরে হরমুজ প্রণালীর কাছে সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে যাতায়াতকারী জাপানি মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে আরও একটি বোমা হামলা হয়। প্রথম বোমা বিস্ফোরণটি হয় সকাল ছয়টার পরপর।

এর এক ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে কাছাকাছি অঞ্চলেই। এ বিস্ফোরণের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও আবারও ইরানকে দায়ী করে বিবৃতি দেন এবং এর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে ইরানকে সতর্ক করেন। এবার তারা তাদের দাবির পক্ষে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওতে দেখানো হয় যে, আক্রান্ত জাপানি জাহাজ থেকে ইরানি নিরাপত্তা সদস্যরা অবিস্ফোরিত মাইন সরিয়ে ফেলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলোও বেশ জোরেশোরে এই ভিডিও প্রচার করতে থাকে।

এই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু মুশকিলটি বাধাল আক্রান্ত জাহাজ কোম্পানি কোকুকা সাঙ্গীও শিপিং ফার্মের প্রেসিডেন্ট মি. ইউতাকা কাতাগা। তিনি বললেন, কোনো মাইন বিস্ফোরণে তার জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। জাহাজের ক্ররা জানিয়েছেন, দূর থেকে উড়ে আসা একটা কিছুর আঘাতে জাহাজে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তাতে জাহাজের একপাশে ফুটো হয়ে যায়। আর ভিডিওতে জাহাজের যে পাশ দেখান হয়েছে তার অপরদিকে উড়ে আসা বস্তুটি এসে আঘাত করে। ভিডিওতে দৃশ্যমান ইরানি নিরাপত্তা সদস্যরা মূলত জাহাজ আক্রান্ত হলে ক্রদের উদ্ধারের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। অবাক করা বিষয়, আক্রান্ত জাপানি জাহাজ কোম্পানির প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের পরও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে অটুট থাকেন এবং এই আক্রমণের জন্য ইরানের ইসলামিক রেভুল্যশনারি গার্ডকে দোষারোপ করত থাকেন।

শুধু তাই নয়, ইরাক আক্রমণের আগে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে যেমন অন্ধভাবে সাপোর্ট করেছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটেও ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট, ১৩ জুন জাপানি তেলেবাহী জাহাজে হামলার জন্য ইরান যে দায়ী, সে ব্যাপারে ব্রিটেন নিশ্চিত বলে তিনি জানান। তার এই বক্তব্যের সমর্থনে কোনো প্রমাণ আছে কিনা, জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগের মূল্যায়ন বিশ্বাস না করার কোনো কারণ নেই। কেননা তারা আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র।’ হান্টের এই বক্তব্য যেন ২০০৩ সালের টনি ব্লেয়ারের দেয়া বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। অবশ্য ইরান ইস্যুতে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে অন্ধভাবে সমর্থনের জন্য কঠোর সমালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। অপরদিকে জার্মানি তেলবাহী জাহাজে মাইন বিস্ফোরণে ইরানের জড়িত থাকার ব্যাপারে আরও স্পষ্ট এবং অধিকতর প্রমাণ চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে।

বোমা বিস্ফোরণের ব্যাপারে জাপানি জাহাজের ক্রদের বক্তব্য এখানে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার দাবি রাখে। ইরানের পাতা মাইন বিস্ফোরণে জাহাজের ক্ষতি হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে দাবি করেছে, অথচ এর সপক্ষে এযাবৎ কোনো প্রমাণ তারা হাজির করেনি। অপরদিকে জাপানি ক্রদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাহাজে কোনো মাইন বিস্ফোরণ ঘটেনি। দূর থেকে উড়ে আসা বোমার আঘাতে জাহাজের একপাশ ফুটো হয়ে গিয়েছে মাত্র, অর্থাৎ জাহাজের ব্যাপক কোনো ক্ষতি হয়নি।

প্রশ্ন হল, ইরান ক্ষতি করার জন্যই যদি মাইনের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে থাকে তাহলে এই সামান্য ফুটো হওয়ার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করবে কেন? আবার যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের সরবরাহকৃত ভিডিও মোতাবেক ইরানের নিরাপত্তা সদস্যরাই বা জাহাজের ব্যাপক ক্ষতিসাধন না করে উল্টো অবিস্ফোরিত মাইন অপসারণ করতে যাবেন কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি গ্রহণ করার চেয়ে জাহাজের জাপানি ক্রদের বক্তব্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী দূর থেকে উড়ে আসা বোমাই জাহাজে আঘাত করেছে। তাদের এই তথ্য যদি সত্য বলে ধরে নিই, তাহলে প্রশ্ন জাগে ওই দূর থেকে জাপানের তেলবাহী জাহাজে আঘাত হানল কে?

এ প্রশ্নেরও মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। কথিত আছে পৃথিবীর বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা তাদের দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আবার ওইসব দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছা পূরণে অনুকূল পরিবেশ তৈরিতেও তারা বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল, ইরাক আক্রমণের আগে আক্রমণের পটভূমি তৈরিতে সিআইএসহ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেসব দেশের তাবৎ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা। সে সময় স্যাটেলাইটে গৃহীত ভিডিও ফুটেজে ইরাকের Weapon of Mass Destruction-এর ছবি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশন দিয়েছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, পাওয়েলের সেই প্রেজেন্টেশন পরে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছিল।

শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবারও ইরানের বিরুদ্ধে তোলা দাবির সমর্থনে তাদের অবস্থান সবার সামনে তুলে ধরার জন্য জাতিসংঘের কাছে সময় চেয়েছে। তবে এবার যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে কিছুটা সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে মনে হয়েছে। এর কারণ ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিক আক্রমণের উদ্যোগ নিয়েও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করেছে। ২০ জুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির হাউস ও সিনেট নেতারাসহ সামরিক ও প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে ঘণ্টাব্যাপী এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। বৈঠকে প্রায় সবাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কিছুটা ‘পরিমিত প্রতিক্রিয়া’ প্রদর্শনের পরামর্শ দেন।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইরানের সঙ্গে ব্যাপক যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে আরও কিছু নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক টার্গেট ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকব। তবে আশঙ্কা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ে সার্বক্ষণিক নিঃশ্বাস ফেলানো মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুরাষ্ট্র ইসরাইলের প্ররোচনা সামাল দিয়ে কতদিন তারা তাদের এই সিদ্ধান্তে অটুট থাকতে পারবে?

একেএম সামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×