স্বাস্থ্যখাতে এ কী দুরবস্থা!
jugantor
স্বাস্থ্যখাতে এ কী দুরবস্থা!

  মনজু আরা বেগম  

২৪ জুন ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের হাসপাতালগুলোর বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে। দু-চারটি হাসপাতালের কথা বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের চিত্র প্রায় একই রকম। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন নিয়ে যে যত কথাই বলুক না কেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসুস্থ অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গেলে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।
প্রতীকী ছবি

দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের হাসপাতালগুলোর বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে। দু-চারটি হাসপাতালের কথা বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের চিত্র প্রায় একই রকম। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন নিয়ে যে যত কথাই বলুক না কেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসুস্থ অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গেলে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।

বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর জীবন নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। একটা রোগী পেলে তার গলা কাটার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উঠেপড়ে লাগে। সেবা কতটুকু দিচ্ছে তার হিসাব নেই; কিন্তু রোগীকে জিম্মি করে যতরকম কায়দা-কানুন করে বিরাট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া যায় সেটাই হল প্রধান উদ্দেশ্য। রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য পরিবারের সদস্যরা ভিটেমাটি বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা করতে রাজি হয়।

সম্প্রতি আমার পরিবারের দু’জন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হয়। একজনকে খোদ রাজধানীতে একটি বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে, অন্যজনকে বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে। তিনি একজন শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নন, মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডারও বটে। মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিয়ে যে পরিমাণ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তা এখানে স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলতে পারি, বিভাগীয় পর্যায়ের একটি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের পেইং বেডে পিলো, ম্যাট্রেস, কফ-থুথু ফেলার জন্য গামলা থেকে শুরু করে কিছুই নেই। জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন এমনকি স্যালাইন পুশ করার জন্য যে ক্যানোলার প্রয়োজন সেটাও হাসপাতালে নেই। নিজেদেরই কিনতে হয়েছে। ডাক্তার, নার্সের সেবার কথা আর নাইবা বললাম। একজন অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে একটি স্যালাইন পুশ করতে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক সময় লেগেছে। ডাক্তার আছে তো নার্স নেই; আবার নার্স পাওয়া গেল তো ডাক্তার নেই। দালালের দৌরাত্ম্য বলার মতো নয়। রোগীকে স্ট্রেচারে তোলার সঙ্গে সঙ্গে ১২০ টাকা দিতে হয়। এটি তাদের রেট। টাকা না দিতে পারলে রোগীকে ফ্লোরেই পড়ে থাকতে হয়। রোগীর ব্যবহারের জন্য বাথরুমের করুণ দৃশা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যি কঠিন। দুর্গন্ধে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। যত্রতত্র ময়লা পড়ে আছে। আমাদের প্রশ্ন, একজন মানুষ সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে যায়, নাকি আরও অসুস্থ হওয়ার জন্য? এসব দেখার কেউ আছে বলে মনে হয়নি।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোনো নিয়মনীতি মেনে চলছে কিনা বোঝা গেল না। স্বাস্থ্যসেবা খাতের এই যদি হয় উন্নতি তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি হলেও এর কোনো প্রয়োজন আছে কি? কাদের জন্য এ প্রবৃদ্ধি বা এ প্রবৃদ্ধির সুফল কারা ভোগ করছে? জনসাধারণের জীবন মান উন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন। মানুষ যদি সুচিকিৎসা না পায়, কর্মমুখী প্রকৃত শিক্ষা না পায় তাহলে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কীভাবে বুঝব?

বেসরকারি হাসপাতালের অধিকাংশ নার্স অদক্ষ। কম বেতনে অদক্ষ এবং অনভিজ্ঞ নার্স, ব্রাদার রাখা হয়েছে। যাদের অনেকেই বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে অক্ষম। এছাড়া একজন রোগীর ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন অন্য রোগীর ফাইলে রেখে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ডাক্তার-নার্সদের অবহেলা, দুর্ব্যবহার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাব দেখানো- এসব আর নাইবা বললাম। ডাক্তারদের অদক্ষতার কারণে ভুল চিকিৎসা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগীর শরীরে পুশ করে কত মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হচ্ছে তার হিসাব কে রাখে? সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকদের বড় অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। জরুরি প্রয়োজনে ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে ডাক্তারের খোঁজ করতে করতে অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে। সম্প্রতি নগর স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবি এক গবেষণা করে। গবেষণায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ৬২ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। অন্যদিকে সরকারি খাতের ৮০ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গবেষকরা বলছেন, চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বড় ভূমিকা রাখলেও এ খাতে জনবলের সংকট একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় বলা হয়, অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক তাদের শর্ত পালন করেন না। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অনুমোদন পেতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৩১টি শর্ত পূরণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। কিছুসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব ঘটছে; কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলেছে। ফলে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। অনেক হাসপাতাল এবং ক্লিনিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও উপকরণ ছাড়াই আইসিইউতে রোগী রেখে উচ্চ হারে ফি আদায় করছে। এমনকি রোগী মারা গেলেও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যদের জানানো হচ্ছে, এসবই বাস্তবতা। এক কথায় প্রকৃত সেবা কোথায় পাওয়া যাবে আমরা সাধারণ মানুষ জানি না।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত বেশকিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জেল-জরিমানা করেছে; কিন্তু এসব জেল-জরিমানায় কিছুই হচ্ছে না। কারণ গুরু অপরাধে লঘুদণ্ড দেয়ায় তারা পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। তারপরও যেটুকু দেয়া হয় সেটুকুও দুর্র্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের পকেটে চলে যায়। সরকারি ওষুধ হাসপাতালে ভর্তি রোগী পায় না; কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এটি আমরা কম-বেশি সবাই জানি।

এছাড়াও ১৭ কোটি মানুষের দেশে ডাক্তার ও নার্সের স্বল্পতার কারণে রোগীরা প্রকৃত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ রাখতে হবে। শুধু বরাদ্দ রাখলেই চলবে না, বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয় সেদিকে তদারকি ও প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হলেও দুর্নীতি অনেকেরই পিছু ছাড়ছে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু কিছুসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে আমরা সর্বক্ষেত্রে হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছি।

এসব হয়রানি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর দৈন্যদশার অবসান ঘটিয়ে স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকারকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটা দেশ বা জাতিকে কখনও এগিয়ে নিয়ে যাবে না। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর জন্য আলাদাভাবে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। তা না হলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সময় থাকতে সাবধানতা অবলম্বন করা একান্তই জরুরি।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও গবেষক; সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

স্বাস্থ্যখাতে এ কী দুরবস্থা!

 মনজু আরা বেগম 
২৪ জুন ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের হাসপাতালগুলোর বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে। দু-চারটি হাসপাতালের কথা বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের চিত্র প্রায় একই রকম। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন নিয়ে যে যত কথাই বলুক না কেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসুস্থ অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গেলে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।
প্রতীকী ছবি

দেশের সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের হাসপাতালগুলোর বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করেছে। দু-চারটি হাসপাতালের কথা বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের চিত্র প্রায় একই রকম। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন নিয়ে যে যত কথাই বলুক না কেন, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসুস্থ অবস্থায় সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে গেলে মানুষের ভোগান্তি কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন।

বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর জীবন নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। একটা রোগী পেলে তার গলা কাটার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উঠেপড়ে লাগে। সেবা কতটুকু দিচ্ছে তার হিসাব নেই; কিন্তু রোগীকে জিম্মি করে যতরকম কায়দা-কানুন করে বিরাট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া যায় সেটাই হল প্রধান উদ্দেশ্য। রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য পরিবারের সদস্যরা ভিটেমাটি বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা করতে রাজি হয়।

সম্প্রতি আমার পরিবারের দু’জন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হয়। একজনকে খোদ রাজধানীতে একটি বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে, অন্যজনকে বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে। তিনি একজন শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নন, মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডারও বটে। মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও তাকে নিয়ে যে পরিমাণ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তা এখানে স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলতে পারি, বিভাগীয় পর্যায়ের একটি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের পেইং বেডে পিলো, ম্যাট্রেস, কফ-থুথু ফেলার জন্য গামলা থেকে শুরু করে কিছুই নেই। জীবন বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন এমনকি স্যালাইন পুশ করার জন্য যে ক্যানোলার প্রয়োজন সেটাও হাসপাতালে নেই। নিজেদেরই কিনতে হয়েছে। ডাক্তার, নার্সের সেবার কথা আর নাইবা বললাম। একজন অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে একটি স্যালাইন পুশ করতে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক সময় লেগেছে। ডাক্তার আছে তো নার্স নেই; আবার নার্স পাওয়া গেল তো ডাক্তার নেই। দালালের দৌরাত্ম্য বলার মতো নয়। রোগীকে স্ট্রেচারে তোলার সঙ্গে সঙ্গে ১২০ টাকা দিতে হয়। এটি তাদের রেট। টাকা না দিতে পারলে রোগীকে ফ্লোরেই পড়ে থাকতে হয়। রোগীর ব্যবহারের জন্য বাথরুমের করুণ দৃশা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যি কঠিন। দুর্গন্ধে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। যত্রতত্র ময়লা পড়ে আছে। আমাদের প্রশ্ন, একজন মানুষ সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে যায়, নাকি আরও অসুস্থ হওয়ার জন্য? এসব দেখার কেউ আছে বলে মনে হয়নি।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোনো নিয়মনীতি মেনে চলছে কিনা বোঝা গেল না। স্বাস্থ্যসেবা খাতের এই যদি হয় উন্নতি তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি হলেও এর কোনো প্রয়োজন আছে কি? কাদের জন্য এ প্রবৃদ্ধি বা এ প্রবৃদ্ধির সুফল কারা ভোগ করছে? জনসাধারণের জীবন মান উন্নয়নের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন। মানুষ যদি সুচিকিৎসা না পায়, কর্মমুখী প্রকৃত শিক্ষা না পায় তাহলে দেশের উন্নয়ন হচ্ছে কীভাবে বুঝব?

বেসরকারি হাসপাতালের অধিকাংশ নার্স অদক্ষ। কম বেতনে অদক্ষ এবং অনভিজ্ঞ নার্স, ব্রাদার রাখা হয়েছে। যাদের অনেকেই বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে অক্ষম। এছাড়া একজন রোগীর ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট ও প্রেসক্রিপশন অন্য রোগীর ফাইলে রেখে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ডাক্তার-নার্সদের অবহেলা, দুর্ব্যবহার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভাব দেখানো- এসব আর নাইবা বললাম। ডাক্তারদের অদক্ষতার কারণে ভুল চিকিৎসা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ রোগীর শরীরে পুশ করে কত মানুষের প্রাণহানি ঘটানো হচ্ছে তার হিসাব কে রাখে? সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকদের বড় অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। জরুরি প্রয়োজনে ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে ডাক্তারের খোঁজ করতে করতে অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে। সম্প্রতি নগর স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশ আইসিডিডিআরবি এক গবেষণা করে। গবেষণায় দেখা যায়, বেসরকারি খাতের ৬২ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। অন্যদিকে সরকারি খাতের ৮০ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গবেষকরা বলছেন, চিকিৎসাসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বড় ভূমিকা রাখলেও এ খাতে জনবলের সংকট একটি বড় সমস্যা। গবেষণায় বলা হয়, অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক তাদের শর্ত পালন করেন না। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অনুমোদন পেতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৩১টি শর্ত পূরণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। কিছুসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব ঘটছে; কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলেছে। ফলে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়াও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। অনেক হাসপাতাল এবং ক্লিনিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও উপকরণ ছাড়াই আইসিইউতে রোগী রেখে উচ্চ হারে ফি আদায় করছে। এমনকি রোগী মারা গেলেও লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যদের জানানো হচ্ছে, এসবই বাস্তবতা। এক কথায় প্রকৃত সেবা কোথায় পাওয়া যাবে আমরা সাধারণ মানুষ জানি না।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত বেশকিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিকের জেল-জরিমানা করেছে; কিন্তু এসব জেল-জরিমানায় কিছুই হচ্ছে না। কারণ গুরু অপরাধে লঘুদণ্ড দেয়ায় তারা পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। তারপরও যেটুকু দেয়া হয় সেটুকুও দুর্র্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের পকেটে চলে যায়। সরকারি ওষুধ হাসপাতালে ভর্তি রোগী পায় না; কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এটি আমরা কম-বেশি সবাই জানি।

এছাড়াও ১৭ কোটি মানুষের দেশে ডাক্তার ও নার্সের স্বল্পতার কারণে রোগীরা প্রকৃত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বরাদ্দ রাখতে হবে। শুধু বরাদ্দ রাখলেই চলবে না, বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয় সেদিকে তদারকি ও প্রখর দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার আর মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার বা শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হলেও দুর্নীতি অনেকেরই পিছু ছাড়ছে না। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু কিছুসংখ্যক দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে আমরা সর্বক্ষেত্রে হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছি।

এসব হয়রানি থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের জন্য বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর দৈন্যদশার অবসান ঘটিয়ে স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে সরকারকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটা দেশ বা জাতিকে কখনও এগিয়ে নিয়ে যাবে না। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর জন্য আলাদাভাবে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। তা না হলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। সময় থাকতে সাবধানতা অবলম্বন করা একান্তই জরুরি।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও গবেষক; সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক