শিক্ষা বাজেট মনিটরিং কেন বেশি দরকার

  কাজী ফারুক আহমেদ ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট
বাজেট। ছবি: যুগান্তর

নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, যিনি লোটাস কামাল নামে বেশ পরিচিত এবং গত কয়েক বছর ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিশেষ করে জিডিপি ও বার্ষিক মাথাপিছু আয় নির্ধারণে প্রদত্ত বক্তব্যের জন্য আলোচিত, ১৩ জুন প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ সালের বাজেট উপস্থাপন করেন।

তবে শারীরিক অসুস্থতার জন্য মুদ্রিত বাজেট বক্তৃতার পুরোটি শেষ করতে না পারায় পরে সাবলীল উপস্থাপনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা সমাপ্ত করেন, যা বাংলাদেশের সংসদীয় রীতি-ঐতিহ্যে নতুন সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন অর্থমন্ত্রীর এ মুদ্রিত বক্তব্য, বিশেষ করে শিক্ষার বর্ণিত লক্ষ্য ও পরিকল্পনা শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।

এর কয়েকটি অংশ উদ্ধৃতিযোগ্য : ‘আমাদের আগামীর পথচলা পুরোটাই নির্ভর করছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষার সবস্তরের জন্য উপযুক্ত শিক্ষক বাছাইকরণ, তাদের প্রশিক্ষণ, সময়োপযোগী শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ এখন একান্তই সময়ের দাবি। আমাদের সরকার এ বছর থেকে এসবের বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে’। ‘বিশ্ব এখন তৃতীয় শিল্প বিপ্লব থেকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে উত্তরণের পথে।

বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদেরও তৈরি হতে হবে, না হলে সামনে অগ্রসর হওয়া আমাদের জন্য দুরূহ হবে। তাই আমাদের ক্লাস রুমগুলো বিষয় উপযোগী (subject specific) করে তুলতে হবে যেখানে শেখানো হবে ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, বকচেইন টেকনোলজি, ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন’।

‘আমাদের ছাত্রের অভাব নেই। অভাব হচ্ছে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের। এসব বিষয়ে শিক্ষা প্রদানের জন্য জাপানের সম্রাট গবরলর’র মতো আমাদেরও আজকের প্রয়োজন মেটাতে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক্ষক নিয়ে আসতে হবে’। ‘এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে আমরা এ বাজেট কাল থেকেই শুরু করতে চাই। এবং সেজন্য ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে আমরা শিক্ষাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখছি’। ‘শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ ও গুণগত উৎকর্ষ সাধনে আমরা সক্রিয় রয়েছি’।

২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বর্তমান ২০১৮-১৯ অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার, ২০১৮-এ বর্ণিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও লক্ষ্যগুলো অর্জনের প্রয়াস চালানো হবে এ বাজেটের মাধ্যমে। আগামী অর্থবছরই সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনার সর্বশেষ অর্থবছর, সুতরাং এ বাজেটে এর বাস্তবায়ন গুরুত্ব পাবে।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার হার ২০০৬ সালে ছিল ৫৩.৭ শতাংশ, বর্তমানে ৭২.৯ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার শতভাগ অর্জিত হয়েছে। ঝরে পড়ার হার ৫০ থেকে ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কারিগরি শিক্ষায় আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর পরিমাণ ছিল ২ শতাংশ, বর্তমানে তা ১৭ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৮০টি, এখন তা ১৪৮টি।

সাত বছর পরে এমপিও প্রদানের সিদ্ধান্তকে সুসংবাদ হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জুলাই ২০১৮ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

বাজেটে শিক্ষার বর্ণিত লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী সবার মতামতের গুরুত্ব আছে। কারণ এর মধ্য দিয়ে প্রচলিত শিক্ষাধারার একটা পর্যালোচনা উঠে আসতে পারে। আমি শিক্ষায় যৌক্তিক বরাদ্দে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। সেইসঙ্গে যে অর্থই বরাদ্দ হয় তার সদ্ব্যবহার চাই। একাধিক ছাত্রসংগঠন শিক্ষায় বরাদ্দ নিয়ে কথা বলেছেন।

সরকারি-বেসরকারি উভয় প্রকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা বাজেটের ওপর মতামত দিচ্ছে। সংবাদপত্রে শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি উচ্চারণ বা প্রত্যাশার উল্লেখের বাইরে বাজেট বিশ্লেষণ আমার খুব একটা চোখে পড়েনি। উল্লেখ্য, বাজেট বিশেষ করে শিক্ষা বাজেট মূল্যায়ন, অতীত থেকে বর্তমানে তার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা পর্যবেক্ষণ বর্তমানে কোনো জাতীয় বিষয় নয়।

‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন’ (জিপিই) এ বছর (২০১৯) ফেব্রয়ারি মাসে শিক্ষা বাজেট মনিটরিং সংক্রান্ত একটি গাইড লাইন বা নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। ৪৭ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনটিতে বাজেট প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৪ স্তরের উল্লেখ করা হয়েছে; তার মধ্যে রয়েছে, ১. বাজেট প্রণয়ন ২. বাজেট অনুমোদন ৩. বাজেট বাস্তবায়ন ৪. বাজেট মূল্যায়ন।

উল্লেখ্য, মাল্টি স্টেকহোল্ডারদের আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে পরিচালিত জিপিই নিু ও নিু মধ্য আয়ের দেশ এবং সংঘাতপীড়িত দেশগুলোতে শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে কাজ করে ও আর্থিকসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈষয়িক ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। সবার জন্য শিক্ষা ও সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে।

দাতা দেশগুলোর আর্থিক ও বিশেষজ্ঞ সমর্থন, বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, সিভিল সোসাইটি, শিক্ষক সংগঠন, বেসরকারি খাত ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সমন্বয় করে থেকে।

এ বিশ্ব সংস্থাটি স্বীকার করে, শিক্ষায় অর্থায়নে বাইরের সহায়তা শূন্যস্থান পূরণে সহায়ক হলেও শিক্ষায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে ও কাক্সিক্ষত ফল অর্জনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিসরে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে জিপিই-এর মতে শিক্ষা ২০৩০ : ইন্চিয়ন ঘোষণা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৪-এর প্রাসঙ্গিকতায় নিুোক্ত বিষয়গুলোতে শিক্ষা বাজেট মনিটরিং করা আবশ্যক : ১. মোট ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ গণশিক্ষায় বরাদ্দ হচ্ছে কিনা ২. শিক্ষার বিভিন্ন স্তর ও ক্ষেত্রে তথ্য পরিসংখ্যানের প্রাপ্যতা উন্নয়ন ৩. বরাদ্দের নির্ধারণে চাহিদার অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী ও শিক্ষার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে গুরুত্বারোপ। ৪. দক্ষতা ও জবাবদিহিতা উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা বাজেটের মনিটরিং, স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানের ভিত্তিতে সংলাপ আয়োজন, মতবিনিময় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ও সুনিদিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন দ্বারা কীভাবে নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করা সম্ভব, জিপিই-এর প্রস্তাবগুলোতে তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের মূল লক্ষ্য ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার বিপরীতে প্রো-অ্যাকটিভ বা সক্রিয় ভূমিকা পালন।

এবারের বাজেটে মানব উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ধারাবাহিকতা রক্ষার সঙ্গে নতুন বক্তব্য ও উদ্যোগের কথা আছে। নতুন এমপিওভুক্তির সঙ্গে আগে থেকে এমপিওভুক্তদের বৈশাখী ভাতাসহ কিছু প্রত্যাশা পূরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত যেমন হয়েছে, শিক্ষার উন্নয়ন ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়া আরও ৮ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সে বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো নিয়ে সমন্বিত শিক্ষা তথা মানবসম্পদ উন্নয়নে সমন্বিত শিক্ষা বাজেটের কথা ভাবা যেতে পারে। মানব উন্নয়নে যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে গুরুত্বারোপ একটি ভালো চিন্তা। শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় দেশে একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া দরকার।

একইভাবে আসতে পারে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার কথা। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে একটি শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভাবা যেতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে কারিগরি ও ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য থোক্ বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

টাকার অঙ্কে শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে স্বীকার করে নিয়ে বলতে হবে, যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে, উদ্যোক্তা হতে সহায়ক গবেষণা খাতে সহায়ক শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির লক্ষ্যে অন্তত খাত অনুল্লেখিত বিশেষ অধিক তহবিল থেকে তা মেটানোর সংস্থান রাখা দরকার। বাজেট পাসের পর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে শিক্ষায় বরাদ্দকৃত অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে তার একটি সময়ভিত্তিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

বাজেটের আকার নিয়ে এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের সঙ্গে আমার দুটি কারণে মতভিন্নতা আছে। এক. বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান অর্থনীতির সঙ্গে আগের মতো এবারের বাজেট সঙ্গতিপূর্ণ। বরং এর আকার ও ব্যাপ্তি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দুই. বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। বাজেটের আকার না বাড়লে যেটুকু অর্জন হয়েছে তা কীভাবে হতে পারত।

অপচয়, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতার মাত্রা কমানো গেলে অর্জন আশাব্যঞ্জকভাবে বাড়বে। আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই বাজেট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও স্টেকহোল্ডারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সমন্বয় ও জোরালো ভূমিকা সেজন্য অপরিহার্য। বাজেট সরকার যা বলে তা করে কিনা, কতটুকু করে, অতীতে যা বলেছে তা করেছে কিনা, তা আর নিরূপণ বা পরিমাপের কোনো কার্যকর পন্থা নেই।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য; শিক্ষক আন্দোলনের নেতা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×