কর্মকর্তাদের আশ্বাস বনাম প্রাথমিকের শিক্ষকদের দীর্ঘশ্বাস

  মো. সিদ্দিকুর রহমান ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক

২০০৫ সালের বেতন বৈষম্য দূরীকরণের আন্দোলনে আমাকে ও লালবাগ থানার শিক্ষক নেতা সেলিমুজ্জামানকে জেলহাজতে যেতে হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, সে অনুষ্ঠানে আমরা বেতন বৈষম্য দূরীকরণের প্রচারপত্র বিলি করেছিলাম।

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের হাতে অনুষ্ঠানস্থল থেকে আমরা গ্রেফতার হই। সারা দেশে শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে বেশি সময় আমাদের কারাবাস করতে হয়নি। বিভিন্ন সংবাদপত্রে গ্রেফতারের সংবাদটি শীর্ষে স্থান পায়। তখন ইলেকট্রনিক, অনলাইন ও ফেসবুকের প্রচলন ছিল না বললেই চলে। আমাদের গ্রেফতারে শিক্ষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ, বেতন বৈষম্য দূরীকরণ আন্দোলন বিশেষ মাত্রা যোগ হয়।

সে সময়ের প্রধান বৈষম্য ছিল ননট্রেইন্ড উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকরা ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সমতুল্য বেতন পেত। সে আন্দোলনে প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকরা ২৬০০ টাকা বেতন স্কেল থেকে ৩০০০ টাকা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ৩০০০ টাকা স্কেল থেকে ৩১০০ টাকা স্কেলে, প্রধান শিক্ষকের ৩৩০০ টাকার স্কেল ৩৭০০ টাকায় উন্নীত হয়।

সে সময় মুক্তাঙ্গনে বিশাল অনশনে শিক্ষকরা অপেক্ষায় ছিলেন সরকারের প্রতিনিধিরা এসে অনশন ভাঙাবেন এবং ঘোষণা দেবেন। শিক্ষকদের মাঝে ক্ষোভের পাশাপাশি চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হারিছ চৌধুরী অনশনস্থল মুক্তাঙ্গনে না এসে শিক্ষক নেতাদের সচিবালয়ে ডেকে সে সময় বৈষম্য দূর করার ঘোষণা দিলেন।

বর্তমান বেতন বৈষম্য হল, প্রধান শিক্ষকের পরের স্কেল সহকারীদের উন্নীত করা। ২০১৪ সাল থেকে সহকারী শিক্ষকদের মাঝে ক্ষোভ জন্মাতে থাকে। তৎকালীন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি যথাযথ ও যথাসময়ে সহকারী শিক্ষকদের ক্ষোভ ও যন্ত্রণা নিয়ে এগিয়ে না আসায় যত্রতত্র সহকারী শিক্ষকদের অসংখ্য সংগঠন গড়ে ওঠে।

অপরদিকে ২য় শ্রেণীর মর্যাদা পেয়ে প্রধান শিক্ষকদের মাঝে অহমিকা মনোভাব সৃষ্টি হয়ে প্রধান শিক্ষক সমিতি গড়ে ওঠে। সেখানে ঐক্যবদ্ধভাবে সব শিক্ষক পরস্পরের সুখ-দুঃখ যন্ত্রণার সাথী হয়ে একে অপরের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাদের সে মমত্ববোধটুকু হারিয়ে গেছে। সমস্যা সমাধানের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের নেতৃত্ব জাহির করা।

অবশেষে সব সহকারী শিক্ষক সংগঠনের অভূতপূর্ব মিলনমেলা হল ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সাধারণ শিক্ষকদের ধাক্কায় সহকারীদের সংগঠন ছাড়াও সব সংগঠনের নেতাদের সমর্থনের তাবিজ পরে শোডাউন করতে দেখা গেছে। অনশনরত সাধারণ শিক্ষকরা আশা করেছেন, এখান থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা আসবে। বেতন বৈষম্য দূরীকরণ হবে।

এখানেও নেতাদের দালালি ও নেতৃত্ব জাহির করার পালা। নতুন অভিজ্ঞতাবিহীন নেতৃত্ব ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় টকশোতে হোঁচট খেয়ে আন্দোলনের তেরোটা বাজিয়েছে। অপরদিকে মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী গিয়ে কোনোরকমে অনশন ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। মাননীয় মন্ত্রী কোনোরকম আশ্বাস না দিয়ে অনশন ভাঙাতে গেলে সাধারণ শিক্ষকদের তোপের মুখে পড়েন।

মন্ত্রী মহোদয় তার বক্তব্যে বলেন, আপনাদের নেতারা আমাকে অনুরোধ করে অনশন ভাঙাতে এনেছেন। তোষামোদকারী নেতৃবৃন্দ হওয়ায় এ তীব্র লজ্জা তারা তাদের গায়ে মাখেনি। তখন যদি আমি নেতা হয়ে সে মঞ্চে থাকতাম; মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্য সত্য না হলে আমি তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাতাম। অবশ্য অনশনরত শিক্ষকদের তীব্র চাপে মন্ত্রী মহোদয় ন্যায্যতার ভিত্তিতে দায়সারা বৈষম্য দূরীকরণের ঘোষণা দিয়ে অনশন ভাঙান।

এরপর সময়ক্ষেপণের পালা চলতে থাকে। মহাপরিচালকের দফতরে চলে নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা; যা ফেসবুকে দেখা গেছে। অবশেষে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন- সময়ক্ষেপণের আরেক পালা। সহকারীদের একাংশ আন্দোলনের নামে রমজান মাসে ঢাকায় অবস্থান ধর্মঘট ডাকায় এলো আরেক আশ্বাসের বাণী। সচিব মহোদয় ২০২০-এর মার্চের মধ্যে প্রাথমিকের সহকারীদের বেতন বৈষম্য দূর করার ঘোষণা দিলেন।

আমার প্রত্যাশা, সচিব মহোদয় যেন মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ সময় থাকেন; যাতে এটাই শেষ আশ্বাস হয়। এ আশ্বাসের প্রেক্ষাপটে আমার শিক্ষক আন্দোলনের স্মৃতি তুলে ধরছি। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে বিএনপি সরকার ঢাকা মহানগরীর প্রাথমিক শিক্ষা ঢাকা পৌরসভা ও সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রাম সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। সে আন্দোলনে সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ৩ মাস ১০ দিন তালাবদ্ধ ছিল।

সে সুবাদে স্থানীয় ঢাকা পৌরসভার জনৈক ওয়ার্ড কমিশনার শিক্ষকদের ডেকে তাদের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে শিক্ষকদের ঢাকা পৌরসভার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার অনুরোধ করেন। সে অনুষ্ঠানে কমিশনার মহোদয়কে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কি পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন ও আজীবন কমিশনার থাকবেন?

তিনি উত্তরে বললেন, এ কী করে সম্ভব! আমি বললাম, তাই যদি হয়; আপনার অবর্তমানে শিক্ষকদের দেখভাল আপনার মতো অন্য কেউ করবে- তার গ্যারান্টি কি দিতে পারবেন? অবশেষে তিনি সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর সময়ের একটি ঘটনা। হজরত ওমর (রা.) যে টাকা মাসিক ভাতা পেতেন, তা দিয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করতেন। সে সময়ে পবিত্র ঈদের আনন্দ উদযাপানের জন্য সরকারি কোষাগারের রক্ষক আবু উবাইদার কাছে তিনি ১ মাসের অগ্রিম অর্থ প্রার্থনা করলেন।

ইবনে আবু উবাইদা জবাবে বললেন, হে খলিফা আমিরুল মোমেনিন; আপনি আগামী ১ মাস জীবিত থাকবেন বা খলিফা হিসেবে থাকবেন, এর নিশ্চয়তা কি দিতে পারবেন? তা না হলে আমি কী করে আপনাকে অগ্রিম অর্থ দেব? মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও সচিব; আপনার ইতিবাচক ও আশাবাদী বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষকরা আশায় দিন গুনছে।

উপরের উদাহরণ দুটি একটু অনুধাবন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে দ্রুত সমস্যা দূর করুন। আশা করি, প্রাথমিকের বৈষম্য সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে অন্যদের মতো আপনাদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না।

প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের আশা- এ যেন শেষ আশ্বাস হয়। প্রিয় নেতৃবৃন্দ, আপনাদের দায় অনেক। প্রাথমিক শিক্ষকদের অতীতের সংগ্রামী ইতিহাস বজায় রাখুন। শিক্ষকদের পাশে থাকুন। প্রাথমিকের সহকারীদের বেতন বৈষম্য, অভিন্ন কর্মঘণ্টা, পাঠ্যবই, মূল্যায়ন পদ্ধতিসহ সব বৈষম্য দূর হোক, এটাই প্রত্যাশা।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ এবং প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×