বাজেটে কী পেল শিক্ষা খাত

  ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান লিটু ৩০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট

২০১৯-২০ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটে ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এটি জিডিপির ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।

ইউনেস্কোর চাওয়া জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ। তাছাড়া আমরা যদি এসডিজির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই তাহলেও শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এসডিজির চার নম্বর লক্ষ্যে শিক্ষার উন্নয়নের কথা বলা হলেও এটিই মূলত অন্যান্য লক্ষ্য পূরণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তাই সংশোধিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা জরুরি। আশার কথা, পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে বলে ইতিমধ্যে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন শিক্ষামন্ত্রী।

বর্তমান বাজেটে দেশের উন্নয়নে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিল্পবিপ্লব ৪.০-কে টার্গেট করা হয়েছে। কারণ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিল্পায়নের চতুর্থ স্তরে উন্নীত হয়েছে এবং সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা শিক্ষা পদ্ধতিকেও চতুর্থ স্তরে উন্নীত করেছে।

এ শিল্পবিপ্লব ৪.০-এর সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে এডুকেশন ৪.০, যা শ্রেণী পঠন-পাঠন থেকে শুরু করে শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণকে নিশ্চিত করে। এডুকেশনের বিভিন্ন জেনারেশন রয়েছে।

শিক্ষাবিজ্ঞানে এ জেনারেশনগুলো এডুকেশন ১.০, এডুকেশন ২.০, এডুকেশন ৩.০ ও এডুকেশন ৪.০ নামে পরিচিত। আধুনিক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা গ্রহণে অবশ্যই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এডুকেশন ৪.০-এ উত্তরিত হতে হবে, নতুবা ইনোভেটিভ, প্রডাকটিভ এবং যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চৌকস প্রজন্ম তৈরি অধরাই রয়ে যাবে।

এক্ষেত্রে দেশের শিক্ষা নেতৃত্বের জন্য বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও শিক্ষা দর্শন অধ্যয়ন সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরিতে বাজেটের বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন হবে। বিদ্যালয় শিক্ষার শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে এনসিটিবি নিরলসভাবে কাজ করে গেলেও শিক্ষা বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞের অভাবের কারণে এর সুফল খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে; উপরন্তু শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই নিয়ে অযথা বিতর্কও সৃষ্টি হচ্ছে।

এভাবে দেখা যায়, শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তার অধিকাংশেরই শিক্ষা বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ জনবল নেই। ফলে প্রচুর বিনিয়োগের পরও প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত ফললাভ সম্ভব হচ্ছে না।

এবারের বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বাবদ ২৪ হাজার ৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা ইতিমধ্যে ঈর্র্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছি। অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে এ বছর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা খাতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের উন্নয়ন বরাদ্দের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। গত বছরের জুলাইয়ে এমপিওভুক্তির জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এরপর গত আগস্টে এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেয়া হয়। মোট ৯ হাজার ৬১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবেদন করে। যাচাইয়ে এমপিও নীতিমালার সব শর্ত পূরণকারী যোগ্য ২ হাজার ৭৬২টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা এসেছে এ বাজেটে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে এ ঘোষণা খুবই আশাব্যঞ্জক। তবে বাকিদেরও যদি এমপিওভুক্তি করা যেত তাহলে বৈষম্য যেমন দূর হতো, তেমনি বিদ্যালয়গুলো সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসত। ম্যানেজিং কমিটির দৌরাত্ম্যও হ্রাস পেত, যা শিক্ষার উন্নয়নে সহায়ক হতো।

এ দিকটি সরকার গভীরভাবে বিবেচনা করবে বলে আশা করি। সারা দেশে ২৬ হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪৮ হাজার ৯৪৭ মাল্টিমিডিয়া শ্রেণীকক্ষ, ২০০ ল্যাংগুয়েজ কাম আইসিটি ল্যাব, ১ হাজার সায়েন্স ল্যাব, ২ হাজার ১২০ স্মার্ট শ্রেণীকক্ষ, ৪৬ হোস্টেল নির্মাণ এবং আসবাবপত্র, অফিস সরঞ্জামাদি ও আইসিটি উপকরণ সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ। শিক্ষার গুণগত মানের উন্নয়নে এগুলোর বিকল্প নেই।

এবারের বাজেটে আইন পাস হওয়া নতুন পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা হয়েছে। আমাদের দেশে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা আনুভূমিক উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিয়ে একের পর এক পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলছি। এতে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বাড়ছে সত্য; কিন্তু সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা।

উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার হার কম; কিন্তু বিশেষায়িত শিক্ষার্থীর হার অনেক বেশি। আমাদের দেশের দৃশ্যপট ঠিক এর উল্টো। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যুগের চাহিদা বিবেচনা করে বিশেষায়িত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এবারের বাজেটে নির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। আবার প্রযুক্তি বিদ্যার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ও কলাবিদ্যার উন্নয়নের জন্য নির্দেশনা থাকাও বাঞ্ছনীয় ছিল।

এবারের বাজেটেও উচ্চশিক্ষায় গবেষণার ওপর খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সংশোধিত বাজেটে বিভিন্ন খাতওয়ারি উচ্চশিক্ষার গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা উচিত। সেই সঙ্গে বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা মনিটরিংয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

শিক্ষার সঙ্গে বাজারের চাহিদার সংযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। এবারের বাজেটে সেই বিষয়টি মাথায় রেখে কারিগরি শিক্ষার অগ্রগতির জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২ হাজার ২৮১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুলের প্রস্তাব করা হয়। এছাড়াও ভূমি জরিপ শিক্ষা উন্নয়ন, ২৩ জেলায় পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরাধীন ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে চার বিভাগীয় শহরে (সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুর) মহিলা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচিতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় এ বছর সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৫ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা।

এ অর্থ মাদ্রাসার অবকাঠামো উন্নয়ন, পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বৈষম্য দূরীকরণে ব্যয় হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, মাদ্রাসাগুলোতে ভোকেশনাল শিক্ষার প্রচলনের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ। এর ফলে মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাও দক্ষ জনসম্পদে পরিণত হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষার উন্নয়নে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে শিক্ষক আনার কথা বলা হয়েছে। বাইরে থেকে বিদেশিদের আনার আগে আমাদের দেশ থেকে যেসব মেধাবী চলে গেছে, তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া উচিত। দেশের প্রচুর মেধাবী মানুষ এখন বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাসহ নানা পেশায় অনেক ভালো করছেন। অনেকে তাদের মেধা ও মনন দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন।

তাহলে আমরা কেন তাদের কাজে লাগাতে পারছি না? যতদূর মনে হয় তাদের বেশিরভাগই যদি উপযুক্ত সম্মান, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পান, তবে বিদেশে প্রাপ্ত অর্থের তিনভাগ কম পেলেও এদেশে এসে তারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন। এ বিষয়টি সরকার ভেবে দেখতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের জাতির পিতাকে নিয়ে গবেষণা সেন্টার করেছে।

কিন্তু দুর্ভাগ্য, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা সেন্টার নেই। অনেকেই তাকে নিয়ে অনেক বই লিখেছেন; কিন্তু গবেষণার সংখ্যা অপ্রতুল। আর বেশিরভাগ গবেষণাই হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে। আশা করেছিলাম, এবারের বাজেটে বঙ্গবন্ধু গবেষণা সেন্টার প্রতিষ্ঠা বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসবে। কিন্তু এলো না। বাঙালি জাতিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত করার জন্য এমন সেন্টারের কোনো বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত শিক্ষা কমিশন যে সুপারিশগুলো করেছিল, এত বছর পর হলেও সেই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নের উদ্যোগ এবারের বাজেটে অনেকটাই প্রতিফলিত হয়েছে। তবে বাজেটের সঙ্গে সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং শিক্ষা উদ্যোগগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে কঠোর তদারকির ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়।

ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান লিটু : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বিশেষ শিক্ষা বিভাগ এবং শিক্ষার্থী উপদেষ্টা, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ৪৯১৯
বিশ্ব ৭,১০,৯৮৭ ১,৫০,৭৮৮ ৩৩,৫৫৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×