কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  ড. সুকোমল বড়ুয়া ০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ফাইল ছবি

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘গুণগত শিক্ষা : প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ’। এ বিষয়ে বক্তব্য রাখবেন দেশের বরেণ্য শিক্ষক এমিরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তার বক্তব্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসবে- আমরা সেই প্রত্যাশায় আছি।

আমরা জানি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি ব্যতীত টেকসই উন্নয়ন কোনোমতেই সম্ভব নয়। জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ছাড়া দেশ কখনও সামনে এগোতে পারে না। ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’- এ ভাবনাটা যদি সবাই ধারণ করে তাহলে দেশের সব কার্যক্রমে আদর্শের ছোঁয়া থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ওই আদর্শ ও লক্ষ্যকে সামনে রেখেই, যেখানে পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী জ্ঞান-বিজ্ঞানে এবং আর্থ-সামাজিক সব ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। ওই চেতনায় আমরা সফলও হয়েছি এবং গৌরবময় ইতিহাসও রচনা করেছি। আর দু’বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে অবদান রেখে চলেছে তা অতুলনীয়। শিক্ষায়, গবেষণায়, উদ্ভাবন, মনন চর্চাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অসামান্য গৌরব। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই জাতীয়তাবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আজ এ দিবসে আমি সবাইকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

১৯২১ সালে ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও এর পেছনের ইতিহাস ছিল অনেক কষ্টের এবং দীর্ঘ। ১৯১২ সালে ২৭ মে ‘নাথান কমিটি’র মাধ্যমে এর অগ্রযাত্রা শুরু হয়। সে সময়কার বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ব্যারিস্টার রবার্ট নাথান ছিলেন এর সভাপতি। নেতৃত্বে ছিলেন পূর্ববঙ্গের তিন বিখ্যাত পুরুষ, যথাক্রমে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও শের-এ-বাংলা একে ফজলুল হক। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকায় এলে এ তিনজনের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিটি ওঠে। সে সময় পূর্ববঙ্গের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার তেমন সুযোগ ছিল না, আর তারা ছিলেন নানাভাবে বৈষম্যের শিকার। ফলে ১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি বড়লাট লর্ড চেমর্সফোর্ড কর্তৃক ‘কলিকাতা কমিশন’-এর মাধ্যমে দৃশ্যত এর দুটি সুপারিশমালা তৈরি হয়। সেই মোতাবেক ১৯২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আইনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিলটি সিলেক্ট সভায় পাঠানো হলে ১৮ মার্চ সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি অ্যাক্ট হিসেবে গৃহীত হয় এবং ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ ‘দি ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ হিসেবে অনুমোদিত হয়।

সে সময় ঢাকার রমনা সিভিল স্টেশন এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এর মোট জমির আয়তন ২৭৫.০৮৩ একর। প্রতিষ্ঠাকালীন মাত্র তিনটি অনুষদ এবং বারোটি বিভাগ নিয়েই এর একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তিনটি অনুষদে মোট শিক্ষার্থী ছিলেন ৮৭৭ জন। তার মধ্যে আবাসিক ও অনাবাসিক হিসেবে ঢাকা হলে ৩৮৬ জন, জগন্নাথ হলে ৩১৩ জন এবং মুসলিম হলে ১৭৮ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনটি অনুষদে মোট শিক্ষক ছিলেন ৭০ জন, এদের মধ্যে ২৮ জন কলা অনুষদে, ১৭ জন বিজ্ঞান অনুষদে ও ২৫ জন আইন বিভাগে পাঠদান করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন স্যার পি.জে, হার্টগ (১৯২০-২৫)। প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন লওরেন্স জন লামলে ডানডাস (১৯২১-২২)। তখন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের কোনো পোস্ট ছিল না। ১৯৭৬-১৯৮১ সালে অধ্যাপক ড. মফিজুল্লাহ কবিরের পদায়নের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পদটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমান প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর-এর পদ দুটি, একটি শিক্ষা ও অন্যটি প্রশাসনিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন রেজিস্ট্রার ছিলেন খান বাহাদুর নাজির উদ্দিন আহমদ (১৯২১-৪৪)।

এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় যারা শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অনেকেই ছিলেন এ উপমহাদেশের স্বনামধন্য শিক্ষক, অনেকের খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। অধ্যাপক জি এইচ ল্যাংলি, স্যার এ এফ রহমান, আর সি মজুমদার, সত্যেন বোস, ডব্লিউ এ জেনকিন্স, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীকালে আরও অনেকেই যুক্ত হন। এ ধারা স্বাধীনতার পরও অব্যাহত ছিল। দু’দশক আগেও মোটামুটি এ ধারা অব্যাহত ছিল। বর্তমানে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষের প্রাচীন নালন্দা কনসেপ্টে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলেও পরে অক্সফোর্ডের আদলে বহু বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জ্ঞানী-গুণী পণ্ডিত শিক্ষকদের পদচারণা এবং শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের আগ্রহ সব মিলিয়ে এক সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কাছে সত্যেন বোসের লেখা চিঠি (৪ জুন ১৯২৪) দেখে আমরা এখনও অভিভূত হই। তাদের থিওরি বিজ্ঞান জগতের এক মাইলফলক। এরকম আরও অনেকে আছেন যারা নানাভাবে খ্যাতিমান হয়েছেন। সেসব শিক্ষকের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের উচ্চতা ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। এখন তেমন পণ্ডিত চোখে পড়ে না। এতে খুব কষ্ট হয়। অতীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছিলেন জ্ঞানচর্চায় বেশ আগ্রহী। এমনকি নীতি-নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধও ছিল উল্লেখ করার মতো। বর্তমানে তা লুপ্ত হতে চলেছে। এটি আমাদের জন্য অতীব বেদনার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হবেন দেশের সর্বোচ্চ আদর্শের প্রতীক। যেহেতু এটি দেশের অগ্রগণ্য বিদ্যাপীঠ, সেই হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রায় তিন দশক পর দীর্ঘ প্রত্যাশিত ডাকসু’র নির্বাচন (১১ মার্চ ২০১৯) একটি গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের মাইলফলকও বটে। এর কার্যক্রম বহুকাল বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবও পড়েছিল। ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন, দীর্ঘকালের বন্ধ্যত্ব কেটেছে এজন্য উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই ধন্যবাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারায় অতীতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা কারও কাম্য ছিল না।

বর্তমানে ভৌত অবকাঠামোসহ এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাপক সম্প্রসারিত হলেও র‌্যাংকিংয়ে তেমন সাফল্য অর্জিত হয়নি, যদিও অতীতে এ প্রতিষ্ঠানের বেশ সুনাম ছিল। সাম্প্রতিককালে আমাদের মূল্যবোধও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এসব নিয়ে আমাদের আরও বেশি ভাবা দরকার। নিজেকে প্রশ্ন করি আমরা এত উচ্চতায় অবস্থান করে আমাদের অর্জনগুলো ধরে রাখতে না পারলে, পারবে কারা? এ কথাগুলো প্রায়ই আমি শিক্ষার্থীদেরকেও বলি।

এই তো গত চার-পাঁচ দিন আগে (২৬-২৭ জুন ২০১৯) শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশন শেষ হল, বাজেটও পাস হল। এবারের বাজেট ধরা হয়েছে আটশ’ দশ কোটি বিয়াল্লিশ লাখ টাকা। সরকারকে শিক্ষা খাতে আরও ব্যয় বাড়াতে হবে। কারণ প্রকৃত শিক্ষা ও মেধায় জাতিকে আলোকিত করতে না পারলে দেশ কখনও সমৃদ্ধির পথে এগোতে পারবে না। এমনকি দেশে নানা ধরনের অপশক্তি, জঙ্গি, সন্ত্রাস, দুর্নীতিসহ অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমান ১৩টি অনুষদে ৮৪টি বিভাগ রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্সটিটিউটের সংখ্যা ১২, শিক্ষার্থী রয়েছে ৪৩,৩৮৫, শিক্ষক সংখ্যা ২,০১০। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২,০৬,৩৪১, শিক্ষকের সংখ্যা ১০,১৭১ জন।

প্রতিবারের মতো এবারও বলছি, সুন্দর পরিবেশ ও নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারদিকের দেয়াল এবং আরও চারটি গেট নির্মাণ করা উচিত। এতে দেশ-বিদেশ থেকে আশা পর্যটক ও অন্যদেরও বিশ্ববিদ্যালয় চিনতে অনেক সহজ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যত্রতত্র সাইনবোর্ড ও বিজ্ঞাপনী প্রচার বন্ধ রাখা উচিত।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে জ্ঞান চর্চা, গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অর্জন রয়েছে তা সত্যিই অতুলনীয়। এর পেছনে যারা ছিলেন তাদেরকে আবারও জানাই সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ।

বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রকম অস্থিরতা নেই। কোনো ধরনের সেশনজটও নেই। রীতিমতো পরীক্ষাও চলছে। তবে হলগুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রমে সব মতাদর্শের শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম আরও বাড়বে।

এই বিরাট ঐতিহ্য ধরে রাখা কর্তৃপক্ষের একার দায়িত্ব নয়। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×