নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

অর্থবছরের শুরুতেই দুটি খারাপ খবর

  ড. আর এম দেবনাথ ০৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস-কর

২০১৯-২০ অর্থবছরটি সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি ভালো যাবে বলে মনে হয় না। বছরের শুরুতেই দুটো খারাপ খবর। প্রথম খবরটি হচ্ছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। সর্বকালের সর্বোচ্চ হারের বৃদ্ধি। প্রায় ৩৩ শতাংশ।

এ খারাপ খবরের আগের দিনই গেছে আরেক খারাপ খবর দিয়ে। নতুন অর্থবছরের নতুন বাজেট পাস হয়েছে। ওই বাজেটে বহু কর, নতুন কর বসানো হয়েছে, পুরনো করের হার বাড়ানো হয়েছে যার পুরো বোঝাটা পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর, মধ্যবিত্তের ওপর।

ব্যবসায়ীদের আশা ছিল ব্যবসা-শিল্প ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অনেক কর প্রস্তাব হয়তো শেষ পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী পুনঃবিবেচনা করবেন। এটা হয়নি। মধ্যবিত্ত আশা করেছিল তাদের বাজেট পাসের সময় কিছুটা স্বস্তি দেয়া হবে। না, তাও হয়নি। টানা তিন মেয়াদের সরকার।

তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে মনে হয় শেষ পর্যন্ত অনমনীয়ই থাকল। এমনকি সরকার তার নির্বাচনী ওয়াদাও অনেক ক্ষেত্রে ভুলে, পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে হয়। তা না হলে ব্যবসায়ীদের কিছু কথা সরকার শুনত।

এমনকি মধ্যবিত্তের দুঃখের কথাগুলোর একাংশের প্রতি হলেও নজর দিতে পারত। যেমন- সঞ্চয়পত্রের ওপর পাওয়া সুদের ওপর কর। অনেকদিন তা ছিল ১০ শতাংশ। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্রে ১০০ টাকা সুদ পেলে তার ওপর উৎসে কর কাটা হতো ১০ শতাংশ। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পর তা করা হয়েছিল ৫ শতাংশ।

এক-দুই বছর যেতে না যেতেই তা আবার করা হল ১০ শতাংশ। এ নিয়ে সব পক্ষ থেকেই জোর প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। আশা ছিল সরকার তা বিবেচনা করবে। না, তা না করেই বাজেট পাস হল। অথচ মধ্যবিত্তের আয়করের বেলায় কোনো পরিবর্তন করা হল না।

তিন-চার বছর ধরে আয়কর হারে কোনো পরিবর্তন নেই। আড়াই লাখ টাকা বার্ষিক আয় হলেই আয়কর দিতে হবে। অথচ গত তিন-চার বছরের প্রতি বছরে ৫ শতাংশের ওপর মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এ বিচারে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত ছিল। বাজেটে তা করা হয়নি।

আশা ছিল অর্থমন্ত্রী সবপক্ষের প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে আয়করে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবেন করদাতাদের। না, তা না দিয়েই বাজেট পাস হল। তার মানে কী দাঁড়াল? মানুষের আয় কমল, বিপরীতে ব্যয় বাড়ল।

সুদ আয় কমল, আয়করের হার অপরিবর্তিত রইল, অধিকন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়ল। এক নম্বর তো গৃহস্থালি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। মাত্র দুই বছর আগে গৃহস্থালি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছিল। এবার তা আবার করা হল- সর্বোচ্চ হারে। অথচ এর বিকল্প ছিল।

আমরা সবাই জানি ‘সিস্টেমলসের’ কথা। হিসাবে দেখা যায়, প্রতি মাসে এর পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকার মতো। বছরে হয় প্রচুর টাকা। এই ‘লস’ মানে চুরি-দুর্নীতি-অদক্ষতা। এটা হ্রাস করা গেলে এ বিশাল পরিমাণের মূল্যবৃদ্ধি না করলেও চলত। না, অর্থমন্ত্রী সেই পথে গেলেন না। বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে গেলেই ‘টিআইএন’ লাগবে বলে বিধান করা হয়েছে।

কিন্তু গ্রামাঞ্চলে অনেকের ‘টিআইএন’ নেই। বিদ্যুৎ একটি আবশ্যকীয় বস্তু এখন। সবারই তা দরকার। কিন্তু ‘টিআইএন’ লাগবে। আশা করা হয়েছিল এতে অর্থমন্ত্রী আরও একটু উদার হবেন; না, তিনি তাও হলেন না। রাজস্ব বাড়ানোর তাগিদ থেকে তিনি কঠোর অবস্থানেই রয়ে গেলেন। স্মার্টফোনের কর প্রস্তাবও তিনি পুনঃবিবেচনা করলেন না।

এদিকে স্টিল রডের আর ‘স্পেসিফিক ডিউটি’ তিনি কিছুটা কমিয়ে ব্যবসায়ীদের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। আগাম কর বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানির ওপর। ব্যবসায়ীরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন।

এতে যে শিল্পায়ন ব্যাহত হবে সে কথা তারা জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। দেখা যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা রেয়াত দিয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম কর আর লাগবে না। কিন্তু কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে তা লাগবে।

এভাবেই বাজেট পাস হয়েছে। জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং খাতে সাত শতাংশ ভ্যাট বসানোর প্রস্তাব ছিল। তা শেষ পর্যন্ত ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ই-কমার্সের ক্ষেত্রেও তাই। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ‘রিটেইনড আর্নিং’ এবং সংরক্ষিত তহবিলের ওপর কর বসানোর প্রস্তাব বাজেটে ছিল। শেষ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে কিছুটা রেয়াত দিয়ে বাজেট পাস হয়েছে।

কর্পোরেট করের হারও কমানো হয়নি। তবে মোবাইলের কলরেট এবং স্মার্টফোনের ওপর বাড়তি করের বোঝা ব্যবহারকারীদের বহন করতেই হবে। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, বাজেট পাসের সময় অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের সামান্য কিছু দাবির প্রতি নজর দিয়েছেন।

কিন্তু তিনি সাধারণ করদাতা, মধ্যবিত্ত করদাতাদের প্রতি বরাবর নির্দয় ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছর মধ্যবিত্তের জন্য হবে একটি দুঃস্বপ্নের বছর। বাজারে ইতিমধ্যে সব জিনিসের দাম বেড়েছে।

চিনি, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, সয়াবিন তেল থেকে শুরু করে সব জিনিসের মূল্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে দুঃসংবাদ গ্যাসের। গৃহস্থালি গ্যাসসহ সব ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি মানেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ গ্যাস ব্যবহৃত হয়। গ্যাস এবং অনুবর্তী বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করবে। আর ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের অবস্থা কী দাঁড়াবে?

এ সম্পর্কে চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতারা তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাদের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে অভ্যন্তরীণ বাজারে তাদের বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। ক্রেতা জোগাড় করা কঠিন হবে।

অপরদিকে বিদেশি বাজারে তারা প্রতিযোগিতার ক্ষমতা হারাবেন। অথচ সরকার বিশাল রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ণয় করেছে। আর রফতানি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড।

গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বাজারে আবার সব পণ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটাবে। এমনকি রিকশার ভাড়াও বেড়েছে। বাড়িভাড়া, মেস ভাড়া বাড়বে। কাঁচাবাজার গরম হবে। মাছ-মাংসের বাজার গরম হবে।

ছোট ছোট মাছের দরও এখন ৪০০-৫০০ টাকা কেজি। চিংড়ি মাছের কেজিও ১০০০ টাকা। এখানেই শেষ নয়। সামনে আছে কোরবানির ঈদ। আসবে পবিত্র রমজান মাস। এটা অভিজ্ঞতার কথা যে, আমাদের ব্যবসায়ীদের একটা অংশ এ দুই উপলক্ষে ভোক্তাদের হয়রানি করে ছাড়েন।

তারা নিয়মিতভাবে এ দুই উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম বাড়ান। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? বাজেট, পবিত্র রমজান মাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ঘাটতি ইত্যাদি কারণে নিয়মিতভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও তাই হবে।

ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিগত জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ক্রমবর্ধমান। প্রায় ছয় শতাংশ ছুঁই ছুঁই এখন মূল্যস্ফীতির হার। অর্থমন্ত্রী বলছেন, তা এবার তিনি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনবেন। এটা কী করে সম্ভব আমি বুঝতে অক্ষম। অর্থমন্ত্রীর এটা প্রথম বাজেট। ব

র্তমান সরকারের টানা মেয়াদে এটা একাদশ বাজেট। এই বাজেট বাস্তবায়িত হোক এটা সবারই কামনা। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে অর্থমন্ত্রী প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিরাট বিরাট টার্গেট নিয়ে এগোতে চান। রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা তার বিশাল। এতে কোনো আপত্তি দেখি না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে একটা।

আমাদের অর্থমন্ত্রীরা শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত, নিুবিত্ত এবং গরিবদের ওপর রাজস্বের বোঝা চাপান। ‘ভ্যাট’ একটি বড় উদাহরণ। ‘ভ্যাট’ সমহারে ধনী-দরিদ্র দেয়। এতে বোঝা কিন্তু গরিব মানুষেরই বেশি। আয়করে রেয়াত দেয়া হয় না, সুদের হার কমানো হয়, সুদের ওপর কর বৃদ্ধি করা হয়। এর অর্থ বাজেটের বোঝা পড়ে মধ্যবিত্তের ওপর।

বিপরীতে ধনীদের ‘ট্যাক্স’, পর্যাপ্ত ‘ট্যাক্স’ করা হচ্ছে না। লাখ লাখ সাধারণ করদাতা কয় টাকা কর দেবে? করদাতার সংখ্যা বাড়বে মাত্র। অথচ টাকা যেখান থেকে আসবে, যেখানে টাকা ফাঁকি দেয়া হয় তার প্রতি নজর আমাদের কম।

ভ্যাট ফাঁকি, গ্যাস-বিদ্যুতের বিলে ফাঁকি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এসব নিত্যদিনের ঘটনা। এসব ফাঁকি বন্ধ করতে পারলে নতুন কর বসানোর প্রয়োজন পড়ে না। আরেকটা ফাঁকির কথা তো অর্থমন্ত্রী তার বাজেটে উল্লেখই করেছেন। কী আমদানি হয়, কী রফতানি হয় তা কেউ জানে না।

এ দুই মাধ্যমে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রচুর রাজস্ব আসবে। দেখা যাক, অর্থমন্ত্রীর নতুন পদক্ষেপের ফল কী দাঁড়ায়? সবশেষে বলা দরকার ২০১৯-২০ অর্থবছর সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খারাপ সংবাদ দিয়ে শুরু হয়েছে।

অথচ ‘ভোগের’ ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যা ৮ শতাংশের বেশ ওপরেই নির্ধারণ করা হয়েছে। আয় কমিয়ে, ভোগ বিঘ্নিত করে, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির রেখে কীভাবে অর্থমন্ত্রী তার লক্ষ্যমাত্রাগুলো পূরণ করেন তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করব।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×