যার মূল্যবৃদ্ধিতে সবকিছুর দাম বাড়ে

প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  প্রণব মজুমদার

অর্থনীতিতে পড়েছি জ্যামিতিক ও গাণিতিক হার, ব্রিটিশ অর্থনীতি ও জনমিতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাসের লেখায়। সতেরো শতকের অর্থনীতির এই পণ্ডিত বলেছেন, মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক আর খাদ্য বাড়ে গাণিতিক হারে।

জ্যামিতিক হার হল ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২ এবং গাণিতিক হার হল ১, ২, ৩, ৪, ৫। এই হারের কথা মনে পড়ে গেল গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তে।

দেশে জ্বালানি তেলের প্রধান উপকরণ গ্যাসের মূল্য সব ক্ষেত্রেই বাড়ানো হয়েছে। রান্নার ১ চুলায় মাসে ৭৫০ টাকার স্থলে ৮২৫ এবং ২ চুলায় ৮০০ টাকার জায়গায় ৯৭৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও তা আগেই বাড়ানোর কথা ছিল। এ মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব সব পণ্যে পড়বে।

পরিবহন খরচ বাড়বে। যাতায়াত খরচ বাড়বে। গ্যাস জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনকারী অতিরিক্ত খরচ আদায় করে নেবে ভোক্তা বা ক্রেতার কাছ থেকেই। সাধারণ মানুষেরই তাতে নাভিশ্বাস উঠবে।

অর্থাৎ পরিবহন ভাড়া এবং উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা পণ্যের দাম বাড়াবে জ্যামিতিক হারে। আমাদের দেশে মূল্যবৃদ্ধি বা অতি মুনাফাখোর মানুষের সংখ্যা অনেক। সরকার কোনো পণ্যের দাম ২ টাকা বাড়ালে ব্যবসায়ীরা মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতায় ম্যালথাসের জ্যামিতিক হারকে অনুসরণ করেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে বাড়ানো হয়। সরকারের মূল্যবৃদ্ধির এ প্রবণতা নতুন নয়। আমাদের দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও একই সময়ে প্রতিবেশী দেশে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা ভেবে বিদ্যমান মূল্য থেকেও কমানো হয়েছে গ্যাসের দাম।

অর্থাৎ আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। ১০ বছরে সপ্তমবারের মতো গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ঠিক যখন বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম কমেছে শতকরা ৫০ ভাগ, যখন ভারত তাদের ভোক্তাদের জন্য গ্যাসের দাম কমিয়েছে ১০১ রূপি, তখন আমরা অবিশ্বাস্য হারে দাম বাড়াচ্ছি।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন দেশের বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ। একটি রাজনৈতিক দল গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছে। কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, এর বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে রাখা যাচ্ছে না। মার্চ মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ, যা জানুয়ারি মাসের চেয়ে দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি।

বিবিএস থেকে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, শাক-সবজি ও মোরগ-মুরগী, মাছ-মাংস, ভোজ্য তেল, ফলমূল ও অন্য খাদ্যপণ্য এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্য, পরিধেয় বস্ত্র, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন খরচসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে গ্যাসনির্ভর শিল্প-কারখানা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন তা নিশ্চিত। সুতা, টাইলস ও রডের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্বের ব্যয়বহুল শহরের মধ্যে ঢাকা অন্যতম। জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক থেকে ঢাকা নগরী অস্ট্রেলিয়ার সিডনির চেয়েও উপরে। এ ছাড়াও শিল্প ও শিল্পীদের কাঙ্ক্ষিত শহর ফ্রান্সের প্যারিসে বিদেশিদের বসবাস করা যতটা ব্যয়বহুল, ঠিক সমপরিমাণ ব্যয়বহুল হল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবসম্পদ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মার্সার প্রকাশিত একটি তালিকায় এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ওপর সব পণ্যের দাম নির্ভর করে। গ্যাস বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রধানতম পণ্য। এই সেই দেশ যেখানে একবার কোনো দ্রব্যের দাম বাড়লে পরে তা কমার ইতিহাস নেই।

জাতীয় বাজেট পাসের দিন রাতে বেসরকারি একটি স্যাটেলাইট টিভিতে অংশ নিয়েছি। অনুষ্ঠান সঞ্চালকের প্রশ্নে টকশোতে বলেছি নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের নিদারুণ কষ্টের কথা।

দেশের সরকার সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত জীবনের কথা ভাবছে না। বরং সামর্থ্যবান শ্রেণীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। ফলে ধনী আরও আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে, আর দিন আনে দিনে খায় শ্রেণীর মানুষের কষ্ট আরও বাড়ছে।

টকশোর আলোচনায় এসব উল্লেখ করে দিয়েছি শ্রেণী বৈষম্যের পার্থক্যের উপাত্ত ও পরিসংখ্যান। বলেছি অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর জ্যামিতিক আস্ফালনের কথা।

ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের কারণে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ মহানগরে চরম কষ্টে জীবন নির্বাহ করছে। সৎভাবে বাঁচার উপায় কোথায়? অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে মধ্যবিত্ত ও নিু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সঞ্চয়ের পথ থাকছে না। ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যাচ্ছে।

সরকার দেশের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকিও দেয়া হচ্ছে বেশ। আর এর সুফল পাচ্ছে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশের কৃষকরাও। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে কৃষকদের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়বে।

সিস্টেম লস, চুরি ও অনিয়মের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক সেবা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান লোকসানে। ফি বছর ভর্তুকি দেয়ার মাধ্যমে জনগণের অর্থে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রেখেছে সরকার দীর্ঘদিন।

সাম্প্রতিক এক হিসাবে জানা গেছে, সরকারি পেট্রোবাংলার অধীনস্থ তিতাস গ্যাসে প্রতি মাসে গ্যাসের সিস্টেম লস বা চুরি হয় সরবরাহকৃত গ্যাসের সাড়ে ১২ শতাংশ। এ চুরি রোধ করা গেলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হতো না।

কিন্তু সেদিকে সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। গ্যাসের দাম বাড়নোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হয় এমন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত পরিহার করা জরুরি। সেটা না হলে সেবা বা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে অরাজকতা ও হয়রানি বাড়বে এবং সমাজে শান্তি বিনষ্ট হবে।

গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর ফলে দেশে টমাস রবার্ট ম্যালথাসের জ্যামিতিক হারে পণ্য ও সেবামূল্য গতিশীল হবে, যা হবে সমাজ ও দেশের জন্য অশুভ।

প্রণব মজুমদার : সাংবাদিক

[email protected]