সমাজের পচন ঠেকাতে হবে

  ড. এম এ মাননান ০৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমাজের পচন ঠেকাতে হবে

অসহায় মেয়েটি ছোটাছুটি করছে খোলা রাস্তায়, পাগলের মতো। গগনবিদারী আর্তনাদ কণ্ঠে। চিৎকার করে আকুতি জানাচ্ছে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের কাছে, যাদের মাঝে ছিল অনেক তরুণ। কেউ এগিয়ে আসছে না। সবার সামনে এলোপাতাড়ি কোপাচ্ছে মেয়েটির তরুণ স্বামীকে গুটিকতক দুর্বৃত্ত। আপ্রাণ চেষ্টা করছে মেয়েটি সদ্যবিবাহিত স্বামীকে বাঁচাতে। কেউ এগিয়ে এলো না। নির্মমভাবে কুপিয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে মৃতাবস্থায় রেখে চলে গেল সবার সামনে দিয়ে, প্রবল দাপটে।

মাদকাসক্ত, ছিনতাইকারী ও লম্পট হিসেবে পরিচিত অনেক মামলার আসামি চিহ্নিত দুর্বৃত্ত; যাদের আছে থানা-পুলিশের সঙ্গে সখ্য, ফিল্মি কায়দায় হত্যা করল মাত্র দুই মাসের বিবাহিত ছেলেটিকে তারই কলেজের সামনে, রাস্তায় প্রকাশ্যে, বহু লোকের উপস্থিতিতে।

সবাই দেখল, ছবি তুলল, ভিডিও করল; আবার উল্লসিত হৃদয়ে ছবি আপলোড করে দিল ফেসবুকে। কী আনন্দ ওদের। একটা অকল্পনীয় ঘটনার ছবি তুলতে পারল। কত কত লাইক পাবে। কত তাদের সুনাম হবে।

হায় রে বাঙালি! মানুষকে না বাঁচিয়ে ছবি তুলে বাহবা নিতে ব্যস্ত। অথচ এ বাঙালিরাই একাত্তরে বীরবিক্রমে ধর্ষক পাক আর্মি আর রাজাকারদের পিটিয়ে মেরেছে লাঠি হাতে, দেশের মা-বোনদের হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষার্থে, তাদের সম্ভ্রম বাঁচাতে। নিজেরাও মরেছে, ধরা পড়েছে, অত্যাচারিত হয়েছে, জীবন দিয়েছে; কিন্তু মা-বোনদের নির্যাতিত হতে দেয়নি, কোনো বোনের ভাইকে কিংবা বাবা-মায়ের কন্যাকে মরতে দেয়নি, সম্ভ্রম হারাতে দেয়নি।

তখনকার একুশ বছর বয়সী আমি নিজে দেখেছি আর শুনেছি এমন সব ঘটনা, নিজের এলাকায়। তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে প্রতিরোধ করেছে ঘৃণ্য হানাদারদের আর তাদের এদেশীয় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দোসরদের। পঞ্চাশ বছর পার হতে না হতেই এ কী হাল হল বাঙালি যুবকদের? কেন এরা মিইয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। কেন তারা অসহায় মানুষের পাশে এগিয়ে আসছে না! কেন তারা অন্যের বোনকে, ভাইকে রক্ষার জন্য দাঁড়াচ্ছে না অসহায়দের পাশে, ঠিক একাত্তরের মতো? কেন তারা হারিয়ে যাচ্ছে অজানা কোনো জগতে, গুটিয়ে রাখছে নিজের মধ্যেই নিজেকে? এ হাল হল কেন ঐতিহ্যধারী বাঙালি সমাজের? ইচ্ছে করে জিজ্ঞেস করতে, একাত্তরের তরুণরা এখন কোথায়?

মেয়েটির আর্তনাদ কি কারও মনে একটুও কম্পন তুলতে পারল না? আশপাশে যারা দাঁড়িয়ে ‘তামাশা’ দেখছিল, তারা তো মেয়েটির পরিচিত, তার আক্রান্ত স্বামী রিফাত শরীফেরও হয়তো কাছের লোকজন; যাদের সঙ্গে নিত্যদিন তার ওঠাবসা হয়েছে। বরগুনার আবদুল হালিম দুলাল শরীফের একমাত্র ছেলে আর আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সদ্য বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ স্বামী রিফাত বখাটেদের হাতে প্রাণ দিয়েছে শুধু স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায়।

নয়ন বন্ড নামধারী উচ্ছৃঙ্খল বখাটে তার দলবল নিয়ে প্রবল বিক্রমে এলাকা দাবড়িয়ে রামদা হাতে একজনকে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে উপর্যুপরি আঘাতে এতগুলো লোকের সামনে হত্যা করল, অথচ কেউ টুঁ শব্দটিও করল না। শত শত মানুষ অন্তত একটা করে ঢিল মারলেও তো বখাটেরা পালিয়ে যেত, একটা প্রাণ বেঁচে যেত। একজন নিরস্ত্র নারী হত্যাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করল প্রাণপণে; অথচ ‘বীর পুরুষরা’ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল, দর্শক সাজল, ফটোগ্রাফার-ভিডিওগ্রাফার হল। এমনটি যারা করেছে, তারাও হত্যাকারীদের মতোই সমান অপরাধী। এ ধরনের লোকরাই সমাজকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়।

পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়, মূল অভিযুক্ত দুই বখাটে স্থানীয় কয়েকজন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের আনুকূল্য পেয়ে মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, রাহাজানি আর চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠে। বহু অভিযোগ-মামলা থাকা সত্ত্বেও কাদের আশ্রয়ে আর অভয়ে এসব অপরাধী এলাকায় দাপিয়ে বেড়াত?

আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কি খুঁজে বের করবে এসব প্রভাবশালী কারা, যাদের ছেলেরাও খুনি বখাটেদের সঙ্গে থানার সামনে বসে আড্ডা দিত, যার প্রতিবাদ করায় থানার পুলিশের এসআইকেও পর্যন্ত তার বাসায় চাপাতি নিয়ে হামলা করেছে? নাকি দাগি চিহ্নিত জেলখাটা কয়েক ডজন মামলার আসামি (পুলিশেরও নাকি সোর্স এরা) অপরাধীরা আটক হওয়ার পরও আগে যেভাবে ছাড়া পেয়েছে, সেভাবে প্রভাবশালীদেরও আড়াল করে রাখা হবে?

অপরাধীদের আশকারা দিলে হয়তো সাময়িক কিছু মিলবে; কিন্তু পরিণামে ভয়ানক পরিণতি তাদের নিজের এবং পরিবারের ওপরও নেমে আসবে। সাধু সাবধান। অতীতে পুলিশের গাফিলতি থাকলে তা-ও তদন্ত করে দেখা অপরিহার্য। ছাড় দেয়া যাবে না কাউকেই, সে রাজনীতিবিদ হোক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হোক, পরিচয় যা-ই হোক না কেন। সমাজটাকে বাঁচাতে হবে সর্বাগ্রে।

আশার বিষয়, খোদ প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিতে ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক তিনি যেভাবে অতি দ্রুত সোনাগাজীর লম্পট অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের (নিজদলীয় একজন স্থানীয় নেতাসহ) বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। মাননীয় উচ্চ আদালতও আসামিরা যাতে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশত্যাগ না করতে পারে, সেজন্য সরকারকে তা নিশ্চিত করতে বলেছেন। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় হাইকোর্টকে।

আদালতের উক্তিটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য : ‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক।...সমাজটা কোথায় যাচ্ছে? দাঁড়িয়ে দেখেছে, কেউ প্রতিবাদ করল না। অন্তত পাঁচজন মানুষ এগিয়ে এলে হয়তো তারা সাহস পেত না। জনগণকে আপনি কী করবেন? বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন ছিল না। ভিডিও করল কিন্তু কেউ এগিয়ে এলো না। এটি জনগণের ব্যর্থতা।’ জনগণ নিজের সমাজকে রক্ষায় অবহেলা করলে তাদের কে রক্ষা করবে?

বরগুনার হত্যাকাণ্ডটি আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে গেলে জাতির সামনে ঘনিয়ে আসবে জমাট অন্ধকার। এমন ঘটনা ঘটাতে প্রভাবশালীদের ছায়াতলে থেকে অন্য সন্ত্রাসীরাও উদ্বুদ্ধ হবে। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎকে প্রকাশ্য দিবালোকে হাজারও মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এখনও আমরা ভুলিনি। সরকারের হস্তক্ষেপে বিচার হয়েছে বটে, তবে দ্রুত বিচারান্তে রায় দ্রুত কার্যকর হলে হয়তো এর সুপ্রভাব পড়ত দুর্বৃত্তদের ওপর; এমনকি তাদের আশ্রয়দাতাদের ওপরও।

অনুরূপ ঘটনা এখন ঘটছে অহরহ। পত্রিকা উল্টালেই দেখা যায় প্রতিদিন অনেক ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণে জড়িত শুধু বখাটেরা নয়; আছে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক, কোচিং শিক্ষক, পীর নামধারী কিছু লম্পট, জিন তাড়ানোর ওঝার বেশে অপচিকিৎসক; আছে মসজিদের ইমাম, দলীয় পরিচয়ধারী কপট-দুর্বৃত্ত।

যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিবেশী ভাতিজা হত্যা করেছে নার্স তানজিনাকে; ভুল চিকিৎসা দিয়ে রোগী মেরে ফেলেছে অদক্ষ চিকিৎসক; যৌন হয়রানি করছে চিকিৎসক মহিলা রোগীকে। বকশিগঞ্জে দুই শিশুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মাকে প্রতিবেশীর ধর্ষণ; রাজশাহীর বাগমারায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা আর অপহরণ, স্ত্রী নির্যাতন (এমনকি কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে ফেলা), যৌতুকলোভীদের স্ত্রী-হত্যা আর পাচারকারীদের নারী অপহরণ।

সামান্য কারণে, ব্যক্তিগত বিরোধের সূত্র ধরে কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মানুষ মানুষকে মারছে। লোভের কারণে মা-ছেলেকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা উল্লাপাড়ায়; জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে দিনদুপুরে করাত দিয়ে গলা কেটে ষাট বছরের বৃদ্ধাকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

বিগত কয়েকদিনের পত্রিকা পড়লেই একজন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হতভম্ব হয়ে যাবে, আস্থা হারিয়ে ফেলবে সমাজের ওপর, মানুষের ওপর। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। মাত্র গুটিকতক ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। পাবনায় মনসুর আলী কলেজে ছাত্রী উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় বখাটেদের হাতে অধ্যক্ষ লাঞ্ছিত (স্থানীয়রা তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি), রাজধানীর আইডিয়াল স্কুলের সামনে থেকে টেনেহিঁচড়ে মাইক্রোবাসে তুলে একজন আইনজীবীর স্কুলপড়ুয়া কন্যাকে পাচারকারী কর্তৃক অপহরণ, দিনাজপুরের হামলাকুড়ি গ্রামের দুই বছরের শিশু আশিককে ঘুমন্ত বাবা-মায়ের মাঝ থেকে তুলে নিয়ে হত্যা, ত্রিশালের ধলা গ্রামের কলেজছাত্রকে অপহরণ (মুক্তিপণের বিনিময়েও মিলেনি তার খোঁজ), রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে শ্রেণিকক্ষে ঢুকে প্রকাশ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন হয়রানি (সালিশে রফা!), সাভারের আশুলিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে এবং একই এলাকার জামগড়ায় পোশাক শ্রমিককে ৭০ বছরের বৃদ্ধের জোরপূর্বক ধর্ষণ, সাতক্ষীরায় ১৪ বছরের কিশোর রিকশাচালক শাহীনের মাথা ফাটিয়ে দুর্বৃত্তদের রিকশাভ্যান নিয়ে যাওয়া, রাজধানীর হাজারীবাগে চা দোকানিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, গাড়ি ছিনতাই করার লক্ষ্যে উবার চালককে হত্যা, আধিপত্য বিস্তারের জেরে উল্লাপাড়ায় মা-ছেলেকে হত্যা, নারায়ণগঞ্জে ব্ল্যাকমেইল করে শিক্ষক কর্তৃক একাধিক ছাত্রীকে ধর্ষণ, শিবালয়ে স্বামীকে মেরে স্ত্রীর পলায়ন, হাজারীবাগে বকশিশের ১৫০০ টাকা ছিনিয়ে নিতে যুবক হত্যা, গফরগাঁওয়ে ইভটিজারকে আটক করল শিক্ষার্থীরা আর ছেড়ে দিল ইউপি চেয়ারম্যান, তাড়াশে স্কুলছাত্রীর অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগে ব্যবসায়ী গ্রেফতার, ট্রেনের টয়লেটে ধর্ষণচেষ্টা, সিদ্ধিরগঞ্জের ধর্ষক শিক্ষক ৬ দিনের রিমান্ডে, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কুপিয়ে জখম নারায়ণগঞ্জে, যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে শিকলে বেঁধে নির্যাতন, সৈয়দপুরে স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার দায়ে মুদি দোকানির কারাদণ্ড, পায়ুপথে বায়ু দিয়ে হত্যা, গাছে বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে শিশু-যুবকের ওপর নির্যাতন (এমনকি মেরে ফেলা, যেমনটা ঘটেছিল সিলেটের রাজনের ব্যাপারে), কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, ফেসবুকে ভালোবাসার খেলা এবং অতঃপর ধর্ষণ-হত্যা, ইন্টারনেটে যৌন নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে আত্মতৃপ্তি আর হায়েনার উল্লাস, নিয়ামতপুরে গৃহবধূকে ধর্ষণের পর হত্যা; আর কত লেখা যায়?

প্রতিদিন নির্মমতার বহু খবর পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে। এক পত্রিকার হিসেবে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৬ দিনে বাইশ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ তো এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সব ঘটনা তো মিডিয়ায় আসেও না।

ঘরে ঘরে পুলিশ দেয়া যাবে না, এ কথা যেমন ঠিক; তেমনি পুলিশ আর সমাজপতি-সালিশকারীরা চোখ বন্ধ করে থাকলে কিংবা দেখেও না দেখার ভান করলে যা হওয়ার তা-ই হবে। সমাজ উচ্ছন্নে যাবে আর তার ভয়ানক পরিণতির শিকার হবে একদিন পুলিশ-সমাজপতিদের পরিবারও। মুক্তি মিলবে না কারও।

আমরা চাই না, অজানা আতঙ্কে নিত্যদিন শঙ্কিত থাকুক নিরীহ মানুষ, ঘুম হারাম করে দিয়ে রাত জেগে থাকুক কিশোরী-যুবতী কন্যার ইজ্জত বাঁচাতে, কিশোর-তরুণ ছেলে বা মেয়েকে স্কুল-কলেজে পাঠাতে গিয়ে মা-বাবার বুক ধড়ফড় করুক সারাদিন, কোনো নারী সম্ভ্রম হারিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরুক নিজে বেঁচে যাওয়ার জন্য, কোনো নির্যাতিতা গৃহবধূ স্বামীর বাড়িছাড়া হয়ে পথে বসুক আর ভিক্ষুকের জীবনযাপন করুক সারাজীবন, সন্তান অপহরণের ভয়ে রাতদিন যন্ত্রণাবিদ্ধ জীবন কাটাক কোনো মা-বাবা কিংবা মাদকসেবী অমানুষদের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাক কোনো পরিবার।

ঘটনা ঘটলেই সোচ্চার হওয়া আর কয়েকদিন পর বেমালুম ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে জাতির মুক্তির কোনো উপায় আছে বলে আমার জানা নেই। খুঁজে দেখতে হবে, তরুণরা পথ হারায় কেন? জানি, তরুণ বয়স ঝুঁকিপূর্ণ বয়স। পিছলা খাওয়ার বয়স। সমাজ পরিচালকরা কী করবেন, বুঝতে পারছেন কি? অনুকরণ করার মতো রোল মডেল কোথায়? কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে তাদের? রোল মডেল গ্রামে গ্রামে তৈরি হচ্ছে না কেন? স্কুল-কলেজে মেন্টর কোথায়? পথ দেখাবে কে? পথ দেখানোর কেউ না থাকলে তরুণরা তো পথের ওপরে চলতে চলতেই পথ হারাবে। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো কেউ কী আছে যে পথহারাদের সামনে এসে সাবধান করে দেবে: ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ।’

সামাজিক অপরাধ আর পারিবারিক অপরাধ বীভৎস রূপ নিচ্ছে। মানুষ মানুষকে কীভাবে সামান্য কারণে খুন করছে বা অত্যাচার করছে, তা দেখলে-শুনলে পত্রিকা পড়তে ইচ্ছা করে না; কারও কাছে শুনতেও ইচ্ছা হয় না। গবেষণার মাধ্যমে সময় থাকতেই সঠিক কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

শুধু অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হল ক্রমবর্ধিষ্ণু অসহিষ্ণুতা, অতিলোভ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে গ্রামে-গঞ্জে আকাশ সংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব, সমাজে অতীতে বিরাজমান কঠোর সামাজিক বিচারের ক্রমাবলুপ্তি, সমাজপতিদের মধ্যে অর্থলোভের অনুপ্রবেশ এবং যেটুকু আছে সেটুকুর মধ্যে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের হটিয়ে অল্প বয়সীদের প্রাধান্য, ধর্ষণ-হত্যার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী আর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং কখনও কখনও অপরাধীদের আশ্রয়দানসহ অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাওয়া আর নিরীহদের উল্টো মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়া, মাদকের আগ্রাসনে সর্বত্র অস্থিরতার সৃষ্টি, প্রেমের নামে ভণ্ডামি, পরকীয়ার মতো মানসিক ব্যাধির প্রাবল্য, সম্পদ আর নারীর প্রতি লোভ, নারীর প্রতি অপসৃয়মান সম্মানবোধ, পারিবারিক শিক্ষা আর গাইডেন্সের অনুপস্থিতি, ক্রমশ আলগা হয়ে যাওয়া পারিবারিক বন্ধন, হঠাৎ ‘বড়লোক’ হয়ে যাওয়া একশ্রেণীর মানুষের মধ্যে ধর্ষকামিতার মনোভাব এবং আরও বড় হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি, গ্রামে-শহরে খেলাধুলাসহ সুস্থ বিনোদনের অভাব (অনেক ক্ষেত্রে নেই বললেই চলে), শহরের মহল্লায় মহল্লায় আর গ্রামে রাস্তার পাশের চা দোকানে আড্ডাবাজির অশুভ বিস্তার, তরুণদের সময় কাটানোর জন্য গ্রন্থাগার-ক্লাবের অভাব, বেকারত্ব, অনেক নেতিবাচক উপাদানের প্রভাবে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আরও অনেক কিছু।

মরণকামড় দেয়ার আগেই অপরাধীদের দমন, অপরাধ নির্মূলের লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। কোনো আইনজীবী যেন অপরাধীদের পক্ষে কোর্টে না দাঁড়ান, সেজন্য সামাজিক আন্দোলন তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, যেভাবে সমাজে পচন ধরছে; তার গতি থামিয়ে দিতেই হবে যে কোনো মূল্যে। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায়, স্বাধীন দেশে কোপাকুপি আর ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য, লজ্জাজনক ঘটনার বারবার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। ভুলে যাওয়া ঠিক নয়, সমাজের লেজে আগুন লাগলে পুরো সমাজই ছাই হয়ে যাবে, কেউই রক্ষা পাবে না।

ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×