মূল্যস্ফীতি : জীবন ও পরিসংখ্যানে

  সাজ্জাদ আলম খান ০৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মূল্যস্ফীতি

‘All theory is gray, my friend. But forever green is the tree of life’. জার্মান মহাকবি ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যাটের এ কবিতা আউড়িয়ে সমাজবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা ভি আই লেনিন তাত্ত্বিকদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। আমাদের জীবনেও তত্ত্বকথায় অনেক সময় মন ভরে না।

সমৃদ্ধ পরিসংখ্যান আর সূচকেও যাপিত জীবনে স্বস্তি পরাভূত হয়। পরিসংখ্যানকে তো এক ধরনের মিথ্যা বলে চালিয়ে থাকেন অনেক বোদ্ধা মানুষ। বলা হয়ে থাকে মিথ্যা তিন প্রকার- সাধারণ মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান। দৈনন্দিন জীবনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আলোচনায় যে কথা ঘুরেফিরে আসে, তা হচ্ছে দ্রব্য ও সেবা মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মূল্যস্ফীতি এবং সরকার সবসময়ই তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির গড় হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণের জীবনে এ হার সাড়ে ৫-এর ঘরে থাকে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

অর্থবছরের শুরুতে গ্যাসের বাড়তি দর কার্যকর হয়েছে। প্রথম দিনেই এ ধরনের বার্তা সাধারণের কাছে অনেকটা হতাশা আর বিরক্তির কারণ। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতির আশঙ্কা, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে যাপিত জীবনে ব্যয় বাড়তে পারে সর্বোচ্চ দশ শতাংশ। এ হিসাব পরিসংখ্যান ব্যুরো মানবে বলে মনে হয় না। বাসাবাড়ি ও শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। এতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গৃহ, শিল্প, বাণিজ্য পরিবহনসহ সব খাতেই গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ লেগেছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের মাসের খরচ আরও কাটছাঁট করতে হবে। গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে। গ্যাসনির্ভর নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। দাম বাড়বে হোটেল-রেস্টুরেন্টের খাবারের। পোশাক, বস্ত্র, স্টিল মিলসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। জনজীবন ও অর্থনীতি দুটিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু বছর শেষের মূল্যস্ফীতির হিসাব জালে এসব ধরা পড়বে কি?

নতুন অর্থবছরের বাজেটে চিনি, ভোজ্যতেল, ফোনকলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য ও সেবার ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স বেড়েছে; নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য যা বাড়তি বোঝা এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পারা জনগণের জন্য এটাকে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব গণপরিবহনেও পড়বে। সিএনজির দাম বৃদ্ধিতে জ্বালানি খরচ যে হারে বাড়বে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হারে ভাড়া বাড়ানো হবে।

সুযোগ বুঝে ডিজেলচালিত পরিবহনেও ভাড়া বৃদ্ধি করা হবে। কারণ এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে মূল দায় চাপবে যাত্রীদের ওপর। তাদের পকেট কাটা যাবে। শিল্পে গ্যাসের দাম ৩৮ শতাংশ বাড়ানোয় এ খাতের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। গ্রিডের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে শিল্পের উৎপাদন নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ক্যাপটিভে গ্যাসের দাম প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এতে পণ্যের দাম বাড়বে। ব্যবসার খরচ বাড়বে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে। নতুন করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বস্ত্র ও পোশাক খাত। বস্ত্রকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে (ক্যাপটিভ পাওয়ার) মূল জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের ব্যবহার হয়। ফলে সুতা এবং কাপড় উৎপাদনে অস্বাভাবিক ব্যয় গুনতে হবে।

জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতি বছরই বাড়ছে। বিশেষ করে ঘরভাড়া, চিকিৎসা, খাবার, যাতায়াত, সন্তানের পড়ালেখার খরচ বেড়েই চলেছে। অথচ এসব খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত আয়সীমা এক টাকাও বাড়ানো হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা আড়াই লাখ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল ২০১৬ অর্থবছরে। এরপর প্রতি বছরই পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে। তবু এ সীমা চলতি বছর পর্যন্ত একই আছে। আয়কর আইন অনুযায়ী, আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব মিলিয়ে বছরে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি প্রকৃত আয় থাকলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই আয়কর পরিশোধ করতে হবে। আয়কর পরিশোধ বা রিটার্ন জমা না দিলে শাস্তি হিসেবে জেল-জরিমানার বিধান আছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছিল সাড়ে ৬ শতাংশ। এর পরের বছর এ বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশের বেশি। আর গত বছর জীবনযাপনের খরচ বেড়েছে ৬ শতাংশ। প্রত্যেককে পরোক্ষ কর হিসেবে দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে ও সেবা কিনতে মোটা অঙ্কের অর্থ সরকারকে দিতে হচ্ছে। সাধারণ আয়ের মানুষ এসব খরচে হিমশিম খাচ্ছে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ করে ছাড়ের প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ালে এবং প্রথম স্ল্যাবের ১০ শতাংশ কমালে ৫ শতাংশ হতে পারত। মূলত রাজস্ব বিভাগের অদক্ষতার ছাপ পড়েছে এ ক্ষেত্রে। এনবিআরের ওপর রাজস্ব আদায় এবং করদাতা বাড়ানোর চাপ থাকে। তাই করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে অল্প কিছু মানুষকেও করসীমার বাইরে নিতে চায় না তারা। কিন্তু করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হলেও এনবিআরের মোট আদায়ে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ এনবিআরের মোট আদায়ের অতি সামান্য এসব মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যায়।

এরই মধ্যে রাজধানীর বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়া বাড়ানোর নোটিশ দিতে শুরু করেছেন। মোবাইল ফোনে ভয়েস সেবা নিতে প্রয়োজন বাড়তি পয়সা। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে দিতে হচ্ছে বাড়তি মাশুল। এবারের বাজেটে নির্দিষ্ট আয়ের মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর খরচের একটা ধাক্কা এসেছে। কারণ দ্রুতই তাদের আয় বাড়ার সম্ভাবনা না থাকলেও ব্যয় বাড়ছে। সয়াবিন, পাম, সরিষা ও সূর্যমুখী তেলে স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা তুলে নেয়ার কারণে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে আড়াই টাকা পর্যন্ত দাম বাড়বে। যদিও খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাজেট প্রস্তাবের পরপরই প্রতি লিটারে দুই টাকা বেড়ে ৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হলুদ, মরিচ, ধনিয়াসহ সব মসলাজাতীয় পণ্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে মূসক নির্ধারণ করার ফলে প্রতি কেজি হলুদের গুঁড়ায় সাত টাকা, মরিচের গুঁড়ায় ৯ টাকা এবং ধনিয়ার গুঁড়ায় ৫ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়বে। এ ছাড়া প্রতি কেজি গুঁড়া দুধে কমপক্ষে ১০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়বে।

একক পণ্যের তুলনামূলক মূল্যবৃদ্ধিকে মুদ্রাস্ফীতি বলা যায় না। একক পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে সেই পণ্যের বাড়তি চাহিদা কিংবা সরবরাহ ঘাটতিতে। সামগ্রিক চাহিদা হচ্ছে অর্থনীতিতে পণ্য ও সেবার ওপর সব ভোক্তার ব্যয়, বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং নিট রফতানি আয়ের সমষ্টি। সাধারণভাবে বলতে গেলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ মূলত চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্যতা। তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে মূল্যস্ফীতি মূলত দুই ধরনের। চাহিদা ও খরচজনিত। প্রায়োগিক দিক থেকে মূল্যস্ফীতি সাধারণত কোনো একটি সূচকের পরিবর্তনের মাধ্যমে মাপা হয় এবং এক্ষেত্রে ‘ভোক্তা মূল্যসূচক’ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত দ্রব্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি পূর্বনির্ধারিত খাদ্য ঝাঁপির মূল্যমানের পরিবর্তনের মাধ্যমে মাপা হয়। বাংলাদেশে ভোক্তা মূল্যসূচক গণনায় ব্যবহৃত পণ্যগুলোকে আটটি ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে- বাড়িভাড়া, জ্বালানি খরচ, খাদ্য, পানীয় ও তামাকজাত দ্রব্য, পোশাক ও পাদুকা। আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির খরচ, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াতসংক্রান্ত ব্যয়, বিনোদন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসংক্রান্ত খরচ এবং বিবিধ পণ্য ও সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যয়।

ভোক্তা মূল্যসূচক গ্রাম ও শহরের জন্য আলাদাভাবে হিসাব করা হয় এবং গ্রামের ক্ষেত্রে ৩১৮টি ও শহরের ক্ষেত্রে ৪২২টি পণ্য হিসাবে নেয়া হয়। অনেক দেশেই বাজার ব্যবস্থা সঠিকভাবে কাজ করে না; সেসব ক্ষেত্রে আড়তদার, মিল মালিক, পাইকারি বিক্রেতা ও অন্যান্য মধ্যস্বত্বভোগী চাহিদা এবং জোগানের সাময়িক ভারসাম্যহীনতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়। বিক্রেতারা কখনও কখনও নিজেদের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, যা বাজারের স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতি ব্যাহত করতে। দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষতার সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা। প্রতিযোগিতা কমিশনসহ সরকারি সংস্থার তদারকি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধ করা উচিত। মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের জোগানের সঙ্গে সম্পর্কিত; তাই সরকারের মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সঠিক সমন্বয় এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বিভিন্ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনার সম্পর্ক সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি।

সাজ্জাদ আলম খান : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×