শতফুল ফুটতে দাও

মাৎস্যন্যায়ের যুগ শুরু হতে কত বাকি?

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ০৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাৎস্যন্যায়

একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিকে ৩ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত কিছু সংবাদের শিরোনাম ছিল : ‘ক্রসফায়ারে’ নয়ন বন্ডের মৃত্যু, নানা প্রশ্ন; অধ্যাপক লাঞ্ছিত, গায়ে কেরোসিন দিল শিক্ষার্থী; ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ইউপি সদস্যসহ নিহত দুই; হজের নামে প্রতারণা নয়; রাষ্ট্রপতি : পৃষ্ঠপোষকদের না ধরলে আরও বন্ড তৈরি হবে; রায় হয়নি, আট পরিবারের অপেক্ষা আরও বাড়ল; গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনার আহ্বান নাসিমের; গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিএনপির মিছিল; সড়ক দুর্ঘটনায় তিন জেলায় নিহত ৪; উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় প্রাণ হারালেন গহবধূ; সুস্থ হলেও দীর্ঘ সময় ভুগতে হবে শাহীনকে; দুদকের প্রতিবেদন- রেলে কেনাকাটা থেকে শুরু করে জমি ইজারা সর্বত্রই দুর্নীতি হয়; দখলের ‘নেপথ্যে’ যুবলীগ নেতা; রগ কেটে গৃহবধূকে হত্যা, সন্দেহে স্বামী; সরু সড়কে কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, যানজটের যন্ত্রণা; ফুটপাতে চাঁদাবাজি- ৪ নেতা গ্রেফতার; আদালতে জবানবন্দি ছাত্রীদের ধর্ষণের কথা স্বীকার শিক্ষক আরিফুলের; কিশোরীকে ধর্ষণ ও গর্ভপাত ঘটানোর অভিযোগ; স্ত্রীর সামনে স্বামীকে জখম- আমজাদকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন; সড়কে ঘর ও বাঁশের বেড়া- জনসাধারণের চলাচল বন্ধ; ৩০ শতাংশ তরুণ কোনো কাজে বা প্রশিক্ষণে নেই।

একদিনের সংবাদপত্রে যদি এতগুলো উদ্বেজনক খবর প্রকাশিত হয় তাহলে দেশের অবস্থা সম্পর্কে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেই হয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, ওই দিনের সংবাদপত্রে ভালো কোনো খবর কি ছিল না? কেন সেই খবরগুলোও পাঠকের বিবেচনার জন্য তুলে ধরা হল না। ২-৪টি ভালো খবর যে ছিল না, এমন নয়। তবে সেগুলো খুব উল্লেখযোগ্য নয়। কোনটি সংবাদ হিসেবে বিবেচিত হবে আর কোনটি সংবাদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নয়, সে ব্যাপারে একটি মজার কথা আছে। কুকুর যদি মানুষকে কামড়ায় তাহলে এটা খুব উল্লেখযোগ্য খবর নয়। কিন্তু মানুষ যদি কুকুরকে কামড়ায় তাহলে অদ্ভুত বা অপ্রত্যাশিত ঘটনা হিসেবে এটি পত্রিকার শিরোনাম হবে। আমাদের দেশে পত্রিকাগুলো যখন উদ্বেগজনক, নেতিবাচক অথবা সরকারের ব্যর্থতা সংবলিত খবর ছাপায়, তখনই দেখা যায় বিদ্যমান সরকারের মুখপাত্ররা বলতে শুরু করেন, সংবাদপত্রগুলো শুধু নেগেটিভ খবরই ছাপায়। এ জন্য সাংবাদিকদের ওপর এক হাত নিতে তারা পিছপা হন না।

অনেক সময় নেগেটিভ খবর ছাপানোর অজুহাতে সংবাদপত্রের টুঁটি চেপে ধরার পাঁয়তারাও করা হয়। অথচ সংবাদপত্রগুলো যদি এসব খবর না ছাপত তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম না দেশ কী অবস্থায় আছে, দেশের মানুষের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি আছে কিনা, ক্ষমতাবানরা কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে, সমাজে কী ধরনের রোগবালাই বাসা বেঁধেছে, রাজনীতি কতটা সুস্থ বা কতটা অসুস্থ, অর্থনীতির অবস্থা কী, কীভাবে ভোটে কারচুপি করা হয়, কীভাবে আইনের শাসন ব্যাহত হয়, কীভাবে সমাজ জীবনের অন্তর্নিহিত শৃঙ্খলাগুলো ধসে পড়ে এবং সমাজে কীভাবে বিকৃত ও বীভৎস অপরাধ বেড়ে চলেছে।

আলোচ্য সংবাদপত্রের হেডিংগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে আইনের শাসন অগ্রাহ্য করে চলেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্য। মর্যাদাবান সিনিয়র শিক্ষকরাও এখন আর লাঞ্ছিত হওয়া থেকে মুক্ত নন। সমাজে দুর্নীতি ও দখলদারিত্ব অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থেকে মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। ধর্ষণ-হত্যার মতো বিকৃত-বীভৎস অপরাধ বাড়ছে। মাত্র এক দিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত উদ্বেগজনক সংবাদগুলো তালিকাবদ্ধ করে দেখা যাচ্ছে, আমাদের সমাজ কতটা অবাসযোগ্য হয়ে পড়ছে। মানুষ সমাজবদ্ধ হয়েছিল নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের জন্য। কিন্তু যখন সমাজের বুননের সুতোগুলো আলগা হয়ে পড়ে, যখন সমাজ মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে তখন সেই সমাজকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর সমাজ বলা যায় না। সমাজে যখন এ ধরনের আপদ দেখা দেয় তখন সমাজের প্রতি মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণকে বলতে শুনি, এ দেশে আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি পারা যায় দেশ ছেড়ে অন্য কোনো সভ্য বা উন্নত দেশে চলে যেতে হবে। এর ফলে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। এরা যদি দেশে থাকত অথবা বিদেশে পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসত তাহলে দেশ কতভাবেই না উপকৃত হতো। দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ পাচারের অর্থের পরিমাণে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায়। অর্থ পাচারকারীরা সর্বত্র নিন্দিত হয়। এরা নিন্দার পাত্রও বটে। এদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী আছে যারা বাংলাদেশে নানা প্রক্রিয়ায় লুণ্ঠন করে যে অর্থ জোগাড় করে তা নিরাপদে রাখার জন্যই বিদেশে অর্থ পাচার করে। এরা অবশ্যই অপরাধী। আরেকটি গোষ্ঠী আছে যারা দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেখতে পায় না এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও আস্থা রাখতে পারে না, তারাও অর্থ পাচার করে। তবে এরা প্রথমোক্ত গোষ্ঠীর তুলনায় কম অপরাধী।

উপরে তালিকাভুক্ত উদ্বেগজনক শিরোনামের একটি ছিল, ৩০ শতাংশ তরুণ কোনো কাজে বা প্রশিক্ষণে নেই। সানেম নামে একটি গবেষণা সংস্থা আছে। এ গবেষণা সংস্থা আয়োজিত সংলাপ থেকে জানা গেছে, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ কোনো ধরনের কাজ, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই। এই পরিস্থিতিতে জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন। সানেমের সম্প্রসারিত নাম হল, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং। সানেমের গবেষণা পরিচালক ড. সায়েমা হকের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী তরুণদের মধ্যে ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো রকম কাজে বা প্রশিক্ষণে নেই। এমনকি তারা শিক্ষাও নিচ্ছে না। দেশের তরুণদের মধ্যে ৩০ শতাংশ যদি বেকার বা প্রশিক্ষণে না থাকে তাহলে এদের পক্ষে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক। বেঁচে থাকার জন্য এদের অন্যের গলগ্রহ হতে হয়। এর ফলে এরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং আত্মগ্লানিতে ভোগে। এ শ্রেণির লোকেরাই মাদক ব্যবসায়ীদের সমূহ শিকারে পরিণত হয়। কবি যতই লেখেন না কেন, শোন হে যুবক, হতাশাই শেষ কথা নয়; কবির এই আশাবাদের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। এত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাহলে বেকারত্ব এত বেশি কেন? এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা তাদের পরিভাষায় যোগ করেছেন একটি নতুন টার্ম। টার্মটি হল, ‘জবলেস গ্রোথ’। আর যাই হোক, বাংলাদেশের মতো একটি নিু মধ্য আয়ের দেশের জন্য এটা কোনো সুখবর নয়। এ পরিস্থিতি বিরাজ করতে থাকলে উচ্চ মধ্য আয়ের দেশ হওয়া তো দূরের কথা, মধ্য আয়ের দেশ হওয়াও সুদূরপরাহত হবে।

অধ্যাপক লাঞ্ছিত, গায়ে কেরোসিন দিল শিক্ষার্থী। আলোচিত অধ্যাপকের নাম মাসুদ মাহমুদ। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে। আমি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতাম, তখন তিনি ছিলেন আমার একজন জুনিয়র সহকর্মী। পড়াশোনা করতে তিনি পছন্দ করতেন এবং অহেতুক ঝামেলা ঝক্কিতে জড়াতে চাইতেন না। বলা যায় এক ধরনের নির্বিরোধী মানুষ ছিলেন তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ ইউএসটিসি নামক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। তার বিভাগে নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি কারও কারওর বিরাগভাজন হন। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এদের মধ্যে শিক্ষক ও ছাত্র উভয়ই ছিল। তবে সংখ্যায় নগণ্য। তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার কথিত উদ্দেশ্যে এক শিক্ষার্থী কেরোসিন ঢেলে দিয়েছিল। যদি সত্যি সত্যি দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হতো তাহলে মহাসর্বনাশ হতো। আমাদের সৌভাগ্য যে, অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ সে ধরনের বিপদের মুখোমুখি হননি। তথাপিও তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। কল্পনাতেও ভাবা যায় না অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ ক্লাসে পড়াতে গিয়ে এমন কোনো কথা বলেছেন, যা ছাত্রীদের কাছে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি ধরেও নেওয়া যায় যে তিনি আপত্তিকর কোনো কথা বলেছেন, তার জন্য তো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবিধান দাবি করা কাম্য ছিল। কিন্তু সে পথে এগোয়নি দুর্জনেরা। হয়তো একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল। যাই হোক, সমাজের অবস্থা দিনের পর দিন যেভাবে খারাপ হচ্ছে তার ফলে কোনো প্রকার ঝুট-ঝামেলায় জড়াতে চায় না এমন মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছে।

একটি পত্রিকার কলাম লেখক লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে অপরাধ প্রবণতায় অহেতুক অতিরিক্ত হিংস্রতা যুক্ত হয়েছে; কোনো কোনো অপরাধের ঘটনায় অপরাধীদের আচরণে মানসিক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অতিশয় হিংস্রতাপূর্ণ ও বীভৎস অপরাধের ঘন ঘন পুনরাবৃত্তির ফলে সামাজিক সংবেদনশীলতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে, সমাজ নির্বিকার হয়ে পড়ছে, ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। ব্যক্তির চেতনা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে শুধুই নিজের ও স্বজনের নিরাপত্তার তাগিদকে ঘিরে। এসব কোনোভাবেই সুস্থ-স্বাভাবিক সমাজের লক্ষণ নয়।’ আমরা একটি অসুস্থ, রুগ্ন, সংবেদনশীলতা-বর্জিত সমাজে বাস করছি। এখন অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন, ‘নিজে বাঁচলেই বাপের নাম’। এহেন সমাজ সংস্থা কার্যত খুবই ভঙ্গুর। এ রকম সমাজেই এক সময় ভয়াবহ নৈরাজ্য দেখা দেয়। বাংলার ইতিহাসে এক সময় মাৎস্যন্যায়ের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। বেশ ক’বছর নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা চলছিল। দেশে কোনো কার্যকর শাসনব্যবস্থা ছিল না। কোনো রাজা ছিল না। শেষ পর্যন্ত জনগণ তাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাজা নির্বাচন করে সিংহাসনে বসায়। তিনি হলেন রাজা গোপাল। সত্যিকার অর্থে বাংলার ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট। দেশে, সমাজে যা ঘটছে তা থেকে কি অনুমান করা যায়, সে ধরনের কোনো সমাধানের পথে দেশ অগ্রসর হবে? বা হচ্ছে? এই পথ হবে অসাংবিধানিক। আশা করি, শাসক মহল সংবিধানের মধ্য থেকে ন্যায়ের মধ্যে এমন পদক্ষেপ নেবে যা দেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করবে।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×