নিম্ন মাত্রায় ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও উন্নয়নে বড় বাধা

  এম এ খালেক ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের ইসলাম কট্টরপন্থী নয়।
ফাইল ছবি

দেশের অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ইতিবাচক ধারায় প্রবহমান থাকলেও নিম্ন মাত্রার ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও নিয়ে শঙ্কা এখনও কাটেনি। নানাভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি।

বিশ্বের যেসব দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও খুবই নিম্ন মাত্রায় বাংলাদেশ সেসব দেশের অন্যতম। অথচ বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকেও ইতিবাচকভাবে উন্নতি হচ্ছে।

কিন্তু কোনোভাবেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আহরণের হার বাড়ানো যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে দুশ্চিন্তা ক্রমশ বাড়ছে। কারণ ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বৃদ্ধি করা না গেলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য বিদেশনির্ভরতা বাড়তেই থাকবে।

একটি মর্যাদাশীল জাতির পক্ষে এ ধরনের অবস্থা মেনে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ কোনো জাতিই চায় না দিনের পর দিন বিদেশি সাহায্যনির্ভর হয়ে থাকতে। তাই ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়ানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন।

উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও একেবারে তলানিতে রয়েছে। এমনকি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে। অথচ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় ছিল মাত্র ১২৯ মার্কিন ডলার।

অর্থাৎ এই বর্ণিত সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়েছে প্রায় ১৫ গুণ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি টন। বর্তমানে তা প্রায় ৪ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। তখনও মানুষ খাদ্যাভাবের মধ্যে বসবাস করত। আর এখন জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এখন দেশে আর খাদ্যাভাব নেই।

বরং বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সীমিত পরিসরে খাদ্যপণ্য রফতানির চিন্তা-ভাবনা করছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছিল খুবই কম। এখন বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ধারণ করছে।

এমনকি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বিতীয়।

একমাত্র ভারত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের দিক থেকে বাংলাদেশের উপরে অবস্থান করছে। পণ্য রফতানি, জনশক্তি রফতানি ইত্যাদি সব দিক থেকেই বাংলাদেশ বর্তমানে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ রেমিটেন্স আহরণ করেছে। আহরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ ১ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার অতিক্রম করে গেছে। ইতিপূর্বে আর কখনও বাংলাদেশ এত বিপুল পরিমাণ রেমিটেন্স আহরণ করতে পারেনি।

একই সময়ে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ করতে পেরেছে। ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ করেছে। বাংলাদেশ আগের বছরের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ করেছে।

মিয়ানমার বাংলাদেশের সমপরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ করতে সমর্থ হলেও তাদের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ কোনো কোনো অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সূচকে ভারতকেও পেছনে ফেলেছে। কিন্তু ট্যাক্স-জিডিপি রেশিওর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও অনেক পেছনে পড়ে আছে।

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ২০৩০ সালের পর বাংলাদেশ আর কোনো বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ করবে না। নিজেদের উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থায়ন নিজেরাই করবে। এটা অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ। আমরাও চাই বাংলাদেশ আর কোনোভাবেই যেন বিদেশি সাহায্যনির্ভর হয়ে না থাকে।

চাইলেই আমরা বিদেশি সাহায্যনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারব না, যদি স্থানীয়ভাবে অর্থ আহরণ বাড়াতে না পারি। আমরা কি সেই উদ্যোগ নিয়েছি? ২০১৯-’২০ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আহরণে সফল কর্মকর্তাদের আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হলে শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি বাতিল করা হয়। রাজস্ব আদায়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তার মূল দায়িত্বই হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্ব আহরণ করা।

এ জন্য জনগণের ট্যাক্সের অর্থে তাদের বেতন-ভাতা দেয়া হয়। কিন্তু ট্যাক্স আদায়ের জন্য তাদের বাড়তি সুবিধা কেন দেয়া হবে? বরং কেউ যদি ট্যাক্স আদায়ে ব্যর্থ হয় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সেটাই কাঙ্ক্ষিত।

অনেকেই মনে করেন, ট্যাক্স আদায়কারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি সঠিকভাবে আন্তরিকতা এবং সততার সঙ্গে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতেন তাহলে এমনিতেই রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যেত।

সাধারণ মানুষ ট্যাক্স দিচ্ছে। প্রদত্ত সেই ট্যাক্স ঠিকমতো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে কিনা, সেটা কি নিশ্চিত করা হচ্ছে? একজন সাধারণ ভোক্তা পণ্য ক্রয়ের সময় নিশ্চিতভাবেই ট্যাক্স দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তাদের সহায়তা না পেলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া অধিকাংশ সময়ই সম্ভব হতো না।

অর্থমন্ত্রী তাত্ত্বিকভাবে বলেছেন, ২০৩০ সালের পর আমরা আর কোনো বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণ গ্রহণ করব না। কোনো দায়িত্বশীল নাগরিকই চাইতে পারে না যে তার দেশ দিনের পর দিন পরনির্ভর হয়ে থাকুক। কারণ পরনির্ভরতা কোনোভাবেই আত্মমর্যাদাশীল অবস্থার নির্দেশক নয়। দরিদ্র দেশের ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীরা যেসব নীতি বা শর্তারোপ করে ধনী দেশের ক্ষেত্রে তা করে না।

তাই একটি দেশের চাওয়া হচ্ছে কিভাবে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের মাধ্যমে মর্যাদাশীল জাতিতে পরিণত হওয়া যায়। আর এটা করতে হলে অবশ্যই সবার আগে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জন নিয়ে কারও কোনো সংশয় নেই। কিন্তু তারপরও আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা তা সবাইকে ভাবিয়ে তোলে।

আগেই উল্লেখ হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের সেসব দেশের অন্যতম যেসব দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও খুবই কম। ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো না গেলে আমরা কোনোভাবেই বৈদেশিক সাহায্য এবং ঋণনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারব না। অর্থমন্ত্রী যতই বলুন না কেন আমরা বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ গ্রহণ করব না, এটা সম্ভব হবে না যদি ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো না যায়।

গত ১০ বছর ধরে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১০ শতাংশে ওঠানামা করছে। গত অর্থবছরে এই হার ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। একই সময়ে ভারতের ক্ষেত্রে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ছিল ২৬ শতাংশ।

নেপালের ক্ষেত্রেও এটা ছিল ২৬ শতাংশ। পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভুটানও ট্যাক্স-জিডিপি রেশিওর দিক থেকে আমাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোর গড় ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ছিল ১৮ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে ফিলিপাইনের ক্ষেত্রে এটা ১৭ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ।

জাপানের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, নিউজিল্যান্ডে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ। বেলজিয়ামের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৪৭ শতাংশ, বেলারুশে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোর গড় ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৩৫ শতাংশের উপরে। পরিসংখ্যান থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিওর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা কেমন। এত নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও দিয়ে টেকসই উন্নয়ন আশা করা যায় না।

প্রতি বছরই সরকার বাজেটে ট্যাক্স বৃদ্ধি করে।

এতে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বৃদ্ধি পায়। মানুষ বাধ্য হয় বর্ধিত হারে কর প্রদান করতে। কিন্তু সেই কর ঠিকমতো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ে না। রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত এক শ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা আদায়কৃত করের এক বড় অংশই সরকারি কোষাগারে জমা না করে আত্মসাৎ করেন। যারা কর আদায়ে সাফল্য প্রদর্শন করবে তাদের পুরস্কৃত করার কিছু নেই।

কারণ এটা তাদের দায়িত্ব। বরং যারা কর আদায়ে ব্যর্থতার পরিচয় দেবে বা কোনো ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করবে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তা না পেলে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কর ফাঁকি দেয়া সম্ভব নয়।

সাধারণ করদাতারা সঠিকভাবে কর প্রদান করতে চায়। তাই কর হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। আর সবাই কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই যেন কর প্রদান করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও যদি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানো না যায় তাহলে আগামীতে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে পড়তে পারে। প্রতি বছরই আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার কমে যাচ্ছে।

এর একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে সঠিক সময়ে অর্থের জোগান দিতে না পারা। আমরা যদি ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়াতে পারতাম তাহলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অর্থের জোগান দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হতো না। ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করতে পারলে আমাদের আর বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতো না। আগামীতে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। সেই অবস্থায় আমরা যদি ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়াতে না পারি তাহলে সেই অর্জন ধরে রাখাটাও কঠিন হবে। তাই আমাদের এখনই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এম এ খালেক : অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×