অন্য দেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

মাত্র কয়েকদিন আগে জাপানে জি ২০-এর বৈঠকে যোগদান শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়া যান এবং নিজের উদ্যোগে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়া সীমান্তে পানমুনজমে এক স্বল্পকালীন সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। ট্রাম্পের অনুরোধে কিম এই সাক্ষাতে সম্মত হন এবং দু’জনের সাক্ষাৎ হয়।

এ সময় কিছুক্ষণের জন্য ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্ত পার হয়ে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখেন। তিনিই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি এ কাজ করলেন।

এটা এক ব্যতিক্রমী ব্যাপার, কারণ ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও এখনও পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শান্তি চুক্তি হয়নি।

এখনও তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থা রয়েছে। তাদের আসল মতলব যাই হোক, মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাঝে মাঝে কিম জং উনের প্রশংসা করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে তিনবার সাক্ষাৎও হয়েছে।

লক্ষ করার বিষয় যে, ট্রাম্প যখন কিমের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ করছেন এবং উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখছেন ঠিক সেই মুহূর্তেই ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার ওপর পরিশোধিত পেট্রল আমদানিতে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে অভিযোগ করে।

শুধু তাই নয়, উত্তর কোরিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা জারি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন এক যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছে। তাদের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছে উত্তর কোরিয়ার কর্মীদের দেশে ফেরত পাঠানোর।

এই পরিস্থিতিতে এসব বিষয় উল্লেখ করে জাতিসংঘে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি এক বিবৃতি দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে ‘সর্বরোগের মহৌষধ’ বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে। এজন্য কথায় কথায় তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এটা ওয়াশিংটনের জন্য ‘সম্পূর্ণ হাস্যকর’ (যুগান্তর, ৫ জুলাই, ২০১৯)। এই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের দেখা-সাক্ষাৎ ও আলোচনা হলেও এখনও পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়া আক্রমণের বিষয়ে অটল রয়েছেন।

অন্য দেশের সঙ্গে স্বার্থের দ্বন্দ্ব হলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বেপরোয়াভাবে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে এবং নিজেদের সামরিক শক্তির জোরে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার উদ্দেশ্যে অবরোধ করছে।

এটা শুধু উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেই হচ্ছে এমন নয়, এ মুহূর্তে তারা ভেনিজুয়েলা ও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে অবরোধের মাধ্যমে তা কার্যকর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া চীন, রাশিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও তারা বিভিন্ন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, যদিও তারা ঘোষিত এই নিষেধাজ্ঞা মানে না। এমনকি তারা এই নিষেধাজ্ঞা তাদের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী মিত্রদের ওপরও ক্ষেত্রবিশেষে আরোপ করে থাকে। ভেনিজুয়েলা ও ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ করার জন্য তারা ভারতের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই নিজে যুদ্ধবাজ হওয়া সত্ত্বেও কোনো যুদ্ধ চান না! ‘শান্তির দূত’ হিসেবে যে তিনি যুদ্ধে উৎসাহী হন এমন নয়। আসলে আগে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ইত্যাদিতে যেভাবে তারা যুদ্ধ ও আক্রমণ করে এসেছে, তার ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর নেই।

এর জন্য যে সামরিক ব্যয় বহন করা দরকার, সে ক্ষমতা তাদের কমে এসেছে, যদিও সামরিক শক্তির জোরেই তারা এখনও পর্যন্ত সারা দুনিয়ার ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এ কারণে সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে তারা এখন নিষেধাজ্ঞাকেই প্রধান অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বৈদেশিক নীতি এবং কূটনীতি পরিচালনা করছে।

ঠিক এখনই দেখা যাচ্ছে তারা ইরান, ভেনিজুয়েলা ও উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে। এই তিন দেশেরই বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নিষেধাজ্ঞাপূর্ণ সংকটজনক পরিস্থিতি সত্ত্বেও এ তিন দেশের জনগণও এখন কঠোরভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। কাজেই আফগানিস্তান বা ইরাক যেভাবে আক্রমণ করা ও দখল রাখা সম্ভব হয়েছিল, কোনো অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধের অভাবে এই তিনটি দেশে তা হবে না।

এখন এই দেশগুলোতে সামরিক প্রতিরোধ ছাড়া জনগণের বেসামরিক প্রতিরোধের শক্তিও বড় রকম হিসাব করার ব্যাপার। এই হিসাব এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগকে করতে হচ্ছে। ভেনিজুয়েলায় সংকট তৈরি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের যে হুমকি দিয়েছিল এবং সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর যে চেষ্টা করেছিল তা ব্যর্থ হয়েছে।

সংকটের মুখেও ভেনিজুয়েলা তার প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান তাদের আকাশসীমায় একটি মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে তার বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কিছুই করতে পারেনি।

কারণ এ জন্য তারা ইরান আক্রমণ করলে শুধু যে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটজনক হবে তাই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতি শক্তিশালী হলেও সামরিকভাবে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাছাড়া এ ধরনের যুদ্ধের ব্যয় বহন করার ক্ষমতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর নেই। শুধু ভেনিজুয়েলা, ইরান বা উত্তর কোরিয়া নয়; অন্য অনেক দেশের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য।

ভারত ভেনেজুয়েলা, বিশেষ করে ইরান থেকে তার প্রয়োজনীয় তেলের একটা বড় অংশ আমদানি করে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ভারত এদিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গাঁটছড়া খুব শক্ত হলেও তাদের মধ্যে এ নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব কোনো গোপন ব্যাপার নয়।

ভারতও তা গোপন করার কোনো চেষ্টা করেনি। এখনকার দুনিয়ায় বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো দেশের অর্থনীতিই স্বাধীন নয়। তারা অন্যান্য দেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েই বাণিজ্য ও অন্যান্য সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এমনকি সামরিক সম্পর্কও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কারণ ভারত ও ইরানের মধ্যে অনেক সম্পর্ক রয়েছে। ইরান-ভারত যৌথভাবে ইরানের চাবাহার নৌবন্দর নির্মাণ করছে। শুধু তাই নয়, বন্দরটির অর্ধেক পরিচালনাও এখন ভারত করছে।

এটা ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বন্দরই হতে যাচ্ছে ভারতের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যম। কাজেই ইরানের থেকে তেল আমদানি বন্ধ হলেই যে ভারতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কছেদ হচ্ছে এমন নয়। যদি সেই অবস্থা দাঁড়ায় তাহলে ইরান বন্দরের ব্যাপারে চীনের সঙ্গে যুক্ত হবে।

এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য যে কত ক্ষতিকর তা বোঝানোর প্রয়োজন নেই। কাজেই ভারত যে সেই পথে অগ্রসর হবে এটা মনে করার কারণ নেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত-ইরান সম্পর্কের ইতি টানতে পারে না।

এদিক দিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দৌড় সীমিত। ভারতের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বড় আকারে দেখা দিলেও বিশ্বের প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য।

নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো দেশকে দমিয়ে রাখা যে প্রায় অসম্ভব, এটা ভেনিজুয়েলা, ইরান, উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছে।

দুনিয়ার অনুন্নত ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র থেকে নিয়ে আমেরিকার ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দিন দিন তাদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে সব দেশেই এক ধরনের প্রতিরোধ আছে।

এদিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবসহ অন্যান্য রাষ্ট্রও কোনো ব্যতিক্রম নয়। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে তাতে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেটা তাদের সবার জন্যই তৈরি করবে এক অতি সংকটজনক পরিস্থিতি।

০৭.০৭.২০১৯

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×