কারা তবে জাতির ভবিষ্যৎ?

  ড. এম এ মাননান ০৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউএসটিসি
ইউএসটিসি। ছবি: সংগৃহীত

ছোটকালের শেখা আপ্তবাক্যগুলো এখন আর মনে রাখতে কিংবা শুনতে একবারেই ভালো লাগে না। মুরব্বিরা বলতেন, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আরও বলতেন, শিক্ষকরাও জাতির মেরুদণ্ড। কোন শিক্ষাটা জাতির মেরুদণ্ড, তা নিয়ে যথেষ্ট ফাঁপরে পড়ে যাই আজকাল।

যে শিক্ষাটা কিছু জংলি ছাত্রনামধারীরা দেবে সেটা, নাকি যে শিক্ষাটা সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা (যাদের আজকাল দয়া করে ‘শিক্ষক’ বলা হয়) দেবে সেটা? জংলি ছাত্রদের জংলিপনা যেভাবে বাড়ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তাতে মনে হয় না ‘শিক্ষক’ নামের কারও কোনো প্রয়োজন আছে।

‘ছাত্র’ কথাটা বলছি এজন্য যে, ছাত্রীরা এখনও জংলিপনাটা মনে হয় রপ্ত করতে পারেনি। আশীর্বাদ করি, তারা যেন যেভাবে আছে সেভাবেই চিরকাল থাকে। তাহলে অন্তত এটুকু সান্ত্বনা থাকবে যে, জাতির ভবিষ্যৎদের একটা অংশ হলেও এখনও সুশিক্ষা নিতে চায়, দেশটাকে যাতে কেউ ‘দুর্ভাগা’ না বলতে পারে সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারবে।

কেন জানি মনে হয়, আমাদের মেয়েরা-কন্যারাই আমাদের ভবিষ্যতের দিকপাল। এরাই বাঁচিয়ে রাখবে শিক্ষকদের সম্মান। এটা কেন মনে হল?

২ জুলাই চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ৬৮ বছর বয়সী, এক সময়ের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করা সুনামধারী শিক্ষককে যেভাবে কিছু ছাত্রনামধারী জংলি দুর্বৃত্ত টেনেহিঁচড়ে ভবনের বাইরে নিয়ে গিয়ে লাঞ্ছিত করে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল, সেখানে দুর্বৃত্তায়নের গণ্ডির বাইরে থাকা ছাত্রীরাই শেষ পর্যন্ত তার জান বাঁচিয়েছিল।

তাদের মতো কন্যাদের ধন্যবাদ জানাই। ছাত্রীরাই এখন দেখছি দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায়, প্রতিষ্ঠানে রুখে দাঁড়াচ্ছে। জোর আওয়াজ তুলছে। প্রতিবাদী হচ্ছে। এমনকি জীবনবাজি রেখে প্রকাশ্য রাস্তায় হামলাকারী-খুনিদের রুখে দিচ্ছে, প্রতিহত করছে।

বীর পুরুষরা তো হাতে চুড়ি দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হয়। যেমনটা দেখেছি বরগুনায় খোলামেলা রাস্তায় নয়ন বন্ডের মতো অল্প বয়সী দুর্বৃত্তরা একজন যুবককে তার স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলল অথচ উপস্থিত কয়েকশ ‘পুরুষ-যুবক-ছাত্র’ টুঁ শব্দটি করল না।

সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত প্রতিবাদী হয়ে লম্পট অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে; কিন্তু জীবিত থাকা অবস্থায় হুমকি-ধমকিতে পিছপা হয়নি। মাদ্রাসার ছাত্ররা কিন্তু নুসরাতের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। অনেক স্কুলে-কলেজে ছাত্রীরাই প্রতিবাদী হয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছে, লড়ছে।

একটা বিরাট অংশের ছাত্রদের মধ্যে নিষ্পৃহতা দেখে আমরা শঙ্কিত। চট্টগ্রামের ঘটনায় বহু ছাত্র সেখানে ছিল, তারা তো দর্শকের ভূমিকা নয় শুধু, রীতিমতো হামলাকারীদের সহায়কের ভূমিকা নিয়েছে। সত্যিই আমরা হতভাগা।

আমাদের দেশ ঠিক আছে, ঠিক নেই শুধু আমরা। এই আমরা কারা? আমরা তরুণ-তরুণীরা। ছেলেরা চারদিকে নির্যাতকের ভূমিকায় নেমেছে। নির্যাতিত হচ্ছে মেয়েরা। তারপরও মেয়েরাই অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে রাস্তায় নামছে। মনে হয়, ভবিষ্যৎ মেয়েদের হাতেই।

চট্টগ্রামের ইউএসটিসির সেই ছাত্রীদের বলছি, তোমরা বুঝিয়ে দিয়েছ : যেসব দুর্বৃত্ত ছাত্র তোমাদের সামনে তোমাদের প্রিয় শিক্ষককে শুধু নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে অপমান করেছে, মেরে ফেলতে চেয়েছে, তারা পুরো শিক্ষক জাতিকে অপমান করেছে।

আর তোমরা কয়েকজন ছাত্রী শিক্ষকের সম্মান রক্ষা করেছ, দুর্বৃত্তদের আগুন থেকে তাকে বাঁচিয়েছ। এও তোমরা বুঝিয়ে দিয়েছ, তারা একজন শিক্ষককে অপমান করে সারা দেশের শিক্ষকের গায়ে অপমানের ধুলা ছিটিয়েছে এবং সে কারণে ‘অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’

আমরা চাই না এমন দুর্বৃত্ত সন্তান কারও ঘরে জন্মগ্রহণ করুক, এমন অসভ্য-বর্বর ছাত্র কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকুক। যারা এসব কুসন্তানের জনক-জননী তাদেরও ধিক্কার জানাই; তারা তাদের সন্তানদের জন্ম দিয়েই দায়িত্ব সেরেছেন- মানুষ করার দায়িত্ব নেননি।

শিক্ষককে আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো ঘৃণ্য উল্লাসে মেতে ওঠা কলঙ্কের মশালধারী ওই ছাত্ররা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিহ্নিত দুর্বৃত্ত। তাদের স্থানীয় নেতারাও চেনেন। ওখানকার সবাই চেনেন। এমনতরো চেনাজানা কলঙ্কিত

ছাত্রনামধারীদের সবারই বিচার দ্রুত করতে হবে, এ দাবি করাটা নিশ্চয়ই অপরাধ বলে গণ্য হবে না। কিছু পত্রিকার খবর থেকে মনে হয় (যদি সত্য হয়), এ বর্বর অচিন্তনীয় ঘটনা সংঘটনে প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের ইন্ধন থাকতে পারে। এরূপ প্রমাণিত হলে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি।

শাস্তি না হলে কিংবা শাস্তি দেয়ার কাজটি বিলম্বিত হলে দুর্বৃত্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে যাবে, যা হবে সমাজের জন্য অশনিসংকেত। আর একথাও ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না, এরাই সরকারের সব অর্জনকে তাদের দুর্বৃত্তায়িত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একেবারেই ম্লান করে দেয়, জনমনে সরকার এবং সরকারি দলের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করে।

আমাদের আশা-ভরসার স্থল যিনি, সেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যাকেও অনুরোধ করব, তিনি যেন সোনাগাজী আর বরগুনার মতোই চট্টগ্রামের এ দুর্বৃত্ত, ছাত্র নামের কলঙ্কগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে শিক্ষক সমাজের সম্মান ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন।

ড. এম এ মাননান : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×