থুসিডিডিস ট্র্যাপ ও রোহিঙ্গা সংকট

  জাহেদ উর রহমান ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা সংকট

চীন সফর শেষে ফিরে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী; সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও হয়ে গেল। এবার প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে যাওয়ার আগেই আমাদের জানানো হয়েছিল, এ সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সমাধান বের করা।

চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বাংলাদেশের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে সম্মত করার চেষ্টা করবে চীন।’ চীন সফরের পর এ কথাকে এক ধরনের মুখ রক্ষার চেষ্টার চেয়ে বেশি কিছু বলা যায় না কোনোভাবেই।

কারণ চীনের বিবৃতি ভালোভাবে খেয়াল করলে আমরা খুব স্পষ্টভাবেই বুঝব রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের অবস্থান একেবারেই বদলায়নি- তারা এখনও এ সমস্যা দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করার কথাই বলছে।

আমেরিকা আর চীনের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকে ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ শব্দযুগল বেশ শোনা যায়। গ্রাহাম এলিসনের ‘ডেস্টাইন্ড ফর ওয়ার : ক্যান আমেরিকা অ্যান্ড চায়না এস্কেইপ থুসিডিডিস’স ট্র্যাপ?’ বইটি এ আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

রোহিঙ্গা সমস্যার কারণ, স্বরূপ এবং এর ভবিষ্যৎ পরিণতি বুঝতে হলে বর্তমানে বহুল আলোচিত ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ নিয়ে কিছুটা ধারণা থাকা ভালো হবে। তাই শুরুতে এটা নিয়ে অল্প কথায় কিছুটা জেনে নেয়া যাক।

এথেন্সবাসী থুসিডিডিসের জন্ম ৪৬০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের দিকে; তাকে ‘বৈজ্ঞানিক ইতিহাস’-এর জনক বলা হয়। থুসিডিডিস স্পার্টা আর এথেন্সের নেতৃত্বাধীন দুটি দলের মধ্যে সংঘটিত পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ নিয়ে লিখেছিলেন।

এ যুদ্ধের কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, তখন সম্পদে এবং রাজনৈতিক শক্তিতে বেশি শক্তিশালী স্পার্টার সামনে যখন এথেন্স মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল তখন উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। উত্তেজনার কারণ প্রতিষ্ঠিত শক্তিটা তার অবস্থান ছাড়তে চায় না, কিন্তু উঠতি শক্তিটা শ্রেষ্ঠত্বের আসন যে কোনো মূল্যে দখলে নিতে চায়। তার ফল হিসেবেই উভয়ের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এ ইতিহাসকে সামনে রেখে অ্যালিসন বলতে চেয়েছেন বর্তমানে পৃথিবীর ক্ষমতা এবং অর্থে শীর্ষে থাকা রাষ্ট্র আমেরিকার শীর্ষ অবস্থান যখন চীনের অতি দ্রুত অগ্রসরতার কারণে হুমকির মুখে পড়ছে তখন তাদের মধ্যে এ রকম একটা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি নিজেই এটাকে নাম দিয়েছেন ‘থুসিডিডিস’স ট্র্যাপ’। তার বইয়ে অ্যালিসন প্রাচীনকাল থেকে সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যন্ত ১৬টি ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ দেখিয়েছেন, যার মধ্যে ১২টিতে উভয়পক্ষ যুদ্ধে জড়িয়েছিল।

আমেরিকা আর চীন এর মধ্যেই বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সশস্ত্র যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও কেউ সেটা পুরোপুরি উড়িয়েও দিচ্ছে না। এমন একটা যুদ্ধের সম্ভাবনা মাথায় রেখে চীনকে বেশ কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হয়েছে এর মধ্যেই।

আমার বিশ্বাস সে রকম একটা কৌশলের বলি হয়েছে রোহিঙ্গারা। সঙ্গে বাংলাদেশ বর্তমান সরকারের একটা চরিত্র এই সমস্যাটার সমাধানের আশা একেবারেই ফিকে করে দিয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

হরমুজ প্রণালির পরে মালাক্কা প্রণালি দিয়েই পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি (এক চতুর্থাংশের বেশি) পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হয়। চীনের প্রায় সব জ্বালানি এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাই ভূরাজনৈতিকভাবে এ প্রণালি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের সঙ্গে আমেরিকার একটা সশস্ত্র যুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি হয়, কিংবা নিদেনপক্ষে একটা তীব্র সামরিক উত্তেজনাও ঘটে তাহলে তার প্রতিপক্ষ মালাক্কা প্রণালি বন্ধ করে দেবে (সবচেয়ে সরু জায়গায় এটার প্রস্থ মাত্র ২.৭ কিলোমিটার)। তাতে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়বে।

এই ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই চীন মালাক্কা প্রণালিকে বাইপাস করার জন্য কিছু বিকল্প পথের চিন্তা করছে দীর্ঘদিন থেকেই। এর ফলেই আমরা দেখি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সবচেয়ে বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে।

এখন পর্যন্ত প্রাক্কলিত ৬২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সিপিইসি বা চায়না পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর তৈরি করা হয়েছে গোয়াদার বন্দর দিয়ে চীন পেট্রোলিয়ামসহ তার অন্য সব পণ্য প্রবাহ যাতে চালিয়ে যেতে পারে। এতেই সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকেনি চীন, সব ডিম একই ঝুড়িতে তো রাখছেই না তারা, বরং ঝুড়ির সংখ্যা যত বেশি সম্ভব বাড়িয়ে যাচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে চীন কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছে। এ বন্দরকে কেন্দ্র করে মালাক্কা প্রণালি বাইপাস করার আরেকটা বিকল্প তৈরি হয়েছে চীনের সামনে।

এ ছাড়া রাখাইন প্রদেশ থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত গ্যাস এবং তেলের পাইপলাইন (থেলং মিয়ানমার চায়না অয়েল অ্যান্ড গ্যাস পাইপলাইন প্রজেক্ট) স্থাপিত হয়েছে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে।

এ ছাড়া প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে রাখাইন প্রদেশ খুব বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন তৈরি হয়েছে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য।

শুধু অর্থনৈতিক কারণেই নয়, সামরিক কৌশলগত কারণেও ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য রাখাইন চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে চীনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত এখানে সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

রাখাইনের সিত্তাউ বন্দরকে কেন্দ্র করে কালাদান নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার (কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট) মাধ্যমে ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোয় একটা বিকল্প পথের চেষ্টা ভারত করছে। সেটা ছাড়াও ভারতের অন্যান্য বিনিয়োগ রাখাইন প্রদেশে আছে।

রাখাইন যে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিও-পলিটিক্যাল হটস্পট হয়ে উঠেছে তার খুব ভালো প্রমাণ কিছুদিন আগে দেখা গেল। মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান রাখাইন প্রদেশকে মিয়ানমার থেকে বিযুক্ত করে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন।

অনেকে এটাকে খুব হালকা কোনো কথা মনে করে উড়িয়ে দিচ্ছেন হয়তো, কিন্তু রাখাইনে একটা অস্থিরতা তৈরি করা আমেরিকার জন্য কৌশলগতভাবে খুবই ভালো হবে। কারণ এতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ এবং তার যোগাযোগের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পথ ঝামেলায় পড়ে যাবে।

রাখাইন ঘিরে এখন একটা পাল্টাপাল্টি অবস্থান দেখা যাচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যখনই জাতিসংঘে যে কোনো ধরনের প্রস্তাব এসেছে সেটার বিরোধিতা চীন এবং রাশিয়া করেছে। যে কোনো প্রয়োজনে তারা মিয়ানমারের স্বার্থ রক্ষা করে ভেটোও দেবে।

মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য না হলেও তার বিরুদ্ধে ওই আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনার আইনি দিক নিয়ে কাজ হচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দেয়া হলে এটার কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না।

তেমন কোনো প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে গেলে চীন-রাশিয়া এতে ভেটো দেবে এটা খুব স্পষ্ট। এত কিছু জানার পরও আমরা কেন আশা করছিলাম, এ ইস্যুতে চীন আমাদের পক্ষে দাঁড়াবে?

এবারের রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর জাতিসংঘসহ পশ্চিমারা যখন মিয়ানমারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করেছিল, তখন সেটা মিয়ানমারের সঙ্গে একটা দ্বিপক্ষীয় ‘সমঝোতা’ স্বাক্ষরিত হয়। এই তথাকথিত সমঝোতা হয়েছে চীনের চাপে, এটা স্পষ্ট।

আমরা মনে করতে পারব চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের সময় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, তারা চায় এ সমস্যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে। মিয়ানমারে গিয়ে তিনি সমাধানের ফর্মুলা জানান।

ওর পরপরই মিয়ানমারের সেনাপ্রধান চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেন এবং প্রেসিডেন্ট সেনাপ্রধানকে আরও বেশি সমর্থন করার কথা জানান।

মিয়ানমারের ওপর আমেরিকা এবং ইউরোপের চাপ বৃদ্ধির ফলে তাদের এ অঞ্চলে ঢোকার একটা মওকা হতে যাচ্ছিল, তাই চীন চেয়েছে মিয়ানমারের শতভাগ স্বার্থ রক্ষা করে খুব দ্রুত একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হোক, যাতে সারা পৃথিবীকে দেখানো যায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে প্রায়।

এর পরও মিয়ানমারের ইচ্ছায় একটার পর একটা ছাড় দিতে দিতে আমরা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে আমরা এখন ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিও ব্যবহার করি না।

আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্ক কখনও চ্যারিটি নয়, এটা দুই পক্ষের স্বার্থ নিয়ে কঠোর দরকষাকষির ব্যাপার। এটা সবলতা আর দুর্বলতার ব্যাপার। কোনো দুর্বল পক্ষ এসব দরকষাকষিতে কখনও ভালো করবে, তার সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশ এ জন্য দুর্বল নয় যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক এবং সামরিক শক্তিতে অনেক ছোট। বাংলাদেশ এ কারণে বরং দুর্বল যে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারটি একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পরও ক্ষমতায় আছে।

এভাবে ক্ষমতায় থাকায় সরকারের পেছনে নানা অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক শক্তির সাহায্য থাকে। তাই যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রিক দরকষাকষিতে বাংলাদেশ এখন খুব দুর্বল রাষ্ট্র।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস কখনও কখনও মিয়ানমারের ওপর চাপ খুব বাড়লে তারা হয়তো কয়েকশ’ বা কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে, কিন্তু মূল জনগোষ্ঠীটি থেকে যাবে।

আমাদের দেশে যে ‘রোহিঙ্গা ট্র্যাপ’ তৈরি হয়েছে, সেটার পেছনে আমেরিকা-চীনের মধ্যকার থুসিডিডিস ট্র্যাপ খুব বড় প্রভাব রেখেছে, আর বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা সরকারের দুর্বলতা এ সমস্যাকে সমাধানের প্রায় অযোগ্য অবস্থানের দিকে নিয়ে গেছে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি যদি জনগণ না হয়, তাহলে নানা রকম বিপত্তি ঘটা অনিবার্য।

জাহেদ উর রহমান : সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×