স্বজনতোষী পুঁজিবাদ খামচে ধরবে ‘গরিবের চামড়াও’

  জাহেদ উর রহমান ০৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বজনতোষী পুঁজিবাদ খামচে ধরবে ‘গরিবের চামড়াও’

দুই ঈদের মধ্যে তুলনায় ঈদুল আজহার একটা বিশেষত্ব আছে- এ ঈদে গরিব মানুষের কিছু পাওয়ার থাকে। ধর্মীয় মতে মাংসের এক-তৃতীয়াংশ এবং চামড়া বিক্রির টাকা পুরোটাই গরিবের হক।

এ পুরো জিনিসগুলো ঠিকঠাকমতো গরিব মানুষের হাতে গেলে সেটি তাদের জন্য কিছুটা উপকার নিশ্চিত করত। এর মাধ্যমে সমাজের আয়ের পুনর্বণ্টনে কিছুটা হলেও প্রভাব পড়ে। কিন্তু গত কয়েক বছর থেকে (বিশেষ করে গত বছর) কোরবানির চামড়া নিয়ে যা হচ্ছে সেটি নজিরবিহীন।

এ রাষ্ট্রে ঘটা কোনো ঘটনা আমাকে ইদানীং অবাক করে না। তাই চামড়া নিয়ে গত বছর যা হয়েছিল এবং এ বছরও যা হতে যাচ্ছে, সেটি আমাকে অবাক করবে না মোটেও। কেন অবাক হব না, সেটি নিয়ে এ কলামের শেষের দিকে আলোচনা করব। এ বছর কোরবানির চামড়া নিয়ে কী হতে যাচ্ছে সেটি বোঝার আগে একটু জেনে নেয়া যাক গত বছর কী হয়েছিল।

গত বছর কোরবানির পরপর পত্রিকার রিপোর্ট থেকে আমরা জানতে পারি- গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিু দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। এ কথার মধ্যেও আসলে শুভংকরের ফাঁকি আছে। চামড়ার দাম আসলে কতটা কমে গেছে, সেটি বোঝার জন্য মুদ্রাস্ফীতিও বিবেচনায় নেয়া উচিত।

আমরা অনেকেই শুধু টাকার অঙ্কে হিসাবটা করছি, যাতে প্রকৃত অবস্থা আসলে বোঝা যাবে না। ৩০ বছর আগে যে চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল আর এখন যে চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়, মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে এখনকার দাম ৩০ বছরের তুলনায় কিছুই নয়; প্রায় মূল্যহীন।

এটি খুব প্রত্যাশিত, চামড়া খাতে গত বছরই যা হয়েছে সেটিকে ‘জায়েজ’ করার জন্য বয়ান তৈরি করা হবে। সেটি হয়েছিলও। জেনে নেয়া যাক ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ চামড়ার দরপতন নিয়ে গত বছর কী বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রধান বাজার হল চীন। অথচ গত তিন মাস ধরে চীনে রফতানি হচ্ছে না। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন আমাদের চামড়া নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আগের অর্ডার তো নিচ্ছেই না, নতুন কোনো অর্ডারও দিচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগের অর্ডার দেয়া প্যাকিং করা প্রায় ১০০ কনটেইনার এখনও নিচ্ছে না চীন।’

এবার দেখা যাক কীভাবে তৈরি হচ্ছে এবারের বয়ান। কোরবানির চামড়া কেনা নিয়ে এ বছরের পরিকল্পনা জানতে একটি অনলাইন পোর্টাল ট্যানারি মালিক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে যা জেনেছে তার সারাংশ এরকম- আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমে গেছে। কমপ্লায়েন্সের কারণে বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অনেক ক্রেতা। গত বছর কেনা চামড়ার ৫০ শতাংশ এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে। নতুন চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণও পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। লক্ষণ দেখে এটি স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে এবার চামড়ার দাম গতবারের চেয়েও কম হবে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি চামড়া শিল্পের ওপর প্রভাব ফেলেছে, এটি সত্য, কিন্তু সে প্রভাব কতটা পড়েছে সেটি বোঝার জন্য গত বছর পাকিস্তানে কোরবানির ঈদের পরের চামড়ার দাম দেখলে আমরা ধারণা করতে পারব। সেখানেও চামড়ার দাম কমেছে তবে সেখানে মাঝারি সাইজের একটি গরুর চামড়ার দাম ১০০০ টাকার ওপরে ছিল।

একটা ছোট অঙ্ক করা যাক। বাংলাদেশের গত বছর ৫০ লাখ গরু কোরবানি করা হয়েছিল। প্রতিটা চামড়ার মূল্য যদি গড়ে ৩০০ টাকা কম হয়, তাহলে কমপক্ষে ১৫০ কোটি টাকা কম পাওয়া গেছে।

এর সঙ্গে ৬০ লাখ খাসি-ভেড়ার চামড়া যুক্ত করলে ২০০ কোটি টাকা কম পাওয়া গেছে চামড়া বিক্রি থেকে। এ টাকাটা দেশের ২ কোটি হতদরিদ্রের (যারা দিনে ১.৯০ ডলারের নিচে জীবন ধারণ করে) মধ্যে বণ্টন করে দিলে প্রত্যেকে ১০০ টাকা করে পেত।

এ খাতে আরও অবিশ্বাস্য ঘটনা আছে। প্রতিবছর কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংকগুলো (মূলত সরকারি ব্যাংক) ঋণ দেয়; কিন্তু এ খাতেই ঋণ নিয়ে ভয়ংকর লুটপাট হয়েছে। গত বছরই পত্রিকায় এসেছে, চামড়া খাতে নেয়া ঋণের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

এর মধ্যে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা খেলাপির তালিকায় যুক্ত হয়েছে। চামড়া খাতের ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংক থেকে চামড়া খাতে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এ খাতে তাদের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ৭০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত রয়েছে। তবে নিয়মিত ঋণের মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাংশ আদায় হচ্ছে। অবশিষ্ট টাকা বকেয়া থাকার পর সেগুলোও খেলাপি হয়ে পড়ছে।

একদিকে পানির দরে চামড়া কেনা, আবার আরেক দিকে ব্যাংকের টাকা লোপাট করে দুই দিকেই দারুণ লাভ নিশ্চিত করছে চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা।

ধরে নেই গত বছর চামড়া ব্যবসায়ীদের বক্তব্য সঠিক ছিল। তার মানে বাংলাদেশের চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে গেছে। তাদের এ বক্তব্য আমরা খেয়াল করব- এমনকি রেডি করা কনটেইনারও রফতানি করা যাচ্ছে না। তাহলে অতি সস্তায় চামড়া কিনেও রফতানি করার কি আদৌ কোনো নিশ্চয়তা আছে? খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে খুব কম দামে কেনা চামড়াও শেষ পর্যন্ত রফতানি করা যাবে না, কারণ তাদের ভাষ্যমতে চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বাজারে চামড়ার চাহিদাই নেই।

তাহলে খুব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আসে সরকার গত বছর ঈদের আগেই বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কাঁচা চামড়া রফতানি করার অনুমতি কেন দেয়নি? কিংবা নিদেনপক্ষে দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়নি কেন? সে ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, মানুষ বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি দাম পেত।

সমাজের সবচেয়ে হতদরিদ্র মানুষের অধিকার চামড়ার টাকাটা অনেক বেশি পরিমাণে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারত। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে অতি ধনী কিছু মানুষের স্বার্থরক্ষা করল। আসলে চীন-আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের বাহানায় ট্যানারি মালিকরা সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ‘পানির দামে’ চামড়া কিনে নিয়েছিল।

এ বছর আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস, কমপ্লায়েন্সের কারণে বাংলাদেশ থেকে ক্রেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেয়া, ব্যাংক ঋণের অপ্রতুলতা, গত বছরের ৫০ শতাংশ চামড়া থেকে যাওয়া এসব কারণের পরিপ্রেক্ষিত সরকার কি কাঁচা চামড়া রফতানি করার অনুমতি দেবে? নিদেনপক্ষে দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেবে?

‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ হচ্ছে পুঁজিবাদের বিকৃত রূপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপের একটি। এটি সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শ্রেণির সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী শ্রেণির একটা চক্র তৈরি হয়। সেই ব্যবসায়ী চক্র বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ব্যবসা করে না, বরং সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ থাকার কারণে অনৈতিকভাবে সরকারি নীতি, কর কাঠামো, ঋণ এবং আর্থিক প্রণোদনা সম্পূর্ণ নিজেদের অনুকূলে নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যবসা করে। এভাবে ব্যবসা করা সেসব ব্যবসায়ীর জন্য অকল্পনীয় পরিমাণ মুনাফা (এ মুনাফার ভাগীদার হয় সরকারও) নিশ্চিত করলেও ভীষণভাবে ভুক্তভোগী হয় জনগণ।

এ দেশে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি টিকে আছে দীর্ঘদিন থেকেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ব্যাপ্তি এবং প্রকটতা বেড়েছে বহুগুণ। তাই চামড়া নিয়ে গত বছর যা হয়েছে, সেটি একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল। সেই কারণেই এ অনুমানও নিশ্চিতভাবে করা যায়- কাঁচা চামড়া রফতানির জন্য অনুমোদন দেয়া হবে না, এমনকি চামড়ার দাম নির্ধারণ না করে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হবে না। তাই এবার চামড়া বিক্রি হবে গত বছরের চেয়েও কম দামে।

এটি নিয়ে আমরা, মধ্যবিত্তরা গত বছর অন্তত ফেসবুকেও খুব বেশি কথাবার্তা বলিনি। বলব না এই বছরও, কারণ চামড়া আমাদের কেনা গরুর হলেও এর বিক্রয়মূল্য কম হওয়াজনিত কারণে ক্ষতিটা আমাদের না, কারণ টাকাটা অন্যকে দিয়ে দেয়ার কথা। কিংবা হাজার হাজার, লাখ লাখ টাকায় কেনা গরুর চামড়া বিক্রি করে হাজারখানেক টাকা কম পেলেই বা আমাদের কী আসে যায়?

মানবিক পুঁজিবাদীব্যবস্থা কল্যাণ অর্থনীতি দূরেই থাকুক এমনকি একটা মোটামুটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক বাজার অর্থনীতি থেকেও আমরা বহু দূরে আছি। রাষ্ট্রের প্রতিটা ক্ষেত্রে এখন ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের জয়জয়কার। আর সেটি প্রতিদিন আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তি সঞ্চয় করছে। এ ক্রোনি ক্যাপিটালিজম এতই সর্বগ্রাসী যে এর পেটে সবকিছুই গেছে; যাবে কোরবানির চামড়াও, গরিবের হক বলে দেয়া দোহাইও এ ক্ষেত্রে কাজে আসবে না।

ডা. জাহেদ উর রহমান : সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×