যান্ত্রিক জীবনে উৎসবটাই আনন্দের

  মুঈদ রহমান ১১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

সারা বিশ্বেই উৎসবের আমেজ দিনকে দিন বাড়ছে। এ থেকে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। এখানে ধর্মীয়ভাবে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ঘিরে উৎসব পালিত হয়।

সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো উৎসবকে ষোলআনা সংকীর্ণতার মধ্যে রেখে শুধু নিজ সম্প্রদায়ের মাহাত্ম্য প্রচারের চেষ্টা করে। কিন্তু যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করেন, তারা চান ধর্মীয় কিছু আবশ্যিক আচারের বাইরে পার্বণগুলোকে সার্বজনীন করে তুলতে।

তাই তাদের স্লোগান তুলতে দেখা যায়- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। আমরা যদি আজ থেকে ৪০-৫০ বছর পেছন ফিরে তাকাই, তাহলে দেখব উৎসবের আয়োজনটা অনেকখানি সীমাবদ্ধ ছিল।

এর দুটি কারণ থাকতে পারে : এক. আর্থিক সঙ্গতির দুর্বলতা; দুই. পারিবারিক গঠন। একান্নবর্তী পরিবারে সারা বছর ধরেই শান্তি ও অশান্তি একত্রে বসবাস করে। তারপরও বন্ধনমাত্রা সুদৃঢ় থাকে।

কিন্তু ‘নিউক্লিয়ার’ পরিবারে বন্ধনমাত্রা থাকে না বললেই চলে কিংবা তা ধরে রাখা সম্ভব হয় না। আজকের গতিশীল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে মানুষ অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে গেছে। তাই উৎসবটাকেই একমাত্র নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।

আজকের বাংলাদেশে উৎসব কেবলই আনন্দ আর ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, এর রয়েছে একটি বড় অর্থনৈতিক দিক। হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব হল দুর্গাপূজা।

ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ২২ লাখ পরিবার আছে যারা পূজাকে কেন্দ্র করে গড়ে ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় করে। সে হিসাবে ভোগব্যয় ধরা যেতে পারে প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

মুসলমানদের প্রধান উৎসব দুটি- রোজার ঈদ বা ঈদুল ফিতর এবং কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা। রোজার ঈদে ঈদের বাজার তো থাকেই, তারপরও সারা মাস ধরে রোজা রাখার সময় মানুষ ভালো কিছু খেতে চেষ্টা করে।

সেই হিসাবে দেখা গেছে, ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ভোগব্যয়ের পরিমাণ কম করে হলেও ৬০ হাজার কোটি টাকা। কোরবানির ঈদেরও একটা হিসাব করা যাবে। ঈদ উপলক্ষে আমাদের গরুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৭০ লাখ এবং ছাগল-ভেড়ার চাহিদা ৩৫ লাখ।

গরুর গড় মূল্য যদি হয় ৫০ হাজার টাকা, তাহলে অঙ্কটা দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা এবং ছাগলের দাম যদি গড়ে ১০ হাজার টাকা ধরা হয় তাহলে তা হবে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদে পশু কেনাবেচার পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মশলাপাতির হিসাব নাই বা নিলাম।

এতো গেল ধর্মীয় উৎসব, এছাড়াও আমাদের রয়েছে একটি সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব পহেলা বৈশাখ। বর্তমান সরকার এ উৎসবকে উৎসাহ দিতে ২০১৬ সাল থেকে উৎসব ভাতার প্রবর্তন করেছে।

সে বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৩ লাখ ৭৫ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা হিসেবে পেয়ে আসছেন।

এ হিসাবে একজন ন্যূনতম ১৬৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৬ হাজার টাকা এই ভাতা ভোগ করছেন। এর বাইরেও এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ১ কোটি পরিবার পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গড়ে ২ হাজার টাকা খরচ করতে সক্ষম এবং তারা তা করেও থাকেন।

তাহলে পহেলা বৈশাখে আমাদের খরচের অঙ্কটা দাঁড়ায় ২ হাজার কোটি টাকা। ছোটখাটো অন্যান্য উৎসব বাদ দিলেও কেবল উল্লেখিত উৎসবেই ব্যয় হয় বছরে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি; যা আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

আর আমাদের বাজেটের আকারের ২০ শতাংশেরও বেশি, যা কিনা যে কোনো খাতে বাজেট বরাদ্দের চেয়েও বেশি। অর্থনীতির এই দিকটি বিবেচনা করতে হবে। ‘অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়ছে এজন্যও।

এমনকি মফস্বল শহরে কারও যদি একটি দোকান থাকে আর সেটি যদি চালু হয়, মুনাফা অর্জনের জন্য তাকে বেশি কিছু করতে হয় না আজকাল। শুধু একটা গ্রহণযোগ্য (যৌক্তিক বলছি না) দাম হেঁকে চুপচাপ বসে থাকলেই হল।

পণ্যটি ক্রেতার মনে ধরলে, তার পয়সা পকেট থেকে না বেরিয়ে যাবে কোথায়! আবারও অবাক হচ্ছেন? এটাই বাংলাদেশের নতুন ধারা’ (মামুন রশীদ, ‘উৎসবের অর্থনীতি’, পৃষ্ঠা : ১৭৪)।

আমাদের অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, মধ্যবিত্তের হাতে এখন পয়সা আসছে এবং তারা তা খরচ করতেও রাজি এবং তা করছেনও, যে কারণে আমাদের উৎসবগুলো অর্থনীতিতে এত বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। সক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটুক এটাই আমরা চাই।

উপরের বর্ণনা আমাদের প্রতি বছরের। ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনার সঙ্গে সঙ্গে এবারের ঈদে একটি নতুন শঙ্কা যুক্ত হয়েছে- ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর সামান্য প্রকোপ কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারে তা কোনো জেলাকেই আক্রমণ করতে দ্বিধা করেনি। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব কোনোটাতেই ফারাক নেই। এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে; মৃতের সংখ্যা ৬০-এর উপরে। ধারণা করা হয়, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাবেন ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ।

তাদের অনেকেই ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করতে পারেন, যা থেকে আরও প্রকটভাবে সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তেমন কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। অবশ্য সরকারের তরফ থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হল আক্রান্তের আকার নিয়ে। গত তিন দিনের গড় হিসাবটা হল আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার। সরকার আশ্বস্ত করেছে, ডেঙ্গু শনাক্তকরণের টেস্টিং কিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত এবং তা ৫০ লাখের অনুমোদন পেয়েছে, যদিও হাতে আছে ২ লাখ।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায় খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কথায়। তিনি ঢাকা থেকে বাড়িতে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। অনেক গ্রাম্য এলাকায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসক থাকে না। সেক্ষেত্রে সুচিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।’

মহাপরিচালকের পরামর্শ মূল্যবান, তবে তা কতজন আমলে নেবেন সেটাই বিবেচ্য বিষয়। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের আচরণ অনেকটা ‘রিস্ক লাভারের’ মতো। বুঝে না বুঝে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকি। বিষয়টি প্রত্যাশিত না হলেও বাস্তব। অন্যদিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়েও আমরা তামাশা করি, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ডেঙ্গু সমস্যার ভয়াবহতার সময় যখন দেখি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সেলিব্রেটিদের নিয়ে রাস্তা ঝাড়ু দিচ্ছেন, তখন তা নিশ্চয়ই আমাদের পীড়া দেয়। এ ধরনের চিত্র মানুষকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে।

কেননা ডেঙ্গু রাস্তার মাঝখানে কিংবা নর্দমায় হয় না, হয় পরিষ্কার পানিতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভূপেন্দর নাগপাল আমাদের দেশে ডেঙ্গু জন্ম নেয়ার সম্ভাব্য ১৯টি জায়গার কথা বলেছেন।

এগুলো হল : পুরনো টায়ার, লন্ড্রি ট্যাঙ্ক, ঢাকনাবিহীন চৌবাচ্চা, ড্রাম বা ব্যারেল, অন্যান্য জলাধার, পোষা প্রাণীর পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের ব্লক, ফেলে রাখা বোতল ও টিনের ক্যান, গাছের ফোকর ও বাঁশ, দেয়ালে ঝুলে থাকা বোতল, পুরনো জুতা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত খেলনা, ছাদ, অঙ্কুরোদগম উদ্ভিদ, বাগান পরিষ্কার করার জিনিসপত্র, ইটের গর্ত ও অপরিচ্ছন্ন সুইমিং পুল। সুতরাং এদিকে মানুষকে মনোযোগী করে তুলতে হবে। ক্ষতির মাত্রা কমানোর এটাই প্রধান উপায়।

আমরা শত নিরাশার মাঝেও আশা খুঁজতে অভ্যস্ত। আমরা যদি আরেকটু সচেতন হই, তাহলে ক্ষতির মাত্রা কমাতে পারব। আশা করব, মানুষ যে আনন্দের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে উৎসবে মেতে উঠেছে তাতে কোনো নিরানন্দের ছোঁয়া লাগবে না। সবার প্রতি রইল ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×