আজকের যুগে সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী ১৭ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আজকের যুগে সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব
আজকের যুগে সন্তানের প্রতি অভিভাবকের দায়িত্ব। ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল, বদলে যাচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ। পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো, মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং সম্পর্কও পরিবর্তিত হচ্ছে।

আমাদের চিন্তাভাবনা, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও রুচিবোধ, হিংসা-দ্বেষ প্রকাশের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। এক জেনারেশন আগেও কোনো বিষয়কে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ যেভাবে বিশ্লেষণ করেছে, এখন তার অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। এর সবকিছু হয়তো আমাদের কাঙ্ক্ষিত নয়। তারপরও আমরা গা ভাসিয়ে দিচ্ছি; ভাবছি, যুগের ফের, এমনতো হতেই পারে। মনকে প্রবোধ দিচ্ছি ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’।

পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ পরিবর্তনগুলো বেশি চোখে পড়ছে। এখন পরিবারগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। একটি-দুটি সন্তানকে ‘তুলুতুলু’ করে বড় করা হচ্ছে। নিুমধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে ওপরের দিকে প্রায় সব পরিবারে প্রত্যেক সন্তানের আলাদা রুম আছে। সেই রুমটির দরজা আবার অধিকাংশ সময় বন্ধও থাকছে। আমাদের কৈশোর, তারুণ্যে অনেক বাসায় একই রুমে তিনটি খাটও বিছানো দেখেছি। একাধিক ভাইবোন একরুমে থাকত, এতে মন বাঁধনহারা হওয়ার সুযোগ কম থাকত।

এখন কেউ কারও রুম ছাড়তে চায় না বলে রাত্রিযাপনের মেহমান আসার রেওয়াজও ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। সন্তান যা চাচ্ছে, বাছ-বিচার না করে অনেক ক্ষেত্রেই তা দেয়া হচ্ছে। এখনকার মা-বাবা’র ছোটবেলায় চাওয়া-পাওয়ায় যে ঘাটতি ছিল, তাদের সন্তানকে যেন তা স্পর্শ করতে না পারে, সেজন্য তারা সদাতৎপর থাকছেন।

মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে সন্তানদের মাসে দু’একবার রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যা খেতে চায় খাওয়ানো হচ্ছে, স্কুলে লেখাপড়া হয় না বলে কোচিং করানো ও গৃহশিক্ষক রাখা হচ্ছে। দেশ-বিদেশের ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হচ্ছে। এ যুগে মা-বাবা’রা সন্তানের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে আলোচনা করছেন। তারা জানেন, সন্তান কখন কোথায় ডেট করছে।

তারা সন্তানকে তাদের প্রেমের কাহিনী শোনায়, সন্তানরাও শোনে। আগে যে কথা বা বিষয়গুলোতে একটু রাখঢাক করে চলা হতো, তা আর নেই। এটার ফলাফল ভালো কী মন্দ সেই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, আমরা এখন অনেক বেশি ওপেন হয়ে গেছি।

কিন্তু এত সুযোগ-সুবিধার পরও পারিবারিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, আন্তঃপারিবারিক পরিবেশ কি আরামদায়ক ও সুখকর হচ্ছে? মনে হয় হচ্ছে না? আমরা অভিভাবকরা কি সন্তানকে প্রথম পাঠ দিতেই ভুল করে ফেলছি? চোখ ফুটে একটি শিশুতো তার মা-বাবাকেই অভিভাবক ও শিক্ষক হিসেবে পায়। আমাদের পথ ও পদ্ধতিতে কি ভুল হচ্ছে? না হলে ছেলেধরা সন্দেহে নিরীহ মহিলাকে লাঠিপেটা করে মেরে ফেলার প্রধান আসামি ‘হৃদয়’ নামের এক তরুণ হতে যাবে কেন? রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া নয়ন বন্ড থেকে শুরু করে সবাই কেন তরুণ?

একটি সন্তাদের মধ্যে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে অন্যান্য গুণের বীজ বপনে কতটুকু চেষ্টা করা হচ্ছে? মুরব্বিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, ভালোবাসার নামে প্রতারণা, ইয়াবা-মাদক সেবন, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি কেন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। সন্তানদের কি বাবা-মা, গুরুজনদের সঙ্গে আচরণ এবং তাদের প্রতি দায়-দায়িত্ব, নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, শেখানো বা স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে? মানুষের মতো মানুষ কতজন হচ্ছে?

পৃথিবীর সব দেশে, সব কালে, সব বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই বিচ্যুতি ঘটেছে। কিন্তু এখন সে বিচ্যুতির সংখ্যা ও ব্যাপকতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাবা-মা’র মুখে মুখে কথা বলা, তর্ক করার প্রবণতা এখনকার প্রজন্মের সন্তানদের মধ্যে অনেক বেড়েছে। কেন এমন হচ্ছে? আমাদের সময় কি তা চিন্তা করা যেত? একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুনতো! বাবা-মায়ের সঙ্গে যারা এরূপ আচরণ করত, তারা সবখানেই অপাঙ্ক্তেয় ও অবাধ্য হিসেবেই বিবেচিত হতো।

স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিত্বের সংঘাত আদর্শ অভিভাবক হওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। তাদের পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব, অশ্রদ্ধাবোধ, একে অন্যের ভুলত্রুটিগুলো সন্তানের সামনে তুলে ধরায় সন্তানের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চেয়েও আরও বেশি তৈরি হয় অসহায়ত্ববোধ। দু’জন রাগারাগি করে পৃথক রুমে শয্যা পাতার ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে তাদের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধায় কিছুটা হলেও চিড় ধরে।

এতে একজন সুস্থ-সন্তানও ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে। এরূপ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সন্তান যখন একা একা বাইরে যাওয়ার মতো বয়সের হয়, তখন ঘরের প্রতি তার আগ্রহ কমতে থাকে। যেটা সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার পথে বড় অন্তরায়।

স্বামী-স্ত্রী দু’জনই চাকরি, ক্যারিয়ার বা অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় সন্তানকে সময় দেয়া বা তাদের চাহিদা, অভাব-অভিযোগ সমন্বয় করার সুযোগ কম থাকে। এ ঘাটতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য সন্তানের সঙ্গে কোনো বিষয়েই সাধারণত দ্বিমত পোষণ করতে চায় না। ফলে সন্তানের কথাই চূড়ান্ত ফয়সালা হিসেবে বিবেচিত হতে হতে মা-বাবার নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায়।

আমাদের দেশে ‘ফেসবুক’ আর্থিক সামর্থ্য, পারিবারিক জৌলুস, দেশ-বিদেশ ঘোরাঘুরির ছবি প্রদর্শনের মুক্তমঞ্চে পরিণত হয়ে গেছে। কার বাবা-মা কাকে দামি মোবাইল কিনে দিল, ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়াতে নিয়ে গেল, দামি পোশাক কিনে দিল, তা বন্ধুরা খুব তাড়াতাড়ি জানতে পারছে। এতে যেসব বাবা-মায়ের সামর্থ্য কম, তাদের সন্তানের ভেতরে হয়তো অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। অমুকের বাবা এটা পারলে তার বাবা কেন পারবে না? বাবা-মায়ের অপারগতা থেকে ওই সন্তানের ভেতর তাদের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞার ভাব পরিলক্ষিত হয়, যা পারিবারিক বন্ধন ও শ্রদ্ধার জায়গাগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়েরা সন্তানকে শাসন করতে ভয় পায়- যদি কোনো ‘অঘটন’ ঘটিয়ে ফেলে। সন্তানের পুনঃপুন অন্যায় কাজের পরও অপত্য স্নেহের কারণে তাদের সামনে কঠোর-কঠিন মানব-মানবীর অসহায় মুখচ্ছবি মনকে বড় বেশি ব্যথিত করে।

শাসন মানে মারধর করা নয়। যে স্নেহ, আদর-ভালোবাসা সন্তানকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার পথকে বাধাগ্রস্ত করে, সে ভালোবাসাকে অবশ্যই ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করতে হবে। এসব নিয়ে আলোচনা করতে অনেকেই সংকোচ বোধ করে। পাছে কেউ যদি নিজের সমস্যাকে সাধারণীকরণের ব্যর্থ প্রয়াস মনে করে।

ইদানীং সন্তানদের মধ্যে হুট করে যে কোনো ধরনের অঘটন ঘটানোর মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী? যেসব কারণে এ ধরনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেটা তালাশ করতে হবে। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষার প্রথম পাঠ পরিবারেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। কচি বয়সের শিক্ষাইতো সুদৃঢ়ভাবে মন-মগজে গেঁথে যায়। তাহলে কি এখনকার পরিবারে সন্তানকে সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়া যাচ্ছে না?

একদিন বন্ধুদের জম্পেশ আড্ডার একপর্যায়ে একবন্ধু বলে বসল ‘স্ত্রীকে ভয় পাওয়া ভদ্রতার লক্ষণ’। কথা শুনে আমার চোখ তো ছানাবড়া, কী বলে আমার বন্ধু! স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তো ভয়-বিদ্বেষ থাকার কথা নয়। এটা তো প্রভু-ভৃত্যের কোনো সম্পর্ক নয়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার। একজন শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের মধ্যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বিষয়গুলো প্রত্যক্ষ করবে, তখন তার মধ্যেও নিজের প্রতি, বাবা-মা ও অন্যের প্রতি এমনিতেই ভালোবাসা তৈরি হতে থাকবে।

সন্তানকে ছোটবেলা থেকে আনন্দময়, নিরাপদ ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে। নিজের প্রতি, বাবা-মা,

আত্মীয়স্বজন ও অন্যের প্রতি তার আচরণ, ভালো-মন্দ, বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, সমাজের প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে, পারতপক্ষে একত্রে আহার করতে হবে। দেশ জাতি, কৃষ্টি-কালচার, সভ্যতা-ভব্যতাসহ বিভিন্ন আলোচনার মাধ্যমে তার চিন্তার ক্ষেত্রটিকে ব্যাপক বিস্তৃত করে দিতে হবে। তাকে জীবনের মূল্য, ব্যাপকতা ও দায়-দায়িত্ব বোঝাতে হবে। নতুবা পথচ্যুত হওয়ার সহজলভ্য পথগুলো নতুন নতুন ‘ঐশী’র সংখ্যা শুধু বাড়িয়েই তুলবে।

আমরা অনেকেই মনে করি সন্তান বড় হলে সবকিছু শিখে নেবে। আসলে বড় হয়ে সবকিছু শেখা যায় না। ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিনই শিখতে হবে। বয়স, পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ শেখার পদ্ধতিতে শুধু ভিন্নতা থাকবে। ছোটবেলা থেকে অল্পে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস তৈরি করে দিতে হবে।

সন্তানের কথা, সমস্যা গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনতে হবে। ইতিবাচক পদ্ধতিতে সমাধান করতে হবে। ইসলামের মহান খলিফা হজরত আলীর (রা.) সঙ্গে তার স্ত্রী ফাতিমার (রা.) কোনো বিষয় নিয়ে অভিমান হয়। বিষয়টি রাসূলের (সা.) গোচরে আসে। হজরত আলীকে (রা.) খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল তিনি মসজিদে মুখগোমড়া করে বসে আছেন। রাসূল (সা.) তাকে বাসায় নিয়ে গেলেন, তারপর নিজে বিছানায় শুয়ে মেয়ে-জামাই দু’জনকে তাঁর দু’পাশে নিয়ে হাত ধরিয়ে মিল করিয়ে দিলেন। ভাবা যায়, কত আধুনিক ছিলেন আমাদের প্রিয় রাসূল (সা.)। এখনকার লেবাসপরা মডার্ন বাবা-মায়েদের এ ঘটনা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

আমাদের বা আগের প্রজন্মের গুরুজনদের কাছে শুনতাম এ ভালো কাজ, ভালো কথা, উপদেশটি তার মা-বাবা, মুরব্বিদের কাছে শিখেছেন এবং অভ্যাস করেছেন। আমাদের সন্তানরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাদের মা-বাবা নিয়েও যেন এরকম গর্ব করতে পারে, সে ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে।

সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছে মহান আল্লাহ পাকের অনেক বড় নিয়ামত এবং একইসঙ্গে আমানত; এর খেয়ানত যেন না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এদের যথাযথ শিক্ষিত, স্বাবলম্বী, মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব বাবা-মায়ের। ইসলাম ধর্মমতে, মৃত্যুর পর দুনিয়ার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ও আমল লাভের প্রায় সব উপায় ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তিনি যদি দুনিয়ায় নেককার সন্তান রেখে যান এবং তারা বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করে, তবে সেটি তার আমলনামায় যুক্ত হবে। আমরা ক’জন অভিভাবক সন্তানকে এ বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছি?

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×