মশা পৃথিবীর প্রধান প্রাণঘাতী প্রাণী!

  সাইফ উল্লাহ মুন্সী ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এডিস মশা
এডিস মশা। ছবি: সংগৃহীত

একটি পুরনো প্রবাদ আছে- ‘আপনি যদি ভাবেন যে, আপনি অন্যের তুলনায় খুব ছোট; তবে একটি মশার সঙ্গে রাত কাটানোর চেষ্টা করুন।’ অর্থাৎ সামান্য মশার সঙ্গে ঘুমালে তার অত্যাচারে আপনি অতিষ্ঠ হয়ে বুঝতে পারবেন ছোট জিনিসও কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মশাদের ডানার গুঞ্জন, জ্বালাময় কামড় এবং প্রায় সর্বব্যাপী উপস্থিতি যদিও একটা সাধারণ উৎকণ্ঠার বিষয়; তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হল, মশার বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা। এ প্রাণীটি মানব ইতিহাসের মারাত্মক সব ক্ষতিকারক রোগ শুধু বহনই করে না; একই সঙ্গে ক্যারিয়ার বা ভেক্টর হিসেবে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ মানুষ মশাবাহিত রোগে মারা যাচ্ছে; যেজন্য মশা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুজ্বর, চিকুনগুনিয়া ও জিকার মতো মশাবাহিত রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত ৩০ বছরে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার ৩০ গুণ বেড়েছে এবং তা প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

জানামতে, পৃথিবীতে তিন হাজারের বেশি প্রজাতির মশা রয়েছে; যদিও মাত্র তিন ধরনের মশা মানুষের মধ্যে রোগ ছড়ানোর জন্য দায়ী। এনোফিলিস মশা একমাত্র প্রজাতি, যা ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে।

কিউলেক্স জাতীয় মশারা ওয়েস্টনাইল ভাইরাস, জাপানিজ এনসেফালিটিস ভাইরাস, সেন্ট লুই এনসেফালিটিস ভাইরাস এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফাইলেরিয়াসিস ও এভিয়ান ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে।

তৃতীয় প্রজাতির মশা, যারা ‘এডিস’ বা ‘টাইগার মসকিউটো’ নামে পরিচিত; ইয়েলো ফিভার, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং জাপানিজ এনসেফালাইটিস ভাইরাস বহন করে।

এডিস দ্বারা সংক্রমিত এ ভাইরাসগুলোর মধ্যে ইয়েলো ফিভার রোগটি ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত।

পশ্চিম আফ্রিকা থেকে উদ্ভূত এ রোগটি ক্রীতদাস ব্যবসার সঙ্গে আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ক্যারিবিয়ান এবং ক্রান্তীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ডেঙ্গু ভাইরাস সাধারণত ফুসকুড়ি ও উচ্চজ্বর তৈরি করে এবং এটি সাধারণত এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের জন্য প্রাণঘাতী অবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে ১ থেকে ৫ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে।

পৃথিবীর উষ্ণপ্রধান অঞ্চল মূলত এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার বেশির ভাগ অঞ্চল এবং আমেরিকার হাওয়াই, ফ্লোরিডা, পুয়ের্তোরিকো ও উপসাগরীয় উপকূলীয় রাজ্যগুলোয় ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণের সাধারণ লক্ষণ হল- জ্বর, জয়েন্ট ব্যথা, মাথাব্যথা, পেশিব্যথা, জয়েন্ট ফোলা বা ফুসকুড়ি। আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে সম্প্রতি এটি মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে।

২০১৩ সালের শেষের দিকে আমেরিকার ক্যারিবিয়ান দ্বীপে প্রথমবারের মতো চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। এটি সাধারণত এক সপ্তাহের জন্য স্থায়ী হয় এবং বেশির ভাগ মানুষ কোনো সমস্যা ছাড়াই ভালো হয়ে যায়।

জিকা ভাইরাস যদিও প্রথমে মোটামুটি নিরীহ হিসেবে বিবেচিত ছিল; কিন্তু ২০১৬ সালের পর ব্রাজিলে জিকা ভাইরাস আক্রান্ত মায়েরা মস্তিষ্কের জন্মগত ত্রুটি মাইক্রোসেফালি নিয়ে শিশুর জন্ম দেয়া শুরু করে, তখন থেকে জিকা ভাইরাস মানুষের চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, মশা প্রাণীদের চিনতে পারে কীভাবে? গবেষণায় দেখা যায়, প্রাণীদেহ থেকে বের হওয়া কার্বনডাই অক্সাইড, গন্ধ, তাপমাত্রা ও চলাচল মশাকে মানুষ বা কোনো প্রাণীকে টার্গেট করতে সহায়তা করে।

মজার বিষয় হল, শুধু স্ত্রী মশার মুখের অংশটি এমনভাবে তৈরি যে, শুধু তারাই প্রাণীদেহ থেকে রক্ত টানতে পারে। পুরুষ মশার মুখমণ্ডল এমনভাবে তৈরি- সে শুধু উদ্ভিজ উৎস থেকে রস সংগ্রহ করতে পারে।

রক্ত চুষতে মহিলা মশা তাদের প্রোবোসিস প্রাণীদের ত্বকে প্রবেশ করায়, যাতে থাকে দুটি নল; এর একটি দিয়ে এনজাইম ইনজেকশন দেয়, যা রক্ত জমাট বাঁধায় বাধা দেয় এবং অন্যটি দিয়ে নিজ শরীরে রক্ত টেনে নেয়।

এ রক্ত কিন্তু তারা তাদের নিজস্ব পুষ্টির জন্য ব্যবহার করে না; বরং বংশবিস্তারের জন্য ডিম তৈরিতে প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। নিজেদের খাবারের জন্য পুরুষ ও মহিলা উভয়েই উদ্ভিদের শর্করার ওপর নির্ভরশীল।

তাহলে এ প্রাণীটি তৈরির কী দরকার ছিল প্রকৃতিতে? আসলে আপনার বাগানের মশা হল পাখি, বাদুড়, ড্রাগনফ্লাইস ও ব্যাঙসহ কয়েক হাজার প্রাণীর খাদ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস।

শুনে দুঃখ পাবেন না, বেশির ভাগ মশারই মানুষ প্রথম পছন্দ নয়; তাদের পছন্দ গবাদিপশু ও পাখি; বিপদে পড়লে বা সুযোগ পেলে তারা আপনাকে খাদ্যের উৎস বানায়। মশার জীবনচক্র শেষ করার জন্য রক্তগ্রহণ অপরিহার্য।

এর জীবনচক্রে চারটি দশা পাওয়া যায়- ডিম, লার্ভা, পিউপা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা। একটি সম্পূর্ণ চক্রের জন্য প্রায় দুই সপ্তাহ প্রয়োজন, যা তাপমাত্রা এবং পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। একটি স্ত্রী মশার জীবনকাল সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ এবং এ সময়ে সে তিন থেকে পাঁচ ব্যাচ ডিম দেয়।

রক্ত গ্রহণের পর স্ত্রী মশা জমানো পানির ওপরে ডিম দেয়। মশারা এক জায়গায় ডিম না পেড়ে বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করে তার বংশধরদের বেঁচে থাকাটা নিশ্চিত করতে চায়।

পানির তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে মশার ডিমগুলো দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে লার্ভাতে পরিণত হয়; যদিও কিছু ডিমের ৬ মাস বিলম্বেও ফোটার ক্ষমতা রয়েছে। এভাবে লার্ভা থেকে পিউপা হয়ে এক সময় পূর্ণাঙ্গ মশায় পরিণত হতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় নেয়।

সব মশা কিন্তু সব ভাইরাস বহন করতে পারে না। এখানেই আসে ভেক্টরের যোগ্যতার প্রশ্ন। সব রক্তচোষা মশা রক্ত খেলেও শুধু নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাস মশা অন্ত্রের এপিথেলিয়াল কোষগুলোকে সংক্রমিত করতে পারে এবং সেখানে নতুন ভাইরাস তৈরি করতে পারে।

এজন্যই আমরা শুধু এডিস মশা দ্বারা ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া ভাইরাস ছড়াতে দেখি, অন্য মশা দ্বারা নয়। মশার অন্ত্রে উৎপাদিত নতুন ভাইরাস সেখান থেকে বের হয়ে মশার লালাগ্রন্থি ও ডিম্বাশয়গুলোকে সংক্রমিত করে, যা পরবর্তী সময়ে মশার লালার মাধ্যমে অন্য সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে সংক্রমণ ঘটায় বা আক্রান্ত ডিম্বাশয় থেকে পরবর্তী সময়ে নতুন মশার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।

এডিস মশা বিশ্বজুড়ে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বাস করে; প্রধানত ৩৫ ডিগ্রি উত্তর এবং ৩৫ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে, যেখানে শীতের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি ঠাণ্ডা হয় না।

যদিও কিছু মশা এ অক্ষাংশগুলোর আরও উত্তর বা দক্ষিণে ভ্রমণ করতে পারে, তবে তারা শীতে বাঁচতে অক্ষম। যেহেতু এডিস মশার উষ্ণ জলবায়ু প্রয়োজন, তাই তারা সাধারণত ১ হাজার মিটার উচ্চতার উপরে বাস করতে পারে না; যেখানে তাপমাত্রা বেশি শীতল।

এ মশা মানুষের বসবাসের জায়গার সঙ্গে যুক্ত। তারা সাধারণত তাদের পুরো জীবন বিভিন্ন স্থাপনা ও এর আশপাশে কাটায়, যেখানে ডিম ফোটানো সহজ।

জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি অনেক প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে গেলেও কিছু কিছু প্রজাতির মশা দিনকে দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। সব মশার বংশবৃদ্ধির জন্য পানি প্রয়োজন; তাই এর নির্মূলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি সাধারণত জমে থাকা স্থায়ী পানির উৎসগুলো অপসারণ বা কীটনাশক স্প্রে করা হয়ে থাকে।

তবে মশার বিস্তার রোধে এসব চেষ্টা খুব কম প্রভাব ফেলছে এবং অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সম্ভবত তাদের সংখ্যা ও পরিধি আরও বাড়বে। সম্প্রতি ন্যাচার মাইক্রোবায়োলজিতে প্রকাশিত এক বিজ্ঞান গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, অবস্থার কোনো উন্নতির সম্ভাবনা তো নেই-ই; বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

পরিসংখ্যানগত ম্যাপিংয়ের কৌশল ব্যবহার করে ওই গবেষকরা মডেল করে দেখিয়েছেন, কীভাবে দুটি রোগ বহনকারী এডিস প্রজাতির মশা- এডিস এজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবপিকটাস গত ৩০ বছরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারা পরবর্তী ৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী কিভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

গবেষকদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, এ প্রজাতির মশা- যারা জিকা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ইয়েলো ফিভার ভাইরাস বহন করে, আগামীতে তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশির ভাগ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে এবং লাখ লাখ মানুষকে এ রোগে আক্রান্ত করবে।

সমীক্ষার পূর্বাভাসে দেখা যায়, এডিস এজিপ্টি মশা ২০৫০ সালের মধ্যে আনুমানিক ১৯.৯৬ মিলিয়ন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তার লাভ করবে। ফলে বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মশাবাহিত ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

মশাবাহিত এ রোগগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি হল, ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক তৈরি; আর অন্যটি হচ্ছে মশা নিধন। অতীতে সবসময়ই ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন তৈরির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

১৯৩৬ সালে ম্যাক্স থেইলর ইয়েলো ফিভার ভ্যাকসিন তৈরি করে নোবেল পুরস্কার পান। এরপর থেকে ইয়েলো ফিভারের প্রকোপ কমে এলেও সম্প্রতি আবার এর প্রাদুর্ভাবের খবর আসছে আফ্রিকার অনেক দেশ থেকে।

পাশাপাশি যদিও ধরে নেয়া হয়েছে, এশিয়ার এডিস মশারা ইয়েলো ফিভার ভাইরাস ছড়াতে পারে না; তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, অচিরেই ইয়েলো ফিভার ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম এমন এডিস মশা এশিয়াজুড়ে বিস্তার লাভ করবে এবং এর ফলে মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হবে।

সাইফ উল্লাহ মুন্সী : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ভাইরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×