হংকংয়ে গণবিক্ষোভের শেষ কোথায়?

  এডিথ টেরি ২২ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘হংকংকে মুক্ত করা আমাদের সময়ের বিপ্লব’- স্লোগানটি হংকং সরকার এবং একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অনুগতদের জন্য লালকার্ডের মতো কাজ করছে। এটি ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করেছিলেন অধিকারকর্মী এডওয়ার্ড লিউং তিন-কেই, যিনি ২০১৬ সালের সহিংস মং কক প্রতিবাদে অংশগ্রহণের কারণে বর্তমানে কারান্তরীণ। ওই সময় নতুন চন্দ্রবর্ষ উদযাপনের উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া হকারদের ছত্রভঙ্গ করতে চেষ্টারত পুলিশের প্রতি গণতন্ত্রপন্থী কর্মীরা ফুটপাতের পাথর ভেঙে নিক্ষেপ করে। মং কক প্রতিবাদ সাধারণভাবে অবৈধ হলেও সেটি সহ্য করা হয়ে থাকে।

হংকংয়ের হলুদ-হেলমেটধারী প্রতিবাদকারীরা চক্রাকারে সহিংসতা শুরু করায় ওই একরাতের সহিংসতা এখন দেড় মাসের বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে এবং ১৩ আগস্ট শেষ রাতের দিকে মূল চীনের দুই ব্যক্তিকে হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হয়রানি করার পর ওই বিক্ষোভ শীর্ষবিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছে।

বর্বর কাজটি সংঘটিত হয়েছে ডিপারচার হলের উপরতলায়, যেখানে প্রতিবাদকারীরা চেক-ইনে থাকা যাত্রীদের অনেক ঘণ্টা আটকে রাখে। এর মধ্য দিয়ে নিচতলার অ্যারাইভাল হলে শত শত প্রতিবাদকারীর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ম্লান হয়ে গেছে। অনুতাপে ভোগা প্রতিবাদকারীরা পরে ভ্রমণকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছে ‘অত্যন্ত দুঃখিত’ এবং বেপরোয়া থাকার কারণে ‘ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে’ লেখা প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরে।

স্পষ্টতই নেতাহীন বজ কঠিন প্রতিবাদ আন্দোলনটি পর্যবেক্ষণকারীদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ক্ষতি করেছে; আন্দোলনকারীদের প্রত্যাশার বিষয়টি না হয় বাদই দিলাম। ওইসব লোক যারা বিশ্বাস করেন যে, এটি এমন একটি লড়াই যা কিনা চীনকে পরিবর্তন করে দিতে পারে, তারা প্রতিবাদকারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে যারা বিশ্বাস করেন, প্রতিবাদকারীরা হংকংকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন, তারা তাদের জেলে পুরতে প্রস্তুত। যদি মূল চীনের পুলিশ তেমনটি চায় তবে তারা সেটিই করতে দিতে রাজি।

সুতরাং এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ কি আছে? এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের কোনো ঘাটতি নেই এবং এমন গ্রুপেরও ঘাটতি নেই, যারা সমাধান বের করার জন্য ব্রেইনের ঝড় বইয়ে দিচ্ছেন। এতে আছে হংকংয়ের স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত কমিটি থেকে নগর পরিকল্পনাবিদ, ব্যাংকার, আইনজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত পণ্ডিত গ্রুপ, যারা এই পত্রিকা ও অন্যগুলোর মাধ্যমে নিজেদের মতামতের প্রবন্ধ প্রকাশ করে যাচ্ছেন।

এদের কেউই নিজেদের প্রস্তাব নিয়ে জনগণের সঙ্গে যুক্ত হতে এগিয়ে আসেননি খুবই সাধারণ একটি কারণে- তা হল এই বিশৃঙ্খলার তিনটি সক্রিয় পক্ষ থাকা। একটি পক্ষ প্রতিবাদকারীরা, অন্যপক্ষ হংকং সরকার এবং তৃতীয় পক্ষটি হল চীনের কেন্দ্রীয় সরকার।

যেভাবে একটি বক্তব্যে প্রতিবাদের সমাপ্তি টানতে পারেন ক্যারি ল্যাম : এই তিনটি পক্ষের প্রতিটিই এমন অনমনীয় যে, অন্যকে অবশ্যই পরিবর্তন হতে হবে। হংকং সরকারের অনমনীয়তা প্রতিবাদকারীদের উসকে দিতে সহায়তা করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, হংকং সরকারের উচিত পুলিশি বা সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্যতার ক্ষেত্রে হংকং সরকারের সহায়তা চাওয়া।

যদিও আন্তর্জাতিক সমর্থন পক্ষে যেতে পারে, তারপরও ব্রিটিশ সরকারের কপটতাকে অন্তত সহজভাবেই অভিযুক্ত করা যেতে পারে। কারণ ১৯৬৭ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লব-প্রভাবান্বিত দাঙ্গায় বোমা হামলা, ৫১ জনের প্রাণহানি ও বহু গ্রেফতারের সময় ব্রিটিশ সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল এবং পুলিশের জন্য সামরিক সহায়তা নিয়ে হাজির হয়েছিল।

অনেকে এমন পরামর্শদাতা হতে পারেন যাতে যৌক্তিকভাবে হংকং সরকারকে দেখা হবে অচলাবস্থা নিরসনকারী হিসেবে, কারণ এর হাতেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি কার্ড। মুখ্যসচিব ম্যাথিউ চেউং কিন-চাংকে কমিউনিটি থেকে প্রস্তাবনা গ্রহণের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আমি চিনি এমন কেউই এ সংক্রান্ত কোনো কিছু শোনেনি।

আমরা যদি ভিন্ন একটি নির্দেশনার দিকে সাময়িক সময়ের জন্য তাকাই তাহলে কেমন হয়- সেটি হল প্রতিবাদকারীদের দিকেই দৃষ্টি দেয়া। তারা নিজেরা প্রতিবাদ করে যাচ্ছেন অনুরাগের সঙ্গে হংকংয়ের ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য, অবশ্যই তা বর্তমানের ওপর হতাশা থেকে। তাদের স্লোগানটি যদিও ইংরেজিতে স্পষ্টত বোঝা যায়, চীনা ভাষায় এর মধ্যে অনেক দ্ব্যর্থতা রয়েছে।

‘লিবারেট’ বা মুক্ত করা অথবা চীনা ভাষায় ‘গুয়োং ফক’ শব্দটির অনুবাদ ‘পুনরুদ্ধার করা’ও হতে পারে। প্রতিবাদকারীরা তাদের নেতাহীন ঘোষণা করেছেন, যারা নিজেদের লিহকগ ও টেলিগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে সংঘবদ্ধ করছে। যদি প্রতিবাদকারীরা হংকংয়ের ভারসাম্যের বোধ ‘পুনরুদ্ধারের’ পদক্ষেপ গ্রহণ করে কমিউনিটি, বাণিজ্যিক সম্প্রদায় ও সরকারের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণের মাধ্যমে; যেখানে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকবে- তাহলে কী ঘটতে পারে?

তেমনটি করার জন্য প্রতিবাদকারীদের তিনটি জিনিস করার দরকার হবে- এক. নিজেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান দাবি এক/দুটিতে নামিয়ে আনা এবং এস্টাবলিশমেন্টের প্রতিনিধিত্বকারীদের কাছ থেকে তাদের দাবিকে সমর্থন দেয়া হবে মর্মে প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে একমত হওয়া। দুই. একটি নেতৃত্ব পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা এবং তিন. অন্যদের তাদের সঙ্গে বসে আইডিয়া বিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো। উল্লেখ্য, মূল পাঁচটি দাবির মধ্যে রয়েছে- বিল প্রত্যাহার করা, ১২ জুনের প্রতিবাদকে দাঙ্গার তকমা দেয়ার চিন্তা পরিহার করা, গ্রেফতারকৃত সব প্রতিবাদকারীর নিঃশর্ত মুক্তি, পুলিশের আচরণ তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন এবং বৈশ্বিক ভোটাধিকার।

প্রতিবাদকারীদের আইডিয়া শেয়ারের সুযোগ দেয়া : এর মাধ্যমে প্রপীড়িত নগরীটির ক্ষমতায়ন করা যেতে পারে। চুক্তিতে এমন স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে যে, এমন প্রতিবাদকারী থাকতে পারে যারা নিয়মিত প্রতিবাদের চেষ্টা চালিয়ে যেত পারবে। এমনকি দাবি পূরণ করা না হলেও সেগুলোকে সমর্থন দেয়ার বিষয়টি থাকবে। চুক্তির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, এমনকি যদি সরকার বড় ধরনের টাউন হলে যোগ দিতে অস্বীকার করে, তাহলে সেটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও হতে পারে।

পাঁচ দফা দাবির বাইরে একটি মিটিং আলোচনার টেবিলে অনেক প্রস্তাবের মধ্য থেকে কিছু নিয়ে আসার কাজও করতে পারে, যা তৈরি করা হয়েছে এমন শত শত সমস্যা সমাধানের জন্য, যেগুলো হংকংয়ের স্পর্শকাতর, শিক্ষিত ও ভালো বোধসম্পন্ন তরুণদের এই পয়েন্টে হতাশ করছে যে, কেউ তাদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। আমার নিজস্ব একটি চিন্তা রয়েছে, যা আমি শেয়ার করতে চাই। প্রতিবাদকারীদের নিজেদের আইডিয়া শেয়ারের সুযোগ দেয়ার প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রপীড়িত এ নগরীটির ক্ষমতায়ন করা যেতে পারে, তাদের কর্মশক্তি হালকা করার এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুরাগ খোঁজার পথ দুর্বল করার মাধ্যমে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

এডিথ টেরি : হংকংয়ের লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×