জন্মাষ্টমী

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এক যুগান্তকারী ঘটনা

  তারাপদ আচার্য্য ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভগবান

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার জন্ম সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, তার জন্ম সাধারণ মানুষের মতো নয় এবং তার মৃত্যুও সাধারণ মানুষের মতো নয়। তিনি বলেছেন, মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং মারা যায়; কিন্তু আমি জন্মরহিত হয়েও আবির্ভূত হই এবং অবিনশ্বর হয়েও অন্তর্ধান করে থাকি। আবির্ভূত হওয়া এবং অন্তর্হিত হওয়া- দুটিই আমার অলৌকিক লীলা।

শ্রীকৃষ্ণের অন্যসব লীলার মতো তার জন্মলীলাতেও সুগভীর আধ্যাত্ম তত্ত্ব আছে, যা অনুশীলন করলে প্রত্যেকের মধ্যেই ভগবানের জন্ম সম্ভব। বাহ্য জন্ম যেমন সত্য, তার চেয়েও অধিকতর সত্য আধ্যাত্ম জন্ম। সাধক ভক্তের হৃদয়ে ভগবানের আধ্যাত্ম জন্ম হয়।

দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রোহিণী নক্ষত্রে বাসুদেব-দেবকীর কোলে কংসের কারাগারে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীকৃষ্ণ। অষ্টমী তিথিতে দেবকীর অষ্টম গর্ভে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে এই জন্মতিথির নাম জন্মাষ্টমী তিথি। শ্রীকৃষ্ণ কংসের কারাগারে যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন দুরাচারী কংসের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সবাই।

ভগবানের জন্মক্ষণে কোনো আনন্দ হয়নি, কোনো মাঙ্গলিক কাজ হয়নি! চারদিকে ভয়, আশঙ্কা- তাকে হত্যা করে ফেলার যড়যন্ত্র। পৃথিবীকে পাপাভার, আশঙ্কা ও ত্রাসমুক্ত করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব।

শ্রীকৃষ্ণ জন্মের পর কীভাবে তাকে রক্ষা করতে হবে সে কথা বাসুদেবকে বলে দেন। তার কথামতো বাসুদেব সূতিকাগার থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। গোকুলে নন্দ এবং যশোদার সন্তানরূপে যিনি জন্মগ্রহণ করেন তিনি ভগবানের অন্তরঙ্গ শক্তি যোগমায়া। যোগমায়ার প্রভাবে কংসের প্রাসাদে প্রহরীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কারাগারের দরজা আপনা থেকেই খুলে যায়। সে রাত ছিল ঘোর অন্ধকার। কিন্তু যখন বাসুদেব তার শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে বাইরে আসেন তখন সবকিছু দিনের আলোর মতো দেখতে পান। আর ঠিক সেই সময় গভীর বজ্রনিনাদের সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়।

বাসুদেব যখন শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বৃষ্টির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তখন ভগবান শেষসর্প রূপ ধারণ করে বাসুদেবের মাথার উপরে ফণা বিস্তার করেন। বাসুদেব যমুনা তীরে এসে দেখেন যমুনার জল প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে ছুটে চলেছে। কিন্তু এই ভয়ংকর রূপ সত্ত্বেও যমুনা বাসুদেবকে যাওয়ার পথ করে দেয়।

এভাবে বাসুদেব যমুনা পার হয়ে অপর পাড়ে গোকুলে নন্দ মহারাজের ঘরে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি সব গোপ-গোপীকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেন। সেই সুযোগে তিনি নিঃশব্দে যশোদার ঘরে প্রবেশ করে শ্রীকৃষ্ণকে সেখানে রেখে যশোদার সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে নিয়ে কংসের কারাগারে ফিরে আসেন। নিঃশব্দে দেবকীর কোলে শিশুকন্যাটিকে রাখেন। তিনি নিজেকে নিজে শৃঙ্খলিত করেন যাতে কংস কিছুই বুঝতে না পারে।

বাসুদেব জীবাত্মা বা প্রাণ। বাসু মানে প্রাণ, দেব মানে অধিপতি। দশ প্রাণের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হচ্ছে প্রাণ- তাকে বলা হচ্ছে বাসুদেব। দেবকী দৈব প্রকৃতি- দৈবী শক্তি। প্রাণের সঙ্গে দৈবী শক্তির মিলন যদি সাধনায় ঘটে তখন সাধক চিত্তে ভগবানের আবির্ভাব ঘটে। বাসুদেব ও দেবকী শ্রেষ্ঠ সাধক ও সাধনার শক্তি। এ দুয়ের মিলনে ভগবানের জন্ম সম্ভব।

জন্ম হল কংসের কারাগারে। কামনার কারাগার হল কংসের কারাগার। হাজার কামনার পিঞ্জর এই দেহ। এই কংস কারাগার মথুরায় অবস্থিত। মথ্ ধাতু থেকে মথুরা শব্দের উৎপত্তি। মথ্ মানে মন্থন করা। কামক্রোধাদি রিপুসমূহ অবিরত এই দেহকে মন্থন করে চলছে। অতএব এই দেহ মথুরা। এর অধিপতি কংস। সে কামনার অধিপতি।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ভাদ্র মাসে। এই মাস মঙ্গলকর হয়েছিল ভগবানের আবির্ভাবে বা মঙ্গলকর মাসে মঙ্গলময়ের আবির্ভাব।

আবির্ভাব কৃষ্ণপক্ষে অষ্টমী তিথিতে। কৃষ্ণপক্ষ চন্দ্রের ক্রমক্ষীয়মাণ অবস্থা। শাস্ত্রে মনকে চন্দ্র বলা হয়েছে। চন্দ্রের যেমন হ্রাস-বৃদ্ধি হয়, মনেরও তেমন হয়। মন ইন্দ্রিয়ের রাজা। মন যতক্ষণ প্রবল থাকে ততক্ষণ চিত্ত চঞ্চল থাকে। কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মনশ্চন্দ্র অর্ধেক ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায়। তখন চিত্তে ভগবদ আবির্ভাব সম্ভব।

ইড়া ভগবতী গঙ্গা পিঙ্গলা যমুনা নদী। পিঙ্গলা যমুনা। পিঙ্গলারূপী যমুনা নদীতীরে শ্রীকৃষ্ণের কত লীলা! দেবকীর অষ্টম গর্ভে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব। অষ্টভূতে, অষ্ট প্রকৃতিতে ব্রহ্মাণ্ড রচিত।

শ্রীকৃষ্ণের জন্ম রোহিণী নক্ষত্রে। রুহ্+ইন্ করে রোহিণী শব্দের উৎপত্তি। রুধহ অর্থ উৎপত্তি হওয়া। মন অনবরতই উৎপন্ন করে থাকে। উৎপত্তির মধ্যে শ্রেষ্ঠ উৎপত্তি ভগবদুৎপত্তি। উৎপত্তি করে বলে মনরূপী চন্দ্র রোহিণী বেশি সঙ্গ করে।

নবজাতক শ্রীকৃষ্ণকে কারাগার থেকে যমুনা পার হয়ে নন্দালয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায় সর্প ফণা বিস্তার করে আছে। এই সর্প হল সাধকের দেহস্থা জাগ্রতা কুলিনী শক্তি। সাধক সাধনার এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে করে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত উত্থিত করেন।

ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি- এক কথায় সর্ববিধ জীবনাচরণের ক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী যুগান্তকারী ঘটনা। নিরাকার পরব্রহ্ম ভগবানের সাকার রক্তমাংসের দেহধারী প্রকাশ সুগভীর তাৎপর্য ও গুরুত্ব বহন করে। আধিভৌতিক, আদিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক জগতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব নানা দৃষ্টিকোণ থেকে অনুধ্যানের দাবি রাখে।

বহু বিচিত্রভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার যোগ্যতা এবং বহু বিচিত্রভাবে অনুধ্যাত হওয়ার ক্ষমতা থেকেও প্রমাণিত হয়- এ জীবন মহাজীবন। যুগে যুগে কত ধ্যানী ঋষি ধর্মের বিচিত্র সূত্রে, কত দার্শনিক, কত সমাজতত্ত্ববিদ, কত রাজনীতিবিদ, কত কবি, শিল্পী নিজ নিজ চিন্তাভঙ্গির মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও কর্ম এবং লীল অনুধ্যান ও আস্বাদন করেছেন তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। চিন্তা ও মননের জগতে শ্রীকৃষ্ণ বহু বর্ণিল এক চরিত্র।

তারাপদ আচার্য্য : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×