রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নাটক

  করীম রেজা ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা ক্যাম্প

অভিজ্ঞতার আলোকে আগেই ধারণা করা গিয়েছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন গত নভেম্বরের মতোই এবারও অসফল হবে। রোহিঙ্গারা পাঁচ দফা দাবি পূরণের নিশ্চয়তা না পেলে কোনোভাবেই ফিরে যাবে না জানিয়েছে। আগেও একই রকম দাবি পূরণ না হওয়ায় কেউই ফেরত যায়নি।

প্রত্যাবাসন না হওয়ায় ইউএনএইচসিআর রাখাইনের অভ্যন্তরে অধিকতর সুযোগ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ জানিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের বর্তমানে প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি চীন সফর করেছেন। আশা করা গিয়েছিল এ সফরের পর চীন সুস্পষ্টভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোরালো ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে কূটনৈতিকভাবে তৎপর হবে। কিন্তু চীন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মৌখিক আশ্বাসের সীমা অতিক্রম করেনি।

কাকতালীয়ভাবে এ সময়েই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শুধু কাশ্মীর বিষয়ে অবহিত করা কিংবা নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছানোই মোদ্দকথা নয়। বাংলাদেশে আসার আগে তিনি চীন সফর করেছেন। এখান থেকে যাবেন নেপাল।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রোহিঙ্গা প্রশ্নে প্রায় নীরব। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রশ্নে মানবিক সূচকে জগদ্বিখ্যাত হলেও পরিত্রাণের অঙ্গীকার আদায়ের কূটনীতিতে আশানুরূপ সফলতা পায়নি। পায়নি নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের কার্যকর সহযোগিতাও।

মনে করা হচ্ছে, আসন্ন জাতিসংঘ অধিবেশন সামনে রেখে চীন মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর জন্য এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের আগের অধিবেশনগুলোতে চীন মিয়ানমারের পক্ষে দুই-দুইবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। প্রয়োজনে এবারও তাই করবে।

তাছাড়া এর আগেও দেখা গেছে, মিয়ানমারের মুখ রক্ষার জন্য চীনের চাপে বাংলাদেশ অসম, অবাস্তব ও প্রয়োগঅযোগ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই মিয়ানমার সারা বিশ্বকে জানিয়েছে তারা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তরিক, তৎপর এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে।

এভাবে কৌশলে আন্তর্জাতিক সমাজের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়েছে। বরাবরের মতোই নানা ছলছুতোয় মিয়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান দূরের কথা, আরও জটিল করে তুলেছে। এবারও ব্যতিক্রম নয়।

উদ্দেশ্য একটাই- বিশ্ববাসীকে দেখানো তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আগ্রহী। যদিও গত নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর সম্পূর্ণ দায় ও দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর চাপাতে মিয়ানমার দ্বিধা করেনি। যে কোনো মূল্যে মিয়ানমার সমস্যাটি শুধু বাংলাদেশের তা প্রমাণের জন্য আন্তর্জাতিক সব রকম প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

এবার যথেষ্ট গোপনীয়তা এবং তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের ঘোষণা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারের বরাত দিয়ে রয়টার্স খবর পরিবেশন করেছে। ঘোষণার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ কিছুই জানত না। ঈদের ছুটির পর দেখা গেল বাংলাদেশ সরকারের অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রস্তুতির তোড়জোড়।

বলা হয়ে থাকে, নভেম্বরে আইওএম জড়িত হওয়ার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্ভব হয়নি। এবার আইওএম জড়িত নয়। তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে নিরুৎসাহিত করার ভূমিকায় অংশ নিয়েছিল। তাই এবার শুধু ইউএনএইচসিআরকে যুক্ত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের নির্বাচিত তালিকার ৩৫৪০ সদস্যের সাক্ষাৎকার গ্রহণেও তারা জড়িত। স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনে আগ্রহীদের যাচাই-বাছাই করতে এবার ইউএনএইচসিআরকে শুরু থেকেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রত্যাবাসনে যোগ্য ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি বলেই মনে করা হয়; বিষয়টি যত স্বচ্ছ হওয়া দরকার ছিল তত স্বচ্ছ নয়।

নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল সেখানে দেখা গেছে, অধিকাংশ হিন্দু পরিবার মিয়ানমার সরকার কর্তৃক তালিকাভুক্ত হয়েছে। ৩৫৪০ ব্যক্তির বাইরে ২৫ হাজার ব্যক্তির মধ্যে অবশিষ্টরা কী কী যুক্তিতে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার যোগ্য নয় কেউ এ প্রশ্ন তুলছে না।

সম্প্রতি আরও ৩০ হাজার নতুন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারকে দেয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা আশ্রিত। কোন পরিস্থিতিতে, কীভাবে তারা মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বিশ্ববাসী ভালোই জানে। তাহলে তারা সবাই কেন বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার যোগ্য নন।

বাংলাদেশ নিশ্চয়ই তার দেশের নাগরিকদের মিয়ানমারের নাগরিক সাজিয়ে রাখাইনে পাঠাবে না। এর পেছনে কোনো যুক্তিও নেই। তাহলে কী উদ্দেশ্যে, কী কৌশলে মিয়ানমার এ পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। অন্যান্য আচরণও বিশ্লেষণ করা জরুরি। সবকিছুর পেছনেই মিয়ানমারের কৌশল হচ্ছে যাতে এ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যায়।

গত বছর নভেম্বরে কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হয়নি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যেতে আগ্রহী ছিল না। অনেকেই শিবির ছেড়ে বাইরে কোথাও আত্মগোপন করেছিল প্রত্যাবাসন এড়ানোর উদ্দেশ্যে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল বিভিন্ন এনজিও তাদের ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করেছে।

এমনকি জাতিসংঘের অঙ্গ-সংগঠন ইউএনএইচসিআর কর্তৃপক্ষও তৎকালীন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে। যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সামগ্রিক নিরাপত্তার অভাব, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না করা, তাদের আগের আবাসভূমিতে ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন করা এবং সেখানে তাদের পুনর্বাসন না করা ইত্যাদি।

এবারে আইওএম জড়িত না হলেও বিভিন্ন এনজিও তাদের যেতে নিরুৎসাহিত করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিছুদিন আগে মিয়ানমারের সরকারি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছে।

মতবিনিময়কালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য ৫ দফা দাবি সুস্পষ্টভাবে পুনরুল্লেখ করেছে। সেসব শর্ত পূরণের অঙ্গীকার ছাড়াই প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে ফিরে যায়।

প্রত্যাবাসন শুরুর সবরকম প্রস্তুতি বাংলাদেশের ছিল। মিয়ানমার বরাবরের মতোই দাবি করেছে তারাও সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ফেরত যাওয়া লোকজনের বসবাসের শিবির প্রস্তুত রয়েছে। জানা যায়নি তাদের অবকাঠামো তৈরি হলেও বাকি ব্যবস্থাপনা কীভাবে, কাদের দ্বারা কতটুকু নিরাপদ। কারা সেই শিবির দেখভাল করবে।

মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ অথবা এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোর অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত হবে কিনা। শরণার্থীদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে এর তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা জড়িত থাকবে কিনা।

গত নভেম্বরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যেক রোহিঙ্গাকে তিন মাসের রসদপত্র দিয়ে মিয়ানমারে পাঠানোর প্রস্তুতি ছিল। ফিরে যাওয়ার পর রসদ সরবরাহের দায়িত্ব যদি বাংলাদেশের হাতেই থাকে তবে তা কেমন প্রত্যাবাসন, প্রশ্নটি সঙ্গতভাবেই উঠে আসে। মিয়ানমারকে বিশেষ ছাড় দেয়া কেন?

কেন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাধারণভাবে রাখাইনের অস্থির, প্রতিকূল, অনিরাপদ পরিবেশের কথা বলা হয়। কিছুদিন পরপর মিয়ানমার সূত্রে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জানা যায় রাখাইন অঞ্চলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে। সেখানে আতঙ্ক ও জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান। কারা এ অবস্থা সৃষ্টি করে তা রহস্যাবৃত।

তাছাড়া রাখাইনে অবস্থিত কিছু আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা সতর্কবার্তা পেয়ে থাকে। প্রকৃত পরিস্থিতি জানা না গেলেও বিভিন্ন উপায়ে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে রাখাইনে ফিরে যাওয়ার সাহস, সদিচ্ছা, আগ্রহ, আন্তরিকতা কোনোটাই রোহিঙ্গাদের মধ্যে দেখা যায় না। কয়েক বছর আগে যারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফেরত গিয়ে শিবিরে বসবাস করছে, আজ পর্যন্ত তারা নিজের বাড়িঘরে ফিরে যেতে পারেনি।

রেড ইন্ডিয়ানদের মতো এক ধরনের মানবেতর পরিবেশে শিবির-বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের পুনর্বাসন শিবিরে বাস করার চেয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ অধিকতর গ্রহণযোগ্য। কেননা রাখাইনে তাদের জীবনের ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে আবারও বাংলাদেশে পালাতে চায় না তারা।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, সব পক্ষই চাইছে যে কোনোভাবেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হোক। প্রতীকীভাবে কিছু লোকজন মিয়ানমারে ফেরত যাক। মিয়ানমারের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী দিনে অনধিক ৩০০ জন ফেরত যেতে পারবে।

এতে রোহিঙ্গাদের লাভ না হলেও এবং বাংলাদেশের ঘাড়ের বোঝা না নামলেও মিয়ানমারের আগাগোড়াই শতভাগ লাভ। আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে চীন-রাশিয়া-জাপান-ভারত-মিয়ানমার বড় গলায় বলতে পারবে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ সফল হয়েছে; যা হবে প্রকৃত সত্যের অপলাপ মাত্র।

করীম রেজা : কবি ও শিক্ষাবিদ

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×