তৃতীয় মত

মন্ত্রী মহোদয় ঠিক বলেননি

  আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় একটি প্রচলিত ধারা হল, রাজনীতিতে পরাজিত প্রতিপক্ষ বা শত্রুকেও কেউ বিদ্রূপ বা কটাক্ষ করে কথা বলেন না। বাংলাদেশে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী এবং দেশের মানুষের একটা বড় অংশের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও আপাতত তিনি পরাজিত। দুর্নীতির মামলায় তিনি পাঁচ বছরের জন্য জেলে গেছেন। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি অন্যায় করে থাকলে তার শাস্তি পেয়েছেন। তা নিয়ে কারও কটাক্ষ বা বিদ্রূপ করা উচিত নয়।

জনগণের সমর্থন থাকলে কোনো রাজনৈতিক নেতার স্থায়ী পরাজয় হয় না। কে বলতে পারে বিএনপি আবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসবে না, বা খালেদা জিয়া আবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন না? ভারতে বহু রাজনৈতিক নেতা এবং নেত্রী দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হয়ে পরে আবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন। গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হোতা বলে অভিযুক্ত ব্যক্তি, যাকে আমেরিকা পর্যন্ত তাদের দেশে যাওয়ার ভিসা দেয়নি, তিনি কি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নন এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তাকে তাদের দেশে সাদরে ডেকে নিয়ে গলাগলি করছেন না?

পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ শাসকদের দ্বারা গণতান্ত্রিক রাজনীতির এই সভ্য ধারাটি বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তা অনুকরণ করেছে। এখন সেই অনুকরণের প্রভাব অন্য কোনো কোনো দলের ওপরও পড়ছে। যিনি এককালে সর্বভারতীয় নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেই শেরেবাংলাকে পাকিস্তান আমলে শুধু গৃহবন্দি করা হয়নি, তাকে ‘ট্রেইটর’ আখ্যা দিয়ে বৃদ্ধ বয়সে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়েছে।

সিন্ধুর এককালের মুখ্যমন্ত্রী এমএ খুরোকে গ্রেফতার করে বিশাল মরুভূমিতে নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তিনি ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচেছিলেন। বিরোধী দলের নেতাদের সম্পর্কে মুসলিম লীগ শাসকদের ভাষা ছিল ‘শির কুচল দেঙ্গে’ অর্থাৎ ওদের মাথা ভেঙে দেব।

বর্তমানে খালেদা জিয়া তো কোনো রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে নয়, দুর্নীতির মামলায় আদালতের রায়ে জেলে গেছেন। কিন্তু একজন প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ডিভিশন, সম্মান ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কোনো দুর্নীতির মামলায় নয়, রাজনৈতিক কারণে বন্দি করে জেলে রাখা হয়েছিল। তখন তার ওপর নানা ধরনের নির্যাতন ছিল অসহনীয়। এমনকি তাকে জেলে পাগলা গারদের পাশে নিম্নমানের সেলে রেখে তার মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করার চক্রান্ত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি পড়লেও এ সম্পর্কে নানা বিবরণ জানা যাবে।

পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ শাসকরা যা করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসে তাদের অনুকরণে বিএনপি দেখিয়েছে, তারা মুসলিম লীগ শাসকদের চাইতেও এ ব্যাপারে এক কাঠি এগিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের প্রধান বেনিফিশারিও বিএনপি। বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও তার প্রতি বিএনপির রোষবহ্নি নির্বাপিত হয়নি, বিএনপি দাবি করে জিয়াউর রহমান এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর বিএনপির প্রধান কর্মসূচি হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হনন, জাতির পিতা হিসেবে তাকে অস্বীকার করা, এমনকি খালেদা জিয়ার পুত্রের একমাত্র কাজ লন্ডনে বসে বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হনন এবং ইতিহাস বিকৃতি।

জন্মের শুরু থেকেই বিএনপি বঙ্গবন্ধুর চরিত্র হত্যা শুরু করে। বিএনপির সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত আবদুস সালাম তালুকদার প্রকাশ্য জনসভায় বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানিরা লায়ালপুর জেলে রাজার হালে রেখেছিল। তাকে পাঁচ কোর্সের ব্রেকফাস্ট দেয়া হতো। তিনি যখন পশ্চিম পাকিস্তানে পাকিস্তানিদের রাজকীয় আতিথ্য ভোগ করছেন, তখন জিয়াউর রহমান বন্দুক হাতে বাংলার মাটিতে যুদ্ধ করছেন।’

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরও তাকে কটাক্ষ করে এ ধরনের মিথ্যা কথা প্রচারে বিএনপি নেতাদের বিবেকপীড়া হয়নি। ভাগ্যের কি পরিহাস, আজ যখন বেগম জিয়া দুর্নীতির দায়ে জেলে, তখন আওয়ামী লীগের কেউ নন, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি কারাগারে রানীর হালে আছেন।’ কারাগারে বেগম জিয়ার ডিভিশন লাভ, তার কক্ষে টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার দেয়া, ব্যক্তিগত পরিচারিকা নিয়োগ ইত্যাদি সম্পর্কে মেনন বলেছেন, ‘কারাগারে কেউ বাইরে থেকে ব্যক্তিগত পরিচারিকা পান এটা আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জানা নেই।’ তিনি কারাগারে বেগম জিয়ার কাছে বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটি কাউকে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তার মতে, তাহলে বুঝতে পারবেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনতে বঙ্গবন্ধুসহ রাজনৈতিক নেতাদের জেলে কী ধরনের জীবনযাপন করতে হয়েছে।

রাশেদ খান মেনন অসত্য কথা বলেননি। কিন্তু অপ্রিয় সত্য কথা কি সব সময় বলা যায়? মনীষীরা বলেন, বলা উচিত নয়। আর বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা বিএনপি-নেত্রীকে পাঠালেই তিনি তা পাঠ করবেন এবং উপকৃত হবেন তার নিশ্চয়তা কী? তার জন্মদিনে একবার সম্ভবত ব্যারিস্টার রফিকুল হক তাকে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা সমগ্র উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিএনপিরই এক নেতা রসিকতা করে কিনা জানি না, বলেছিলেন, ‘আমার নেত্রীর বই পড়ার সময় নেই, অভ্যাসও নেই। তিনি নিরন্তর দেশ সেবায় ব্যস্ত। তার বই পড়ার, তাও আবার সুকান্তর কবিতা পড়ার সময় ও আগ্রহ কোথায়?’

আমার কথা, বেগম খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। তিনি শাস্তিভোগ করছেন, এটাই যথেষ্ট। পরাজিত প্রতিপক্ষের সমালোচনা করা চলে, কিন্তু তাকে লক্ষ্য করে বিদ্রূপ ও কটাক্ষ করতে নেই। রাশেদ খান মেনন আমাদের দেশের একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা। তার কাছ থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাধারণ সৌজন্যবোধ আশা করেছিলাম।

পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুসহ রাজনৈতিক নেতাদের যেভাবে জেলে রাখা হয়েছিল, সেভাবে আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের জেলে রাখা হোক, এটা কারও কাম্য নয় এবং তা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য সুনাম বয়ে আনবে না। বেগম জিয়াকে জেলে মর্যাদার সঙ্গে রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদারতা এবং প্রতিপক্ষকে সমমর্যাদা দানের নীতি অনুসরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

যত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে জেলে রাখা হোক, বন্দিদশায় কেউ রাজার বা রানীর হালে থাকতে পারেন না। বেগম জিয়ার আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদকে জেলে সব রকম সুযোগ-সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্য দেয়া হয়েছিল। ছয় বছর সেই স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করেও তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। জেল জেলই। সেখানে রাজা বা রানীর হালে থাকা যায় না।

লন্ডন, ২৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, ২০১৮

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter