অস্বাভাবিকতাই এখন স্বাভাবিক!

  পবিত্র সরকার ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এনআরসি
এদের মধ্যে ক’জনের নাম আছে এনআরসিতে?

যখন চীনে ধুন্ধুমার বিপ্লব চলছিল তখন একজন সাধারণ কমরেড সর্বাধিনায়ক মাও দে জংকে খুব ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কমরেড, চারদিকে এ অশান্তি চলছে! কবে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলতে পারেন?’ মাও তার জবাবে বলেছিলেন, ‘কমরেড, কী বলছেন আপনি! বিপ্লবই তো সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা!’ এ কথা শুনে সেই কমরেড কী বলেছিলেন তার উল্লেখ নেই।

আমাদের? দেশ ভারতের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এখানেও এই রকম একটি ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা বহাল করার জন্য আমাদের শাসকরা বদ্ধপরিকর। না, বিপ্লব নয়। বিপ্লব তাদের চিন্তার ধারেকাছে নেই, তাদের অগ্রাধিকার মনে হয় খুব কিম্ভূত। তাদের লক্ষ্য মৌচাকে ঢিল ছোড়া এবং তারপর মজা দেখা। নইলে বুঝুন, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোটে জিতে শাসকরা দাপটের সঙ্গে দিল্লির মসনদ দখল করেছেন, সেখানে তো শান্তি আর উন্নয়নের মহাযজ্ঞ শুরু হওয়ার কথা। বিরোধী ব্যাটাদের ট্যাঁফোঁ করার রাস্তা নেই। এবার এমন ব্যবস্থা নেয়া শুরু হবে যে, চাষীরা আত্মহত্যা করবে না আর, সবাই পুষ্টিকর খাদ্য আর সুপেয় জল পাবে, সব ছেলেমেয়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাবে, সবাই সুচিকিৎসা পাবে, দেশের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ঝকঝক-তকতক করবে, কেউ রাস্তায় জলত্যাগ করতে বসবে বা দাঁড়াবে না, মাঠে মলত্যাগ করতে যাবে না, পান-জর্দা-গুটখা খেয়ে কেউ সিঁড়িতে পিক ফেলবে না, দ্রব্যমূল্য গরিবের আয়ত্তের মধ্যে থাকবে অর্থাৎ দেশের একটা সুখী-সুন্দর মুখ তৈরি করার জন্য শাসকরা নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এসব কাজে বিরোধীদের মুখ খোলার কোনো সুযোগ থাকবে না তা নয়, এসব জরুরি অগ্রাধিকার শিকেয় তুলে দিয়ে তারা খুঁচিয়ে ঘা করার প্রকল্পে মহা উৎসাহে নেমে পড়লেন।

ভারতের দুই প্রান্তে দুটি রাজ্য, কাশ্মীর আর আসাম। শাসকদের মনে হল, এই দুই রাজ্যে দুটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাসা বেঁধে আছে। একটিতে ৩৭০ ধারা, আরও কী কী সব ধারা, আর অন্যটিতে বহিরাগতরা। এবং এখুনি এই দুই রোগের চিকিৎসা না করলেই নয়। ওই ৩৭০ বা কাছাকাছি ধারা অরুণাচল-মেঘালয় ইত্যাদি রাজ্যেও আছে; কিন্তু কাশ্মীরের বেলায় সেটা যেন শাসকদের কাছে বেশি খচখচ করছিল। সেটা কী? না কাশ্মীরিদের অল্প খরচায় নানা জিনিসপত্র আর বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছিল আর সেখানে বহিরাগতরা জমি কেনার অধিকার পায়নি। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের পর কাশ্মীরের একটা অংশ যখন ভারতে আসে তখন ভারত সরকারই তাদের এই শর্ত বা সুবিধা দিয়েছিল। গণভোট থেকে তাদের মুখ ফেরানোর জন্য, কারণ গণভোটের ঝুঁকি ছিল।

আর আসামের অবস্থা প্রায় উলটো। আসামে একদিকে মধ্যবিত্ত লেখাপড়া জানা আর ব্যবসায়ী বাঙালি ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই সেখানে গিয়ে বসবাস ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, শুধু কাছাড়ে নয়, আসামের অন্যান্য অঞ্চলেও স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গ থেকে পরিশ্রমী চাষীরা গিয়ে আসামের মাটিতে সোনা ফলিয়েছে, মূলত অসমিয়াদেরই আমন্ত্রণে। উপযাচক হয়ে নয়। নিজ এলাকার সীমানা পেরিয়ে যারা সেখানে গেছে, ভাগ্যের সন্ধানে, নিশ্চয়ই এমন কেউ কেউ আছে। কিন্তু সে তো পৃথিবীর সব জায়গাতেই ঘটে থাকে। আমরা মুখে মার্শাল ম্যাকলুহানের ভাষা ধার করে বলি যে, পৃথিবীটা এখন একটা গ্রাম হয়ে গেছে; কিন্তু অন্যদিকে এই গ্রামের মধ্যে অজস্র বেড়া তুলতে ছাড়ি না। অসমিয়াদের আতঙ্ক দু’দিক থেকে। এক, মধ্যবিত্ত হিন্দু বাঙালি তাদের চাকরি-বাকরি আর মধ্যবিত্ত অর্থনীতিতে ভাগ বসাবে, আর চাষী মুসলমান বাঙালি তাদের ভূমিক্ষেত্রে এবং দু’পক্ষ মিলেই তাদের সংখ্যালঘু করে তুলবে। তার সঙ্গে বিজেপির মুসলমান আতঙ্কও যুক্ত হয়েছে, ভারতকে তারা হিন্দুর দেশ করতে চায়। আমরা শুনেছি এতে অবাঙালি ব্যবসায়ীদেরও বেশ প্ররোচনা ছিল বা আছে, কারণ ১৯৬১-র বঙ্গাল খেদাতেও অবাঙালি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তেমন আক্রমণ হয়নি।

তাই ভারতের এখনকার সরকার, তার গভীর প্রজ্ঞায়, স্থির করল যে, কাশ্মীরিদের আটকে রাখো তাদের সীমানায়, আর তাদের দীর্ঘদিনের অধিকার হরণ করো, আর অসমের ‘বহিরাগত’দের সীমানার বাইরে তাড়াও। কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্যরা দীর্ঘদিন ধরে প্রায় সামরিক শাসনই চালু রেখেছিল, এখন তো ভোটে নির্বাচিত সরকারকেও বাতিল করা হয়েছে। কার্ফিউ বসছে, উঠছে; কিন্তু কাশ্মীরের মানুষ এক অলিখিত বন্দিদশা ছাড়া আর কোনো অবস্থার স্বাদ পাচ্ছে না। ইন্টারনেট, মোবাইল পরিষেবা বন্ধ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, বা নামে খোলা থাকলেও সেখানে ছাত্রছাত্রী নেই। রাস্তাঘাট সুনসান, ডাল লেকে আর অন্যত্র পর্যটক যাচ্ছে না, হোটেলগুলোর ব্যবসা ধুঁকছে। পুলিশ প্রতিবাদীদের পেলেট ছুড়ছে, ঢিলপাটকেল খাচ্ছে, তার বদলে মৃত্যু উপহার দিচ্ছে। কাশ্মীরিদের মত না নিয়েই তাদের রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে লে লাডাকের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে তাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়ে গেল, যাতে তার ওপর সামরিক নজর আরও বেশি থাকে। নির্বাচিত সরকার, মন্ত্রী এমনকি বিরোধী নেতাদের গৃহবন্দি করা হল বিনা অজুহাতে। তাই নিয়ে সঙ্গতভাবেই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, কিন্তু সেসব তোয়াক্কা কে করে? প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একের পর এক সোনালি প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন কাশ্মীরে শিল্প হবে, হাজার হাজার চাকরি হবে, নতুন নতুন ব্যবসা আসবে, প্রতি গ্রামের পাঁচজন সেনাবাহিনীতে চাকরি পাবে- প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটছে। ওদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নানা নিগ্রহের খবর ছাপছে, দেখাচ্ছে গণতন্ত্রের ব্যবস্থার সঙ্গে যার কোনো সঙ্গতি নেই। তাই সমস্যা সমাধানের দিগন্ত কাছেপিঠে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

আসামেও তাই। আগে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) থেকে বাদ পড়েছিল ৪০ লাখ, এখন মাজাঘষা করে দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ। তাতে বাদ পড়া মানুষ দলে দলে আত্মহত্যা করছে, তার দায় শাসকরা বহন করবে কি? শুধু তাই নয়, হাস্যকর সব বর্জনের নমুনা এ তালিকাতেই দাঁত খিঁচিয়ে আছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলী আহমদের আত্মীয়রা বাদ পড়েছেন, ভারতীয় সৈন্য দলের প্রবীণ সেনানী বাদ পড়েছেন, মন্ত্রীর আত্মীয় বাদ পড়েছেন। আগের বারের তালিকায় অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের নাম বাদ গিয়েছিল বলে শুনেছি। এ কি তালিকা না প্রহসন! দু’বারের তালিকাতেই এ ধরনের অক্ষমণীয় অসঙ্গতি আছে। যারা এগুলো তৈরি করেছেন তাদের যোগ্যতা আর শিক্ষা সম্পর্কে প্রশ্ন জাগে। তারা কি দলীয় কর্মী, কিছু পাইয়ে দেয়ার জন্য তাদের নিয়োগ করা হয়েছে? তারা কি অনুসন্ধান করে এ তালিকা তৈরি করে, নাকি দলের মতলববাজরা তাদের কানে উড়ো কথা তুলে দেয়?

তালিকা কমসম করে যাই দাঁড়াক, যাদের নাম বাদ পড়বে তারা কোথায় যাবে? বাংলাদেশ তাদের নেবে না বলেই দিয়েছে। তাই তো স্বাভাবিক। রোহিঙ্গাদের নিয়ে তারা জেরবার। তবু রোহিঙ্গারা- ধরা যাক, সাময়িকভাবে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। এদের কী গতি হবে? এই গভীর মানবিক প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। আমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘বোট পিপ্ল’দের কথা মনে আসছে, মনে ভাসছে ইরাক ও মধ্য এশিয়ার অন্যান্য শরণার্থীর কথা। সমুদ্রের তীরে তিন বছরের শিশু আয়লানের মৃতদেহটার ছবি আবার বুকে এসে আঘাত করছে। কী আছে এদের ভবিতব্যে?

আমার ভারতের বর্তমান শাসকদের জন্য একটু সহানুভূতিই হচ্ছে। আর সব ছেড়ে তারা এমন দুই ভিমরুলের চাকে নাড়া দিয়েছেন, যাতে তাদের নিজেদেরও সমূহ বিপদে পড়ার আশঙ্কা। তারা হয়তো ভাবছেন সংসদে আমরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমাদের হাতে এতগুলো রাজ্য, তাই আমাদের ছোঁয়া কার সাধ্য? জানি না কতদিন তারা এ আরামদায়ক আত্মপ্রসাদে ভেসে থাকতে পারবেন।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×