প্রতিটি আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিচ্ছি আপনি-আমিও

  ডা. জাহেদ উর রহমান ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একজন খুব বিখ্যাত সাহিত্যিক এবং কলামিস্টের ‘আত্মহত্যার মিছিল’ শিরোনামের একটা কলাম প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে কিছু কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করায় সেই কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের জীবনে যে ভয়াবহ দুর্ভোগ নেমে এসেছিল সেই বিষয়ে লেখা কলামটি।
ফাইল ছবি

একজন খুব বিখ্যাত সাহিত্যিক এবং কলামিস্টের ‘আত্মহত্যার মিছিল’ শিরোনামের একটা কলাম প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে কিছু কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করায় সেই কলেজগুলোর শিক্ষার্থীদের জীবনে যে ভয়াবহ দুর্ভোগ নেমে এসেছিল সেই বিষয়ে লেখা কলামটি।

সেই কলামের একটা বাক্য এরকম ‘এই দেশের ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়ার পরও আমরা কেমন করে আমাদের দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছি?’ এ মন্তব্য থেকে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি- এমন কিছু পরিস্থিতি আছে যখন মানুষকে আত্মহত্যা করতে হয়।

তাহলে প্রশ্ন আসে আত্মহত্যা অনিবার্য হয়, আসলেই কি এমন কোনো পরিস্থিতি আছে?

বাংলাদেশে প্রতিবছর ১১ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। মানে প্রতিদিন ৩০ জনের বেশি। সংখ্যাটা নিশ্চিতভাবেই প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে অনেক কম, কারণ হত্যার ঘটনায় মানুষ পুলিশের কাছে গেলেও আত্মহত্যার অনেক ঘটনা পুলিশের কাছ পর্যন্ত আসে না। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যার বৈশ্বিক হারের (প্রতি লাখে ১০ জন) তুলনায় বাংলাদেশের আত্মহত্যার হার কম, (প্রতি লাখে ৬.৫ জনের বেশি)। কিন্তু আমাদের জন্য আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, প্রতিবছর বৈশ্বিক আত্মহত্যার হার ক্রমান্বয়ে যখন কমে আসছে, আমাদের আত্মহত্যার হার বাড়ছে।

আত্মহত্যার সংখ্যা কেন বাড়ছে, কীভাবে সেটা কমিয়ে আনা যায়, সেসব নিয়ে মনোবৈজ্ঞানিক, সমাজতাত্ত্বিক নানা দিক থেকে আলোচনা করাই যায়। দুঃখজনক ব্যাপার হল, সেই আলোচনা আমাদের সমাজে খুব কমই হয়। অবশ্য সেই আলোচনা করার জন্য আজকের এ কলামটি লিখছি না। এ কলামে একটা ভিন্ন দিক আছে।

আমরা যে ভাষায় মিডিয়ায় আত্মহত্যার খবর দেই, কিংবা যে ভাষায় আমরা নিজেদের মধ্যে কারও আত্মহত্যা নিয়ে আলোচনা করি, আত্মহত্যাকে আমরা আমাদের সাহিত্যে, শিল্পে, সিনেমায় যেভাবে দেখানোর চেষ্টা করি, সেটার দিকে কি আমরা কখনও ন্যূনতম মনোযোগ দিয়েছি? আমরা হয়তো খেয়ালই করি না প্রতিটি সংবাদে, কিংবা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আমরা আত্মহত্যাকে এক ধরনের যৌক্তিকতা দিয়ে দেই আমাদের অজান্তেই।

বখাটের অত্যাচারে স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা, লজ্জায় ধর্ষিতার আত্মহত্যা, দাম্পত্য কলহের জের ধরে চট্টগ্রামে চিকিৎসকের আত্মহত্যা, বিচ্ছেদ, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রেমিকের আত্মহত্যা, দারিদ্র্য সইতে না পেরে আত্মহত্যা, নীলফামারীতে মাস্টার্স পাস বেকার যুবকের আত্মহত্যা, ঋণের বোঝা সইতে না পেরে গৃহবধূর আত্মহত্যা, সরকারি চাকরির বয়স শেষ হওয়ায় যুবকের আত্মহত্যা- এগুলো এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকের আত্মহত্যার খবরের শিরোনাম।

আত্মহত্যা, বাংলাদেশ এসব ট্যাগ দিয়ে গুগলে সার্চ করলেই দেখা যাবে আমাদের প্রতিটি সংবাদের বিস্তারিত এবং হেডলাইনের একটা বিশেষ ধারণা আছে। প্রতিটি সংবাদে এটি যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, যেই মানুষটা আত্মহত্যা করেছে সে কত কষ্টে ছিল এবং সেই কষ্টের কারণে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

কলামটির শিরোনাম এবং তার ভেতরের বক্তব্যে একই ধরনের কথাই রয়েছে।

আমরা নিজেরাও যখন জাতীয়ভাবে আলোচিত কোনো আত্মহত্যা অথবা আমাদের পাশের কোনো আত্মহত্যা নিয়ে আলোচনা করি আমরাও এমনভাবে কথা বলি যার মূল কথাটা এমন দাঁড়ায়- আত্মহত্যাকারী মানুষটা কতটা কষ্টে ছিল, সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। সবাই মিলে আমরা এমন একটা হাইপোথিসিস সমাজে দাঁড় করাই, জীবনে এমন কোনো পরিস্থিতি আসে যখন আত্মহত্যা করা যায়। আসলেই কি আছে তেমন কিছু?

আত্মহত্যার কি আসলেই আছে কোনো যৌক্তিক কারণ? এখন পর্যন্ত শুধু একটা ক্ষেত্রে মানুষ তার নিজের জীবনের অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে এরকম আলোচনা হচ্ছে। এটা হচ্ছে অ্যাকটিভ ইউথ্যানাসিয়া।

কোনো মানুষ যদি এমন রোগে আক্রান্ত হয়, যার প্রভাবে সে খুব কম সময় বাঁচবে; কিন্তু সেই সময়টাও সে প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাবে- এমন ক্ষেত্রে একজন মানুষ তার নিজের স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিতে পারবে কি না, এটা নিয়ে পৃথিবীতে এ মুহূর্তে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। কোনো কোনো দেশ এটার অনুমতি এর মধ্যে দিয়েছেও; কানাডা, নেদারল্যান্ডস এবং কলম্বিয়া এর উদাহরণ। এর বাইরে মানুষের আত্মহত্যা করার মতো পরিস্থিতি নেই, এটি নিয়ে বড় ধরনের ঐকমত্য আছে।

পৃথিবীতে বেশকিছু ভালো মানের গবেষণা হয়েছে যেগুলো প্রমাণ করে আত্মহত্যার খবর আমরা যেভাবে পরিবেশন করি, সেটা অন্য মানুষের আত্মহত্যা করার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে, অনুকরণ করে করা আত্মহত্যার (কপিক্যাট সুইসাইড) ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিরাট। সে কারণে আত্মহত্যার খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশেই নীতিমালা আছে।

কিন্তু আমাদের দেশের মিডিয়ায় আত্মহত্যার খবর যেভাবে আসে সেটা দেখে বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না, এ নীতিমালার কথা অনেকেই হয়তো জানেন না, অথবা জানলেও সেটা মেনে চলতে তাদের আগ্রহ নেই। কারণ, সেই নীতিমালা পালন করলে আত্মহত্যাজনিত খবর আর চাঞ্চল্যকর থাকবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ সংক্রান্ত অনেক গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে আত্মহত্যার রিপোর্টিংয়ের ধরনের সঙ্গে আত্মহত্যার যোগসূত্রের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে এবং সেই সূত্রে আত্মহত্যার খবর মিডিয়ায় কীভাবে দেয়া হবে সেই ব্যাপারে একটা দিকনির্দেশনাও তারা দিয়েছে। সেগুলো মোটামুটি এরকম-

১. আত্মহত্যার বর্ণনায় এমন ভাষা ব্যবহার করা কোনোভাবেই উচিত নয় যেটা আত্মহত্যাকে চাঞ্চল্যকর করে তোলে, কিংবা এটাকে খুব স্বাভাবিক ঘটনা বানিয়ে ফেলে কিংবা আত্মহত্যাকে সমস্যার একটা সমাধান হিসেবে দেখানো হয়।

২. আত্মহত্যার সংবাদ পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা যাবে না এবং আত্মহত্যার বর্ণনার অহেতুক পুনরাবৃত্তি করা হবে না। ৩. সংবাদে একটা আত্মহত্যা বা আত্মহত্যা চেষ্টার স্থান এবং পদ্ধতি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা থাকবে না।

৪. খুব সতর্কভাবে হেডলাইনের ভাষা ব্যবহার করতে হবে এবং সেখানে ‘আত্মহত্যা’ শব্দটি বাদ দিতে হবে। ৫. ছবি বা ভিডিও না দেয়াই উচিত হবে, দিলেও সেই ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ৬. সেলিব্রিটিদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই সেটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত হবে না, যাতে সেটা তাকে গৌরবান্বিত করে।

এ নীতিমালার সঙ্গে আমাদের দেশের মিডিয়ায় আত্মহত্যার খবর প্রচারকে তুলনা করলে দেখব আমাদের কোনো মিডিয়াই এ নীতিমালাগুলো মেনে চলছে না।

আমরা নিজেরাও যখন আমাদের হাতে থাকা মিডিয়ায় (সামাজিক মাধ্যম) আত্মহত্যা নিয়ে লেখি কিংবা পরস্পরের মধ্যে আত্মহত্যা নিয়ে কথা বলি তখনও আমরা এগুলো এভাবে মাথায় রেখে কথা বলি না।

আত্মহত্যার চেষ্টা আজও আমাদের দেশে একটা ক্রিমিনাল অফেন্স। এ ধরনের আইন পৃথিবীর অনেক দেশে এক সময় থাকলেও বহু বছর আগেই এগুলো বাতিল হয়েছে। আমাদের দেশে আজও এই আইন থেকে যাওয়া প্রমাণ করে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে যাওয়া মানুষগুলোর প্রতি আমরা কতটা অসংবেদনশীল। যে মানুষ কোনো কারণে নিজের জীবনই শেষ করে দিতে চেয়েছিল, আমরা মনে করছি সে কোনোভাবে বেঁচে ফিরে এলে তাকে শাস্তি দিয়ে এ প্রবণতা থেকে দূরে রাখা যাবে।

এ ধরনের আইন বাতিল হওয়া উচিত এক্ষুনি। আমাদের প্রত্যেকের উচিত হবে নানা সেক্টরকে এক সঙ্গে করে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কাজ করে যাওয়া। তার মধ্যে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনে মিডিয়াকে বাধ্য করা উচিত তারা যেন ডব্লিউএইচও’র নীতিমালা মেনে চলে। আমরা নাগরিকরাও এ সংক্রান্ত আলোচনা এবং সামাজিক মিডিয়ায় তথ্য দেয়ার ব্যাপারে নীতিমালাগুলো মাথায় রাখব।

আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়া একটা ক্রিমিনাল অফেন্স আমাদের দেশে। সেটাকে দূরে সরিয়ে রেখেও যদি বলি, কোনো একটা আত্মহত্যার সঙ্গে আমাদের নাম যদি কোনোভাবে জড়িত হয়ে যায় সেটা অন্ততপক্ষে ভীষণ অনৈতিক। আত্মহত্যার খবর পরিবেশনে মিডিয়া এবং আমরা নিজেরাও যেভাবে অসতর্ক থাকি তাতে প্রতিটি আত্মহত্যার সম্ভাবনায় আমাদেরও অবদান থাকে, এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। মানে আমরাও আত্মহত্যায় প্ররোচিত করি।

এ বাস্তবতা স্বীকার করা উচিত আমাদের এবং সেই আলোকে আমাদের ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়া উচিত। পেশাদার মিডিয়া এবং আমাদের বোঝা উচিত আমরা যা করছি, যেভাবে করছি, তার সঙ্গে একটা মানুষের বেঁচে থাকা বা মরে যাওয়া জড়িত।

পাদটীকা : ১০ সেপ্টেম্বর ছিল বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। খবরটি মিডিয়ায় এলেও আমাদের অনেকেরই চোখে পড়েনি, কারণ এটি নিয়ে যথেষ্ট আলাপ-আলোচনা আমাদের সমাজে হয়নি। আমরা এখনও এ ব্যাপারে ভীষণই অসংবেদনশীল।

ডা. জাহেদ উর রহমান : সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×