শতফুল ফুটতে দাও: এ কেমন ছাত্র রাজনীতি!

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতি

বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠনের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কখনও ঘটেনি। চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

তাদের জায়গায় আল নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, শোভন ও রাব্বানীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে। আল নাহিয়ান খান জয় ছাত্রলীগের এক নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় পদাধিকারবলে সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। আর লেখক ভট্টাচার্য এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থাকায় তিনিই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন।

তারা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দ্রুততম সময়ে তাদের সম্মেলন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের। এদিকে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী একটি সূত্রে জানা গেছে, ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগপত্র দেন ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী।

শোভন ও রাব্বানী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ থেকে কয়েক শতাংশ চাঁদা দাবি করেছেন বলে সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮ সেপ্টেম্বর দলের এক সভায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেন বলেও খবর প্রকাশ হয়। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক চিঠিতে গোলাম রাব্বানী নিজেদের নির্দোষ দাবি করে উল্টো উপাচার্যের স্বামী ও ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। একই বিষয়ে রাব্বানী ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও খোলামেলা কথা বলেছেন।

ছাত্রলীগের ঊর্ধ্বতন যে দুজন নেতাকে সরিয়ে দেয়া হল তারা কীভাবে নেতৃত্বে এসেছিলেন? গত বছর ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়ার পর ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মতিতে শোভনকে সভাপতি ও রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, সম্মেলনের প্রায় ৩ মাস পর প্রধান নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয়।

আমরা স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করতে পারি, কাকে কাকে প্রধান নেতৃত্বের আসনে বসালে সংগঠনের জন্য ভালো হবে- এমন প্রশ্ন নিয়ে নেত্রিত্ব বাছাইকারীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগেরও নেত্রী। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে শেখ হাসিনা বহু তথ্য পেয়ে থাকেন। দলীয় চ্যানেল, গোয়েন্দা সংস্থা এবং শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে তিনি অনেক ফিডব্যাক পান।

আবার গোয়েন্দা সংস্থা তো একটি নয়, একাধিক। শেখ হাসিনা একজন সক্রিয় রাজনীতিক। তিনি ভালো করেই জানেন তার মূল দল এবং অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে যারা আছেন, তাদের চরিত্র কেমন। সততা ও রাজনৈতিক নিষ্ঠার প্রশ্নে তাদের অঙ্গীকার কতটা দৃঢ়। এতসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ছাত্রলীগের জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক খুঁজে বের করতে অনেক সময় লেগেছে। এত সাধনার ফল যদি এতটাই তেতো হয়, তাহলে কাকে দোষ দেয়া যাবে? বাংলাদেশে একটি প্রচলিত প্রবাদ হল, ‘ঠক বাছতে গাঁ উজাড়।’

মনে প্রশ্ন জাগে, দেশের অবস্থা কি এমনটি হয়ে দাঁড়িয়েছে? আমরা সবাই সৎ মানুষ খুঁজি, জিন্তু সত্যিকারের সৎ মানুষ খুঁজে পাওয়া দুরূহ। সে কারণেই বোধহয় আমাদের এত ভোগান্তি। যেদিনের সংবাদপত্রে শোভন-রাব্বানীর অপসারণের খবর বেরিয়েছে, সেদিনকারই সংবাদপত্রে একটি শিরোনাম হল, ‘পিডি হতে লম্বা লাইন’, পিডি মানে প্রজেক্ট ডিরেক্টর। সরকার ছয় হাজার কোটি টাকায় ধানের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এ প্রকল্প অনুযায়ী, ভেজা ধান কেনা হবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে।

প্রতিটি পাঁচ হাজার টন ধারণক্ষমতার ২০০টি সাইলো নির্মাণ করা হবে। ধানের সাইলো (ছোট গুদাম) নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হওয়ার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন সরকারের শতাধিক সাবেক কর্মকর্তা। পিডি হওয়ার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারা ধরণা দিচ্ছেন (সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)। প্রকল্পের পিডি হওয়ার জন্য জান কবুল এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার হেতু কী? কারণ পিডি হওয়ার মধ্যে অনেক মধু আছে। দামি গাড়িতে যাতায়াত তো বটেই, তার সঙ্গে আছে ঠিকাদারদের কাছ থেকে উপরি, উপহার ও উপঢৌকন লাভের মহাসুবিধা।

পৃথিবীটা এসব মহাশয়ের জন্য স্বর্গ হয়ে ওঠে। ধরায় থেকেই যদি স্বর্গ লাভ সম্ভব, তাহলে স্বর্গ লাভের জন্য ঈশ্বরের সাধনা, আরাধনা, পূজা অর্চনা করার কী প্রয়োজন! কেউ এই বাক্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পেতে পারেন বলে আরও বলছি, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইবাদত করারই বা কী প্রয়োজন! অবশ্য ভণ্ড ইবাদতকারীদের মধ্যে এমনসব লোক রয়েছে যাদের কাছে উপরি আদায় ও ভোগ কোনো রকম মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে না।

৩১ জুলাই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন দেয়ার পর বলা হয়েছিল, অচিরেই ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে। কিন্তু তা হয়নি। প্রায় দশ মাস পর ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, দুই বছর মেয়াদি নতুন এ কমিটি ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘাতও সৃষ্টি হয়। এসব দেখে ভাবছি, সেকাল ও একালের ছাত্র রাজনীতির কথা। অতীত দিনগুলোতে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা বা নেত্রী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব বেছে নিতেন না। যারা নেতা হওয়ার যোগ্য অর্থাৎ কর্মনিষ্ঠা, সংগঠনের প্রতি আনুগত্য এবং আদর্শের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত, এমনসব কর্মীই নেতৃত্বের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। এদের অনেকেই ছিলেন সুবক্তা এবং একাডেমিক দিক থেকেও সুযোগ্য। ছাত্র সংগঠনগুলোর নিয়মিত সম্মেলন হতো। সম্মেলনে কাউন্সিলররা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন করতেন। সবসময় যে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হতো, এমন নয়। একটি প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি নির্বাচনী কমিটি আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করত পরবর্তী নেতৃত্বের বিভিন্ন পদে কারা আসছেন। এ তালিকাটি কাউন্সিলের সামনে পেশ করা হতো এবং দেখা গেছে প্রায় সব ক্ষেত্রে কাউন্সিলররা করতালির মাধ্যমে প্রস্তাবিত কমিটির প্রতি সমর্থন জানাত। নেতৃত্বের জন্য কখনও কখনও বা কিছু মতপার্থক্যের সৃষ্টি হলেও সেটা হতো খুব স্বল্প সময়ের জন্য। ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন অনেকটাই ছিল রেশমি বস্ত্রের মতো মসৃণ। কারণ তখন পদ-পদবির চাইতে বড় ছিল আদর্শ। লক্ষ্য হাসিল করার আদর্শ। এ লক্ষ্যের মধ্যে ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন, গণতন্ত্র অর্জন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সাধারণ দেশবাসীর জন্য অন্ন-বস্ত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সব ধরনের জুলুম ও নির্যাতন প্রতিরোধ। বহু ছাত্রনেতাই সে সময় দীর্ঘ কারাবাস করেছেন। অনেককে জেলে থেকেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

ছাত্র সংগঠন করার জন্য সরকারের স্পেশাল ব্রাঞ্চের গোয়েন্দা প্রতিবেদন নেতিবাচক হলে সিভিল সার্ভিস বা সরকারি চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হতো। আজকালও এক রকম বাধা আছে, সেই বাধা হল কেউ যদি শাসক দলের বিরোধীদের সমর্থন করে তার জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়োগের দরজা রুদ্ধ হয়ে যায়। এমনকি নানা ধরনের ঝুট ঝামেলায়ও পড়তে হয়। অথচ স্বাধীন দেশে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

এখন যারা ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হয় তাদের আদর্শিক লক্ষ্যের চেয়ে বৈষয়িক লক্ষ্যের দিকেই নজর বেশি। তা না হলে কেন টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠবে। কেন অভিযোগ উঠবে যে, ছাত্রনেতারা দামি গাড়ি হাঁকান, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। এ কাহিনীর সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনকারী হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনীগুলো মেলাতে পারছি না।

শোভন ও রাব্বানীকে অব্যাহতি দেয়ায় আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জোর গলায় দাবি করছেন, তাদের নেত্রী অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন না। প্রয়োজনে তিনি কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তবে এ ধরনের ন্যায্যতা সৃষ্টির প্রয়াসকে ছাড়িয়ে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হল, ছাত্রসংগঠনের মূল নেতৃত্ব যদি অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো খামাখাই কেন ছাত্রসংগঠনের দুর্বহ বোঝা বয়ে চলেছে। এর ব্যাখ্যা হয়তো এ রকম যে, শাসক দলের বিরুদ্ধে যখন কোনো আন্দোলন দানা বাঁধে তখন একে সামাল দেয়ার জন্য একটি বাহিনী প্রয়োজন, যেটি রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী নয়, নিছক রাজনীতির লেবাসে এটি কাজ করবে। স্বাধীনতা-উত্তর দিনগুলোয় বিভিন্ন সরকারের আমলে আমরা প্রায় একই ধরনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব মোনেমের ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী হিসেবে কাজ করত এনএসএফ। এক সময় এনএসএফের ত্রাসের মুখে কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগ্রাম গড়ে তোলাই দুরূহ হয়ে পড়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশটি না বুঝলে ছাত্র সংগঠনগুলোর স্খলন বোঝা যাবে না। দেশে লুম্পেন লুটেরা ধনিক শ্রেণি শাসকের আসনে বসে আছে। এ শ্রেণিটি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং যে পরিস্থিতি অব্যাহত রাখলে লুণ্ঠনের অর্থনীতি পুনরুৎপাদিত হতে থাকবে, সেই পরিস্থিতি বহাল রাখাই লুম্পেন লুটেরা ধনিকদের স্বার্থসহায়ক। কাজেই ছাত্র সংগঠনকে নয়, বরং যে শ্রেণি ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে পাপাচার সংক্রমিত করছে সেই শ্রেণির বিরুদ্ধেই সোচ্চার হতে হবে। তাহলে হয়তো ছাত্র সংগঠনগুলোর সুদিন ফিরে আসতে পারে। ফিরে আসতে পারে যে ধরনের চরিত্রে আমরা তাদের দেখতে চাই, সেই চরিত্র।

পাদটিকা হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শুধু শোভন-রাব্বানীই নয়, প্রশ্নের তীর নিক্ষিপ্ত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষক হিসেবে ভাবতে পারি না, শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন অনৈতিকতার অভিযোগ উঠবে! এরও একটি দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×