স্মরণের আবরণে শেখ রাসেল

  গীতালি দাশগুপ্তা ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্মরণের আবরণে শেখ রাসেল

(গীতালি দাশগুপ্তা, ১৯৭২ সাল থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনিই পড়িয়েছেন ছোট্ট রাসেলকে। তার স্মৃতিচারণ নিয়ে এ লেখা)

‘হারিয়ে গেছে অন্ধকারে- পাইনি খুঁজে আর,

আজকে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাবার!

আজকে তোমার জন্মদিন-

স্মরণ বেলায় নিদ্রাহীন

হাতড়ে ফিরি হারিয়ে যাওয়ার অকূল অন্ধকার!

এই সে হেথাই হারিয়ে গেছে কুড়িয়ে পাওয়া হার!’

শেখ রাসেল ও আমার সম্পর্কটা ছিল এক বিচিত্র সুরে বাঁধা। সেখানে প্রচলিত সুর-তাল-লয় বা ছন্দের বালাই ছিল না। ছোট্ট একটি হাসিমাখা মুখ আমার সামনে দাঁড়িয়ে, অথচ সে মিষ্টি মুখখানা ছুঁতে পারছি না, পারছি না আগের মতো করে আদর করতে!

খুনসুটির খেলাটাও তো বন্ধ! দম আটকে আসছে, চোখ বুজে অনুভব করছি, আমার সামনেই অতীত বর্তমান রূপে জাগরূক! এ যন্ত্রণা বোঝাই কী করে? কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন, তার বক্ষে বেদনা অপার।’

১৯৭২ সালের খুব সম্ভবত জুলাই কী আগস্ট মাস। আমি তখন ছোট্ট রাসেলকে পড়াতে যেতাম গণভবনে। আজ ওই গণভবনের নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘সুগন্ধা’। এটা পড়া শুরুর প্রথম দিকের কথা। ওখানে বেশিদিন পড়াইনি। মনে হয় এক মাসের মতো বা কিছু বেশি হবে। এরপরে ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতেই পড়াতে যেতাম, সকাল ৯টা কী ১০টার দিকে।

প্রথম দিনে খুব বেশি পড়াইনি। রাসেল তখন ক্লাস ওয়ানে। কয়েক মাস পরই ওর বার্ষিক পরীক্ষা। ক্লাস টু-এ উঠবে। সবকিছু আমাকে বেশ তাড়াতাড়ি শেখাতে হবে। ওকে আকার-ইকার থেকে শুরু করে অ ই ঈ উ সব শেখাতে হবে। সেদিনের মতো পাঠ শেষ করে রাসেলকে বাসার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পড়া দিয়ে চলে এলাম।

আমাকে ওদের গাড়িতেই বাসায় পৌঁছে দিল। গাড়ির ড্রাইভারকে সবাই মুন্সী নামে ডাকত। শুনেছি, সে অনেক পুরনো ড্রাইভার এবং খুব বিশ্বস্ত। সেদিন গাড়ির ভেতরেই মুন্সী ভাই আমায় কিছু প্রশ্ন করেছিল। যেমন- রাসেল পড়েছে কিনা, কেউ আমার সঙ্গে দেখা করেছে কিনা, আমার সব প্রশ্নের উত্তর ছিল, ‘না’। ‘আজ তো প্রথম দিন, তাই পড়ানো হয়নি তেমন। তবে যা যা রাসেলকে করতে বলেছি ও তা-ই করেছে। আজ সামান্য পড়েছে মাত্র।’ মুন্সী ভাই হেসে বলল, ‘তাই? আপনারে পছন্দ হোইছে তাইলে।’ আমি অবাক হয়ে ভাবতাম এর মানে কী।

এরপর তিন-চার দিন কেটে গেল, মুন্সী ভাইয়ের সেই একই প্রশ্ন : ‘আইজ রাসেল পড়ছে আপা?’

: আজ তিন-চার দিন আসছি ও তো কম হলেও পড়েছে। এ কথা শুনে মুন্সী ভাই একটু হেসে বলল, ‘আম্মার (রাসেলের মা) সঙ্গে দেখা হোইছে আপনার?’

: না, এখনও দেখা হয় নাই।

: আম্মা মনে হয় লজ্জায় আপনার সঙ্গে দেখা করতেছে না।

: কেন? লজ্জা কেন হবে? প্রথম দিন তো ওনার সঙ্গেই কথা হল।

মুন্সী ভাই হেসে বলল, ‘রাসেল ভাইয়ের কোনো টিচার পছন্দ হয় না। একদিন-দুইদিন পড়ার পর ‘এই টিচার পছন্দ না’ কইয়া আসতে মানা কইরা দেয়। ভাইয়ার যে কত টিচার আসল আর গেল! টিভিতে একজনকে পছন্দ হইছে, তার কাছে সে পড়বে কইল, তারে বাসায় আনল, তার কাছে দুই-তিন দিন পড়ল, ব্যস, তারে পছন্দ না কইয়া বিদায় করল। এই রকম অনেককে করছে। তাই আম্মা হয়তো আপনার সঙ্গে দেখা করে না। আপনারে আবার রাসেল ভাই কী কইয়া দেয়!

: আমাকে এখনও কিছু বলে নাই ড্রাইভার সাহেব।

এভাবে প্রতিদিন ড্রাইভার সাহেবের সঙ্গে কথা হতো। মুন্সী ভাই-ই আমাকে রোজ প্রশ্ন করত। রাসেলকে পড়াতে মুন্সী ভাইয়ের এ কথাগুলো পরবর্তীকালে আমায় খুব সাহায্য করেছিল। আমি রাসেলকে অতি সহজেই বুঝতে পেরেছিলাম। ওই সময় রাসেল এক/দুই-এর সঙ্গে পরিচিত ছিল না। তাই ওকে এক/দুই শেখাচ্ছি। একশ’ পর্যন্ত সংখ্যা শিখতে তার মাত্র একটি দিন সময় লেগেছে। তাকে দুটো জিনিস আমি বলেছিলাম- ১. এক থেকে নয় পর্যন্ত সংখ্যার ছবি খেয়াল করে পড়ো ও দেখো এবং কোন সংখ্যার পর কোনটা রয়েছে তা মন দিয়ে দেখে নাও, ২. ‘ঊন’ শব্দটি মনে রাখো। এটা ছিল একটি খেলার মতো। ও দারুণ মজা পাচ্ছিল, সেটা আমি বুঝতে পারলাম। সুতরাং এই সুযোগটা কাজে লাগালাম।

অল্প সময়ের মধ্যে সে শিখে নিল। পরের দিন সামান্য ভুল করল; কিন্তু সেদিন-ই শিখে গেল সবটা। এরপর আর লিখতে ও পড়তে ভুল হয়নি। এবার অঙ্ক শেখানোর পালা। প্রথমে হাতের আঙুলের কড় গুনতে শেখাতে শুরু করি।

ছোট্ট ছোট্ট আঙুলে যখন রাসেল কড় গুনত, তা দেখতে খুব ভালো লাগত। সে দারুণভাবে মনোযোগ দিয়ে গুনত। তার ভ্রু যুগল থাকত কুঁচকে আর চোখ থাকত ছোট্ট আঙুলগুলোর দিকে।

ওই চেহারাটা আমায় খুব আনন্দ দিত বলে আমি ওর কড় গোনার সময় বলতাম, ‘আবার গোনো তো, আমি দেখতে পাইনি। ভুল হল কিনা বুঝতে পারলাম না। আবার গোনো।’

ও ক্ষেপে গিয়ে বলত, ‘আপনি অন্যদিকে ফিরা থাকেন ক্যান? একবারে দেখেন না ক্যান?’ এ কথা বলে কখনও গুনত, কখনও আবার স্বভাবসুলভ বলে বসত, ‘আর গুনব না, আপনি দ্যাখেন নাই ক্যান!’ এই শেষ কথাতেও আমি বেশ মজা পেতাম। কড় গোনাটা শেখার পর খুব ছোট্ট ছোট্ট সংখ্যা দিয়ে যোগ শেখাতে শুরু করি। যেমন : ২+১=কত, ২+২=কত- এমনি সব। এই অঙ্ক শেখাতে গিয়ে আমি খেয়াল করলাম, ও অঙ্ক খুব একটা পছন্দ করছে না। পরদিন পড়তে বসেই বলে দিল রাসেল, ‘আইজ আর অঙ্ক করব না।’ আমার উত্তর ছিল- ‘কেন করবে না?’

: ভালো লাগে না।

: অঙ্ক তো আগে শিখতে হবে, পরীক্ষা তো এসে গেল, পাস করতে হবে তো।

সে কিছুতেই অঙ্ক করতে রাজি হল না। অগত্যা আমাকে অন্য পড়ায় যেতে হল। কিন্তু আমার মাথায় অঙ্কটা রয়ে গেল। বেশকিছু সময় কাটিয়ে ওর পেন্সিল বক্সটা বের করে নিলাম। সে বক্সে সাধারণ পেন্সিলের সঙ্গে নানা রঙের অনেক পেন্সিল।

পেন্সিলগুলো দেখে আমার মাথা কাজ করতে শুরু করে দিল। মনে মনে খুশি হলাম। বললাম, ‘তোমার এতগুলো পেন্সিল?’ রাসেল মাথা নাড়ল। হাতে পেন্সিলগুলো নিয়ে আমি গুনতে শুরু করলাম। আমাকে গুনতে দেখে ও নিজেই গুনতে চাইল। এটাই তো আমি চেয়েছিলাম। এবার ওকে অঙ্ক শেখাতে পারব। ঠিক তা-ই হল। ওইদিন সে যোগ অঙ্কটা শিখে গেল। মনে মনে দারুণ খুশি হলাম। আমার কাজ শেষ, অথচ ও কিছুই বুঝতে পারল না।

এ ক’দিনে ও খানিকটা আমার কাছে এসে গেছে বলে আমার মনে হচ্ছিল। আমি বেশ খুশি। ভাবলাম, সবকিছু ঠিকঠাক। এক সপ্তাহ পার হয়েছে, কিন্তু কতদিন সে হিসাবটা আমার ছিল না। পড়াচ্ছি পড়াচ্ছি, হঠাৎ করে রাসেল আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আইজ আপনার কয় দিন?’

আমি চমকে উঠলাম! সঙ্গে সঙ্গে মনে হল মুন্সী ভাইয়ের কথা, ভাবলাম, আজ আমার হয়তো শেষদিন। রাসেলকে বললাম, ‘কেন? আমি তো গুনে রাখিনি।’ একটুখানি হাসি দিয়ে বলল, ‘আইজ আপনার নয় দিন। আমারে যে সব চাইতে বেশি পড়াইছে, তার ছিল সাত দিন। আপনার আইজ নয় দিন।’ মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, সেই সঙ্গে ভাবলাম, আজকেই শেষ হবে এ খেলা! সুতরাং শেষ বেলার চেষ্টা করতে হবে এখন আমাকে। রাসেল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে বললাম, ‘তোমার পরীক্ষাটা শেষ হয়ে গেলে আমি আর আসব না।’

খানিকটা যেন চমকে উঠল রাসেল! ভ্রূ দুটো কুঁচকে বলে উঠল- ‘আপনি আর আসবেন না?’ আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম ‘না, আসব না তো! তবে, আমি আবার নতুন করে আসব।’

সে ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল- ‘ক্যান আসবেন? আপনি তো পুরান!’

: বারে! তুমি নতুন ক্লাসে উঠবে, নতুন বই কিনবে, আমি নতুন করে আবার আসব। তোমার নতুন বইগুলোর সঙ্গে পরিচয় করব, তাহলে কী হল বল? আমার আবার নতুন করে আসা হল না?

রাসেলের মুখে সুন্দর একখানা হাসি ফুটে উঠল। আমি থাকি আর নাই থাকি, সে মুহূর্তে দারুণভাবে উপভোগ করলাম সেই মিষ্টি হাসিখানা। ও যে শিশু ভোলানাথ! এসব যখন মনে হয় খুব কষ্ট হয় আমার। চোখ দুটো বড্ড অবাধ্য হয়ে ওঠে। মনে হয় বুঁচু (পরবর্তী সময়ে আমি রাসেলকে আদর করে বুঁচু নামেই ডাকতাম) আমার সামনে রয়েছে, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব।

: তাইলে পরীক্ষা পর্যন্ত আসবেন?

আমি মাথা নেড়ে বোঝালাম, হ্যাঁ তা-ই।

: পরীক্ষা শ্যাষ হইলে আর আসবেন না?

: পরীক্ষা শেষে তুমি যা খুশি করতে পারবে। আমি আসব না। তবে তুমি যদি চাও, আমাকে ফোন করলে আসব।

রাসেল ওর খাতাটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনার ফোন নম্বরটা এইখানে লেইখ্যা দ্যান।’

আমি তা-ই করলাম। বলা বাহুল্য, শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে এসেই আমাকে ফোন করে এবং ওইদিনই আমাকে পড়াতে যেতে বলে।

একদিন সে রাগ করে পড়ার মাঝখানে ওর সব বই-খাতা-রাবার-পেন্সিল মাটিতে ফেলে দিল। ঘরময় বই-খাতা-পেন্সিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যেভাবে জিনিসগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, তা দেখলে যে কেউ রাগ করবে। আমিও প্রথমটায় হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। রাসেল এ কাজটি করে টেবিলের উপর আর যা ছিল সেগুলো দু’হাতে আমার দিকে ঠেলে দিয়ে তার কনুই দুটো টেবিলের উপর রেখে ছোট্ট দু’খানা হাত দু’গালে লাগিয়ে বসে থাকল। মুখে প্রচণ্ড রাগ।

আমি একেবারে চুপ। আমার চোখে-মুখে কোনো রাগ বা বিরক্তির চিহ্ন ছিল না। রাসেল এভাবে রাগ করে বসে আছে, অপরদিকে আমিও উদাসীনভাবে আছি। মনে হচ্ছে কিচ্ছুটি হয়নি। এভাবে দু’জনের বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। কারও মুখে কোনো কথা নেই। দু’জন-ই চুপ। আমি আর ওর দিকে তাকাচ্ছি না; কিন্তু বুঝতে পারছি রাসেলের চোখ আমার দিকেই। সে আমাকে খুব করে খেয়াল করছে। কিন্তু কেন এমন করে দেখছে তা বুঝতে পারছি না। আর কতক্ষণ এভাবে থাকা যায়? হঠাৎ খুব বিরক্তির সুরে বলে উঠল- ‘আমি যে বই-খাতা সব ফেলাইয়া দিলাম, এতে আপনার রাগ হয় নাই?’

মাথা নেড়ে বললাম, ‘না।’

: ক্যান রাগ হয় নাই?

: বইগুলো তো আমার না। তোমার বই তুমি ফেলেছ, আমি রাগ করব কেন?

এ উত্তরটি রাসেল আশা করেনি। মনে হচ্ছিল, এ উত্তরে সে একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। ভ্রু যুগল কুঁচকে বললে,

: রাগ হন, আপা, আপনি রাগ হন!

: বারে, আমি রাগ করব কেন? এ কথা বলে আমি একটু হাসলাম।

: আপনি রাগ হবেন না?

: না ।

: রাগ হবেন না ক্যান?

: বইগুলো তো আমার না, তাই আমার রাগও হবে না। এ কথাগুলো মুখে ঠিক-ই বলছি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চিন্তাও হচ্ছিল বেশ। এ খেলার শেষ কী হবে তা ভেবে।

ভ্রু কুঁচকেই বলল, ‘বইগুলা কে উঠাবে?’

: যার বই সে-ই উঠাবে।

মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি তো উঠাব না।’

: আমিও উঠাব না। এভাবেই মাটিতে পড়ে থাকবে।

চোখে-মুখে তার চিন্তার ছাপ! হয়তো ভাবছে কী বিপদ! এ সময়টা আমি খুব-ই উপভোগ করছিলাম। আমার বুঁচু ছোট্ট বাচ্চা বই তো কিছুই নয়! তাই ভাবনাটা শিশুর মতোই। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠল, ‘বইগুলো না উঠালে কী হবে?’

আমি খুব শান্তভাবে সুর দিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এগুলো না উঠালে বিদ্যা হবে না, বুদ্ধি হবে না, বোকা হয়ে থাকতে হবে।’

একটু ভেবে নিয়ে ও আস্তে আস্তে চেয়ার থেকে মেঝেতে নামল, মেঝেতে উপুড় হয়ে বসে বই-খাতা-পেন্সিল-রাবার একটা একটা করে অনিচ্ছার সঙ্গে গুছিয়ে টেবিলের উপর আমার সামনে ওগুলো ধপ্ করে রেখে বলল, ‘এই ন্যান আপনার বই-খাতা!’

: গুড বয়, বলে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে চেষ্টা করলাম। ও ঝট করে মাথাটা সরিয়ে নিল। আদর করতে পারলাম না। শেষে আমি বই-খাতা সব গুছিয়ে ওর ব্যাগে ভরে রেখে দিলাম।

এ নাটক যত তাড়াতাড়ি লিখে শেষ করলাম, সেদিন কিন্তু এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়নি। এ নাটক শেষ হতে বেশ সময় নিয়েছিল। এ নাটক শেষ হতে সময় নিয়েছিল বলে আমাকে এর পরেই ফিরে আসতে হয়েছিল।

আসার সময় ফরিদ (রাসেলদের কাজের ছেলে) আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপা, রাসেল ভাইয়া কি আপনার ওপর রাগ করছে? দেখলাম বই খাতা সব সারা ঘরে ছড়ানো।’

: ও কিছু না। ফরিদকে আর কিছু বললাম না।

: আবার দ্যাখলাম রাসেল ভাইয়াই সবকিছু গোছাইল। অবাক হয়েই কথাগুলো বলেছিল ফরিদ।

: হ্যাঁ, রাসেলই গুছিয়েছে সব।

বুঝতে পারলাম, বাসার সবাই ওকে আর আমাকে খেয়াল করছে। এছাড়া আমার মনে হল, ওকে আর আমাকে নিয়ে সবাই খানিকটা চিন্তিত। রাসেলকে বুঝতে আমার খুব সময় লাগেনি। এর পেছনেও গল্প রয়েছে। সে গল্পটা হল, ওকে আকার, ইকার শেখাতে আদর্শলিপি বইখানা ব্যবহার করছিলাম। বলছিলাম, ‘এগুলো যদি সব শিখতে ও মনে রাখতে পার, তবে তুমি যে কোনো বই পড়তে পারবে।’ বুঝলাম, আমার কথাটা ওর পছন্দ হয়েছে। আদর্শলিপি বইয়ের পাতা এক এক করে উল্টে যাচ্ছি আমি। মাঝে মাঝে ছবিগুলোও দু’জনে মিলে দেখছি, সেই সঙ্গে আ-কার, ই-কারগুলো শেখাতে শুরু করি। য-ফলা ও র-ফলাতে এসে একটা ছবির উপর রাসেলের চোখ পড়ল। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই পাতায় কী আছে? এগুলো কী?’

: একে বলে য-ফলা ও র-ফলা। ওই পাতায় একটা ছবি ছিল (আজকের ‘আদর্শলিপি’তে এ ছবি আছে কিনা আমি জানি না), সেই ছবির ওপর তর্জনী দিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘এইটা একটা বাঘ না আপা?’

: হ্যাঁ। বাঘকে ব্যাঘ্র বলে, তাই এই ছবি। আমি একথা বলে ব্যাঘ্র বানানের য-ফলা ও র-ফলা কোনটা তাই দেখালাম। রাসেল কি ওইসব দেখছে?

ওর চোখ বাঘের দিকে। ছবিটা ছিল বাঘের মুখে একটা ছাগল, আর অনেক ছাগল ভয়ে চারদিকে দৌড়ে পালাচ্ছে। ছবিটা রাসেলকে আকর্ষণ করেছে। ছবিটার দিকে সে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে, এটা আমি খেয়াল করলাম। বাঘের মুখে যে ছাগলটা সেই ছবিটার উপরে ছোট্ট তর্জনীটা রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করল- ‘দ্যাখেন আপা, বাঘটা কী বোকা, মুখের ছাগলটা তো বাঘের কামড়ে মইড়্যাই গেছে, ছাগলটা তো আর দৌড়াইতে পারবে না, বাঘটা তো অর মুখের ছাগলটা মাটিতে রাইখ্যা অন্য ছাগলগুলোরে ধরতে পারে। বাঘটা কি বোকা তাই না আপা?’

এরপর কি আমার ছোট্ট বুঁচুকে চিনতে ভুল হয়?

আমার চিনতে ভুল হয়নি। ওর ভেতরে রয়েছে ওর মতোই একটি শিশু মন। ওই মনটিকে বস করাই হবে আমার শিক্ষকতার অলঙ্কার। ওই অবুঝ মনটা আমার চাই। এই মর্মার্থটাই আমি সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম। সুতরাং বই-খাতা যখন রাসেল মাটিতে ফেলেছে, তখন আমার কোনো রাগ বা বিরক্ত হয়নি। এখানে ছিল আমার নিজের ওপরে নিজের পরীক্ষা। বলা যায় চ্যালেঞ্জ।

ছোট ছোট অঙ্ক শেখার পর তাকে অঙ্ক করতে দিলে সে মোটেও খুশি হতো না। অঙ্কের প্রতি তার প্রবল অনীহা। দুটো-তিনটার বেশি অঙ্ক করতে চাইত না। এমনই একদিন তাকে ওই রকম ছোট ছোট পাঁচটি অঙ্ক করতে দিয়েছি, সে অঙ্ক করে খাতাটা আমার দিকে ঠেলে দিল। আমি দেখি সে তিনটা অঙ্ক করেছে, দুটো করেনি। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘তুমি তিনটে করেছো, আর দুটো করে ফেলো।’

: ইচ্ছা করছে না।

: ও দুটো কে করবে?

: জানি না। বেশ জোরেশোরেই বলে দিল।

মহা মুশকিল হল এবার। ওকে আরও বড় অঙ্ক শিখতে হবে। একেবারে শুরু থেকেই সব শেখাতে হচ্ছে ও হবে। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি। বার্ষিক পরীক্ষাও এসে যাচ্ছে সামনে। এ চিন্তা আমার সে মুহূর্তের নয়, এ চিন্তা প্রথম থেকেই আমার মাথায় ঢুকে রয়েছে। কী করি, কী করি? কীভাবে সবক’টা অঙ্ক করানো যায়? ভাবছি আর ভাবছি! ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে একটা গল্প ফেঁদে নিলাম। অঙ্কের খাতাটা আমার হাতের নিচে রেখে রাসেলকে প্রশ্ন করলাম- ‘তোমার স্কুলে কোনো বন্ধু আছে?’

ও ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল- ‘আছে। ক্যান?’

: তুমি তাদের সঙ্গে কী করো?

: ক্যান? খেলি, গল্প করি। আরও অনেক কিছু করি।

: ও...। তুমি চকলেট খুব পছন্দ করো, তাই না?

: হ্যাঁ। এই কথা জিজ্ঞাসা করতেছেন ক্যান?

: স্কুলে চকলেট নিয়ে যাও?

: হ্যাঁ, যাই তো চকলেট নিয়া।

ও কিন্তু ভ্রু যুগল কুঁচকেই উত্তরগুলো দিয়ে যাচ্ছে।

: তুমি স্কুলে চকলেট নিয়ে যাও তাহলে?

: স্কুলে চকলেট নেই তো।

: কোথায় পাও চকলেট? মানে কোথা থেকে নিয়ে যাও চকলেট?

: ক্যান, বাসার থিকা নিয়া যাই।

: বাসা থেকে কি একটা চকলেটই নিয়ে যাও?

মাথা নেড়ে বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘না, একটা চকলেট নেব ক্যান? অনেক নিয়া যাই।

: তুমি তোমার বন্ধুদের সামনেই চকলেটগুলো খাও?

: হ্যাঁ। বলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।

: বন্ধুদের দাও না? একা একা সব চকলেট ওদের সামনেই খাও?

এবার আমার বুঁচু গর্জে উঠে বলল, ‘আপনি কিচ্ছু জানেন না। আমি ক্লাসের সবাইকে আগে দিয়া তারপর খাই। কোনোদিন আমার জন্য একটাও থাকে না।’

আমি ততোধিক শান্তভাবে বললাম, ‘ও, তুমি তাহলে সবাইকে দাও চকলেট?’

: আমি সবাইকে দিয়া খাই।

ঠিক এই সময়ে আমি আস্তে করে আমার হাতের তলা থেকে অঙ্কের খাতাটা বের করে ওকে বললাম, ‘দেখো, পাঁচটা অঙ্কের মধ্যে তুমি তিনটে করেছ, দুটোকে করোনি, ওই দুটো অঙ্ক কষ্ট পেল না? ওরা মনে মনে কষ্ট পেয়ে ভাবছে, রাসেল ভাই তিনজনকে (তিনটে অঙ্ক) করল, আমরা দু’জন বাদ পড়ে গেলাম। আমাদের দু’জনকে করল না! ওই অঙ্ক দুটো তো কষ্ট পেল! এখন বলো, আমি কীভাবে বুঝব তুমি তোমার বন্ধুদের চকলেট দাও?

ছোট্ট মানুষ! আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলে উঠল, ‘অঙ্ক কি বুঝতে পারে? অঙ্কের কি প্রাণ আছে? ওরা কি কথা বলতে পারে? ওদের তো প্রাণ নাই, তাইলে ওরা কষ্ট পাবে ক্যান?’

: তুমি ঠিক বলেছো। ওরা আমাদের মতো কথা বলতে পারে না ঠিক; কিন্তু ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারে। মানে, অঙ্কে অঙ্কে কথা বলতে পারে। দেখো না, একটা পিঁপড়া আর একটা পিঁপড়ার গা ছুঁয়ে যায়, এভাবেই ওরা কথা বলে। ওটাই ওদের কথা বলার ভঙ্গি। একটু যেন চিন্তায় পড়ে গেল আমার ছোট্ট ছাত্রটি। বলে উঠল- ‘এইটা ক্যামনে হয়?’

: বারে, হবে না কেন? আমাদের যেমন বাংলাদেশ আছে, অঙ্কেরও হয়তো বা একটা অঙ্কের দেশ আছে। ওরাও আনন্দ পায়, কষ্ট পায়, দুঃখ পায়।

কথাগুলো শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, ‘দ্যান, খাতাটা দ্যান।’

হাতের তলা থেকে খাতাটা ওর দিকে ঠেলে দিলাম। টান মেরে খাতাটা নিয়ে ঝটপট অঙ্ক দুটো করে খাতাটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, ‘ন্যান আপনার অঙ্ক। এখন তো ওদের কষ্ট হবে না।’ সব ক’টা অঙ্ক সেদিন সে ঠিকভাবে করেছিল। কত মায়া-মমতায় ভরা ওই ছোট্ট বুকখানি। আমার ছলনায় সে নিজে কষ্ট পেয়ে অঙ্ক দুটোর কষ্ট অনায়াসে মুছে দিল।

এই শিশু ভোলানাথকে ভালো না বেসে কি পারা যায়? ওর অবুঝ মনটা কত সহজ-সরল! ছোট্ট হৃদয়খানা মায়া আর মমতায় মাখা! তা না হলে ওই অঙ্কগুলোর জন্য এতটা কষ্ট পায়? অথচ যারা আমার এ সুন্দর বুঁচু সোনার ছোট্ট মায়াভরা বুকটায় বুলেট ভরে দিল, তাদের কি একটুও কষ্ট হল না? তাদের সন্তানদের মুখ একবারও মনে পড়ল না? মনে হল না, তাদের সন্তানদের যদি এমনভাবে বুলেটে বুক ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়, তখন কেমন লাগবে? ঈশ্বর কি এই খুনিদের ক্ষমা করবেন? তাই তো ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন আমার- তুমি কি তাদের করিয়াছ ক্ষমা, তুমি কি বেসেছ ভালো?

বুঁচু, আমি একান্তে নিভৃত অন্তরে আজও শুনতে পাচ্ছি তোমার ‘আপু আপু’ ডাক! তোমায় অনেক অনেক ভালোবাসি!! বুঁচু সোনা, আজও আমি তোমার সেই প্রিয় গান শুনে যাচ্ছি-

‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে

মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ ।

তব ভুবনে তব ভবনে

মোরে আরো আরো আরো দাও স্থান।।’

তুমি তার ভুবনে এবং ভবনেই রয়েছ, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ভালো থেকো বুঁচু সোনা।

গীতালি দাশগুপ্তা : শেখ রাসেলের সাবেক গৃহশিক্ষিকা, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×