ব্রিটেনের ভাগ্যে এখন কী ঘটবে?

  ক্রিস প্যাটেন ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটেনের ভাগ্যে এখন কী ঘটবে?

ব্রিটেনের ব্রেক্সিট মনস্তাত্ত্বিক নাটক এখনও চলছে। যদিও ব্রিটিশ সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিচ্ছেদের সংশোধিত একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল মধ্য অক্টোবরে; কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তার প্রত্যাশিত ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইইউ ত্যাগের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পার্লামেন্টকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ কারণে ইইউ নেতারা ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ পর্যন্ত ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সীমারেখার জন্য আরও তিন মাস বাড়তি সময় মঞ্জুর করেছেন। এরই মধ্যে ১২ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যা বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে সহায়তা করতে পারে।

জনসন ইইউ থেকে প্রত্যাহার চুক্তি নিশ্চিত করেছেন কিছুটা নিজের পূর্বেকার অবস্থানে ছাড় দিয়ে ও উত্তর আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের বাকি অংশের মধ্যে একটি শুল্ক সীমান্তের উপস্থিতি মেনে নিয়ে এবং কিছুটা তার পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র দরকষাকষি করা বাজে শর্তাবলীর সমাধান করে। যদিও চুক্তিটিকে এখনও অনেক সংসদীয় বাধা স্পষ্ট করতে হবে এবং এ কারণে আসন্ন সংসদীয় নির্বাচন হবে সবার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা- অতি শিগগিরই সম্ভবত আমরা দেখতে পাব আমাদের জন্য ব্রেক্সিট কতটুকু ভালো বা খারাপ দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু সম্ভবত আমাকে বিফোর লঙ্গ বা অতি শিগগির ফ্রেজটির পুনরালোচনা করতে হবে। ধরে নিই ব্রেক্সিট হচ্ছে, তারপর যদি ব্রেক্সিটের প্রথম কয়েকটি বছর ব্রিটেনের জন্য অর্থনৈতিকভাবে কঠিন হয়; তখন ব্রেক্সিটপন্থীরা আমাদের বলবেন যে, কিছুটা সময় তো দিতে হবে।

বস্তুত, জনসনের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের একজন বলেছেন যে, আমরা সম্ভবত জানি না আগামী ৫০ বছর ব্রেক্সিটের পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে। যে জন্য আমরা ইইউ ত্যাগ করতে যাচ্ছি তা পূরণ করতে হলে এখন এবং ওই সময়ের মধ্যে ফলাফল ভালো হতে হবে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলান এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, পদ্ধতিগত ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার বিষয়টি বদলে দিতে হলে ব্রিটেনের উচিত সে সময়ের ইউরোপিয়ান কম মার্কেটে যোগদান করা। ১৯৫১ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটেনের ছিল ওইসিডি অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একেবারে তলানিতে, যেখানে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। জাপান তখন দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি ছিল, যার গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির প্রবৃদ্ধি ছিল ঘুরেফিরে ৫ শতাংশ ও এর আশপাশে।

ব্রিটেনের নীতিনির্ধারকদের ‘কী সমস্যা হল’ প্রশ্নে চিন্তিত ছিলেন। আমরা ফরাসি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আমাদের ভার্সন চালু করেছি। আমরা নতুন নতুন হাসপাতাল ও সড়কে বিনিয়োগ করলাম, লোকসান দেয়া রেল লাইনগুলো বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু ঘটনাবশত আমরা সব সময় ইউরোপিয়ান এ চিন্তায় ফিরে আসতাম যে আমাদের ইউরোপিয়ান গ্রুপে যোগদান করতে হবে, যেখানে আমাদের মূলত অবজ্ঞার সঙ্গে বিবেচনা করা হতো। আরেকজন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ঘটনাবশত আমাদের ইউরোপিয়ান দরজার ভেতরে নিয়ে গেছেন চার্লস ডি গলের মৃত্যুর পর। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যিনি ব্রিটেনের সদস্য পদের বদ্ধমূল বিরোধী হয়ে পড়েছিলেন।

ব্রিটেনের ইইউতে যোগদানের বছর ১৯৭৩ সাল থেকে ইইউ ছাড়ার গণভোট বা ব্রেক্সিট রেফারেন্ডামের বছর ২০১৬ পর্যন্ত আমাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির প্রবৃদ্ধি থেকে অনেক বেশি হারে বেড়েছে। আর ১৯৯২ সালের প্রকৃত একক বাজার চালু হওয়ার পর (যেটি ছিল মার্গারেট থ্যাচারের বড় অর্জনগুলোর অন্যতম)- ব্রিটেন তার প্রথাগত প্রতিযোগীদের চেয়ে উল্লেখযোগ্য ভালো পারফর্ম করেছে, অন্তত ২০১৬ সাল পর্যন্ত।

অবশ্যই অন্যান্য বিষয়াবলি যেমন- থ্যাচারের ট্রেড ইউনিয়ন সংস্কার ব্রিটেনের সফলতায় অবদান রেখেছে। কিন্তু মূল ঘটনা ছিল ইইউতে প্রবেশের পূর্বের অবনতি থেকে যোগদানের পর ওপরের দিকে জাম্প দেয়া। সর্বোপরি, ব্রিটেন এ সফলতা অর্জন করেছে কিছুটা নিজেদের অবস্থান থেকেও- আমরা একক মুদ্রা ইউরো গ্রহণ করিনি, আমরা মুক্তবাণিজ্যকে প্রমোট করেছি এবং ইইউকে সেন্ট্রাল ও পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত করার ধারণার প্রবর্তক আমরা। কিন্তু জনসনের চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ার পর জীবন কেমন হবে? ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কারণেই বলেছেন, চুক্তি করে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসলে ব্রিটেনের অর্থনীতি ভালো হবে চুক্তিহীন অবস্থায় বেরিয়ে আসা থেকে। যদিও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, জনসনের চুক্তি তেরেসা মে যে চুক্তি করেছেন তার চেয়ে কম ইতিবাচক হতে পারে। তারপরও মে’র চুক্তিও দেশকে দুর্বল করে তুলবে স্বাভাবিকভাবে আমরা ইইউতে থেকে গেলে যেমন থাকব তার চেয়ে।

আরেকটু প্রকাশ্যে বলতে গেলে, জনসনের অর্থমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ নতুন প্রস্তাবিত চুক্তির প্রভাব মূল্যায়ন ও তা তুলে ধরতে অস্বীকার করেছেন। এতে করে এসব সন্দেহ জোরদার হচ্ছে যে, এমন একটি মূল্যায়নের ফলাফল সম্পর্কে সরকার অনেক কম আত্মবিশ্বাসী। সর্বোপরি, নিজের সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে বড় মার্কেটকে বাইরে থেকে ব্রিটেন কীভাবে সম্ভাব্য ভালো করতে পারে? কেন আমরা সক্ষম হব আমাদের পক্ষে তুলনামূলক বড় ও ভালো চুক্তি করার জন্য ওইসব দেশের সঙ্গে যেখানে আমাদের চেয়ে তাদের বাজারের আকার দশগুণ বড়? কিছু আশাবাদী বিশ্বাস করেন, ব্রিটেন বিশ্বকে ঝড়ের মতো টেনে আনতে পারে নিয়ন্ত্রণমুক্ত, মুক্তবাজার ব্যবসায়ী হিসেবে (সিঙ্গাপুর স্টাইলে)। কিন্তু তারা যেসব বিষয় এড়িয়ে যান তাহল পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা চেক এবং কর্মীদের অধিকারের বিষয় তুলে নেয়া কনজারভেটিভ দলের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় হতে পারে।

ধরে নিই জনসনের চুক্তি মোতাবেক ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করছে, তাহলে ইইউ’র সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করতে হলে ২০২০ সালের শেষ পর্যন্ত আলোচনা চালাতে হবে, যেখানে সরকার হয়তো ইইউর সঙ্গে কানাডার বিদ্যমান এফটিএ’কে বিবেচনায় নেবে নিজেদের পছন্দের মডেল হিসেবে। কিন্তু ভিন্ন ব্রেক্সিট দৃশ্যাবলীর আওতায় ভবিষ্যদ্বাণী করা ব্রিটেনের আগামীর অর্থনৈতিক পারফরমেন্স এ অপশনটিকে দ্বিতীয় বাজে র‌্যাঙ্কিংয়ে ফেলছে, যা কেবল চুক্তিহীন বিচ্ছেদের ওপরে আছে। কানাডা স্টাইলের চুক্তির অনেক নেতিবাচক দিকের একটি হল এতে সেবাখাতগুলো খুব একটা অন্তর্ভুক্ত হয় না, যাতে ব্রিটেনের ব্যবসায় উদ্বৃত্ত ইইউ’র সঙ্গে কেবল ২০১৮ সালেই ছিল ৩৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এটি একটি কারণ যে, কেন এ ধরনের একটি চুক্তি ইইউ’র পক্ষে বেশি সুবিধাজনক হবে ব্রিটেন থেকে।

এর বাইরে কানাডা পদ্ধতির চুক্তি বেশিরভাগের ক্ষেত্রে না হলেও অনেক উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে সীমান্তে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চাপিয়ে দেবে। এসবগুলো একটি স্মরণকারী যে, ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করার পরও বছরের পর বছর তাকে ইইউ’র সঙ্গে অনেক কঠোর আলোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যেখানে সে দুর্বল অবস্থানে থেকে দরকষাকষি করবে। বাস্তবতা হচ্ছে, তারপরও প্রতি সকালে সূর্য উঠবে এবং আমাদের বিশ্বমানের অনেক প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি ও সম্পত্তি থাকবে। কিন্তু খোদ ব্রিটেনের একত্রিত থাকার প্রবণতা (ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও নর্থান আয়ারল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্য গঠিত) টানটান অবস্থায় পড়ে যাবে মূলভূমি ইংলিশ জাতীয়তাবাদী নীতি কর্তৃক পরিচালিত হওয়ার কারণে।

সর্বোপরি, আমরা হয়ে পড়ব তুলনামূলক দরিদ্র। বস্তুত, সরকার কর্তৃক প্রায়ই ব্যবহৃত অর্থনৈতিক থিঙ্কট্যাংকগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমরা সম্ভবত এখনই ২ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পদহীন হয়ে গেছি, যেটি ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াহীন থাকলে হতাম না। একটি দেশের জন্য বিশ্বে কম সম্পদধারী ও কম প্রভাবশালী থাকার পথ বেছে নেয়া বাজে একটি সিদ্ধান্ত। কেউ কেউ বলেন, এটি কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু চলুন, দেখি কী ঘটে যখন দেশ হিসেবে ও ব্যক্তি হিসেবে আমরা যেসব জিনিস চাই সেগুলোর জন্য যদি আমাদের অর্থ কম থাকে। ব্রেক্সিট সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যদ্বাণীগুলো অতিদ্রুত বাস্তবতার বিরুদ্ধে পরীক্ষিত হবে। যখন সেসব ঘটতে শুরু করবে, আমি তখন জনসনের ব্রেক্সিটবাদীদের একজন হতে চাইব না।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

ক্রিস প্যাটেন : অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর; হংকংয়ের সর্বশেষ ব্রিটিশ গভর্নর ও ইইউ’র পররাষ্ট্রবিষয়ক সাবেক কমিশনার

ঘটনাপ্রবাহ : ব্রেক্সিট ইস্যু

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×