গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে চিলি

  ড্যানিয়েল বোরজুটজকি ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে চিলি

১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে অস্থিরতা চিলি প্রত্যক্ষ করছে গত দুই সপ্তাহজুড়ে, যাতে প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা বাধ্য হয়েছেন আটজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করতে।

কিন্তু প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের সহিংস পদক্ষেপ দেশের ভেতরে ও বাইরে বসবাসকারী চিলির নাগরিকদের অন্ধকার অতীতের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে।

পিনেরা ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা শক্তিশালী এক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত’। তিনি নিজের বক্তব্যের সমর্থন করেছেন দেশের বেশিরভাগ অংশে জরুরি অবস্থা ও কারফিউ জারি এবং ট্যাঙ্ক ও সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে। অনলাইনে প্রকাশ হওয়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে বর্বর শক্তি ব্যবহার করছে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী। আমার ফেসবুক নিউজফিডে সাম্প্রতিক একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যাচ্ছে একদল প্রতিবাদী শান্তিপূর্ণভাবে ফুটপাত ধরে হাঁটছে। পায়ে হাঁটা এক ব্রিগেড সেনা এবং মোটরসাইকেলে চড়া অফিসাররা প্রতিবাদকারীদের মুখোমুখি হয় এবং তাদের বেধড়ক পেটাতে থাকে।

সান্তিয়াগোর বাকুয়েদানো পাতাল রেলস্টেশনে প্রতিবাদকারীদের নির্যাতনের খবরগুলোর তদন্ত করছে চিলির ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইন্সটিটিউট। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, অন্তত ১৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও কয়েক হাজার আহত হয়েছেন, যদিও এগুলোর সবই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নয়।

অন্যদিকে ২০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিকে আমাদের বলা উচিত- মোটের ওপর মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্রমাগত লঙ্ঘন।

প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে আইনের দু’শ’ অধ্যাপক একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট ২৪ অক্টোবর ঘোষণা করেছেন, তিনি একটি টিম পাঠাবেন তদন্তের জন্য।

চিলি গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে প্রায় ৩০ বছর আগে। কিন্তু এখনকার ঘটনাবলীতেও মনে হয় যে এগুলো জেনারেল অগাস্টো পিনোশের পদত্যাগের সময়ে ঘটেছে কিনা, যিনি ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত হাজারো মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন করেছেন।

সম্প্রতি ১০ লাখের বেশি মানুষ সান্তিয়াগো এবং অন্যান্য শহরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করেছেন। হ্যাঁ, কিছু প্রতিবাদে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাতাল রেলস্টেশন, বাস ও সুপারমার্কেট জ্বালিয়ে দেয়া এবং আরও কিছু ঘটনা নিরপরাধ মানুষদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বয়ে আনবে; কিন্তু সেগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবাদীর প্রতিবিম্ব নয়।

চিলিকে সবসময় একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়- এমন একটি দেশ যে তার অনুতাপমূলক অতীত মোচন করছে এবং রাজনৈতিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে। ১৯৮০ সালে পিনোশের শাসনামলে দেশটির সংবিধান বাজারচালিত অর্থনৈতিক মডেলের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে, যা পেনশন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে প্রাইভেটাইজ করেছে। চিলির স্বৈরশাসন যৌথ দরকষাকষির অধিকার ধ্বংস করেছে, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপুলভাবে নষ্ট করেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্যসেবা, বিভিন্ন সেবাখাত ও সরকারি সেবাগুলোকে বেসরকারি প্রকল্পে হস্তান্তর করেছে।

এসব নীতির প্রভাব এখনও অনুরণিত হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায় লিভিং কস্ট বা জীবনযাপনের ব্যয় চিলিতে সবচেয়ে বেশি। জাতিসমূহের অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গ্রুপে দেশটিকে বর্তমানে সবচেয়ে অসমতার দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রতি আরোহণে পরিবহন ভাড়া ১ দশমিক ২০ করা বা প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বড় ধরনের বোঝা হতে পারত, যারা নিজেদের বাজেটের ১৩ শতাংশ পরিবহনে ব্যয় করে এবং অবসরপ্রাপ্তদের যারা সর্বনিম্ন বেতনের নিচে একটি নির্দিষ্ট পেনশনের ওপর জীবন ধারণ করে।

এসব কষ্ট-অপমান আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে যখন অর্থমন্ত্রী জুয়ান অ্যান্দ্রেস ফন্টেইন পরামর্শ দিয়েছেন, যেসব চিলিবাসী নতুন হারে ভাড়া দিতে সক্ষম নয় তারা যেন কাজে যাওয়ার জন্য সকাল ৭টার আগে বের হয়। এতে করে তারা প্রচণ্ড ভিড়ের সময়ের বাড়তি ভাড়ার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারবে।

চিলিবাসী প্রতিবাদ করছে কারণ তারা এমন একটি আর্থিক বিপদে আছে, যেখানে তাদের হারানোর কিছু নেই। অনেকে এমন একটি জাতীয় পরিষদের আহ্বান জানাচ্ছেন যা ১৯৮০ সালের সংবিধানের পরিবর্তে নতুন একটি সংবিধান আনবে; কিন্তু মূল আইন প্রণয়নের জন্য অনেক বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার। এ কারণে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তন প্রায় অসম্ভব।

গত সপ্তাহে পিনেরা বলেছেন, ‘তার সরকার চিলিবাসীর দেয়া স্পষ্ট ও শক্তিশালী বার্তা শুনেছে।’ কারফিউ তুলে নেয়া হয়েছে এবং পেনশন পদ্ধতি সংস্কারের একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন পিনেরা, যদিও যে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। তিনি মাসিক সর্বনিম্ন বেতন বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবাদীদের কাছে এসব পদক্ষেপ বড়দাগে প্রতীকী মনে হয়েছে, যা চিলির বাজারচালিত অর্থনীতির মডেলের তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

গরিব পেনশনধারী, কম মজুরি পাওয়া শ্রমিক, স্কুলশিক্ষক এবং কলেজের ছাত্ররা রাষ্ট্রের শত্রু নয়। শিক্ষা সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা সংস্কার, বর্ধিত বেতন, বড় ধরনের হাউসিং ভর্তুকি, সরকারি সেবাগুলোর ব্যয় কমানো- এসবই যৌক্তিক দাবি, যা চিলির মতো একটি অগ্রসর অর্থনীতির পক্ষে পূরণের সক্ষমতা থাকা দরকার।

কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত রাস্তায় দমন-পীড়ন চলতে থাকবে।

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

ড্যানিয়েল বোরজুটজকি : পুরস্কারপ্রাপ্ত মার্কিন লেখক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×