বিচারব্যবস্থায় জনগণের হয়রানি দূর হোক
jugantor
মিঠে কড়া সংলাপ
বিচারব্যবস্থায় জনগণের হয়রানি দূর হোক

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন  

১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিচারাঙ্গনে কী হচ্ছে, জনগণ সেখানে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কিনা এবং সেসব ভোগান্তির মাত্রা কত, সে বিষয়ে সঠিক জরিপ চালানো হয় বা হচ্ছে বলে মনে হয় না। ফলে নিরীহ জনসাধারণের ভোগান্তির মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।

আদালত চত্বরে, আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার করে দিতে হচ্ছে; কিন্তু তবুও মামলার সুরাহা হচ্ছে না। এমনকি অতি সাধারণ একটি মামলা যা দুই-এক মাসে বা ছয় মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, সেক্ষেত্রেও একজন বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।

আর এজন্য মূলত দায়ী একশ্রেণির উকিল এবং আদালতের পেশকার-কর্মচারী। কারণ অনেক আইনজীবীকেই দেখা যায়, তিনি তার মক্কেলের পক্ষে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেন। ফলে এসব মামলার ক্ষেত্রে আদালতের পেশকার-কর্মচারীরা বিমাতাসুলভ আচরণ করার সুযোগ পেয়ে যান।

আবার একশ্রেণির আইনজীবী ও পেশাকারের যোগসাজশেও নিু আদালতের কোনো কোনো মামলায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম তারিখ ফেলা হয়। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের অতি ব্যস্ততার সুযোগ গ্রহণ করা হয়। কারণ মামলার সংখ্যাধিক্যের কারণে বিচারকরা এত ব্যস্ত থাকেন যে, অনেক ক্ষেত্রেই পেশকাররা নথিতে যেমন তারিখ বসিয়ে দেন, তেমনিভাবেই তা ধার্য হয়ে যায়।

এমন দু’একটি ঘটনার উদাহরণ জানা আছে বলেই এখানে তা উল্লেখ করা হল। তবে এসব বিষয়ে তদারকি করা হয় কিনা তা আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ নিম্ন আদালতে বা দেশের ৬৪টি জেলার আদালতগুলোয় একেকটি মামলায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অযথা লম্বা লম্বা তারিখ ফেলে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি করা হয় কিনা, এ বিষয়ে হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট থেকে ভালোভাবে দেখভাল করা হয় কিনা সে বিষয়টি দেশের মানুষ সঠিকভাবে জানতে বা বুঝতে পারছেন না। ফলে অনেক মামলার ক্ষেত্রেই ইচ্ছাকৃত বা দুরভিসন্ধিমূলকভাবে লম্বা লম্বা তারিখ ফেলানোর সন্দেহটি একেবারে অমূলক নয়।

আগেই বলা হয়েছে, সামান্য মামলাতেও লম্বা লম্বা তারিখ ফেলার ঘটনা আমাদের জানা আছে। এখন সেসব ঘটনার প্রতিকার কী সে বিষয়টি খুঁজে বের করাই হবে সময়ের কাজ। সর্বোচ্চ আদালত থেকে যদি বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আদালতের ওই শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী-উকিলের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে, এমনকি এক্ষেত্রে যদি কোনো বিচারকের গাফিলতি থাকে সে বিষয়টিও নজরদারি করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা যায়, তাহলে দেশের নিরীহ বিচারপ্রার্থীদের জন্য তা একটি সুখবর বলেই বিবেচিত হবে।

কারণ ছয় মাস বা এক বছরেই যে বিচারকার্যটি নিষ্পত্তি হতে পারত, তারিখের পর তারিখ ফেলে বছরের পর বছর ধরে তা যে প্রলম্বিত করা হয় সে বিষয়টিও কিন্তু ওপেন সিক্রেট! দেশের প্রতিটি বিচারালয়ে যে উপচে পড়া ভিড় এবং মাননীয় বিচারকরা যে, এসব ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সে কথাটি যেমন সত্য, ঠিক তেমনি একশ্রেণির বিচারক সামান্য একটি মামলা যা অতি সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতার পথে হাঁটেন তেমন অভিযোগও রয়েছে।

এ অবস্থায় যেসব মামলা সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব, আদালতের পেশকার-কর্মচারী বা একশ্রেণির উকিলের ইচ্ছার বলি হয়ে সেসব মামলা যেন দীর্ঘসূত্রতার পথে না হাঁটে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারকদেরই কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আর সেসব বিষয়ে সজাগ থেকে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিচারকদের টেবিলে মামলার জটও অনেকাংশে কমে আসবে।

অন্যথায় আদালতের ওই শ্রেণির পেশকার-কর্মচারী ও উকিল তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যদি আদালতকে ব্যবহার করার সুযোগ পান, তাহলে যুগ যুগ ধরে বিচারপ্রার্থী মানুষের হয়রানি অব্যাহত থাকবে। সুতরাং আদালতকে সুষ্ঠু ও গতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনতে দেশের ৬৪টি জেলার বিচারককেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

আদালতের কোনো পেশাকার-কর্মচারী কোনো বিচারপ্রার্থীর নোটিস জারির ক্ষেত্রে তা ফেলে রাখা, সঠিকভাবে বিলি না করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত কিনা, বা কোনো পেশকার-উকিলের যোগসাজশে বিচারকার্যকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা হচ্ছে কিনা- এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট আদালতের মাননীয় বিচারকদেরই খুঁজে দেখতে হবে।

একজন বিচারপ্রার্থীর সঠিক ও সুষ্ঠু বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন বিচারকেরই আরও বেশি ভূমিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ আদালতের প্রশাসনিক কর্মচারীদের মূল্যবোধের অভাবে বিচারপ্রার্থী জনগণকে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। আদালত থেকে একটি রায় বা অন্য কোনো কাগজপত্রের একটি কপি ওঠাতে গেলেই ভুক্তভোগীরা তা হাড়ে হাড়ে টের পান।

এ অবস্থায় বিচারালয়ে যদি কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রাধান্য বজায় থাকে, তাহলে যুগ যুগ ধরে বিচারপ্রার্থীদের যন্ত্রণা-বঞ্চনা অব্যাহত থাকবে। বিচার প্রার্থনা করতে গিয়ে তাদের দুই-তিনগুণ অর্থ ও সময়ের অপচয় করতে হবে।

ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমলের কথা শুনেছি, একজন উকিল বা মোক্তার একটি কেস গ্রহণ করার পর বছরের পর বছর পার হলে সেই উকিল সাহেবের মৃত্যুর পরও তার পুত্র বা উত্তরসূরিকে সেই মামলা বছরের পর বছর ধরে পরিচালনা করতে হতো।

কিন্তু আজ স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর যদি সেই অবস্থাই বহাল থাকে, তাহলে স্বাধীনতার সুফল জনগণ ভোগ করছেন- এক্ষেত্রে সে কথাটিই বা ধোপে টেকে কীভাবে? বলা বাহুল্য, এখনও একজন সাধারণ নাগরিককে সামান্য একটি মামলায় বছরের পর বছর আদালতে ঘোরাঘুরি করতে হয়। আর এক্ষেত্রে আদালতের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বহুলাংশে দায়ী।

আদালত প্রাঙ্গণ থেকে কায়েমি স্বার্থবাদী কর্মচারী এবং একশ্রেণির উকিলের দৌরাত্ম্য কমানো এক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একবার একটি জেলা শহরের একজন জেলা ও দায়রা জজ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে উপরোক্ত প্রসঙ্গটি টেনে কথা বলতে চাইলে তিনি নিজেও আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন, ‘আদালতের একশ্রেণির কর্মচারী ও উকিলের কারণেও মামলার দীর্ঘসূত্রতা বেড়ে যায়।’ আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেছিলাম, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না কেন? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'They are very powerful.' সেই জেলা ও দায়রা জজ সাহেবকে আমার পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই তার সহজ স্বীকারোক্তি আমার কাছে প্রকাশের জন্য।

আর সেই সঙ্গে বিষয়টির প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি তথা গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে দেশের আইন-আদালতেও গতিশীলতা আনয়ন করা প্রয়োজন। ভেবে দেখা প্রয়োজন এখনও কেন সামান্য ছোটখাটো একটি মামলাতেও একজন বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর আদালতে ঘোরাঘুরি, হয়রানি-পেরেশানিসহ দুই-তিনগুণ সময় ও অর্থ খরচ করতে হবে।

এক্ষেত্রে যাদের অর্থ খরচের সামর্থ্য আছে, সে কথাটি বাদ দিলেও তো তাদেরও সময় নষ্ট হয়, নাকি? আবার যাদের অর্থ নেই বা অর্থের অভাব, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি যে ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ সে কথাটিও জনান্তিকে বলে রাখা ভালো।

পরিশেষে উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, দেশের মানুষের জন্য আইনি সুবিধা সহজতর করার লক্ষ্যে বিচারাঙ্গনে নজরদারি বাড়ানো দরকার বলেই মনে হয়।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

মিঠে কড়া সংলাপ

বিচারব্যবস্থায় জনগণের হয়রানি দূর হোক

 মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন 
১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের বিচারাঙ্গনে কী হচ্ছে, জনগণ সেখানে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কিনা এবং সেসব ভোগান্তির মাত্রা কত, সে বিষয়ে সঠিক জরিপ চালানো হয় বা হচ্ছে বলে মনে হয় না। ফলে নিরীহ জনসাধারণের ভোগান্তির মাত্রা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।

আদালত চত্বরে, আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার করে দিতে হচ্ছে; কিন্তু তবুও মামলার সুরাহা হচ্ছে না। এমনকি অতি সাধারণ একটি মামলা যা দুই-এক মাসে বা ছয় মাসের মধ্যেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, সেক্ষেত্রেও একজন বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর ধরে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।

আর এজন্য মূলত দায়ী একশ্রেণির উকিল এবং আদালতের পেশকার-কর্মচারী। কারণ অনেক আইনজীবীকেই দেখা যায়, তিনি তার মক্কেলের পক্ষে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেন। ফলে এসব মামলার ক্ষেত্রে আদালতের পেশকার-কর্মচারীরা বিমাতাসুলভ আচরণ করার সুযোগ পেয়ে যান।

আবার একশ্রেণির আইনজীবী ও পেশাকারের যোগসাজশেও নিু আদালতের কোনো কোনো মামলায় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম তারিখ ফেলা হয়। আর এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিচারকদের অতি ব্যস্ততার সুযোগ গ্রহণ করা হয়। কারণ মামলার সংখ্যাধিক্যের কারণে বিচারকরা এত ব্যস্ত থাকেন যে, অনেক ক্ষেত্রেই পেশকাররা নথিতে যেমন তারিখ বসিয়ে দেন, তেমনিভাবেই তা ধার্য হয়ে যায়।

এমন দু’একটি ঘটনার উদাহরণ জানা আছে বলেই এখানে তা উল্লেখ করা হল। তবে এসব বিষয়ে তদারকি করা হয় কিনা তা আমাদের জানা নেই। অর্থাৎ নিম্নআদালতে বা দেশের ৬৪টি জেলার আদালতগুলোয় একেকটি মামলায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অযথা লম্বা লম্বা তারিখ ফেলে বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি করা হয় কিনা, এ বিষয়ে হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্ট থেকে ভালোভাবে দেখভাল করা হয় কিনা সে বিষয়টি দেশের মানুষ সঠিকভাবে জানতে বা বুঝতে পারছেন না। ফলে অনেক মামলার ক্ষেত্রেই ইচ্ছাকৃত বা দুরভিসন্ধিমূলকভাবে লম্বা লম্বা তারিখ ফেলানোর সন্দেহটি একেবারে অমূলক নয়।

আগেই বলা হয়েছে, সামান্য মামলাতেও লম্বা লম্বা তারিখ ফেলার ঘটনা আমাদের জানা আছে। এখন সেসব ঘটনার প্রতিকার কী সে বিষয়টি খুঁজে বের করাই হবে সময়ের কাজ। সর্বোচ্চ আদালত থেকে যদি বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আদালতের ওই শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী-উকিলের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে, এমনকি এক্ষেত্রে যদি কোনো বিচারকের গাফিলতি থাকে সে বিষয়টিও নজরদারি করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা যায়, তাহলে দেশের নিরীহ বিচারপ্রার্থীদের জন্য তা একটি সুখবর বলেই বিবেচিত হবে।

কারণ ছয় মাস বা এক বছরেই যে বিচারকার্যটি নিষ্পত্তি হতে পারত, তারিখের পর তারিখ ফেলে বছরের পর বছর ধরে তা যে প্রলম্বিত করা হয় সে বিষয়টিও কিন্তু ওপেন সিক্রেট! দেশের প্রতিটি বিচারালয়ে যে উপচে পড়া ভিড় এবং মাননীয় বিচারকরা যে, এসব ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সে কথাটি যেমন সত্য, ঠিক তেমনি একশ্রেণির বিচারক সামান্য একটি মামলা যা অতি সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব, সেক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতার পথে হাঁটেন তেমন অভিযোগও রয়েছে।

এ অবস্থায় যেসব মামলা সহজেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব, আদালতের পেশকার-কর্মচারী বা একশ্রেণির উকিলের ইচ্ছার বলি হয়ে সেসব মামলা যেন দীর্ঘসূত্রতার পথে না হাঁটে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারকদেরই কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আর সেসব বিষয়ে সজাগ থেকে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিচারকদের টেবিলে মামলার জটও অনেকাংশে কমে আসবে।

অন্যথায় আদালতের ওই শ্রেণির পেশকার-কর্মচারী ও উকিল তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যদি আদালতকে ব্যবহার করার সুযোগ পান, তাহলে যুগ যুগ ধরে বিচারপ্রার্থী মানুষের হয়রানি অব্যাহত থাকবে। সুতরাং আদালতকে সুষ্ঠু ও গতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনতে দেশের ৬৪টি জেলার বিচারককেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

আদালতের কোনো পেশাকার-কর্মচারী কোনো বিচারপ্রার্থীর নোটিস জারির ক্ষেত্রে তা ফেলে রাখা, সঠিকভাবে বিলি না করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত কিনা, বা কোনো পেশকার-উকিলের যোগসাজশে বিচারকার্যকে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা হচ্ছে কিনা- এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট আদালতের মাননীয় বিচারকদেরই খুঁজে দেখতে হবে।

একজন বিচারপ্রার্থীর সঠিক ও সুষ্ঠু বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন বিচারকেরই আরও বেশি ভূমিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ আদালতের প্রশাসনিক কর্মচারীদের মূল্যবোধের অভাবে বিচারপ্রার্থী জনগণকে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। আদালত থেকে একটি রায় বা অন্য কোনো কাগজপত্রের একটি কপি ওঠাতে গেলেই ভুক্তভোগীরা তা হাড়ে হাড়ে টের পান।

এ অবস্থায় বিচারালয়ে যদি কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রাধান্য বজায় থাকে, তাহলে যুগ যুগ ধরে বিচারপ্রার্থীদের যন্ত্রণা-বঞ্চনা অব্যাহত থাকবে। বিচার প্রার্থনা করতে গিয়ে তাদের দুই-তিনগুণ অর্থ ও সময়ের অপচয় করতে হবে।

ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমলের কথা শুনেছি, একজন উকিল বা মোক্তার একটি কেস গ্রহণ করার পর বছরের পর বছর পার হলে সেই উকিল সাহেবের মৃত্যুর পরও তার পুত্র বা উত্তরসূরিকে সেই মামলা বছরের পর বছর ধরে পরিচালনা করতে হতো।

কিন্তু আজ স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর যদি সেই অবস্থাই বহাল থাকে, তাহলে স্বাধীনতার সুফল জনগণ ভোগ করছেন- এক্ষেত্রে সে কথাটিই বা ধোপে টেকে কীভাবে? বলা বাহুল্য, এখনও একজন সাধারণ নাগরিককে সামান্য একটি মামলায় বছরের পর বছর আদালতে ঘোরাঘুরি করতে হয়। আর এক্ষেত্রে আদালতের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বহুলাংশে দায়ী।

আদালত প্রাঙ্গণ থেকে কায়েমি স্বার্থবাদী কর্মচারী এবং একশ্রেণির উকিলের দৌরাত্ম্য কমানো এক্ষেত্রে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। একবার একটি জেলা শহরের একজন জেলা ও দায়রা জজ সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে উপরোক্ত প্রসঙ্গটি টেনে কথা বলতে চাইলে তিনি নিজেও আমার কাছে স্বীকার করেছিলেন, ‘আদালতের একশ্রেণির কর্মচারী ও উকিলের কারণেও মামলার দীর্ঘসূত্রতা বেড়ে যায়।’ আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেছিলাম, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না কেন? প্রত্যুত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'They are very powerful.' সেই জেলা ও দায়রা জজ সাহেবকে আমার পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই তার সহজ স্বীকারোক্তি আমার কাছে প্রকাশের জন্য।

আর সেই সঙ্গে বিষয়টির প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, অন্যান্য ক্ষেত্রে অগ্রগতি তথা গতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে দেশের আইন-আদালতেও গতিশীলতা আনয়ন করা প্রয়োজন। ভেবে দেখা প্রয়োজন এখনও কেন সামান্য ছোটখাটো একটি মামলাতেও একজন বিচারপ্রার্থীকে বছরের পর বছর আদালতে ঘোরাঘুরি, হয়রানি-পেরেশানিসহ দুই-তিনগুণ সময় ও অর্থ খরচ করতে হবে।

এক্ষেত্রে যাদের অর্থ খরচের সামর্থ্য আছে, সে কথাটি বাদ দিলেও তো তাদেরও সময় নষ্ট হয়, নাকি? আবার যাদের অর্থ নেই বা অর্থের অভাব, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি যে ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ সে কথাটিও জনান্তিকে বলে রাখা ভালো।

পরিশেষে উপরোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, দেশের মানুষের জন্য আইনি সুবিধা সহজতর করার লক্ষ্যে বিচারাঙ্গনে নজরদারি বাড়ানো দরকার বলেই মনে হয়।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট