ধোঁয়াশা দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুন
jugantor
ধোঁয়াশা দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুন

  এ কে এম শাহনাওয়াজ  

১৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দেশ পরিচালনা করা সোজা কথা নয়। সরকারকে নানাদিক বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণ করতে হয়। আমাদের মতো অজ্ঞ অর্বাচীনরা তা সবসময় বুঝতে চাই না। তাই মাঝেমধ্যে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি। তবে যার যার অঞ্চলের অভিজ্ঞতার তো কিছু সঞ্চয় থাকে!

আমরা যারা জীবনের একটি বড় সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছি, একাডেমিক দায়িত্ব ছাড়াও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে; তারা ক্যাম্পাসে নানা সংকট কেমন করে তৈরি হয় এবং সেসব কীভাবে নিষ্পত্তি করে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হয়, তা আমাদের মতো করেই বুঝতে পারি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হয়তো তাদের মতো করে ভাবে। তবে দুই অঞ্চলের ভাবনায় মাঝেমধ্যে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাংশ ভিসিবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিক্ষক ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশ আন্দোলনে সাড়া না দেয়ায় আন্দোলন লক্ষণীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি।

তবে একশ্রেণির সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বহীন সহযোগিতায় দেশবাসী একটি খণ্ডিত চিত্রকে পূর্ণাঙ্গ বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনো এক গোষ্ঠীর উত্থাপিত অভিযোগকে সত্য মেনে রায় দেয়ার মতো স্বল্পশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষের অভাব নেই এ দেশে।

তারা কোনো প্রমাণ পাওয়া বা তদন্তে সত্য প্রকাশের আগেই ক্যাম্পাসের ক্ষুদ্র অংশের বিশেষ উদ্দেশ্যে করা অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এর প্রতিক্রিয়া খুব ভালো হয় না। এমন ধোঁয়াটে অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। এ কারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের উচিত, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে তা দ্রুত জনসম্মুখে উন্মোচন করা।

যেহেতু আমরা জেনেছি, ভিসির পক্ষ এবং অভিযোগকারীদের পক্ষ যার যার তথ্যপ্রমাণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এর বাইরে গোয়েন্দাদের কাগজপত্রও জমা হয়েছে। তারপরও সিদ্ধান্ত এখনও জানাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট পক্ষ। এভাবে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ বিলম্বিত হওয়ায় আবার ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

অনেক সাধারণ মানুষও বলাবলি করছে, সত্যি যদি অভিযোগের সারবত্তা না থাকবে তাহলে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশে এত গড়িমসি কেন! এভাবে দায়টি কিন্তু সরকারপক্ষের ওপরই বর্তাচ্ছে।

শীতের ছুটির পর এখন ক্যাম্পাসে ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়মিত চলছে। এর মধ্যে অল্প ক’জনকে নিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে ভিসিবিরোধী আন্দোলনকারীরা ঝটিকা মিছিল করছে। এসব মিছিলে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা খুব একটা সামনে থাকছেন না। পেছন থেকে এগিয়ে দিচ্ছেন তাদের অনুসারী ছাত্রদের।

ক্যাম্পাসের ভেতর এর তেমন প্রভাব না থাকলেও বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার অবকাশ থাকছে। এসব কারণে আমরা মনে করি, ধোঁয়াশার ভেতর আর ফেলে না রেখে সত্য সামনে নিয়ে আসা এখন রাষ্ট্রপক্ষের জন্যই জরুরি।

আমরা বরাবরই দেখে আসছি, ক্যাম্পাসে কোনো সংকট তৈরি হলে এর প্রতিবিধানের ক্ষমতা যখন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের হাতে চলে যায়; তখনই সরকারের ধীরে চলা নীতি প্রকাশ্য হয়। এতে সরকারের কতটা লাভ হয় আমি জানি না, তবে অসত্য ডালপালা মেলতে থাকে। বিভ্রান্ত হতে থাকে দেশবাসী। জট বাড়ে বলে তা খুলতেও সময় লাগে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় ভিসির বিরুদ্ধে করা ছাত্র-শিক্ষকদের একটি খণ্ডিতাংশের অভিযোগ এবং এর প্রতিক্রিয়ার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া অচল অবস্থার খবর দেশবাসী রাখে। এখন তো সারা দেশে মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নেই।

যে ধরনের নিউজ করলে পাঠক ‘খাবে’- সত্যাসত্য যাই হোক; তেমন সংবাদই পরিবেশিত হবে কোনো কোনো মিডিয়ায়। এতে অহেতুক কে হেয় হলেন, কাদের বিনা কারণে লাঞ্ছিত হতে হল, তা পরোয়া করে না সেসব মিডিয়ার দায়িত্ববানরা। অবশ্য এসব কারণে সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিবেশিত সংবাদের ওপর মানুষের আগ্রহ ও আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া কাগজপত্র দেখে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্তে আসবে, আমরা জানি না; তবে এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে তো আন্দোলনকারী পক্ষের অভিযোগের সারবত্তা খুঁজে পাচ্ছি না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মুক্তচিন্তার মানুষও মেলাতে পারছেন না অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠতা।

অনেক খটকা রয়েছে এখানে। যদি ব্যক্তি (ভিসি) ড. ফরজানা ইসলামের কথা বলি- তাকে ক্যাম্পাসে সবাই ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবেই জানেন। হঠাৎ রাতারাতি তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ হয়ে গেলেন কেমন করে! প্রথমত, একটি অডিও প্রচার করে আমাদের চমকে দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বড় নেতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কথোপকথন।

তাতে জানা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন বাজেট থেকে একটি বড় অঙ্কের টাকা চাঁদা হিসেবে ওদের বিতরণ করেছেন ভিসি মহোদয়।

আর তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশ, সেইসঙ্গে জামায়াতপন্থী, বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি যৌগিক দল এবং বামপন্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিবিরপন্থী হিসেবে গোয়েন্দাদের কাছে চিহ্নিত ছাত্রদের কিছু অংশ ভিসি মহোদয়কে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগের দাবি তোলেন।

সংখ্যায় এরা খুব কম হলেও একটি আলোড়ন তো তৈরি হল। তবে এতে অনেক খটকাও আমাদের সামনে চলে এলো। প্রথমত, কথিত তথ্য ছাড়া ভিসি মহোদয়ের প্রত্যক্ষ কোনো অংশগ্রহণ অডিওতে নেই। যে কেউই তো কাউকে বিপদে ফেলতে এমন কাল্পনিক অডিও প্রচার করতে পারেন।

যদি অডিওকেই মানতে হয়, তবে তো আত্মস্বীকৃত ছাত্রলীগের চাঁদা গ্রহীতা নেতাদের গ্রেফতার করার দাবি ওঠার কথা ছিল সবার আগে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে একেবারেই নীরব আন্দোলনকারীরা। যেন তাদের কাজ কিছুটা এগিয়ে দিয়েছে ছাত্রলীগের ছেলেরা; অথবা এভাবেই প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে অডিওতে একটি অভিযোগের সূত্র পাওয়া যাচ্ছে মাত্র। এতে যে কোনো সচেতন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দাবি থাকত, অডিওতে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করার; এর সত্যাসত্য খুঁজে বের করার। অথচ এসবের ধার না ধেরে সবকিছু ছাপিয়ে ভিসির পদত্যাগের দাবি তুলে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল।

মনে হল, কোনো পক্ষের যেন ভিসির আসনটি ফাঁকা করা প্রয়োজন। প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা নাড়াচাড়া করার ইচ্ছেটিকে যেন আর দমাতে পারছিলেন না। তাই সঠিক প্রেক্ষাপট তৈরি না হলেও অতি সামান্য ইশারাতেই ভিসিবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটি পাঁচ কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ থেকে উত্তোলিত অংশের পাই পাই খরচের হিসাব দিয়ে দিল। আরেক অডিওতে কথিত চাঁদা গ্রহীতা ছাত্রলীগের ছেলেরা স্বীকার করল, প্রকৃত অর্থে তারা কোনো চাঁদা নেয়নি। তাদের নেতাদের নির্দেশে অমন অডিও বানাতে হয়েছিল।

আমরা মনে করেছিলাম, এ সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর আপনা আপনি আন্দোলন থেমে যাবে; কিন্তু তা হল না। আন্দোলনকারীদের প্রেস্টিজ ইস্যু যেন হয়ে গেল এটা। যুক্তি ও তথ্যহীনতার মাঝে বসেও তারা আন্দোলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে লাগলেন।

ক্লাসরুম তালাবন্ধ করে দিলেন। প্রশাসনিক ভবনে তালা দিলেন। ভিসির বাড়ি অবরুদ্ধ করলেন; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সহানুভূতি বা সমর্থন আদায় করতে পারলেন না। প্রেক্ষাপট তৈরি করে সাধারণ শিক্ষার্থীর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে মিছিল বড় করা সম্ভব হল না।

অবশেষে সরকার পক্ষ মুখ খুললেন। সরকারপ্রধানও জানালেন, তাদের কাছে ভিসির দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ নেই। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের বেশ অনেকটা ক্ষতি করে আন্দোলনকারীরা তদন্তের প্রস্তাব মানলেন। দুই পক্ষ স্ব স্ব কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেন।

আমরা ভাবলাম, এখন দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু অনেক দিন চলে গেল; অথচ ফলাফল দেখতে পাচ্ছি না। যে কারণে আবার উষ্ণতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাস উত্তপ্ত না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।

এর ফলাফল শিক্ষাঙ্গনে কখনও শুভ হয় না। আমরা চাই, যা সত্য তা যেন প্রকাশ্যে আসে। ভিসি যদি অপরাধ করে থাকেন, তার যেমন প্রতিবিধান প্রয়োজন; তেমনি গোষ্ঠীস্বার্থ অর্জনের জন্য কোনো পক্ষ যদি ভিসি মহোদয়কে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেন বা দেশবাসীর সামনে হেয় প্রতিপন্ন করেন, তারও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন; তবে সরকারেরই দায়িত্ব দেশবাসীর সামনে তার নিষ্কলুষতার প্রমাণ দিয়ে তাকে সম্মানিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নষ্ট ছাত্র রাজনীতি এবং সুবিধাবাদী শিক্ষক রাজনীতি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও সৌন্দর্য রক্ষা করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং যদি এর প্রতিবিধান করা না যায়, তবে এ বিষবাষ্প বরাবরের মতো ছড়িয়ে পড়বে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ডিজিটাল যুগে অডিও ভিডিওতে যে কাউকে ফাঁসানো কঠিন কোনো কাজ নয়।

এর আলামত তো আমরা নানা জায়গাতেই দেখছি। এতে করে এখন জনমানসে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি। সত্যিকার অভিযোগে সংগঠিত আন্দোলন নিয়েও তৈরি হচ্ছে সন্দেহ। এভাবে মুক্তচিন্তার পবিত্র ভূমি কলুষিত হচ্ছে প্রতিদিন।

এসব বাস্তবতা সামনে রেখে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর কাছে নিবেদন করতে চাই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গটির দ্রুত একটি ন্যায়ানুগ নিষ্পত্তি যাতে করা হয়। আমরা অনেকটাই সেশনজটমুক্ত হয়েছিলাম। আবার এক-দুই মাসের জটে পড়ে গেছি।

আরও অন্ধকার নেমে আসুক, তা কেউ চাইব না। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও প্রশাসন কেউ প্রশ্নের মুখোমুখি হোক তা কাম্য নয়। আমরা চাইব, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত থাক।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ধোঁয়াশা দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুন

 এ কে এম শাহনাওয়াজ 
১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

দেশ পরিচালনা করা সোজা কথা নয়। সরকারকে নানাদিক বিবেচনা করে নীতি নির্ধারণ করতে হয়। আমাদের মতো অজ্ঞ অর্বাচীনরা তা সবসময় বুঝতে চাই না। তাই মাঝেমধ্যে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ি। তবে যার যার অঞ্চলের অভিজ্ঞতার তো কিছু সঞ্চয় থাকে!

আমরা যারা জীবনের একটি বড় সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছি, একাডেমিক দায়িত্ব ছাড়াও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে; তারা ক্যাম্পাসে নানা সংকট কেমন করে তৈরি হয় এবং সেসব কীভাবে নিষ্পত্তি করে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হয়, তা আমাদের মতো করেই বুঝতে পারি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হয়তো তাদের মতো করে ভাবে। তবে দুই অঞ্চলের ভাবনায় মাঝেমধ্যে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর একাংশ ভিসিবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শিক্ষক ও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশ আন্দোলনে সাড়া না দেয়ায় আন্দোলন লক্ষণীয় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি।

তবে একশ্রেণির সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বহীন সহযোগিতায় দেশবাসী একটি খণ্ডিত চিত্রকে পূর্ণাঙ্গ বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। শুধু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনো এক গোষ্ঠীর উত্থাপিত অভিযোগকে সত্য মেনে রায় দেয়ার মতো স্বল্পশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত মানুষের অভাব নেই এ দেশে।

তারা কোনো প্রমাণ পাওয়া বা তদন্তে সত্য প্রকাশের আগেই ক্যাম্পাসের ক্ষুদ্র অংশের বিশেষ উদ্দেশ্যে করা অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এর প্রতিক্রিয়া খুব ভালো হয় না। এমন ধোঁয়াটে অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। এ কারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষের উচিত, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে তা দ্রুত জনসম্মুখে উন্মোচন করা।

যেহেতু আমরা জেনেছি, ভিসির পক্ষ এবং অভিযোগকারীদের পক্ষ যার যার তথ্যপ্রমাণ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এর বাইরে গোয়েন্দাদের কাগজপত্রও জমা হয়েছে। তারপরও সিদ্ধান্ত এখনও জানাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট পক্ষ। এভাবে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ বিলম্বিত হওয়ায় আবার ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

অনেক সাধারণ মানুষও বলাবলি করছে, সত্যি যদি অভিযোগের সারবত্তা না থাকবে তাহলে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশে এত গড়িমসি কেন! এভাবে দায়টি কিন্তু সরকারপক্ষের ওপরই বর্তাচ্ছে।

শীতের ছুটির পর এখন ক্যাম্পাসে ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়মিত চলছে। এর মধ্যে অল্প ক’জনকে নিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে ভিসিবিরোধী আন্দোলনকারীরা ঝটিকা মিছিল করছে। এসব মিছিলে আন্দোলনকারী শিক্ষকরা খুব একটা সামনে থাকছেন না। পেছন থেকে এগিয়ে দিচ্ছেন তাদের অনুসারী ছাত্রদের।

ক্যাম্পাসের ভেতর এর তেমন প্রভাব না থাকলেও বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার অবকাশ থাকছে। এসব কারণে আমরা মনে করি, ধোঁয়াশার ভেতর আর ফেলে না রেখে সত্য সামনে নিয়ে আসা এখন রাষ্ট্রপক্ষের জন্যই জরুরি।

আমরা বরাবরই দেখে আসছি, ক্যাম্পাসে কোনো সংকট তৈরি হলে এর প্রতিবিধানের ক্ষমতা যখন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের হাতে চলে যায়; তখনই সরকারের ধীরে চলা নীতি প্রকাশ্য হয়। এতে সরকারের কতটা লাভ হয় আমি জানি না, তবে অসত্য ডালপালা মেলতে থাকে। বিভ্রান্ত হতে থাকে দেশবাসী। জট বাড়ে বলে তা খুলতেও সময় লাগে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় ভিসির বিরুদ্ধে করা ছাত্র-শিক্ষকদের একটি খণ্ডিতাংশের অভিযোগ এবং এর প্রতিক্রিয়ার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া অচল অবস্থার খবর দেশবাসী রাখে। এখন তো সারা দেশে মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ নেই।

যে ধরনের নিউজ করলে পাঠক ‘খাবে’- সত্যাসত্য যাই হোক; তেমন সংবাদই পরিবেশিত হবে কোনো কোনো মিডিয়ায়। এতে অহেতুক কে হেয় হলেন, কাদের বিনা কারণে লাঞ্ছিত হতে হল, তা পরোয়া করে না সেসব মিডিয়ার দায়িত্ববানরা। অবশ্য এসব কারণে সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিবেশিত সংবাদের ওপর মানুষের আগ্রহ ও আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া কাগজপত্র দেখে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্তে আসবে, আমরা জানি না; তবে এ প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে তো আন্দোলনকারী পক্ষের অভিযোগের সারবত্তা খুঁজে পাচ্ছি না। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের মুক্তচিন্তার মানুষও মেলাতে পারছেন না অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠতা।

অনেক খটকা রয়েছে এখানে। যদি ব্যক্তি (ভিসি) ড. ফরজানা ইসলামের কথা বলি- তাকে ক্যাম্পাসে সবাই ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবেই জানেন। হঠাৎ রাতারাতি তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ হয়ে গেলেন কেমন করে! প্রথমত, একটি অডিও প্রচার করে আমাদের চমকে দেয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বড় নেতার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কথোপকথন।

তাতে জানা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন বাজেট থেকে একটি বড় অঙ্কের টাকা চাঁদা হিসেবে ওদের বিতরণ করেছেন ভিসি মহোদয়।

আর তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশ, সেইসঙ্গে জামায়াতপন্থী, বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি যৌগিক দল এবং বামপন্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও শিবিরপন্থী হিসেবে গোয়েন্দাদের কাছে চিহ্নিত ছাত্রদের কিছু অংশ ভিসি মহোদয়কে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে তার পদত্যাগের দাবি তোলেন।

সংখ্যায় এরা খুব কম হলেও একটি আলোড়ন তো তৈরি হল। তবে এতে অনেক খটকাও আমাদের সামনে চলে এলো। প্রথমত, কথিত তথ্য ছাড়া ভিসি মহোদয়ের প্রত্যক্ষ কোনো অংশগ্রহণ অডিওতে নেই। যে কেউই তো কাউকে বিপদে ফেলতে এমন কাল্পনিক অডিও প্রচার করতে পারেন।

যদি অডিওকেই মানতে হয়, তবে তো আত্মস্বীকৃত ছাত্রলীগের চাঁদা গ্রহীতা নেতাদের গ্রেফতার করার দাবি ওঠার কথা ছিল সবার আগে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে একেবারেই নীরব আন্দোলনকারীরা। যেন তাদের কাজ কিছুটা এগিয়ে দিয়েছে ছাত্রলীগের ছেলেরা; অথবা এভাবেই প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে অডিওতে একটি অভিযোগের সূত্র পাওয়া যাচ্ছে মাত্র। এতে যে কোনো সচেতন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দাবি থাকত, অডিওতে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করার; এর সত্যাসত্য খুঁজে বের করার। অথচ এসবের ধার না ধেরে সবকিছু ছাপিয়ে ভিসির পদত্যাগের দাবি তুলে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল।

মনে হল, কোনো পক্ষের যেন ভিসির আসনটি ফাঁকা করা প্রয়োজন। প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা নাড়াচাড়া করার ইচ্ছেটিকে যেন আর দমাতে পারছিলেন না। তাই সঠিক প্রেক্ষাপট তৈরি না হলেও অতি সামান্য ইশারাতেই ভিসিবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটি পাঁচ কোটি টাকার প্রাথমিক বরাদ্দ থেকে উত্তোলিত অংশের পাই পাই খরচের হিসাব দিয়ে দিল। আরেক অডিওতে কথিত চাঁদা গ্রহীতা ছাত্রলীগের ছেলেরা স্বীকার করল, প্রকৃত অর্থে তারা কোনো চাঁদা নেয়নি। তাদের নেতাদের নির্দেশে অমন অডিও বানাতে হয়েছিল।

আমরা মনে করেছিলাম, এ সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর আপনা আপনি আন্দোলন থেমে যাবে; কিন্তু তা হল না। আন্দোলনকারীদের প্রেস্টিজ ইস্যু যেন হয়ে গেল এটা। যুক্তি ও তথ্যহীনতার মাঝে বসেও তারা আন্দোলনের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে লাগলেন।

ক্লাসরুম তালাবন্ধ করে দিলেন। প্রশাসনিক ভবনে তালা দিলেন। ভিসির বাড়ি অবরুদ্ধ করলেন; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সহানুভূতি বা সমর্থন আদায় করতে পারলেন না। প্রেক্ষাপট তৈরি করে সাধারণ শিক্ষার্থীর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করলেন। তবে মিছিল বড় করা সম্ভব হল না।

অবশেষে সরকার পক্ষ মুখ খুললেন। সরকারপ্রধানও জানালেন, তাদের কাছে ভিসির দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ নেই। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের বেশ অনেকটা ক্ষতি করে আন্দোলনকারীরা তদন্তের প্রস্তাব মানলেন। দুই পক্ষ স্ব স্ব কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেন।

আমরা ভাবলাম, এখন দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু অনেক দিন চলে গেল; অথচ ফলাফল দেখতে পাচ্ছি না। যে কারণে আবার উষ্ণতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাস উত্তপ্ত না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে।

এর ফলাফল শিক্ষাঙ্গনে কখনও শুভ হয় না। আমরা চাই, যা সত্য তা যেন প্রকাশ্যে আসে। ভিসি যদি অপরাধ করে থাকেন, তার যেমন প্রতিবিধান প্রয়োজন; তেমনি গোষ্ঠীস্বার্থ অর্জনের জন্য কোনো পক্ষ যদি ভিসি মহোদয়কে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেন বা দেশবাসীর সামনে হেয় প্রতিপন্ন করেন, তারও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন; তবে সরকারেরই দায়িত্ব দেশবাসীর সামনে তার নিষ্কলুষতার প্রমাণ দিয়ে তাকে সম্মানিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নষ্ট ছাত্র রাজনীতি এবং সুবিধাবাদী শিক্ষক রাজনীতি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও সৌন্দর্য রক্ষা করতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং যদি এর প্রতিবিধান করা না যায়, তবে এ বিষবাষ্প বরাবরের মতো ছড়িয়ে পড়বে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ডিজিটাল যুগে অডিও ভিডিওতে যে কাউকে ফাঁসানো কঠিন কোনো কাজ নয়।

এর আলামত তো আমরা নানা জায়গাতেই দেখছি। এতে করে এখন জনমানসে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি। সত্যিকার অভিযোগে সংগঠিত আন্দোলন নিয়েও তৈরি হচ্ছে সন্দেহ। এভাবে মুক্তচিন্তার পবিত্র ভূমি কলুষিত হচ্ছে প্রতিদিন।

এসব বাস্তবতা সামনে রেখে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর কাছে নিবেদন করতে চাই, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গটির দ্রুত একটি ন্যায়ানুগ নিষ্পত্তি যাতে করা হয়। আমরা অনেকটাই সেশনজটমুক্ত হয়েছিলাম। আবার এক-দুই মাসের জটে পড়ে গেছি।

আরও অন্ধকার নেমে আসুক, তা কেউ চাইব না। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও প্রশাসন কেউ প্রশ্নের মুখোমুখি হোক তা কাম্য নয়। আমরা চাইব, বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানসৃষ্টির প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত থাক।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়