বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও বাংলাদেশের রাজস্ব আয়

  ড. এ কে আবদুল মোমেন ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা

টেকসই উন্নয়নের জন্য উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো দেশের একার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। সুষম ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সহযোগী ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি শক্ত আঞ্চলিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা। এ কারণেই বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা-২০৩০-এর সর্বশেষ লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে এসডিজি-১৭। যার মূল লক্ষ্য হল টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব উজ্জীবিতকরণ এবং বাস্তবায়নের উপায়গুলো শক্তিশালীকরণ।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের জন্য অংশগ্রহণকারী সব দেশের উচিত বিশেষ বিশেষ কিছু দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি দেয়া। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে আর্থিক ও অর্থবহির্ভূত খাত, সরকারি-বেসরকারি খাত এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনয়ন। আর্থিক খাতের মধ্যে অন্যতম হল অভ্যন্তরীণ কর, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ), বিদেশে টাকা পাচার বন্ধকরণ ইত্যাদি। অন্যদিকে অর্থবহির্ভূত সম্পদের মধ্যে রয়েছে দেশীয় নীতি কাঠামো, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ প্রশাসন, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। একদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা ও গতিশীলতা আনয়নে অনবরত সংগ্রাম করে যাচ্ছে; অপরদিকে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে নিয়ে আসতে নানারকম সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। এ কার্যক্রমকে আরও জোরদার ও সত্যিকারভাবে অর্জন করাই এসডিজি-১৭-এর উদ্দেশ্য।

১৯৯০ সাল থেকে বিগত দুই দশকে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির ফলে রাজস্ব আয় মোট জিডিপির ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ মধ্যআয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধারা পরিলক্ষিত হয়। তারপরও দারিদ্র্যপীড়িত ও অভাবগ্রস্ত দেশগুলোতে উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দেশীয় রাজস্ব আয়ে ঘাটতি রয়েই গেছে। জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম রাজস্ব আদায়কারী বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যেসব দেশে এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাস যেমন- বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়া- এসব দেশে জিডিপির অনুপাতে কর-রাজস্বের হার এখনও ১৫ শতাংশের নিচে।

নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলো (এলএমআইসিএস), বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশগুলো তাদের উন্নয়ন এজেন্ডা অর্থায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বা বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে। অথচ ২০১৩ সালে অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) অন্তর্ভুক্ত মাত্র ছয়টি দাতা দেশ জাতিসংঘের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মোট জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ সরকারি উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে ব্যয় করার শর্ত পূরণ করতে পেরেছে। অধিকাংশ দেশই ওয়াদাকৃত উন্নয়ন সহায়তা প্রদানের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ২০১৫ সালে মোট নিট সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) ছিল ১৩১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বিরাট অঙ্কের মধ্য থেকে মাত্র ৩৭.৩ বিলিয়ন ডলার গিয়েছে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে। বিভিন্ন সূচকে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করতে হলে প্রায় ৫ থেকে ১১ ট্রিলিয়ন বার্ষিক সাহায্য প্রয়োজন। সে তুলনায় ধনিক দেশগুলো থেকে যে সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে তা নিতান্তই কম- ১ শতাংশেরও কম। এসডিজি-১৭ এ অবস্থার পরিবর্তন চায়। এ অভীষ্টের মূল সুর হচ্ছে : উন্নয়নশীল দেশগুলোর দেশীয় ও বৈদেশিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা বৃদ্ধি, সমন্বিত নীতি ও কর্মপন্থার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা টেকসইকরণ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে পৌঁছানোর কর্মপন্থা বাস্তবায়ন ও শক্তিশালীকরণের ওপর আলোকপাত করা। মোট কথা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও আর্থিক সম্পদ ভাগাভাগির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করে এসডিজি-১৭।

সাম্প্রতিককালে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ ২০১৫-১৬ সালের স্থীরমূল্যে এসডিজি বাস্তবায়নের খরচ অনুমান করেছে মোট ৯২৮.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭-২০৩০ সময়ের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক বিভিন্ন উৎস থেকে বার্ষিক ব্যয় দরকার হবে প্রায় ৬৬.৩২ বিলিয়ন ডলার। এ বিপুল পরিমাণ সম্পদের ঘাটতি পূরণে অর্থ জোগানের উৎস হিসেবে বেসরকারি খাত ৪২.০৯ শতাংশ, সরকারি খাত ৩৫.৫০ শতাংশ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ৫.৫৯ শতাংশ, বৈদেশিক অর্থায়ন ১৪.৮৯ শতাংশ এবং বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান ৩.৩৯ শতাংশ অবদান রাখবে বলে অনুমান করা হয়েছে। সব স্টেকহোল্ডারকে সঙ্গে নিয়ে বৈশ্বিক অভীষ্ট ও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এসডিজির কার্যকর বাস্তবায়নে জাতীয় পকিল্পনার দক্ষ পদচারণা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বর্তমান অগ্রগতিকে আরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এগিয়ে নিতে সরকার বদ্ধপরিকর।

বাংলাদেশে জাতীয় রাজস্বের একটি বড় খাত হল কর-রাজস্ব। এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ মোট রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ। সমপর্যায়ের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত আনুমানিক ১০ শতাংশ। এখন পর্যন্ত যা সবচেয়ে কম। এর পেছনে দায়ী মূলত সংকুচিত করভিত্তি, বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা। বাংলাদেশের স্বল্প কর আহরণ সূচকের (লো ট্যাক্স-ইফোর্ট ইনডেক্স) মান বর্তমানে ০.৪৯৩ (বিবিএস, ২০১২), যা থেকে বোঝা যায় দেশের রাজস্ব আদায় সক্ষমতা এখনও অদক্ষতার পর্যায়েই রয়ে গেছে। বর্তমান রাজস্ব আহরণ সক্ষমতার উন্নয়ন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি পুনর্গঠনসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আরও আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র ২১ শতাংশ বা ৩৩ লাখ মানুষ আয়কর দেন। আয়করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য যেসব নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র আছে তাদের সবাইকে আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ দিতে বাধ্য করা উচিত। কর্পোরেশনের জন্য টিআইএন প্রথা চালু রাখলে করদাতার সংখ্যা বাড়বে এবং রাজস্ব আয়ও বাড়বে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি আর্থিক সহায়তা (ওডিএ), প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং রেমিটেন্সসহ অন্যান্য বৈদেশিক সম্পদের পর্যাপ্ত অন্তঃপ্রবাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ের পূর্ব পর্যন্ত বৈদেশিক খাত থেকে আগত আর্থিক সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নয়ন হলেও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তা মোটেও যথেষ্ট ছিল না। ২০১০-২০১৪ সময়ের মধ্যে সরকারি উন্নয়ন সহায়তার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়েছে ১৪.২ শতাংশ, যদিও পরের দুই বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৭ সালে তা কমে নেমে গেছে ১১.২ শতাংশে। ২০১০-১৪ সময়ের মধ্যে টেলিযোগাযোগ, টেক্সটাইল ও জ্বালানি খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের হার বার্ষিক প্রায় ১৪.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ আরও বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিগত সময়গুলোতে রেমিটেন্স প্রবাহের বার্ষিক গড় প্রায় ৭.৬ শতাংশ হারে বেড়েছে, যদিও মাঝখানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন বৈদেশিক শ্রমবাজারে শ্রমশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে অবৈধ অভিবাসীসহ নানাবিধ কারণে ব্যাপক ধসের ফলে এ খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০১০ সালে সরকারি আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ছিল ১৭৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৭৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১০ সালের ৯১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের বিপরীতে ২০১৭ সালে বিনিয়োগ এসেছে ২৪৫৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে এসডিজি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রয়োজনীয় সম্পদ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত উন্নয়ন পরামর্শ ও সহায়তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ বিভাগ সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ সংগ্রহের স্বার্থে বিভিন্ন দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এরই মধ্যে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সহায়তা নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় সম্পদ সংস্থান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন’ (এনপিডিসি) প্রস্তুত করেছে। এ প্রচেষ্টার পাশাপাশি আছে হাই-লেভেল পলিটিক্যাল ফোরামগুলোতে (এইচএলপিএফ) সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের অগ্রগতি ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের ওপর জাতীয় পর্যালোচনা তুলে ধরা, কার্যকর উন্নয়ন সহায়তার জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের ওপর উচ্চপর্যায়ের মিটিং (হাই-লেভেল মিটিং- এইচএলএম-২)। ২০১৭-এর ডিসেম্বরে উচ্চ পর্যায়ের মিটিংয়ে (এইচএলএম-২) পরবর্তী সময়ে কার্যকর উন্নয়ন সহায়তার জন্য বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের (জিপিইডিসি) সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ, যা বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। এছাড়াও নিয়মিত স্থানীয় পর্যায়ে পরামর্শ বৈঠক, অনলাইন সেবা পোর্টাল ‘এইড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’-এর যাত্রা, ব্যাপক সরকারি অর্থায়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থ প্রবাহের কৌশলগত রূপান্তর এবং বৈদেশিক সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (বিডিএফ) আয়োজন হল এ বিভাগের প্রধান প্রধান গৃহীত পদক্ষেপ।

টেকসই উন্নয়নের জন্য জিডিপিতে রাজস্বের অনুপাত বৃদ্ধি করা জরুরি। জিডিপির তুলনায় মোট সরকারি রাজস্বের অনুপাতের মাধ্যমে যেমন অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়, তেমনি বাজেট ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতার বিষয়েও ধারণা পাওয়া যায়। ২০১৬-১৭ সালে কর-রাজস্ব এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব মিলিয়ে সরকারি রাজস্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১৮৫.০ বিলিয়ন টাকা, যা মোট জিডিপির প্রায় ১১.১ শতাংশ। আগের বছরের ৯.৬ শতাংশের তুলনায় রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে মূলত নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, কর-রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দূরদর্শী কর-আহরণ ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। এগুলোই রাজস্ব বৃদ্ধির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। যদি এ প্রবৃদ্ধির ধারা ভবিষ্যতে ধরে রাখা যায়, তাহলে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আহরণের হার ২০২০ সালের মাইলফলক ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। দেশে বর্তমানে মোট সরকারি রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে কর-রাজস্ব থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশীয় বাজেটে এ খাতের অবদান বেড়েছে। ২০১৭ সালের বাজেট অর্থায়নে কর-খাতের অবদান ২০২০-এর মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের বাজেট ব্যয় অর্থায়নে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং সরকারি উন্নয়ন সহায়তাসহ বিভিন্ন বৈদেশিক উৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মোট বাজেট অর্থায়নের প্রায় ১৫ শতাংশ এসব উৎসের অবদান। ২০১৬ সালে নিট সরকারি উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ ছিল ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৬.৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু দেশের মোট বার্ষিক বাজেটে সরকারি উন্নয়ন সহায়তার অবদান ২০১৫ সালের চেয়ে হ্রাস পেয়েছে। বিগত কয়েক বছরে উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ ৯ শতাংশ স্তরের চেয়ে কম হারে কমেছে এবং ২০১৩-১৪ সালে মোট বাজেটে অবদানের ভিত্তিতে পৌঁছেছে ৯.৯ শতাংশ স্তরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন সহায়তার প্রবৃদ্ধির চেয়ে জাতীয় বাজেটের প্রবৃদ্ধির আকার বাড়ছে দ্রুত গতিতে। ২০১৭ সালে এসে এফডিআইয়ের পরিমাণ এবং মোট বাজেটের অনুপাত উভয়ই বেড়েছে, যদিও ২০৩০ সালের মাইলফলক অর্জন এখনও রয়ে গেছে অনেকটা দূরে। এফডিআইবিষয়ক আরেকটি দিক হল দেশীয় বিনিয়োগের অর্থায়নে এফডিআইয়ের অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় বিনিয়োগে এফডিআইয়ের অর্থায়ন বিশেষভাবে লক্ষণীয় কোনো প্রবণতা ছাড়াই প্রায় ৩.২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে।

২০১০ সাল থেকে রেমিটেন্সের বার্ষিক প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, ২০১৫ সালে যা সর্বোচ্চ প্রায় ১৫.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়; কিন্তু পরবর্তী দুই বছরে এর পরিমাণ কমে অনেকটাই নিচে নেমে এসেছে। জিডিপির অনুপাতে রেমিটেন্স প্রবাহের এ নিম্নগামী হার সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছে ২০১৭ সালে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের মাইলফলক (১৪ শতাংশ) অর্জন অনেকটাই কঠিন হয়ে গেছে বাংলাদেশের জন্য। বৈদেশিক শ্রমবাজারে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে সম্প্রতি বিমসটেকের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ অনুদান দেয়ায় ফলে রেমিটেন্সের পরিমাণ বেড়েছে। আশা করা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে তা ১৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে।

যে কোনো দেশের জন্য ঋণসেবা পরিশোধের বিরাট অঙ্ক প্রকৃতপক্ষে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির সক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণসেবা বোঝার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের। ২০১২ সালে ঋণের বোঝা ছিল প্রায় ৭ শতাংশ, ২০১৬ সালে যা কমে নেমে আসে ৪.৬ শতাংশে। অর্থবছর ২০১৭তে এ বোঝার হার আরও কমে প্রায় ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। সহায়তার অন্তঃপ্রবাহ কমে যাওয়ায় একদিকে ঋণসেবা অনুপাতের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে টেকসই হয়েছে রফতানি প্রবৃদ্ধি। ফলস্বরূপ ২০২০ সালসহ ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রাও ২০১৭ সালের মধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।

অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়নের জন্য অন্ত ও আন্তঃদেশীয় অবাধ তথ্য ও প্রযুক্তিগত যোগাযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের যোগাযোগ প্রযুক্তি ও যোগাযোগ সুবিধার স্তর এবং বিশ্বব্যাপী জ্ঞান ভাগাভাগির সুযোগকে সহজলভ্য করে। স্থায়ী ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা জ্ঞান অনুসন্ধান এবং শেয়ারিংয়ের অবারিত সুযোগ প্রদান করে। দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রহীতার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৬ সালে প্রতি ১০০ জনে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা হিসাব করা হয়েছে ৩.৭৭; ২০১৪ সালের তুলনায় যা প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল সময়ের মধ্যে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণের হার বেড়েছে বার্ষিক গড়ে প্রায় ৫৪.৯ শতাংশ এবং ২০১৫-১৬ সময়ের মধ্যে ৫৬.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্টারনেট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এ অবদান বিস্ময়কর। এ সূচক অনুসারে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশের লক্ষ্য অর্জনে বাকি বছরগুলোতে বার্ষিক মাত্র ১২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। দেশে ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ২০১০ সালের ৩.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৫ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০.৩৯ শতাংশে। নতুন এ যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী মানুষের সংখ্যা খুব দ্রুত গতিতে বেড়ে ২০১৭ সালে পৌঁছে গেছে প্রায় ৪১.৪ শতাংশে। ২০১৮ সালে এসে যা পৌঁছেছে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালেই ২০২০ সালের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে।

সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে এমন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে সহায়তার অঙ্গীকার ছিল মোট ৫৩০.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৭ সালে এসে এ অংশ বিপুল পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৬৭৭.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।

একটি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে অনুকূল শুল্কহার সুবিধা ভোগ করে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তির সদস্যপদ থাকায় বাংলাদেশ রফতানির ক্ষেত্রেও বিশেষ শুল্কহার সুবিধা ভোগ করে। ২০১১ সালে উন্নত দেশ কর্তৃক বাংলাদেশের কষিজাত দ্রব্য এবং বস্ত্র ও পোশাক খাতে আরোপিত গড় শুল্কহার ছিল ০-৯ শতাংশের মধ্যে; যা ২০১৫ সালের ১২ শতাংশ থেকে অনেকটা কম। এ সূচক স্পষ্ট করে, আমদানিকারক দেশগুলোর ক্ষেত্রেও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যেই এসডিজির লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের দারুণ কৃতিত্ব সত্ত্বেও এখনও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষ করে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও কর-জালের (ট্যাক্স নেট) বাইরে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও কর-জালের বাইরে রয়ে গেছে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় করদাতার সংখ্যার দ্বিগুণ। সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রয়োজনীয় লোকবল এবং কারিগরি সক্ষমতায় ঘাটতির কারণে ভ্যাট সংগ্রহ কার্যক্রম শক্তিশালী করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু অভ্যন্তরীণ প্রতিকূল পরিবেশ নয়, এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বহিঃস্থ উৎস থেকে প্রাপ্ত সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজেট ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বৈদেশিক সম্পদের একটি বড় উৎস। সাম্প্রতিক সময়ে মোট জাতীয় বাজেটের আকারের তুলনায় সরকারি উন্নয়ন সহায়তার অবদান কমে আসছে। এছাড়াও বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লেখানোয় ভবিষ্যতে কম সুদে ঋণপ্রাপ্তি এবং বিভিন্ন সহায়তা বরাদ্দ পেতে আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এ দেশে রেমিটেন্সের উৎস খুব বেশি বৈচিত্র্যময় নয়। প্রচলিত বৈদেশিক শ্রমবাজারে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেই চলেছে। অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও গভীরভাবে নজর দেয়া প্রয়োজন। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতির কারণে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের খুব বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। বিনিয়োগের জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। মোটের ওপর এসডিজির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসডিজি বাস্তবায়নকালীন এসব সূচকের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জিত হয়েছে এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সঠিক পথেই এগোচ্ছে দেশ। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বাংলাদেশকে সময়মতো পর্যাপ্ত সহায়তা প্রদান করা, অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সূচক অর্জনে ব্যর্থতার দায়ভার তাদেরও নিতে হবে।

ড. এ কে আবদুল মোমেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×