বস্ত্র খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র রুখে দিন

  মীর আবদুল আলীম ১৯ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বস্ত্র খাত

দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাত এখন ধ্বংসের মুখে। এ খাত নিয়ে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র আছে। আন্তর্জাতিক চালে আটকে যাচ্ছে এ শিল্প। গত কয়েক বছরে অসংখ্য টেক্সটাইল মিল (তাঁত) বন্ধ হয়ে গেছে। এখন একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সুতা কলগুলো। যেগুলো চালু আছে, উৎপাদিত সুতা বিক্রি হচ্ছে না। গোডাউনে সুতার পাহাড় জমছে।

স্পিনিং মিলগুলোতে বর্তমানে আড়াই লাখ টন সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে বলে জানা যায়। যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। প্রায় প্রতিদিনই এমন সংবাদ ছাপছে আমাদের পত্রিকাগুলো। আন্তর্জাতিক চক্র অত্যন্ত সুকৌশলে বাংলাদেশে পুরো বস্ত্র খাতকে করায়ত্তে নিয়ে আসার জন্য পরিকল্পিতভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। যেভাবে সুতা, বস্ত্র ও গার্মেন্ট খাতকে ধীরে ধীরে গ্রাস করা হচ্ছে, তাতে আগামীতে ভিনদেশিদের একচেটিয়া ব্যবসার হাতে বাংলাদেশকে পুতুল হয়েই থাকতে হবে।

বিদেশি আগ্রাসনের ফলে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্ট খাত পরনির্ভর হয়ে পড়বে। এদিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে মিল মালিকরা এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত। ঋণখেলাপি হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে পড়েছে; অনেকটি আবার বন্ধ হয়ে গেছে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই। অন্যদিকে তুলার বাজার ঊর্ধ্বমুখী আর উৎপাদিত সুতার বাজার নিম্নমুখী। বেশি দামে আমদানিকৃত তুলা দিয়ে সুতা ও কাপড় তৈরি করে মিল মালিকরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। ক্রেতার অভাবে গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে লাখ লাখ টন সুতা। এভাবে মাসের পর মাস লোকসান দিয়ে এবং ব্যাংকের ঋণ ও সুদ গুনতে গিয়েই বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিল। আর দেশীয় সুতা ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাক শিল্পেও পড়তে শুরু করেছে নেতিবাচক প্রভাব।

বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ কম দামের ভিনদেশি সুতা প্রবেশ করায় দেশীয় সুতার কারখানাগুলো অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। কারণ বাংলাদেশের সুতা কারখানার মালিকদের সার্ভিস চার্জ ও চক্রবৃদ্ধিসহ ব্যাংক ঋণের সুদের হার গুনতে হয় ২২ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত; যা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক ডিজিটে করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন, ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য না হলে শিল্প টিকে থাকবে না। শিল্প টিকে না থাকলে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে; সেই সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। আরেকটি বিষয় আছে সেটা হল, এ খাতে অধিকাংশ রাষ্ট্র মিলগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে থাকে; কিন্তু আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয় না।

আমাদের স্পিনিং মিলগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলা কিনতে হয় চড়া দামে। তুলা ক্রয়-বিক্রয়েও ঢুকে পড়েছে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। শেয়ারবাজারের মতো তুলার দাম বাড়িয়ে দিয়ে সটকে পড়েছে ওই চক্রটি। কয়েক বছর আগে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ সেন্ট ছিল প্রতি পাউন্ড তুলা; সেখানে লাফিয়ে লাফিয়ে সেই তুলা উঠে আসে ২ ডলার ৫০ থেকে ৮০ সেন্টে। আবার বাড়তি দর তুলে দিয়েই সটকে পড়ে প্রতারকরা। সেই তুলাই এখন নেমে আসে ১ ডলার ৫০ সেন্টে। ফলে ভোক্তা স্পিনিং মিলগুলো বিপাকে পড়ে। আন্তর্জাতিক এ চক্রটি বাজারে তুলার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কাগজে-কলমেই বাড়িয়ে দেয় তুলার দাম। বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভোক্তার কাঁধে লোকসানের বোঝা চাপিয়েই সটকে পড়ে তারা। এদিকে চড়া সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে বাধ্য হওয়ায় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকটে বিপদে পড়েছেন স্পিনিং মিল মালিকরা। চাইলেই গ্যাস-বিদ্যুৎ পায়না শিল্প মালিকরা।

ভারত, চীনসহ কয়েকটি রাষ্ট্র বাংলাদেশের সুতা ও বস্ত্র খাতের বাজার পুরোপুরি দখল করে রাখতে সুকৌশলে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একদিকে তারা এ খাতকে দিচ্ছে আকর্ষণীয় প্রণোদনা (ইনসেনটিভ) সুবিধা, অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও রেখেছে সর্বনিম্ন। ফলে ভারতীয় সুতা কলগুলোর উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম পড়ছে। কেজিপ্রতি তারা ৫ থেকে ৫ ডলার ২০ সেন্ট দরে বিক্রি করছে। আর নানা বৈধ-অবৈধ পথে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণে এ কম দামের সুতা প্রবেশ করায় দেশীয় সুতার কারখানাগুলো অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। কারণ বাংলাদেশের সুতা কারখানার মালিকদের সার্ভিস চার্জ ও চক্রবৃদ্ধিসহ ব্যাংক ঋণের সুদের হার গুনতে হয় ২২ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত। আবার সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতের জন্য কোনো ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয় না। ফলে সব মিলিয়ে দেশীয় মিলগুলোর অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার পথে।

সুতা শিল্পে বিদ্যমান দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা চলতে থাকলে মিলগুলোর সবই সুতা বিক্রি করতে না পেরে অর্থ সংকটে বন্ধ হয়ে যাবে। আর এগুলো একবার বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প বন্ধ হয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পুরো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পে ধস নামবে। সংকটের সুযোগে তখন ভারতীয় সুতা বিক্রেতারা আরও বেশি দামে বাংলাদেশে সুতা বিক্রি করবেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থা শ্রীলংকা, মরিসাসের মতো হবে। বর্তমানে পোশাক রফতানিতে যে প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, সেটা কোনোভাবেই সফল হবে না। বরং বস্ত্র ও তৈরি পোশাকগুলোর লোকসানের পরিণামে ব্যাংকগুলোও দেউলিয়া হয়ে যাবে। কারণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েই বস্ত্র ও পোশাক কারখানায় বিনিয়োগ হয়েছে। শিল্প-কারখানা বন্ধ ও ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় দেশে বেকারত্বের হারও অনেক বেড়ে যাবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটবে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা তৈরি হবে।

আমরা মনে করি, স্পিনিং তথা গোটা বস্ত্র খাতে চলমান সংকট সমাধানের উপায় হচ্ছে- ১. বস্ত্র মিলগুলোর জন্য অন্তত ২০ শতাংশ হারে ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদান, ২. গোটা বস্ত্র খাতের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ৭-৮ শতাংশে নিয়ে আসা, ৩. দেশীয় সুতা ও কাপড় প্রস্তুতকারকদের ১৫-২০ শতাংশ হারে ক্যাশ ইনসেনটিভ দিতে হবে। সুতা-বস্ত্রশিল্পকে বাঁচাতে হলে ও ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রক্ষা করতে এ উদ্যোগ নিতেই হবে সরকারকে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটেরও সমাধান করতে হবে। আমাদের শিল্প সংরক্ষণ নীতি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প-আগ্রাসনও প্রতিরোধ করতে হবে। এ ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব না দিলে বস্ত্র শিল্প বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।

মীর আবদুল আলীম : সাংবাদিক, গবেষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×